ময়ূরগাঁথা

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

নিচের ছবিটি দেখুন। প্রথমেই মনে হতে পারে একটি বাচ্চা ময়ূর তার মায়ের সাথে বসে আছে। কিন্তু এখানে ২টি মজার বিষয় আছে। প্রথমত এটি আসলে মা ময়ূর না, বরং বাবা ময়ূর। দ্বিতীয়ত যাকে আপনি বাচ্চা ময়ূর ভেবেছেন, সে’ই আসলে ময়ূরী।

হ্যাঁ, সঠিক শুনেছেন।

ছবি- পুরুষ ও নারী ময়ূর।

আমরা ময়ূর এবং ময়ূরীদের চিনতে প্রায়ই ভুল করে ফেলি।

পুরুষ ময়ূরদের শরীরেই  এধরনের চোখধাঁধানো রং বেরং এর পেখম থাকে। আর নারী ময়ূর দেখতে খুবই সাধারণ পুরুষ ময়ূরের তুলনায়।  এদের শরীরে এই ধরনের আকর্ষণীয়,লম্বা কোন পেখম নেই, আবার পালকের রংও অনেকটা কালচে বা ধুসর প্রকৃতির। ময়ূর ও ময়ূরী পাশাপাশি থাকলে মনে হয়, যেন  তাদের মধ্যে এক আকাশ পাতাল তফাৎ। কিন্তু দেখতে খুব সাধারণ হলেও পুরুষদের জন্য তারা খুবই মুল্যবান। কারণ, তাদের মন জয় করা অতটাও সহজ নয়। আর মন জয় করতে না পারলে প্রজননও অসম্ভব। এদিকে প্রজনন না হলে তো আবার ভবিষ্যত প্রজন্ম আসবেনা। এতে ময়ূরের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

যদিও আমাদের সমাজে দেখা যায়, পুরুষদের আকর্ষণ করার জন্য নারীরা অনেকেই দামী শাড়ী, চাকচিক্যময় গহনাসহ অনেক প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করে থাকে।

একইরকমভাবে, ময়ূর সমাজেও তাদের রং ছটানো পালকগুলোই পুরুষ ময়ূরদের কাছে দামী গহনার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। প্রজননের এর সময় এলে পুরুষরা নারীদের আশে পাশে এসে ঘুরঘুর করে। একধরনের মৃদু শব্দের মাধ্যমে  নিজেদের প্রণয় অনুভূতির জানান দেয়। আর দৃষ্টি আর্কষণ করতে প্রেয়সীর সামনে ৬-৭ফুট লম্বা বিশাল পেখমগুলো মেলে ধরে। অতঃপর, এক বিশেষ ভঙ্গিমায় নৃত্য শুরু করে।

ছবি- ময়ূরীকে সম্মোহনের চেষ্টায় ময়ূর।

 যার পেখম যত লম্বা, বিস্তৃত ও উজ্জ্বল, নারীরা মনে করে সে তত বেশি প্রজননের উপযুক্ত। আর উপযুক্ত সঙ্গী থেকে জন্ম নিবে সুস্থ, সুন্দর ভবিষ্যত প্রজন্মরা। তাই সেই বাছাইকৃত বিশেষ পুরুষের সাথেই সঙ্গমে লিপ্ত হয় নারী ময়ূর।

তাহলে পুরো ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখলে বুঝা যায়, পুরুষ ময়ূরের ঝিলমিলে পেখম গুলো এত আকর্ষণীয়ভাবে বিবর্তিত হয়েছেই আসলে নারীদের মন জয় করার জন্য।

নইলে দেখুন, এই কমনীয় পেখম গুলো কিন্তু পুরুষদের অস্তিত্বের জন্য খুব বেশি উপকারী না। বরং কিছুটা অসুবিধাও সৃষ্টি করে। কারণ বনে জঙ্গলে থাকা অন্যান্য শিকারী প্রাণীদেরকেও রঙিন পেখমগুলো আকর্ষণ করে। এত লম্বা পেখম নিয়ে দ্রুত পালাতে পারেনা। আবার নিজেকে সহজে কোথাও লুকিয়ে ফেলতেও পারেনা এরা। সুতরাং, অস্তিত্ব আবার হুমকীর মুখে।

ছবি- ময়ূরের পেখম।

কিন্তু  আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরিবেশ থেকে লক্ষনীয় একটা নেগেটিভ ট্রেইট থাকার পরও, কিভাবে এই রাজকীয় সৌন্দর্য নিয়ে ময়ূর প্রজাতী হাজার হাজার বছর প্রকৃতিতে টিকে আছে?

এর কারণ হলো- দেখা যাচ্ছে,  ময়ূর তার চিত্তাকর্ষক পেখমগুলো থেকে ইতিবাচক আর নেতিবাচক দুটো প্রভাব  পেলেও, তুলনামুলকভাবে ইতিবাচক  প্রভাবটা নেতিবাচকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। অর্থাৎ, পেখমের সাহায্যে ময়ূরীকে আকৃষ্ট করে  প্রজাতিকে রক্ষা করার হার, সেই একই পেখমের মাধ্যমে শিকারী পশুরা আকৃষ্ট হয়ে ময়ূরকে মেরে ফেলার হারের তুলনায় বেশি।  আর এভাবে প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও বংশ পরম্পরায় লাল নীল ঝলমলে পেখমগুলো নিয়ে পুরুষ ময়ূর টিকে যাচ্ছে।

দারুন নাহ?

তবে সুসংবাদ হলো, পুরুষ ময়ূরও কিন্তু বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। অর্থাৎ, লম্বা পালকগুলোকে এরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যও ব্যবহার করে থাকে। যখন কোন শিকারী আক্রমণ করতে চলে আসে, তখন  ময়ূর এদের বিশাল পেখমগুলো তার সামনে মেলে ধরে। আর বোঝাতে চায়, “এই দেখ, আমি কত্ত বড়ো!! “

আর ভয় পেয়ে অনেক ঠুনকো শিকারী পালিয়েও যায়। এরা আবার উড়তেও পারে। যদিও পায়রা, ঈগলের মত খুব বেশি দুর যেতে পারেনা।

ছবি- ময়ূর উড়তেও পারে।

সেই উড়াকে কাজে লাগিয়ে গাছের উঁচু ডালে আশ্রয় নেয়। আর সেখান অবধি শিকারীরা সহজে পৌঁছাতে পারেনা। এবং রাতের বেলায়ও শিকারী থেকে দুরে থাকতে এরা রাতটা গাছে কাটাতেই পছন্দ করে।

এখন কথা হলো- আমরা তো জানলাম, পুরুষ ময়ূরের এত বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য পাওয়ার পেছনের রহস্য।

কিন্তু নারী ময়ূর কেন দেখতে তেমন বৈচিত্র্যময় হয় না? কিংবা কেনই বা এদের পেখম নেই? তবে চলুন, উত্তরটা খোঁজ করা যাক।

নারী ময়ূর এদের অধিকাংশ সময় কাটায় বাচ্চাদের সাথে। প্রজননের পর মাসে প্রায় ৫-১০টি বাচ্চা জন্ম দেয়।  

ছবি- বাচ্চাগুলোর দেখভাল করে নারী ময়ূর।

বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনা, সুস্থ ভাবে বড় করার সম্পুর্ন দায় দায়িত্ব পালন করে মা ময়ূর। এদের পিতার থেকে কোন সাহায্য নেওয়া ছাড়াই।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, ময়ূরীকে তার বাচ্চাদের শিকারীর থেকে বাঁচাতে সবসময় বাসার আশে পাশেই থাকতে হয়।

তাই এর গায়ের রং এমন ভাবে বিবর্তিত হয়েছে, যা দেখতে অনেকটা তার বাসা বা চারপাশের পরিবেশের সাথে মিশে যায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ক্যামোফ্ল্যাজ (Camouflage)  বলা হয়।

পুরুষ ময়ূরের মত দেখতে  এত চাকচিক্যময় হলে তো, শত্রুরা এসে এর বাসায় হানা দিবে। বাচ্চাসহ একেও মারা পড়তে হবে। এভাবে প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাঁচতে এরা কালচে বা,ধুসর বর্ণে বিবর্তিত হয়েছে।

 আর এই মা ময়ূরগুলো যথেষ্ট সামাজিক। আপনি এদের বাসায় এনে পুষতেও পারবেন। কিন্তু একবার আপনি এর বাচ্চা বা ডিমের দিকে কুনজর দিয়েছেন তো, এটা আপনার চোখ খুলে নিয়ে আসতেও দ্বিধা বোধ করবেনা। এরা বাচ্চার প্রতি অতটাই সংবেদনশীল।

এখন প্রশ্ন হলো,

সন্তানের দ্বায়িত্ব কর্তব্য ছেড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই পিতা ময়ূরের কি খবর? একে কোথায় পাওয়া যাবে?

হুমম, আসলে অন্য নারী ময়ূরের সাথে। মানে, প্রজনন কালে একটি পুরুষ ময়ূর প্রায় ২-৬ টি ময়ূরী নিয়ে নিজের জন্য হেরেম তৈরি করে। ওখানেই সে প্রজনন প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়। প্রত্যেক নারী ময়ূর ৪-৮টি ডিম দেয়। এদের প্রায় ২৮ দিন ধরে তা দেয়। তো বলা যেতে পারে, পুরুষ ময়ূর বস্তুতপক্ষে বহুগামী।এই আচরণও সম্ভবত প্রজাতি রক্ষার স্বার্থেই। তবে দুঃখের বিষয় হলো-  আসলেই এদের প্রজাতি এখন হুমকির মুখে এগিয়ে যাচ্ছে । প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে ময়ূর শিকার হচ্ছে। হয় পোষবার উদ্দেশ্যে নয়ত মাংসের জন্য। অথবা এদের সুন্দর পালকগুলোর জন্য।

তবে অনুরোধ থাকবে যদি ময়ূরের পালক সংগ্রহের খুব ইচ্ছেই থাকে, তবে এদের প্রজননের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। প্রজননের পর দু এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরুষ ময়ূর তার সব পালক ত্যাগ করে। তখন আপনারা এর ছেড়ে যাওয়া  রঙিন পালকগুলো সংগ্রহ করতে পারেন।

তাহলে ময়ূর কি এর সৌন্দর্য আর ফিরে পাবেনা? এই ভেবে চিন্তার কিছু নেই।

আবার নতুন করে এদের শরীরে ১৫০-২০০টির মত ঝলমলে পালক গজাতে শুরু করে। আবার সে মেলে ধরে তার রুপ লাবণ্য প্রকৃতিতে। সেই রুপের ভাবাবেশে এসে অনেকে মনে করে__ ময়ূর সৌন্দর্যের প্রতীক। আবার কারো কাছে তো শুভের প্রতীকও বটে। ভারতে ময়ূরকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় পাখির মর্যাদা। একে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক দেশে অজস্র লোকগাথা। এভাবে ১০-২৫ বছরের আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে রেখে যায় সে তার জীবন, যৌবন ও বার্ধক্যের পসরা।

পরিশেষে, রবি ঠাকুরের এক টুকরো কবিতা দিয়ে শেষ করি আজকের পাঠ-

টুনটুনি কহিলেন, ‘রে ময়ুর, তোকে
দেখে করুণায় মোর জল আসে চোখে।’
ময়ুর কহিল, ‘বটে! কেন কহ শুনি,
ওগো মহাশয় পক্ষী, ওগো টুনটুনি।’
টুনটুনি কহে, ‘এ যে দেখিতে বেআড়া,
দেহ তব যত বড়ো পুচ্ছ তারো বাড়া।
আমি দেখো লঘুভারে ফিরি দিনরাত,
তোমার পশ্চাতে পুচ্ছ বিষম উৎপাত।’
ময়ুর কহিল, ‘শোক করিয়ো না মিছে—
জেনো ভাই, ভার থাকে গৌরবের পিছে।’

তথ্যসূত্র-

লেখাটি 101-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 907 other subscribers