কেমন ছিল সর্বশেষ আদি পূর্বসূরি কোষ?

এই লেখাটা প্রাণ সৃষ্টির উপাখ্যান শিরোনামে লেখাটারই দ্বিতীয় কিস্তি। গত লেখায় আরএনএ বিশ্ব হাইপোথিসিস দিয়ে আলোচনা শেষ করেছিলাম। বলেছিলাম, প্রাণের স্পন্দন বাজতে হলে প্রোটিন আর আরএনএ’র একসঙ্গে যুগলবন্দী হতে হবে। কেননা একটা ছাড়া অন্যটা একা কাজ চালিয়ে যেতে পারে না। অনেকে আবার মনে করেন, প্রোটিন কিংবা নিউক্লিক এসিড কোনোটাই আগে আসে নি। বরং সবার আগে এসেছে কোষ। তবে নিশ্চয় সকলের আদি পূর্বসূরি এই কোষ বর্তমান আধুনিক কোষের মতন ছিল না। তাহলে কেমন ছিল? এটা নিয়েই আলাপ করব আজকের লেখায়।

[restrict]

সবার আগে কি কোষ এসেছে? 

প্রাণ সৃষ্টি নিয়ে তৃতীয় পক্ষের মত হল, পৃথিবীর প্রথম প্রাণ ছিল কতগুলো সরল ফুটকি, অনেকটা বুদ্বুদ যেরকম। খুব সম্ভবত এগুলোর চারপাশে চর্বির তৈরি পর্দা ছিল। আর ভেতরে জলীয় কোর ছিল। এই আদি কোষগুলো একটা দিক থেকে আধুনিক কোষের সঙ্গে সাযুজ্য ছিল। আর তা হল, উভয়ই আসলে প্রাণরাসায়নিক থলি। প্রাণের সকল উপাদান ভেতরে ধারণ করে আছে এরা। এই হাইপোথিসিসিটি “কম্পার্টমেন্টালাইজেশন ফাস্ট” কিংবা “প্রথমে আবদ্ধকরণ” নামে পরিচিত। জীবকোষের চারপাশে পর্দার প্রয়োজনীয়তার ওপরেই জোর দেয় এই অনুকল্প। ১৯৭০ সালের দিকে, বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে এ ধরনের আদিকোষ তৈরি করতে সক্ষম হন। গবেষকদের দাবী এগুলোর মধ্যে কিছু প্রাণসদৃশ আচরণ খেয়াল করা যায়। যেমন বেশি বেশি ফ্যাটি এসিড সরবরাহ করলে এগুলো বাড়তে থাকে। বোস্টনের হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিকেল ইনস্টিটিউটের জ্যাক সজোস্টাক, পৃথিবীর প্রথম আদিম কোষটি যেমনটি হতে পারে গবেষণাগারে সেরকম কোষ তৈরি করার জন্যে বহু বছর ধরে চেষ্টা চালান। 

ড. জ্যাক সজোস্টাক

তাঁর নজর ছিল ফ্যাটি এসিডের ওপর। পানির সঙ্গে মেশালে এই জৈব অনুগুলো বুদবুদ তৈরি করে। তিনি বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় ফ্যাটি এসিডের দ্রবণে থাকা বুদবুদগুলোকে বাড়াতে এবং বিভাজিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই ফ্যাটিএসিডের প্রোটোকোষগুলোতে তিনি আরএনএ সংযুক্ত করতেও সফল হয়েছিলেন। এভাবে তিনি এমন প্রোটোকোষ তৈরি করেন যেগুলো আরএনএ বহন করতে সক্ষম। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের দিকে, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারজিনা অ্যাডামলা এবং তিনি, এই প্রোটোকোষগুলোর ভেতর কি করে আরএনএ কপি করা যায় সে উপায় খুঁজে বার করেন। প্রথম প্রথম আরএনএ কপি করতে গেলে দেখা যায় কোষগুলো ভেঙে যাচ্ছে। পরবর্তীতে কিছু পরিমাণ সাইট্রেট যোগ করলে এ সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু সজোস্টাকের এই পরীক্ষা পরিশেষে আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিসকেই সমর্থন করে। কেননা এই পরীক্ষানুসারে যেহেতু প্রথম সরল প্রাণকোষটিতে সফল ভাবে আরএনএ থাকা সম্ভব, সুতরাং আরএনএ থেকেই পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে এই ধারনা একেবারেই অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

মেটাবলিজম ফার্স্ট হাইপোথিসিস 

এতক্ষণ যতগুলো হাইপোথিসিস নিয়েই আলাপ হয়েছে সবকটারই ভিত্তি ছিল কোনো না কোনো জৈব অণু। কেউ কেউ পুরো বিষয়টাকে একটু অন্যদিক থেকে ভেবেছেন। একটা প্রাণকোষকে টিকে থাকার জন্যে দরকার অনবরত শক্তি উৎপাদনের ব্যবস্থা। কোষের সকল কাজে শক্তির যোগান দেওয়া হয় ATP ভেঙে। এই ATP’র ব্যাপারটা অনেকটা মুদ্রার মতন। সবদেশেই যেমন লেনদেনের জন্যে মুদ্রা ব্যবস্থা থাকে। এই মুদ্রা দিয়েই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়। তেমনি সকল জীবেই প্রোটিন তৈরি থেকে শুরু করে পেশীর চলন সহ সকল জৈবিক ক্রিয়া-বিক্রিয়াগুলো চলে ATP ভাঙিয়ে। ATP ভাঙলে পাওয়া যায় শক্তি। তাই এটিকে শক্তিমুদ্রা ডাকা হয়। এই ATPও একটি প্রাণরাসায়নিক অণু। তাই কোষকে টিকে থাকতে হলে অনবরত ATP উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তেমনি পৃথিবীর প্রথম প্রাণকোষটিতেও নিশ্চয় ATP উৎপাদনের ব্যবস্থা ছিল। কোষে ধারাবাহিক কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এই শক্তি অণু। বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ তাই ভাবছেন পৃথিবীর প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে শক্তি উৎপাদনের এই ধারাবাহিক বিক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে। 

মাইটোকন্ড্রিয়ায় কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়ায় ATP উৎপাদন হয়

তাহলে ব্যাপারটা গোঁড়া থেকে বলা যাক। কোষে শক্তি অণু তৈরি হয় কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়ায়। এই ধারনার জনক প্রাণরসায়নবিদ পিটার মিচেল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কার কথা। যুক্তরাজ্যের কর্নওয়ালে একটা পুরোনো জমিদার বাড়িতে তাঁর গবেষণাগার। কোষে শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে চলেছেন। জীবের গৃহীত খাদ্য থেকে ধারাবাহিক কতগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোষে শক্তি (ATP) তৈরি হয়। তখন এই ধারনাই গেড়ে ছিল বেশীরভাগ বিজ্ঞানীদের মধ্যে। কিন্তু মিচেল বললেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়ার কথা। তিনি বললেন কোষের শক্তি সাধারণ কতগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে আসে না। কোষে শক্তিমুদ্রা উৎপাদিত হয় বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ায়। জীবকোষে খাদ্য থেকে পাওয়া রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে প্রোটন তথা হাইড্রোজেন আয়ন কোষপর্দার বাইরে পাঠানো হয়। যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটন কোষপর্দার বাইরে জমা হলে, কোষের পর্দার ভেতর তৈরি হয় তড়িৎরাসায়নিক নতি বা গ্র্যাডিয়েন্ট। কোষপর্দার বাইরে ধনাত্মক চার্জ বেশি আর ভেতরে কম। এই নতি বা বিভব পার্থক্যের শক্তি ব্যবহার করে প্রোটন আবার ঢুকতে থাকে কোষের ভেতর। ফলে উৎপন্ন হয় শক্তি। এই শক্তি ব্যবহার করে তৈরি হয় ATP। ব্যাপারটা অনেকটা, প্রথমে বালতি বালতি জল দিয়ে পানির ট্যাংক পূর্ণ করে, এই ট্যাংকের জল ব্যবহার করে ওয়াটার হুইল ঘুরাবার মতন।

প্রাণরসায়নবিদ পিটার মিচেল

মিচেলের এই মডেল কেমিঅসমোসিস মডেল নামে জগদ্বিখ্যাত। প্রথম প্রথম কেউই এই মডেল মেনে নিতে চান নি। কেননা এই মডেল কীরকম যেন স্ব-বিরোধী লাগছিল সবার কাছে। এত এত সরল রাসায়নিক বিক্রিয়া থাকতে কোষ কেন এত জটিল উপায়ে শক্তি অণু তৈরি করতে যাবে? মিচেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রাণরসায়নবিদ লেসলি অরগেল তো বলেই বসলেন, “আমার মনে হচ্ছিল এই আইডিয়া নিয়ে মিচেলের প্রতিটি ধারনাকেই আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারবো। আমি নিশ্চিত, কোনো জীবই এই প্রক্রিয়ায় শক্তি অণু তৈরি করে না। কেননা ডারউইন এবং ওয়ালেস, আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ এবং শ্রোডিঞ্জারের মতন পরস্পর বিরোধী কোনও তত্ত্ব দেন নাই।”

তবে ১৯৭৮ সালে রসায়নে নোবেলটা যখন মিচেলের ঝুলিতে যায় তখন বোধ করি ওঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত তর্ক-বিতর্কের অবসান হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় কেমিঅসমোসিস মডেল। সকল জীবেই কেমিঅসমিস একটা অত্যাবশ্যক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া। শুধু শ্বসন নয়, উদ্ভিদে সালোকসংশ্লেষণের সময়ও ATP তৈরি হয় একই প্রক্রিয়ায়। সূর্য থেকে আসা শক্তিকে ব্যবহার করে তৈরি হয় তড়িৎরাসায়নিক নতি। আর এই নতির শক্তি ব্যবহার করেই কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় ATP। ঠিক যেমন শ্বসনের সময় খাদ্য থেকে আসা শক্তিকে ব্যবহার করে তড়িৎরাসায়নিক নতি তৈরি হয়। সুতরাং জীবদেহে কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়া কোনও নতুন অর্জন নয়। জীবন ইতিহাসের শুরু থেকে সেই আদিম প্রাণকোষেই বিবর্তিত হয়েছিল কেমিঅসমোসিস। জীবনবৃক্ষও এই ধারনাকে সমর্থন করে। জীবনবৃক্ষের একেবারে প্রথম শাখাটি ভাগ হয়েছে দুটি সরল আদিকোষীর মধ্যে। এর একটি হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া অন্যটা আর্কিয়া। উভয়ের কোষেই থাকে একটি প্রোটন পাম্প। উভয়ই প্রোটনের তড়িৎ শক্তি দিয়েই ATP তৈরি করে। ব্যবহার করে একই প্রোটিন। সুতরাং এই দুই দলেরই সাধারণ পূর্বসূরি কোষটি যে একই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই পূর্বসূরি কেবল ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়ারই সাধারণ পূর্বসুরি তা নয়। এই ধরিত্রীর সকল প্রাণই তার উত্তরসূরি।

সর্বশেষ প্রাচীন পূর্বসূরি কোষগুলো কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়ায় ATP উৎপাদন করত। ছবিসুত্রঃ সায়েন্টিফিক এমেরিকান

তবে কেমন ছিল এই সাধারণ পূর্বসূরি কোষ? যদি ধরেই নিই ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়ার মধ্যে যে যে মিলগুলো আছে তার সব উপস্থিত ছিল ধরিত্রীর প্রথম সে প্রাণকোষে। আর অমিল যা আছে সেসব এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরবর্তীতে আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। তাহলে তো বলতেই হয়, নিঃসন্দেহে সে পূর্বসূরি কোষটিতে ডিএনএ, আরএনএ, প্রোটিন, সার্বজনীন জেনেটিক সংকেত আর প্রোটিন তৈরির কারখানা রাইবোজোম, ATP এবং তা উৎপাদনের জন্যে দরকারি প্রোটন চালিত এনজাইম- এসবই উপস্থিত ছিল। এমনকি ডিএনএ’তে লুকানো নীল নকশা পড়ে প্রোটিন উৎপাদনের কলা-কৌশলও নিশ্চিতভাবে উপস্থিত ছিল। এর মানে দাঁড়ায় আমাদের সকলের সেই পূর্বসূরি কোষটি অনেকটা আধুনিক কোষের মতই ছিল।

কিন্তু না, বেশকিছু প্রশ্ন থেকে যায় এখানেও। একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যদি দেখি ডিএনএ অনুলিপন প্রক্রিয়া (ডিএনএ থেকে ডিএনএ তৈরির প্রক্রিয়া) ব্যাকটেরিয়া-আর্কিয়া এই দুই সম্প্রদায়ের জীবে আলাদা। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় ডিএনএ অনুলিপন প্রক্রিয়া এই দুই প্রকৃতির জীবে পরবর্তীতে আলাদা ভাবে বিবর্তিত হয়েছে। তাছাড়া অনেক প্রাণরাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন এনজাইম দ্বারা পরিচালিত হয়। উদাহরণ হিসেবে গাঁজন প্রক্রিয়ার কথাই টানা যাক। কেননা এটি প্রাণ সৃষ্টির ইতিহাসে বেশ উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়া। গাঁজন প্রক্রিয়াকে ধরা হয় আদিম শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া। অক্সিজেন ছাড়াই খাদ্য উপাদান থেকে শক্তি উৎপাদিত হয় এই প্রক্রিয়ায়। ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়া- এই দুই আদিকোষী জীবেই গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পাদিত হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে উভয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এনজাইম দিয়ে এই প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়। এমন যেন গাঁজন প্রক্রিয়া পরবর্তীতে অনেক পরে আলাদাভাবে এই দুই আদিকোষে বিবর্তিত হয়েছিল।  একেবারে প্রাণের স্পন্দনের শুরু থেকে তা ছিল না। এমনকি কোষপর্দা এবং কোষপ্রাচীরেও তেমন সাযুজ্য নেই এই দুই জীবে। তাহলে কি পূর্বসূরি সেই কোষে কোনো পর্দা ছিল না? অসম্ভব!  তাহলে কেমন ছিল সেই প্রাচীন পূর্বসূরি? সম্ভবত পৃথিবীর শেষ সাধারণ পূর্বসূরি কোষটি জিন এবং প্রোটিনের সম্ভারে আলাদা ছিল, গাঁজন প্রক্রিয়ার বদলে প্রোটনের চার্জ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করত, এমনকি এর বাইরের আবরণটাও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা গড়নের। এটা নিশ্চয়ই জীব ছিল, কিন্তু আমরা যেমনটি জানি সেরকম নয়। 

তথ্যসূত্রঃ

  • লেহনিনজার, প্রিন্সিপাল অব বায়োকেমিস্ট্রি- ডেভিড এল. নেলসন, মাইকেল কক্স  
  • লাইফ অন আর্থ- নিউ সায়ন্টিস্ট
  • The origin of life in alkaline hydrothermal vents

[/restrict]

সুজয় কুমার দাশ
বিজ্ঞান ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আছি। পড়াশোনা করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে। প্রকাশিত বই- দ্য মাঙ্গা গাইড টু বায়োকেমিস্ট্রি, দ্য মাঙ্গা গাইড টু মলিকিউলার বায়োলজি, অন্বেষা প্রকাশন; জীব জগতের অজানা গল্প, পুঁথি প্রকাশন।