রাসায়নিক বিস্ফোরণঃ নাকি সবকিছুই একসঙ্গে এসেছে?

অ্যালকালাইন ভেন্ট হাইপোথিসিস জোর দেয় জীবকোষ চালাবার শক্তির ওপর। তাই একে “মেটাবলিজম ফার্স্ট” হাইপোথিসিসও বলে। কিন্তু এই অনুকল্পে ভর দিয়ে প্রাণ সৃষ্টির দৃশ্যপট কল্পনা করতে গেলেও সবার শুরুতে একটা পর্দার কথা ভাবতে হয়। যদিও এটা বর্তমান কোষপর্দার মতন না। তাই এই হাইপোথসিসিসেও কম্পার্টমেন্টালাইজেশনের প্রসঙ্গ চলে আসে।

[restrict]

এরপর প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হতে থাকে আদিম সরল কোষ থেকে জটিল কোষে পরিণত হবার বাদবাকী মাল মশলা। এই ধারণা বেশ অনেক দিন ধরেই গ্রহণযোগ্য হয়ে টিকে আছে। এর পেছনে সবারই যুক্তি, এত জটিল একটা গড়ন তৈরির সব মাল মশলা একসঙ্গে তৈরি হয়ে গেছে তা কোনোমতেই যুক্তিসম্পন্ন হতে পারে না। একারণেই গবেষকদের কাছে প্রোটিন ফার্স্ট এবং আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস এতটা জনপ্রিয়। তবে কেউ কেউ এই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেননা পুরো ব্যাপারটা অনেকটা এমন দাঁড়ায় যে, “আপনি একটা গাড়ি বানানোর অভিপ্রায়ে এর কাঠামোটা বানিয়ে বসে থাকলেন এবং আশা করছেন গাড়ির চাকা আর ইঞ্জিন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তৈরি হয়ে যাবে।“

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বরং দাবী করছে প্রাণ সৃষ্টির সকল মাল মশলা একসঙ্গেই সৃষ্টি হয়েছে। বলা যেতে পারে একটা রাসায়নিক বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। কেননা একটা মাত্র কার্বন বেজ রাসায়নিক থেকেই তৈরি হতে পারে প্রাণ সৃষ্টির দরকারি সকল উপাদান। আর এসব উপাদান জড়ো হয়ে সৃষ্টি হতে পারে প্রথম আদিকোষ।

জীবকোষ চালানোর কোর সিস্টেম হচ্ছে তিনটিঃ সবকিছুকে একসঙ্গে ধরে রাখার মতন একটা কোষপর্দা; একসেট রাসায়নিক বিক্রিয়া যেগুলো কোষটির শক্তি যোগাবে; কোষটির জৈবিক তথ্য ধারণ, বংশানুক্রমে স্থানান্তর এবং সংখ্যা বাড়ানোর জন্যে জিন। এই তিনটা প্রধান সিস্টেমের রাসায়নিক গাঠনিক এককও জানা। পর্দা তৈরির জন্যে চর্বি, বিপাক ক্রিয়া চালাবার জন্যে প্রোটিন বিশেষ করে এনজাইম আর জিন হল ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড। চর্বি কার্বনের লম্বা শিকল দিয়ে তৈরি, অ্যামাইনো এসিডের চেইন প্যাচিয়ে তৈরি হয় প্রোটিন আর নিউক্লিক এসিড হচ্ছে নিউক্লিওটাইডের পলিমার, এটিও কার্বন বেজ রাসায়নিক। জীবনের এই ত্রয়ী প্রক্রিয়া আবার নিজেদের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে। জিনে লেখা তথ্য থেকে তৈরি হয় প্রোটিন, আবার এই জিনের কপি তৈরি তথা অনুলিপন চলে প্রোটিনের (এনজাইমের) সাহায্যে। পর্দার চর্বি তৈরি হতে হলেও প্রোটিন আবশ্যিক উপাদান। প্রাণ সৃষ্টির ব্যাখ্যায় এই ব্যাপারটাকে আমলে নিতেই হবে। জিন, পর্দা ও বিপাক একসঙ্গে সৃষ্টি হতে হলেও এদের যেকোনো একটাকে আগে সৃষ্টি হতে হবে। একটা তৈরি হলে এটা থেকে বাদবাকী দুটো তৈরি হবে।

হাঙ্গারিয়ান প্রাণরসায়নবিদ তিবর গান্তিছবিসূত্র- https://www.wasdarwinwrong.com/korthof66.htm

আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস এই পথ ধরে চললেও গবেষণাগারে আরএনএ থেকে প্রাণকোষ তৈরি করতে সেরকম সফলতা পান নি বিজ্ঞানীরা। সেজন্যে এর বিকল্প আইডিয়ার খোঁজ করেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড ড্রিমার। তাঁর ভাবনায় এই ত্রয়ী সিস্টেম একসঙ্গে এসেছে তবে তা খুবই সরল গড়নে। তবে এটা নতুন কোনো ধারণা নয়। হাঙ্গারিয়ান প্রাণরসায়নবিদ তিবর গান্তি ১৯৭১ সালে তাঁর লেখা বইয়ে “কেমোটন” নামে এমন এক জীব সত্ত্বার কথা কল্পনা করেন যেটি এনজাইমের প্রভাবে চলা বিপাক ক্রিয়ায় চলে। এই বিপাক ক্রিয়া থেকে তৈরি হয় জিন, তখন উপজাত হিসেবে তৈরি পদার্থ জমে জমে তৈরি হয় পর্দা। এভাবে কেমোটন বিকাশ আর বিভাজনের ক্ষমতা লাভ করে। ২০০০ সালের আগ অবধি তিবর গান্তির এই আইডিয়া তেমন সাড়া ফেলতে পারে নি। এর মধ্যে আরও অনেকে আলাদা ভাবে একই রকম ধারণা দিতে থাকেন।

তবে সাম্প্রতিক কালে তিবরের এই আইডিয়া অন্যদিকে মোড় নিতে থাকে। এখন আমরা জানি আরএনএ’র রাসায়নিক গঠন প্রোটিনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তেমনি প্রোটিন রাসায়নিক গড়নের দিক দিয়ে চর্বি থেকে ভিন্ন। তাই এই তিনটি কোর সিস্টেম একই সময়ে একই রাসায়নিক উপাদান থেকে উদ্ভুত হতে পারে সাম্প্রতিক প্রাণরসায়নবিদেরা তেমনটা মনে করেন না। সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের সুরাহা খুঁজেছেন মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া উল্কাপিণ্ডের মধ্যে। এগুলোর বয়স প্রায় পৃথিবীর বয়সের সমান। তাই তরুণ পৃথিবীর হালচাল সম্বন্ধে কিছুটা হলেও ধারণা মেলে এসব উল্কাপিণ্ড থেকে। এর মধ্যে সবথেকে বেশি গবেষণা হয়েছে “মুরচিসেন উল্কাপিণ্ড” নিয়ে। ১৯৬৯ সালে এটা অস্ট্রেলিয়ায় আছড়ে পড়েছিল। ১৯৮৫ সালে ড্রিমার এর মধ্যে কোষ পর্দার গাঠনিক উপাদান চর্বি অণুর খোঁজ পান। ২০০৮ সালে একই উল্কাপিণ্ডে অ্যামাইনো এসিডের খোঁজ মেলে এবং এরপর লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জিয়া মার্টিন্স আরএনএ’র উপাদান খোঁজে পান মুরচিসেন উল্কাপিণ্ডে।

মুরচিসেন উল্কাপিণ্ড। ছবিসূত্র- metelolovers

এরই মধ্যে রোমের সেপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্নেস্তো ডি মাউরো তরুণ পৃথিবীতে কি করে এই ত্রয়ী সিস্টেম সৃষ্টি হতে পারে এ নিয়ে প্রায় দু দশক ধরে গবেষণা চালান। তিনি “ফরমামাইড” নামে সায়ানাইডের মতন এক রাসায়নিকের ওপর জোর দেন। ফরমামাইড অণুতে ছয়টি পরমাণু থাকে। মহাবিশ্বের প্রায় সবখানেই এই ফরমামাইডের সন্ধান মেলে। তরুণ গ্রহগুলোতেও প্রচুর ফরমামাইড উপস্থিত ছিল। ২০০১ সালে তাঁর গবেষণা দল আবিষ্কার করে, ১৬০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় চুনাপাথরের উপস্থিতিতে ফরমামাইড থেকে আরএনএ’র গাঠনিক উপাদান তৈরি হয়। এমনকি ফরমামাইড থেকে অ্যামাইনো এসিডও উৎপাদন সম্ভব। শুধু ফরমামাইডই নয় এমন আরও রাসায়নিকের খোঁজ মেলেছে যেগুলো থেকে আরএনএ’র গাঠনিক উপাদান, অ্যামাইনো এসিড তৈরি সম্ভব। কেমব্রিজের এমআরসি গবেষণাগারের জন সাদারল্যান্ড সায়নামাইডের সঙ্গে আরও কিছু রাসায়নিকের সমন্বয়ে তৈরি করেন আরএনএ’র বিল্ডিং ব্লক নিউক্লিওটাইড। সাদারল্যান্ডের দল পরে একই ভাবে অ্যামাইনো এসিডও তৈরি করে দেখান। পরবর্তীতে সাদারল্যান্ড এই বলে উপসংহার টানেন যে,

“প্রাণ সৃষ্টির সবরকম দরকারি সিস্টেম একসঙ্গে একই রাসায়নিক মিশ্রণ থেকে তৈরি হতে পারে। সাদারল্যান্ড এই রাসায়নিক মিশ্রণের নাম দেন “গোল্ডিলক কেমিস্ট্রি”

কাজেই এমনটা হতেই পারে প্রাণ সৃষ্টির কোর সিস্টেমগুলো একসঙ্গেই সৃষ্টি হয়েছে। এবারে প্রশ্ন আসে এগুলো মিলে কি করে পরবর্তীতে জটিল কোষ তৈরি হল? ড্রিমারের মতে, প্রথমে সৃষ্টি হওয়া চর্বি অণু স্বতঃস্ফূর্তভাবে পর্দায় ঘেরা আদিকোষ তৈরি করে। চর্বির থলে আরএনএ এবং প্রোটিনকে একসঙ্গে যুগলবন্দী হবার সুযোগ করে দেয়; আরএনএ’কে প্রতিলিপিত হতে আর আরএনএ পর্দাকে সুস্থিত হতে সাহায্য করে। এই ত্রয়ী সিস্টেম একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে অবশ্যই সিস্টেমটা বেশ ভালো কাজ করে। ২০০৩ সালে নোবেলজয়ী প্রাণরসায়নবিদ জ্যাক সজটেকের গবেষণা দল চর্বি উপাদান ফ্যাটি এসিডের পর্দায় আবৃত একটা মডেল কোষ তৈরি করেন যার ভেতরে বেশ যুতসই ভাবেই আরএনএ থাকতে পারত। মন্টমরিলোনাইটের কণার উপস্থিতিতে বেশ দ্রুতই এধরণের কোষ তৈরি হয়। তবে সজটেকের এই মডেল কোষের ভেতর বিপাক ক্রিয়া তথা শক্তি উৎপাদনের রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো অনুপস্থিত। এধরণের কোষের ভেতর শক্তি উৎপাদনের ধারাবাহিক বিক্রিয়াগুলো সৃষ্টি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং কারবার। আধুনিক কোষে এই বিক্রিয়াগুলো যেসব এনজাইম দিয়ে ত্বরিত হয় তখনকার পৃথিবীতে এগুলো ছিল না। তবে কেউ কেউ এনজাইমের অনুপস্থিতে এই বিক্রিয়াগুলো চালানো যায় কিনা সে উপায় খোঁজ করছেন।

জন সাদারল্যান্ড। ছবিসূত্র- www2.mrc-lmb.cam.ac.uk/group-leaders/n-to-s/john-sutherland

এরই ধারবাহিকতায় দেখা গেছে, কিছু কিছু বিক্রিয়া আয়রন-সালফার খনিজের সমন্বয়ে চলতে পারে। সজটেকের  দল দেখান যে, তাঁদের তৈরি মডেল কোষের ভেতর অতিবেগুনী আলোর উপস্থিতিতে আয়রন-সালফার পরমাণু তৈরি হতে পারে। এবারে দেখার পালা, এই আদিকোষের ভেতর বিপাক ক্রিয়ার চালিকা বিক্রিয়াগুলো চলতে পারে কিনা। এরপরেও সজটেকের এই মডেল কোষ থেকে পৃথিবীর সকল প্রাণের আদি পূর্বসূরি কোষটি কেমন ছিল তার একটা ধারণা মেলে। সরল কিছু রাসায়নিকের উপস্থিতিতে এই কোষ আরএনএ ধারণ করতে পারে, সংখ্যা বাড়াতে পারে, জিন এর অনুলিপন ঘটতে পারে। তবে এই আদিকোষ ডি মাউরোর ধারণার রাসায়নিক থেকে তৈরি হয়েছিল নাকি সাদারল্যান্ডের গোল্ডিলক মিশ্রণ থেকে সেটা বলা মুশকিল। কেননা এটা নির্ভর করছে তখনকার রাসায়নিক পরিস্থিতির ওপর যেখানে প্রাণের স্পন্দন বেজেছিল যা আমাদের পক্ষে কোনোদিন জানা সম্ভব না।

এইটা প্রাণ সৃষ্টির উপাখ্যান শিরোনামে সিরিজের শেষ লেখা। আবার আসব প্রাণরসায়নের নতুন কোনো লেখা নিয়ে। সে অবধি ইনসাইডারের পাতায় চোখ রাখুন

তথ্যসূত্র-

এই সিরিজের বাকী লেখাগুলোর লিংক-

[/restrict]

সুজয় কুমার দাশ
বিজ্ঞান ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আছি। পড়াশোনা করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে। প্রকাশিত বই- দ্য মাঙ্গা গাইড টু বায়োকেমিস্ট্রি, দ্য মাঙ্গা গাইড টু মলিকিউলার বায়োলজি, অন্বেষা প্রকাশন; জীব জগতের অজানা গল্প, পুঁথি প্রকাশন।