রোগ বালাই তো মানুষের লেগেই থাকে। তখন আমরা দৌড়াতে থাকি ডাক্তার কবিরাজের কাছে। অবশেষে পথ্য নিয়ে সুস্থ হই। কিন্তু আমরা কিভাবে রোগে আক্রান্ত হলাম তা কিন্তু চিন্তার বিষয়! আমরা এখন জানি রোগ সৃষ্টির সাথে অণুজীবের গভীর সম্পর্ক আছে। আমাদের সবার কাছে পরিচিত ও ভয়াবহ একটি রোগ হল এইডস। আর যে কারণে এইডস হয় তা হল HIV ভাইরাস। একইভাবে আমাদের অনেকেরই জলবসন্ত হয়। এটার কারণও অণুজীব। কোথাও ব্যথা পেয়ে কেটে ছিঁড়ে গেলে অনেক সময় ইনফেকশন হয়। এটাও কিন্তু অণুজীবের কারণে। এভাবে চোখের সামনে নানা ভাবে আমরা অণুজীবের কারণে রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। তবে সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো এখন আমরা রোগের সাথে অণুজীবের যে সম্পর্ক আছে তা জানি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগের মানুষেরা কি এভাবেই আমাদের মত সচেতন ছিল এ ব্যাপারে। চলুন আজ আমরা একটু সে সময় থেকে ঘুরে আসি।আমরা দেখার চেষ্টা করব তখন মানুষ রোগ নিয়ে কি ভাবত আর আমরাই বা কিভাবে এত কিছু জানি।

সেই সময় মানুষ যখন রোগে আক্রান্ত হত তখন মনে করত কোন দেবতার অভিশাপ কিংবা অসন্তুষ্টির কারণে তাদের রোগ হচ্ছে। অথবা তারা কোন বড় রকমের পাপ করেছে বলেই বিধাতা তাদের শাস্তি দিচ্ছে। নানা মহামারী রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যেত। আর তারা তাদের নিয়তিকেই দুষতে থাকতো। সত্য না জানার ফল তাদের এভাবেই পেতে হত। আহারে!

এখন আসি কিভাবে আমরা রোগ সৃষ্টির কারণ খুঁজে পেলাম সেদিকে। ১৫৪৬ সালে Girolamo Fracastoro ধারণা করেন যে খুবই ছোট, দেখা যায় না এধরণের কোন জীব থেকে রোগ সৃষ্টি হতে পারে। এরপরে ১৮৩৫ সালে Agostino Bassi রেশম পোকার এক ধরণের রোগের কারণ হিসেবে ছত্রাক সংক্রমণকে দায়ী করেন। এটাই ছিল রোগের সাথে অণুজীবের প্রথম সম্পর্ক দেখানো। রোগের সাথে অণুজীবের যে সম্পর্ক আছে এই ধারণাটি Germ theory of disease বা রোগের জীবাণুতত্ত্ব নামে পরিচিত।

লুইস পাস্তুর

আঠারো শতকের শেষের দিকে ইউরোপের রেশম শিল্প ধ্বংসের মুখে পরে। তার কারণ ছিল রেশম পোকার এক ধরণের রোগ। এই সমস্যা সমাধানের জন্যে লুইস পাস্তুরকে ডাকা হয়। তিনি তখন মদ শিল্পে এক সমস্যার দারুণ এক সমাধান দিয়েছেন। সেই সমাধান কি তা নিয়ে না হয় আরেকদিন কথা হবে। তো যা বলছিলাম, লুইস পাস্তুরকে রেশম শিল্প বাঁচানোর জন্যে আনা হয়। তিনি দীর্ঘ ৬ বছর এ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি তাঁর গবেষণায় Agostino Bassi এর সকল তথ্য ব্যবহার করেন। অবশেষে পাস্তুর সিদ্ধান্তে আসেন যে, সম্প্রতি রেশম পোকার যে রোগ হয়েছে সেটির কারণ হলো এক ধরণের পরজীবী প্রোটোজোয়া। কোন সমস্যার সমাধানের জন্যে সমস্যার কারণ জানা দরকার। ঠিক একই ভাবে রোগের কারণ জানার সাথে সাথে এর প্রতিকারও বের হয়ে এলো।

জোসেফ লিস্টার

তবে রোগের সাথে অণুজীবের সম্পর্ক বের করার ক্ষেত্রে খুব বড় অবদান ছিল রবার্ট কখ্ এর (Robert Koch) । তবে উনার সম্পর্কে বলার আগে একজন ডাক্তারের গল্প বলি। সেই ইংরেজ ডাক্তারের নাম ছিল জোসেফ লিস্টার (Joseph Lister)। তিনি ছিলেন সার্জন। তো তিনি দেখতে পেলেন অপারেশনের পর ইনফেকশনে রোগীর মৃত্যুর হার অসম্ভব রকম বেশি। উনি জানতেন হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক Ignaz Semmelweis ১৮৪০ সালে বলেছিলেন, যেসব চিকিৎসক হাতকে জীবাণু মুক্ত করে না তাদের দ্বারা ইনফেকশন এক রোগী থেকে আরেক রোগীতে সংক্রমিত হয়। সাথে সাথে তিনি পাস্তুরের কাজ সম্বন্ধে জানতেন। তবে তিনি আরও একটি জিনিস জানতেন যা দিয়ে তিনি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জানতেন ফেনল (কার্বক্সিলিক এসিড) জীবাণুনাশক। তিনি তাই অপারেশনের আগে সব কিছু তাপ ও ফেনল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতেন। আর মাঝে মাঝে অপারেশন থিয়েটারে ফেনল স্প্রে করতেন। এই পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে অপারেশনের পর রোগীর মৃত্যুর হার আশ্চর্যজনকভাবে কমে গেল। তাঁর এই সাফল্য দেখে অন্য ডাক্তাররাও এই পদ্ধতি গ্রহণ করলেন। তবে সার্জনের সেই পদ্ধতি কিন্তু পরোক্ষ প্রমাণ দিল Germ theory of disease বা রোগের জীবাণুতত্ত্বের। কারণ এতে বুঝা গেল অণুজীবের সংক্রমণের কারণেই অপারেশনের পর রোগীরা ইনফেকশনে মারা যেত।

রবার্ট কখ্

এবার সবশেষে আসা যাক রবার্ট কখ্ এর কাছে। রবার্ট কখ্ দেখলেন এন্থ্রাক্স রোগে গরু মেষ একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। তিনি নেমে পড়লেন এন্থ্রাক্সের কারণ অনুসন্ধানে। অবশেষে তিনি জানতে পারলেন Bacillus anthracis নামের ব্যাকটেরিয়াই এন্থ্রাক্সের কারণ। কখ্ এই ব্যাকটেরিয়ার কালচার করে সুস্থ পশুর দেহে তা প্রবেশ করান। পশুগুলো অসুস্থ হয়ে একসময় মারা যায়। তিনি সেই মৃত পশুর রক্ত থেকেও একই ব্যাকটেরিয়া অর্থাৎ Bacillus anthracis পান। এ পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি কিছু সিদ্ধান্ত দেন যা কখ্ এর স্বীকার্য নামে পরিচিত। কখ্-এর স্বীকার্য নিয়ে অন্য কোন সময় লেখার ইচ্ছে রইল। তো যে ব্যাপার নিয়ে লিখছিলাম অর্থাৎ রোগের কারণ কিভাবে আমরা জানি তা কিন্তু বলা হয়ে গিয়েছে। কখ্ এর এই সিদ্ধান্তের পরে রোগের সাথে অণুজীবের সম্পর্কের ব্যাপারটা পাকাপোক্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রোগের জীবাণুতত্ত্বের কল্যাণে আজ আমরা অনেক রোগ থেকে মুক্ত। যেই মহারথীদের জন্যে আজ আমরা একটি সুস্থ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে সাহস করি তাদের জন্যে রইল অনেক অনেক সম্মান!

সুত্রঃ

1. Microbiology an introduction by Tortora,Funk, Case
2. Microbiology concepts and application by Pelczar,Chan,Krieg
3. Microbiology by Prescott,Harley,Klein
4. ছবিগুলো উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ

অজানাকে জানার চেষ্টা সবসময় রোমাঞ্চকর ও আনন্দের। সেই আনন্দ পাবার লোভে বিজ্ঞান নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করি ।অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ছি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। https://www.facebook.com/syedmonzur.morshed

সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 21 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    গুড। ভালো লেখা। ব্যাসিলাসের বৈজ্ঞানিক নাম ইটালিক হবে।

    ‘এই একুশ শতকে এসে আমরা জানতে পারি রোগ সৃষ্টির সাথে অণুজীবের গভীর সম্পর্ক আছে।’ এই লাইনটা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। কারণ সারা লেখাতে পাস্তুর, কখ্ প্রমুখের কর্মের বর্ণনায় অামরা জানতে একুশ শতকের আগেই জানতে পারি অণুজীব বিভিন্ন রোগ তৈরি করছে।

আপনার মতামত