এআই কীভাবে গান লিখছে, ছবি আঁকছে, গল্প বলছে?

একটা সময় ছিল, যখন মানুষ ভাবতো, সৃজনশীলতা কেবল তাদের হাতেই সীমাবদ্ধ। তারাই কেবল গান লিখবে, ছবি আঁকবে, গল্প বলবে! যন্ত্রের কাজ তো শুধু গাণিতিক হিসাব-নিকাশ, ডেটা বিশ্লেষণ ও সময়সাপেক্ষ কঠিন কাজ সহজতর করে তোলা!

কিন্তু এখন সময় বদলেছে। ধরণীতলে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এখন সেই মেশিনই, যাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বলা হয়, পা রেখেছে সৃজনশীলতার ময়দানে। শুধু পা নয়, হাত-পা-পেট-মাথা সবকিছু নিয়েই জড়োসড়ো হয়ে বসেছে সে! বর্তমানে এমন সব কাজ করছে যা দেখে যারপরনাই অবাক হচ্ছে মানবজাতি। কীভাবে? চলুন বুঝিয়ে বলছি।

এআই-এর ভুবনে গিয়ে আপনি যদি বলেন, আমাকে রবীন্দ্রনাথের মতো একটি কবিতা লিখে দাও তো।  সফটওয়্যার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনাকে সেই ঢঙে কবিতা লিখে দিবে।

[restrict]

অথবা আপনি বললেন, নীল আকাশের নিচে সবুজ পাহাড় আর লাল ফুলের ছোট্ট বাগানের একটি ছবি চাই। সঙ্গে সঙ্গে একটি ছবি তৈরি হয়ে গেল, যা দেখে মনে হবে কোনো শিল্পী ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে এঁকেছে।

এভাবেই এআই এখন গান লিখছে, ছবি আঁকছে, গল্প বলছে। সবই করছে মানুষের মতো, কিংবা আরো নিখুঁতভাবে, দ্রুততার সঙ্গে! কিন্তু কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এসব? কীভাবে ওরা গান লিখছে, ছবি আঁকছে, গল্প বলছে? চলুন আজ আমরা ডুব দিই সেই রহস্যময় জগতে। শুনবো এক মহাজাগতিক সত্তা এআই-এর গল্প!

এআই এখন সবকিছুই করছে; ছবিসূত্রঃ Alma mater

এআই-এর শুরুটা

১৯৫৬ সাল। ডার্টমাউথ কলেজ। যুক্তরাষ্ট্র।

গ্রীষ্মের অলস দুপুরে জীর্ণশীর্ণ এক কক্ষে জড়োসড়ো হয়ে বসেছেন একদল তুখোড় বিজ্ঞানী। সপ্তাহান্তের ঝড়ঝাপ্টা ও খাটুনি শেষে পার করছেন উইকিন্ডের ছুটি। মাঝখানে হেলান দিয়ে বসে আছেন সবার মধ্যমনি গণিতবিদ জন ম্যাকার্থি। সঙ্গে ছিলেন মার্ভিন মিন্সকি, ক্লদ শ্যানন, হারবার্ট সাইমনসহ আরও জনা কয়েক বিজ্ঞান অনুসন্ধানী।

গল্প-আড্ডা, গবেষণা-আলোচনা ও খুনসুটির একপর্যায়ে তাদেরই একজনের মাথায় আচমকা খেলে গেল এক অদ্ভুত প্রশ্ন- আচ্ছা, মেশিন কি কোনোদিন মানুষের মতো করে ভাবতে পারবে? উপস্থিত শ্রোতাদের চক্ষু চড়কগাছ! বিস্ময়ে হতবিহ্বল! কী বলছে এসব?

কারো কারো উত্তর, আরে না! তা-ও কী সম্ভব নাকি? আবার কারো কারো মতামত- হ্যাঁ, হয়তো একসময় মেশিনও শিখবে, সুন্দর করে লিখবে, যুক্তি দিবে, সিদ্ধান্ত নেবে, মানুষের মতোই কিংবা আরো অভিনব উপায়ে।

কল্পনায় ডুবে থাকা সেই মানুষগুলো যখন এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন কম্পিউটার ছিল সীমিত ক্ষমতার। ছিল না কোনো স্মার্ট প্রযুক্তি। তবুও সেই ক্ষুদ্র আসরের আলোচনা থেকে পরবর্তীতে জন্ম নেয় এক বিশাল ধারণা, যা কয়েক দশকে প্রযুক্তি জগতকে চমকপ্রদভাবে বদলে দিয়েছে।

আজকের এআই গান বুনে, ছবি আঁকে, গল্প লেখে, এমনকি মানুষের আবেগও বোঝে। সেই ডার্টমাউথের কক্ষে শুরু হওয়া স্বপ্ন এখন বিরামহীন বয়ে চলেছে আমাদের ছোট্ট স্মার্টফোনে, কম্পিউটারের স্ক্রিনে। শিখছে প্রতিনিয়ত। সমৃদ্ধ করে চলেছে নিজের সাতরঙা ভুবনকে। কীভাবে শিখছে এআই? কীভাবেই বা করছে এসব?

কোনো একদিন মানুষের সমকক্ষই হয়ে উঠবে এআই; ছবিসূত্রঃ Bing images

এআই-এর শেখার পদ্ধতি

মনে করুন, আপনি একটি শিশুকে ছবি আঁকা শেখাচ্ছেন। প্রথমে তাকে অনেক অনেক ছবি দেখাচ্ছেন- গাছ, নদী, পাহাড়, মানুষ, প্রাণী ইত্যাদি। বারবার দেখানোর ফলে সে বুঝে নিতে শুরু করবে কোন জিনিস দেখতে কেমন, কোন রঙ কোথায় লাগে, কোন লাইন কীভাবে আঁকতে হয়। এআই-এর শেখার পদ্ধতিও এমনই, তবে পার্থক্য হচ্ছে এখানে “মস্তিষ্ক” হিসেবে কাজ করছে মানুষের নিজস্ব মস্তিষ্ক আর সেখানে কম্পিউটারের ভেতরের গাণিতিক অ্যালগরিদম। আর শেখানোর জন্য দেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ বা কোটি কোটি ডেটার উদাহরণ।

কম্পিউটার আসলে মানুষের মতো অনুভূতি দিয়ে শেখে না। এটি শেখে সংখ্যার হিসাব করে। কোনো ছবি, গান, বা লেখা কম্পিউটারের কাছে সরাসরি ছবি বা গান নয়, বরং একেকটি বিশাল সংখ্যা-তালিকা। উদাহরণস্বরূপ, একটি ছবিকে আমরা দেখি নানা রঙের বিন্দুর সমন্বয়ে, কিন্তু কম্পিউটার সেটিকে ভাঙে ছোট ছোট পিক্সেলের রঙের মান-এ (Standard)। যেমন, লাল, সবুজ, নীলের কত শতাংশ আছে- এভাবে। প্রতিটি পিক্সেলের রঙকে প্রকাশ করা হয় তিনটি সংখ্যায়ও। যেমন: RGB। ফলে পুরো ছবিটা দাঁড়িয়ে যায় লাখ লাখ সংখ্যার একটি টেবিলে।

এখন এআই-কে এই সংখ্যাগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বুঝতে শেখাতে হয়। ধরুন, আমরা এআই-কে হাজার হাজার বিড়ালের ছবি দিচ্ছি। প্রতিটি ছবির সাথে আমরা বলে দিচ্ছি- “এটি একটি বিড়াল”। এআই প্রতিটি ছবির সংখ্যা-তালিকা দেখে বোঝার চেষ্টা করে, বিড়ালের ছবিতে কী কী মিল পাওয়া যায়। হয়তো কানের আকৃতি, চোখের অবস্থান, শরীরের বক্রতা, লোমের রঙ। এই মিলগুলো খুঁজে বের করার জন্য এআই ব্যবহার করে এক ধরনের গাণিতিক কাঠামো, যাকে বলা হয় নিউরাল নেটওয়ার্ক।

মানুষ শেখে কল্পনায়, ওরা শেখে সংখ্যার হিসাব করে; ছবিসূত্রঃ Alarming scenario

নিউরাল নেটওয়ার্ক হলো মানুষের মস্তিষ্কের আদলে বানানো একটি গাণিতিক মডেল। মানুষের মস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরন একে অপরের সাথে সংযোগ করে চিন্তা ও শেখনকার্য চালায়। ঠিক তেমনই, এআই-এও নোড নামে ছোট ছোট গাণিতিক ইউনিট থাকে, যেগুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত। প্রতিটি সংযোগের একটি ওজন (weight) থাকে, যেটি বলে দেয়, কোনো একটি বৈশিষ্ট্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে এই ওজনগুলো এলোমেলো হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে শেখার মাধ্যমে পৌঁছে যায় সঠিক মান-এ।

শেখার প্রক্রিয়া শুরু হলে- এআই-কে একটি বিড়ালের ছবি উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হলো। এআই তার বর্তমান ওজন দিয়ে অনুমান করে এটি কী। বিড়াল নাকি অন্য কিছু? তারপর প্রোগ্রামার তার অনুমানের সঠিকতা যাচাই করে। যদি ভুল হয়, প্রোগ্রামার তাকে জানায় ভুলটি কতটুকু। এই ভুলকে বলা হয় ত্রুটি বা error। এরপর একটি গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে, যাকে বলা হয় ব্যাকপ্রপাগেশন বা backpropagation, সেই ত্রুটি অনুযায়ী ওজনগুলো সামান্য পরিবর্তন করা হয়। এভাবে বারবার উদাহরণ দেখে দেখে এআই ধীরে ধীরে শিখে ফেলে।

গানের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা একই, শুধু ইনপুট ডেটা আলাদা। একটি গানকে কম্পিউটার বোঝে শব্দ-তরঙ্গের (sound wave) আকারে। প্রতিটি তরঙ্গকে ভাঙা হয় সময় ও ফ্রিকোয়েন্সির মানে, যা হয়ে যায় সংখ্যার সারণি। এআই যদি হাজার হাজার গান বিশ্লেষণ করে, তবে সে শিখে ফেলে কোন ধরণের নোট একসাথে ভালো শোনায়, কোন বিট কোন মুড তৈরি করে, কোন কর্ড-প্রগ্রেশন জনপ্রিয়। বুঝে যায়, কোন সুরে দুঃখের গান মনকে ছুঁয়ে যায়, কোন বিট তৈরি করে আনন্দের সুর-তাল-ছন্দ। যখন নতুন গান তৈরি করতে বলা হয়, তখন সে শিখে নেওয়া প্যাটার্ন ব্যবহার করে সাজিয়ে নেয় একেবারে নতুন সুর।

গল্প লেখা বা জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই শব্দকে সরাসরি শব্দ হিসেবে বোঝে না। প্রতিটি শব্দকে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার ভেক্টরে রূপান্তর করা হয়, যাকে বলা হয় এম্বেডিং (embedding)। এই ভেক্টর বলে দেয়, কোন শব্দ কোন শব্দের সাথে বেশি মিল আছে। যেমন “রাজা” এবং “রানী” হয়তো কাছাকাছি ভেক্টর মান পাবে, কারণ তাদের অর্থ কাছাকাছি। আবার “বিড়াল” এবং “কুকুর”ও কাছাকাছি থাকবে, কারণ দুটোই প্রাণী। এই এম্বেডিং থেকে এআই শিখে ফেলে কীভাবে বাক্য সাজাতে হয়, কোথায় কোন শব্দ দিলে অর্থপূর্ণ হয়, কীভাবে গল্পের ধারা তৈরি হয়। প্রতিটি শব্দের মানে, বাক্যের ভঙ্গি, আবেগের প্রকাশ, চরিত্রদের ভূমিকা- অর্থাৎ, সবই শেখে সে।

বিষয়বস্তুকে ভেঙে বিশ্লেষণ করে শেখে ওরা; ছবিসূত্রঃ Power Bi

প্রোগ্রামিংয়ের দিক থেকে, এই শেখার জন্য অনেক ধরণের অ্যালগরিদম ব্যবহার হয়। কিছু অ্যালগরিদম ছোট ডেটাসেটেও ভালো কাজ করে, কিছু আবার বিশাল ডেটা ছাড়া ঠিকমতো শেখে না। বর্তমানে জনপ্রিয় পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে মেশিন লার্নিং (machine learning) ও ডিপ লার্নিং (deep learning), যা আসলে বিশাল ও জটিল নিউরাল নেটওয়ার্ক। ডিপ লার্নিং মডেল একসাথে কোটি কোটি প্যারামিটার শিখতে পারে, যা খুব সূক্ষ্ম ও জটিল প্যাটার্নও ধরতে সক্ষম।

গাণিতিকভাবে, শেখার পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে একটি অপ্টিমাইজেশন সমস্যা। এখানে এআই চেষ্টা করে “ত্রুটি” বা ভুলের মান যত কম রাখা যায়। এজন্য সে একটি “লস ফাংশন” (loss function) ব্যবহার করে যা ভুলের মান মাপার পদ্ধতি। তারপর “গ্রেডিয়েন্ট ডিজসেন্ট” (gradient descent) নামে একটি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ধাপে ধাপে ওজন বদলায়, যাতে লস বা ভুল কমে আসে। এটা অনেকটা পাহাড়ি অঞ্চলে নেমে আসার মতো, যেখানে আপনি চোখ বেঁধে শুধু নিচের দিকে নামছেন, যতক্ষণ না একেবারে নিচের সমতলে পৌঁছে যাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে, এআই-এর শেখা কোনো যাদু নয়- এটি আসলে এক বিশাল গাণিতিক মহড়া, যেখানে সংখ্যার ভেতর থেকে প্যাটার্ন বের করা হয়। এই প্রক্রিয়ার সৌন্দর্য হলো, একবার এআই শিখে গেলে সে যা শিখেছে তা নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারে। যেমন, যদি সে বিড়ালের ছবি চিনতে শিখে, তবে অচেনা জাতের বিড়ালও চিনে ফেলতে পারে। অথবা যদি সে কষ্টের গান শিখে, তবে এমন নতুন কষ্টের গান বানাতে পারবে যা আগে কেউ শোনেনি।

পার্থক্য হলো, এই মহড়া এত দ্রুত হয় এবং এত বিশাল পরিসরে হয় যে মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। মানুষ যেখানে হাজার উদাহরণ দেখে শিখতে পারে, এআই একই কাজের জন্য কোটি উদাহরণ দেখে ফেলতে পারে কয়েক ঘণ্টায়। আর রেসপন্সও হয় খুবই দ্রুত! কিন্তু কীভাবে করে এটা, এত দ্রুতভাবে?

উদাহরণ চিনে নিয়ে শেখে ছবির কারুকার্য; ছবিসূত্রঃ Gemini Ai

দ্রুত সাড়া দেওয়ার কৌশল

ধরা যাক, আপনি এআই-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে স্ক্রিনে লিখলেন- “পৃথিবী গোলাকার কেন?” আপনার প্রশ্নটি চোখের পলকে চলে গেল এআই-এর বিশাল ডেটাসেন্টারে। ভেতরে হাজার হাজার ছোট ছোট “ডেটা-যাত্রী” ছুটে চলল আলোর গতিতে, প্রশ্নের কাঙ্ক্ষিত উত্তর খুঁজতে।

প্রথমেই কিছু প্রসেসর শব্দগুলো খুলে খুলে পড়ল- “পৃথিবী”, “গোলাকার”, “কেন”। তারপর এক ঝটকায় ডেটার পাহাড়ে ডুব দিল। একেকটি প্রসেসর আলাদা আলাদা বই, প্রবন্ধ, ছবি, কোড ও উদাহরণ থেকে খুঁজে আনতে লাগল টুকরো টুকরো তথ্য।

অনেকটা এরকম, আপনি যখন প্রশ্নটি করলেন, তখন এআই যেন বিশাল এক গ্রন্থাগারে একসঙ্গে হাজার জন লাইব্রেরিয়ানকে ছুটে পাঠিয়েছে। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা তাক থেকে তথ্য জোগাড় করে আনছে। তারপর মুহূর্তেই সব তথ্য এক জায়গায় জড়ো করা হচ্ছে। ফলাফল- সেকেন্ডের ভেতরেই উত্তর।

প্রশ্ন হচ্ছে, এআই এত দ্রুত লিখতে পারে কীভাবে? কীভাবে এতো দ্রুত সাড়া দেয় সে? উত্তরটা সহজ। এআই-এর ভেতরে রয়েছে অসম্ভব শক্তিশালী প্রসেসিং ক্ষমতা। মানুষের মস্তিষ্কে অনেক নিউরন একসঙ্গে কাজ করে, আর এআই-এর ভেতরে সেই কাজটা করে হাজার হাজার প্রসেসর। কাজগুলো দ্রুত করতে সহযোগিতা করে বিশেষ ধরনের প্রসেসিং, যার নাম- প্যারালাল প্রসেসিং (parallel processing)। এখানে একটা প্রসেসের সঙ্গে হাজার হাজার প্রসেস চলে একসঙ্গে।

কিছু প্রসেসর শব্দের মানে বোঝে, কিছু প্রসেসর শিক্ষালব্ধ ডেটার সাথে খুঁজে মিল, কিছু নতুন বাক্য গঠন করে, আর বাকিরা উত্তর সাজিয়ে পাঠায় স্ক্রিনে। অন্যদিকে, আরেক দল প্রসেসর শুরু করে সম্ভাবনার খেলা- কোন শব্দে উত্তরটা শুরু হবে? কোন বাক্যে বিষয়টি সহজভাবে বোঝানো যাবে? কোন তুলনাটা সবচেয়ে স্পষ্ট হবে? সেখান থেকে সবচেয়ে মানানসই উত্তরটিই বেছে স্ক্রিনে দেখায় সে।

তাছাড়া, এআই-এর মডেলগুলো বিশাল ডেটাসেন্টারে পরিচালিত হয়, যেখানে থাকে জিপিইউ (GPU- Graphics Processing Unit) আর টিপিইউ (TPU – Tensor Processing Unit) নামে বিশেষ ধরনের প্রসেসর। এগুলো হাজার হাজার কোর (core) ব্যবহার করে একই সময়ে কোটি কোটি কার্য সমাধান করতে পারে। ঠিক যেন উপরে বর্ণিত বিশাল এক গ্রন্থাগারে হাজার জন লাইব্রেরিয়ান একসঙ্গে ছুটে গিয়ে তোমার দরকারি প্রশ্নোত্তরটা খুঁজে আনে।

এভাবেই এআই আয়ত্ত করা ডেটা, জটিল অ্যালগরিদম, আর অসংখ্য শক্তিশালী প্রসেসরের ক্ষমতাবলে সেকেন্ডের ভেতর গল্প লেখে, ছবি আঁকে, উত্তর দেয়। তারপর, চোখের পলকেই ভেসে উঠে উত্তর কম্পিউটার স্ক্রিনে।

কয়েক হাজার কোরের সমন্বয়ে সৃষ্ট প্রসেসর; ছবিসূত্রঃ Chatgpt picture

সৃজনশীলতা নাকি চতুরতা

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এগুলো কি সত্যিই সৃজনশীলতা, নাকি শুধু শেখা জিনিস কপি করা? সমালোচকদের মতামত, এআই আসলে নিজের মতো নতুন কিছু ভাবতে পারে না। সে শুধু আগের জিনিসগুলোর মিশ্রণ তৈরি করে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষও তো শিখে শিখেই সৃষ্টি করে। একজন কবি যতই মৌলিক হন না কেন, তার লেখায় আগের পড়া বই, শোনা গান বা দেখা জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ থেকে যায়। তাই এআই-এর কাজকে সম্পূর্ণ অনুকরণ বলা ঠিক নয়, বরং একে বলা যেতে পারে এক ধরনের প্রযুক্তিগত স্মার্ট কল্পনা!

এছাড়া আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো- মানুষের কাজের জায়গা কি এআই নিয়ে নিচ্ছে? যেমন, বিজ্ঞাপনের জন্য আগে যেসব এডিটর, ডিজাইনার বা রাইটার প্রয়োজন হতো, এখন অনেক সংস্থা এআই দিয়েই এসব কাজ করিয়ে নিচ্ছে।

বলা বাহুল্য, এআই-এর বদৌলতে মানুষের চাকরির সংখ্যা কমতে পারে, সন্দেহ নেই। তবে এর ইতিবাচক দিকও আছে। একজন সংগীতশিল্পী এআই দিয়ে একটি বেসিক সুর বানিয়ে নিলেন, তারপর নিজের মতো করে তা সাজালেন। এতে সময় ও পরিশ্রম দুটোই বেঁচে যায়। একজন লেখক এআই দিয়ে গল্পের কাঠামো তৈরি করে তারপর নিজের ভাষায় সেটিকে গড়ে তুলছেন। এমনকি একজন চিত্রশিল্পীও এআই দিয়ে প্রাথমিক কনসেপ্ট ডিজাইন বানিয়ে তাতে চালাচ্ছেন নিজের তুলি।

মানুষের জায়গা দখল করবে না বরং বিস্তৃত করবে এআই-রা; ছবিসূত্রঃ Debut Infotech

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

শিল্পের ভবিষ্যৎ হবে মানুষ ও যন্ত্রের যৌথ সৃষ্টি। যন্ত্র দেবে গতি, দক্ষতা ও বিশাল ডেটা থেকে প্রাপ্ত আইডিয়া; মানুষ দেবে প্রাণ, আবেগ ও জীবনের ছোঁয়া। যেমন, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এআই দিয়ে দ্রুত স্ক্রিপ্ট, স্টোরিবোর্ড, এমনকি বিশেষ প্রভাব বানিয়ে ফেলতে পারবেন, কিন্তু গল্পের প্রাণ দেবেন নিজেই। একজন গীতিকার এআই-এর সাহায্যে সুর তৈরি করলেও, গানের কথায় ভালোবাসা বা বেদনার অভিজ্ঞতা জুড়ে দেবেন স্বয়ং।

এআই হয়তো একসময় সত্যিকার অর্থেই বদলে দেবে আমাদের সৃজনশীলতার সংজ্ঞা। আগে যেখানে আমরা ভাবতাম, সৃজনশীলতা মানেই মানুষের অনন্য ক্ষমতা, সেখানে এখন দেখতে পাচ্ছি, মেশিনও সৃজনশীল হতে পারে, হতে পারে অনন্য প্রতিভার অধিকারী। যদিও তা মানুষের মতো নয়, তবে কোনো অংশে কমও নয়। এটি হয়তো শিল্পকে আরও বিকাশমান করে তুলবে, যেখানে যে কেউ, যিনি আগে গান বা ছবি তৈরি করেননি, এআই-এর সাহায্যে প্রকাশ করতে পারবেন নিজের সৃজনশীলতা।

সুতরাং আমাদের ভাবনা বদলাতে হবে। এআই আমাদের জায়গা দখল করবে নাকি আমাদের সৃজনশীলতার নতুন সহযোগী হবে, এর উত্তরে বলবো, প্রযুক্তি এসেছে মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে নয়, বরং তাকে আরও শক্তিশালী করতে।

ভবিষ্যতে এআই হয়ে উঠবে মানুষের অন্যতম সহযোগী; ছবিসূত্রঃ Bing Ai

ছাপাখানা এলে লেখকরা হারিয়ে যাননি, বরং তাদের লেখা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। ক্যামেরা আসার পরেও চিত্রশিল্পীরা হারিয়ে যাননি, বরং নতুন শিল্পধারা তৈরি হয়েছে।

সম্ভবত এআই-ও সে পথেই হাঁটছে। একে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করলে আমাদের কল্পনা ও সৃজনশীলতা পেতে পারে অভূতপূর্ব সাফল্য, অনিন্দ্য সুন্দর ভবিষ্যৎ, যা আগামী দিনের শিল্পকে দেবে এক নতুন পরিচয়। পৌঁছে যাবে অনন্য উচ্চতায়। আবিষ্কার করবে শিল্পের অজানা রহস্যময় রূপ। সে-দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নেই! তাই-না?

তথ্যসূত্র:

[/restrict]

মো. মিজানুর রহমান
উপকথা, লোককথা ও পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি ভালোবাসি প্রাচীন ইতিহাস, সম-সাময়িক বিশ্ব ও বিজ্ঞান-বিষয়ক আলোচনা। পড়াশোনা করছি লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।