বই পর্যালোচনাঃ মস্তিষ্ক বিজ্ঞান ও রহস্যের গভীরে

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

টম সোরেনসন, বয়স সতেরো। ড. রামচন্দ্রের চেম্বারে ভারাক্রান্ত মনে বসে আছেন। ড. রামচন্দ্রের কাছে আসার কারণ তার হাতে প্রচন্ড ব্যথা, যা কিনা কয়েকমাস আগে দুর্ঘটনায় সে হারায়। এমনকি এই হাত দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিও সে পায় স্পষ্ট! মিরাবেল্লা ২৫ বছর বয়সী প্রাণবন্ত নারী। ড. রামচন্দ্রের কাছে এসেছেন টমের মতোই সমস্যা নিয়ে। তবে মিরাবেল্লার জন্ম থেকেই হাত নেই! কিন্তু তার অনুভূত হাত নাকি স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে ছয় থেকে আট ইঞ্চি ছোট। ড. রামচন্দ্র পরীক্ষা করে দেখলেন এই অনুভূতি বাস্তব!

ডায়ান ফ্লেচার এক চটপটে, হাসিখুশি মেয়ে কার্বন মনোঅক্সাইডের বিষক্রিয়ায় তিনি নিজের দৃষ্টি শক্তি হারান। অথচ প্রফেসর মিলানের কাছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গেলে, মিলানের হাত থেকে ঠিক স্বাভাবিক মানুষের মতো, স্বাভাবিক গতিতে পেন্সিল তুলে নেয়। এমনকি একটি আড়াআড়িভাবে রাখা চিঠির বাক্সে সফলভাবে চিঠির খাম ফেলে দেয়!

লেখক হাসান তারেক চৌধুরী

উপরে উল্লেখিত ঘটনা দুটি যেমন আশ্চর্যজনক, তেমনি ভুতুড়েও। প্রথম ঘটনাকে বলে ফ্যান্টম লিম্ব আর দ্বিতীয় ঘটনাটি দিয়ে বোঝা যায়, আমাদের মস্তিষ্ক কত জটিল উপায়ে আমাদের দৃষ্টির অনুভূতি তৈরি করে। আমরা জানি যে, বস্তু থেকে আলো রেটিনায় প্রতিফলিত হয়ে তা দর্শন অনুভূতি সৃষ্টি করে। তবে দ্বিতীয় ঘটনা থেকে বুঝতেই পারছেন বিষয়টা মোটেও এত সহজ নয়, যতটা আমরা জানি। বরং তিনটে জটিল ধাপের মাধ্যমে আমাদের এই সম্পূর্ণ দৃষ্টি অনুভূতির সৃষ্টি হয়। আর ফ্যান্টম লিম্বের পিছনেও রয়েছে মস্তিষ্কের জটিল, অদ্ভুত কারিকুরি। আর মস্তিষ্কের যাবতীয় এই কারিকুরি নিয়েই লেখা “মস্তিষ্ক — বিজ্ঞান ও রহস্যের গভীরে”! 

There are no sights, sounds, tastes or smells in the world–just various types of waves and molecules. Therefore, are “virtual” constructions created by the brain.

               — Rita Carter

বইয়ের বিষয়বস্তু ও দৃষ্টপাত

বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলার আগে বইয়ের বিষয়বস্তুর সজ্জাটা বলা দরকার। মস্তিষ্ক বরাবরই বেশ কৌতূহলী অঙ্গ। এর কারিকুরিগুলো তাই সহজে উপস্থাপন করাও জটিল। তবে এই কাজটি লেখক অতি দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সাথে করেছেন। বইয়ের প্রথম অধ্যায় তিনি মস্তিষ্ক বিষয়ক কিছু চুম্বক অংশের ব্যাখ্যা, কখনো কখনো স্রেফ ঘটনাটাই বলে গেছেন পাঠকের কৌতূহলের আগুনে ঘি ঢালার জন্য। আর তিনি সফলভাবে সেটা করতে পেরেছেন। এছাড়াও জটিল বিষয়ের পূর্বে কিংবা কোনো একটি অধ্যায় শুরু করার আগে কিছু বাস্তব ও অদ্ভুত গল্প বলেছেন, যা থেকে সেই বিষয়ের গুরুত্বটা ফুটে উঠেছে। 

এবার ধীরে ধীরে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলা যাক। প্রথম অধ্যায়তেই মস্তিষ্ক নিয়ে ঘটে যাওয়া ভাবনার বিষয়গুলোকে তুলে ধরার পর লেখক শুরু করেছেন মস্তিষ্কের গভীরে যাত্রা। অর্থাৎ মস্তিষ্কের জটিল, খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর সাথে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বাতাসে ভেসে আসা তরঙ্গ কানের উদ্দীপনা সম্পন্ন কোষকে উদ্দীপ্ত করলে তা মস্তিষ্ক প্রসেস করে, যা আমরা শব্দ হিসাবে শুনি। কিন্তু এই কাজ কিভাবে করে? বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে। এই বৈদ্যুতিক তরঙ্গগুলো কিভাবে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, সে অনুযায়ী কিভাবে আমাদের নানান অঙ্গ প্রতিক্রিয়া দেখায় তা ফুটে উঠেছে পরবর্তী দুই অধ্যায়ে। যেমন: নিউরোট্রান্সমিটার কি? কিভাবে কাজ করে?  তারপর বিভিন্ন মাদক: গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা কিভাবে আমাদের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে? কেনই বা মাদকাসক্ত ব্যক্তি ঝিম মেরে বসে থাকে আবার ইয়াবা সেবনকারী কেন তাগড়া অনুভব করে?  এই সব ব্যাখ্যাও উঠে এসেছে এখানে। 

চতুর্থ থেকে সপ্তম এই অধ্যায়গুলোতে আলোচনা করা হয়েছে আমাদের অনুভূতি নিয়ে। কিভাবে মস্তিষ্ক আমাদের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং সেই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটলে কি হতে পারে সেইসব আলোচনা করা হয়েছে। যার একটা ঘটনা শুরুতেই উল্লেখ করেছি। আচ্ছা ভাবুন তো আমরা কিভাবে দেখতে পাই? কিভাবে আমরা একটা মানুষকে শনাক্ত করতে পারি? মস্তিষ্ক কি শুধু শনাক্ত করেই ক্ষান্ত হয় নাকি তার সাথে মাখিয়ে দেয় আবেগের প্রলেপ? নিচে একটি ছবি দেওয়া হলো এই ছবিটি সবাই চেনা তবে ছবিটি উলটো থেকে সোজা করে দেখুন। 

এখন দেখুন তো আপনার পরিচিত ছবি আর এই ছবির মধ্যে তফাৎ আপনি ধরতে পারছেন কিনা! অথচ উলটো ছবিটা দেখার ফলে এই অনুভূতি কি আপনার হয়েছিল? তাহলে শুরুতে কেন এটা এত পরিচিত লাগছিল? এই প্রশ্নটাই কি আপনাকে ভাবায় না কত অদ্ভুত এই মস্তিষ্ক!  এমনই অদ্ভুত কার্যকলাপের ব্যাখ্যা আছে অধ্যায়গুলোতে, যেমন: ফ্যান্টম লিম্ব, নসিবো, প্লাসিবো এফেক্ট ইত্যাদি। 

এখন একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। মনে করুন, একটা নিয়ন্ত্রণহীন ট্রেন চলছে তবে সামনে চারজন শ্রমিক যারা কিনা কাজ করছেন। আর অপর একটি লেনে একজন শ্রমিক কাজ করছে। আপনার সামনে একটা লিভার আছে– যদি লিভার না টানেন ৪ জন শ্রমিক মারা যাবে আর যদি টানেন ১ জন মারা যাবে। আপনি কি করবেন? দেখা গেছে এই প্রশ্নের উত্তরে বেশিরভাগ মানুষই লিভার টানার সম্মতি জানিয়েছেন। এখন ধরুন একই ঘটনা, শুধু ১ জন শ্রমিকের ঐ লেনটা নেই বরং সেখানে আছে একটা পানির ট্যাংক, যার চূড়ায় আপনি এবং আরেকটা লোক। যদি আপনি লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন তার ওজনজনিত বাধায় ট্রেনটি থেমে যাবে (কল্পনা করুন এটা হবে)। এখন আপনি কি করবেন?

এই উত্তরে গত প্রশ্নে যারা লিভার টানার সম্মতি দিয়েছিলো। তারা এবার অসম্মতি জানালেন, কারণ এতে ব্যক্তির সাথে আপনার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে এবং এটি একটি হত্যা হিসাবে তাদের কাছে গণ্য হয়েছে। কিন্তু দেখুন, ফলাফল কিন্তু একই। তখনো একজনের মৃত্যু, এখনো একজনেরই। তাহলে কেন মস্তিষ্ক এই সিদ্ধান্ত নিলো না? মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিগত, আদর্শগত দিক আলোচিত হয়েছে একাদশ অধ্যায়। আর মস্তিষ্কের অনেক অদ্ভুত কার্যাবলি— ঘুম ও স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে দশম অধ্যায়ে। যেখানে লুসিড ড্রিম, স্লিপ প্যারালাইসিসের মতো অদ্ভুত ঘটনাগুলো উঠে এসেছে। বাকি অধ্যায়গুলো আমাদের আবেগ, সত্ত্বা, আমিত্ব, চেতনাসহ বিভিন্ন মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া, এপিলেপসি, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো রোগ গুলো নিয়ে বিস্তারিতও গোছালো আলোচনা করা হয়েছে। যা খুবই প্রাঞ্জল ও চিন্তার খোরাক জাগানোর মতো। আর পরিশেষে কৃত্রিম মস্তিষ্ক নিয়ে হয়েছে আলোচনা। আর এভাবে ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে ভাবনার উদয় ঘটিয়ে এককটা অধ্যায় শুরু হয়েছে এবং শেষ হয়েছে বইটি। 

পরিশেষে 

পরিশেষে বলতে গেলে বইটি খুবই গোছানো। পাঠক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পড়ে গেলে ষোল আনা রস অনুভব করতে পারবেন। আর বইটিতে যেভাবে ধীরে ধীরে পাঠককে আগ্রহের তুঙ্গে তুলে, তারপর গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই প্রচেষ্টা সত্যিই অতুলনীয়। সত্যিকারে বলতে বইয়ে এমন অপূর্ব ধারাবাহিকতা ও সজ্জা থাকলে এমনিতেই বই অনন্য উচ্চতা লাভ করে। আর বইয়ে একটা অসংগতি ছিল যা হলো, বানান ভুল। কয়েক জায়গায় এই বানান ভুল লক্ষ্য করা গেছে। আশা করি এগুলো পরবর্তী সংস্করণে শুধরে নেওয়া হবে।

শেষ করার আগে আরেকটা ঘটনা বলি, আমাদের মস্তিষ্কের ডান ও বাম হেমিস্ফিয়ার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। আর এমন ব্রেইনকে বলা হয়, স্প্লিট ব্রেইন (যখন ব্রেইনের উভয় হেমিস্ফিয়ারের যুক্তকারী করপাস বিচ্ছিন্ন থাকে)। এমন এক রোগীকে ড. রামচন্দ্রন প্রশ্ন করেন, তিনি নাস্তিক নাকি আস্তিক? তার বাম হেমিস্ফিয়ার বলেছিল সে একজন নাস্তিক আর ডান হেমিস্ফিয়ার বলেছিল সে একজন দৃঢ় খোদা বিশ্বাসী। এখন এই মানুষটা কি হবে? সে স্বর্গে যাবে নাকি নরকে পুড়বে?

একনজরে-

বইয়ের নামঃ মস্তিষ্ক বিজ্ঞান ও রহস্যের গভীরে

লেখকঃ হাসান তারেক চৌধুরী

পৃষ্ঠাঃ ৩৩৬

মুদ্রিত দামঃ ৮০০ টাকা

প্রকাশকঃ ভাষাচিত্র

লেখাটি 65-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।