নতুন নতুন জ্ঞান লাভ, বিশ্লেষণ এবং তা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আর একারণেই মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নত প্রজাতির প্রাণী। অন্য প্রাণী থেকে মানুষের পার্থক্য এখানেই যে এদের রয়েছে উন্নত মস্তিষ্ক। ফলে মানুষ সৃষ্টিলগ্ন থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেছে, নিজেদের জন্য সুবিধাজনক বিষয় গ্রহণ করেছে। আফ্রিকা থেকে মানুষের আজকের এই সমাজে আবির্ভাব কোন অলৌকিক ঘটনা নয়। এটাও মানুষের উন্নত মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার ফসল। প্রাচীনকাল থেকে মানুষের বিভিন্ন বিষয় জানার আগ্রহ ছিল। প্রথম দিকে প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর প্রতি তাদের সর্বাধিক দৃষ্টি ছিল। মানুষ প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত যে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে মস্কিষ্ককে অধিক ক্ষয় করেছে তার একটি হল উদ্ভিদ সম্পর্কিত জ্ঞান। আর এর প্রধান কারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয়তা। প্রাচীনকালে মানুষের বসবাসের জন্য আজকের মত বাড়িঘর ছিল না। তারা বাস করত মাটির গুহায়। আর খাবারের প্রয়োজনে নির্ভর করত উদ্ভিদের উপর। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী শিকার করে এর মাংস ভক্ষণ করত কিন্তু এর জন্য তীর, ধনুক, বল্লম প্রভৃতি আবিষ্কার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বর্তমানে উদ্ভিদের গুরত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেক উন্নত। আমরা জানি ক্লোরোপ্লাস্টের উপস্থিতিতে উদ্ভিদ সূর্য থেকে তাপশক্তি গ্রহণ করে খাদ্য তৈরীর ক্ষমতা রয়েছে শুধু উদ্ভিদের। আর মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। প্রাচীন মানুষেরা উদ্ভিদের ফল ভক্ষণ করে ক্ষুধা নিবারণ করত। কোন একটি অন্চলে প্রাপ্ত ফলের উপস্থিতি হ্রাস পেলে তারা অন্য অন্চলে দল বেঁধে স্থানান্তিরত হত। তারা বনে জঙ্গলে তাদের খাদ্য উপযোগী উদ্ভিদ অনসন্ধান করত। প্রথমদিকে তারা এমন কিছু উদ্ভিদ ভক্ষণ করত যা বর্তমানে আর খাদ্যের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় না। যার অধিকাংশ এখন আগাছা হিসেবে বিবেচিত। লৌহযুগে মানুষের খাদ্যউপযোগী একটি উদ্ভিদ টোনাল্ড যা বর্তমানে আগাছা হিসেবে মাঠ থেকে অপসারণ করা হয়। আবার কলমিশাক, শাকনটে, কাঁটানটে উদ্ভিদ আগাছা হিসেবে বিিেবচত হলেও বর্তমানে আমরা সবজি হিসেবে ভক্ষণ করে থাকি। চাষাবাসের যাত্র শুরুর পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন মানুষ খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষভাবে প্রাকৃতিক উদ্ভিদের উপর নির্ভর করত । মানুষের বসতির চারপাশে চাষাবাদের যাত্রা শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব দশহাজার অব্দে যার মূল কৃতিত্ব নারীদের। লৌহ আবিষ্কারের ফলে মানুষ আবিষ্কার  করে বলদ টানা লাঙল। ফলে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০ অব্দের ব্যপকভাবে কৃষিকাজের যাত্রা শুরু হয়। তবে প্রাচীন মানুষেরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণকৃত উদ্ভিদ বিভিন্নভাবে পার্থক্য করতে পারত। উদ্ভিদ বাছাই করার ক্ষেত্রে তারা উদ্ভিদের পুষ্টিগুণ, সুস্বাদুতা, সুপ্রাচ্যতা,প্রাথমিক খাদ্যেও সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং উদ্ভিদের উপর মানুষের দেহ-মনের ক্রিয়া প্রভৃতি বিষয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করত। এ থেকে অনুধাবন করা যায় প্রাচীন মানুষেরা বিভিন্ন উদ্ভিদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারতো। প্রাচীন ভাস্কর্য ও প্রাচীরগাত্রে শিল্পীর আঁকা বিভিন্ন উদ্ভিদের ছবি প্রমাণ করে প্রাচীন মানুষেরা উদ্ভিদ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিল। খাদ্য হিসেবে ছাড়াও ঔষধি গুণের জন্য মানুষের কাছে উদ্ভিদের গুরুত্ব অধিক ছিল। মানুষের বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে উদ্ভিদের পাতা, বাকল, মূল ,ফুল ও ফল। বিশেষ করে শিকারের সময় প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত স্থান থেকে প্রবাহিক রক্ত বন্ধ করতে এবং ব্যাথা উপশমে তারা উদ্ভিদের পাতা ব্যবহার করত। আর এর মাধ্যমে ঔষধি হিসেবে উদ্ভিদ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ওষুধ হিসেবে সরাসরি উদ্ভিদের ব্যবহার এখনও আমাদের সমাজে প্রচলিত। বিশেষ করে রক্ত জমাট বাঁধতে গাদা ফুলের পাতা, সর্দি কাশিতে তুলসি পাতা, হৃদরোগের ক্ষেত্রে অর্জুন গাছের বাকল, চর্ম রোগে নীম গাছের পাতাসহ অ্যালোবেরা, হরতকি, পুদিনা প্রভৃতি উদ্ভিদ আমরা ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু উদ্ভিদ সম্পর্কিত এই তথ্য অনেক পূর্ব থেকে প্রাপ্ত। প্রাচীনকালে মানুষ উদ্ভিদের এই সকল গুণ সম্পর্কে অবহিত ছিল। ফলে তারা ঔষধিগুণ আছে এমন উদ্ভিদ সনাক্ত করত। এর উপর নির্ভর করে ভেষজ চিকিৎসাবিদ্যা উৎপত্তি লাভ করে। প্রাচীনকালে চীনে ভেষজ গুণের উপর নির্ভর করে উদ্ভিদ সম্পর্কিত জ্ঞান অšে¦ষণ শুরু হয়। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে লিখিত  জু-১ এর সনাতনী ফার্মাকোপিয়াতে এ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কিত জ্ঞান অšে¦ষণে ভারতের প্রাচীন বিজ্ঞান সাধকদের অবদান স্বরণ করার মত। ভারতে ওষুধি উদ্ভিদ সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রমাণ পাওয়া যায় পুরোনা চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ  ”সুশ্রুত সংহিতায়”। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শেষে সুশ্রুত এই গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি এই গ্রন্থে ৭৬০ রকমের চিকিৎসাগুণে ভরপুর উদ্ভিদেও বর্ণনা দিয়েছেন। এছাড়াও বিজ্ঞান সাথকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম ভরদ্বাজ, শালীহোত্র,অগ্নিবেশ,দুধবল,নাগার্জুন । অর্থাৎ এটি স্পষ্ট যে প্রাচীন মানুষেরা উদ্ভিদের গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন ছিল। আর তা সংগ্রহের প্রয়োজনে বিভিন্ন গুণাগুণের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজন ছিল। যা পরবর্তীকালে গবেষণা ও তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে আধুনিক রূপ লাভ করে।
উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাসের যাত্রা শুরু প্রাচীনকাল থেকে। প্রথমদিকে মানুষের জ্ঞান ছিল সীমিত। তখন উদ্ভিদ সম্পর্কিত জ্ঞান ছিল প্রয়োজন নির্ভর। বিভিন্ন উদ্ভিদের কোন অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে উদ্ভিদের তালিকা তৈরী করা হত। এ সময়ে উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাসে যারা অবদান রেখেছেন তার মধ্যে অগ্রগণ্য থিওফ্রাসটাস। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দে প্রাণী ও উদ্ভিদের ব্যবহারিক এবং তাত্তিক জ্ঞান সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এসময় মানুষ অধিক পর্যবেক্ষণ নিভর হয়। ঠিক এই সময় জীবন সম্পর্কে যারা অধিক দর্শন করেছেন তারা হলেন অ্যানাক্সিমিন্ডার, হেরাক্লিটাস, এম্পিডোক্লেস অন্যতম। সর্বপ্রথম উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে দাবি করা হয় ইতালির সিবারিসকে যিনি উদ্ভিদ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করেছেন। পাশাপাশি উদ্ভিদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ চলতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ অব্দের দ্বিতীয়ার্ধে অ্যারিস্টটল এবং থিওফ্রাসটাস উদ্ভিদবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের একটি পৃথক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তারা দুজনই প্লেটোর প্রতিষ্ঠিত লাইসিয়ামে বিজ্ঞানচর্চা করতেন। থিওফ্রাসটাস ছিলেন  এরিস্টটলের ছাত্র। কাজের সুবিধার জন্য থিওফ্রাসটাস উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং এরিস্টটল প্রাণীবিজ্ঞান নিয়ে কাজ শুরু করেন। মানুষের দ্বারা বিভিন্ন উদ্ভিদেও ব্যবহার,গুণাগুণের উপর নির্ভর করে থিওফ্রাসটাস উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস করেন। তার শ্রেণীবিন্যাসের মূল ভিত্তি ছিল উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য। তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ হিস্টোরিয়া প্লান্টেরিয়াম (ঐরংঃড়ৎরধ চষধহঃধৎরঁস)। এই গ্রন্থে ৫০০’র বেশি প্রজাতির উদ্ভিদের বর্ণনা আছে। এছাড়াও প্রাচীন সময়ে উদ্ভিদ সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ম্যাটেরিয়া মেডিকা (গধঃবৎরধ সবফরপধ) ।
থিওফ্রাসটাসের পর দীর্ঘদিন উদ্ভিদ নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয় নি। অতপর ষোড়শ শতকে উদ্ভিদ নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু হয়। এসময় যারা উদ্ভিদ সম্পর্কে গভীর চিন্তা ভাবনা করেন তাদের মধ্যে অটো ব্রুনফেলস, হেরোনোমাস বক, লিয়োনহার্ট ফুস উল্লেখযোগ্য। এসময় বিজ্ঞানীরা শ্রেণীবিভাগ অপেক্ষা উদ্ভিদের ঔষধী গুণ বিষয়ে অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। রেঁনেসা যুগে উদ্ভিদেও শ্রেণীবিভাগ নিয়ে কিছ’ গবেষণা হয়ে থাকে। এসময় ক্যাসপার বাউহিন তার  বারোটি বইয়ে ৬০০০ এর বেশি উদ্ভিদেও বর্ণনা প্রদান করেন। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণীবিন্যাস প্রদান করেন বৃটিশ বিজ্ঞানি জন রে এবং ফ্রান্সের উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ পিটন ডি টুর্নিফোর্ট। জন রে ১৮০০০ উদ্ভিদেও তালিকা প্রদান করেন। তবে উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাসের ক্ষেত্রে যে গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে তা হল স্পিসিস প্লান্টেরাম (ঝঢ়বপরবং চষধহঃধৎঁস) । সুইডেনের উপসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রকৃতিবিদ ও শ্রেণীকরণবিদ ক্যারোলাস লিনিয়ান এই গ্রন্থের রচয়িতা। এই গ্রন্থে তিনি ৭৩০০ টি উদ্ভিদেও বর্ণনা ও শ্রেণীবিন্যাস করেন। তার প্রদত্ত লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস সর্বাধিক স্বীকৃত উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস। এই শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতিতে খুব সহজে উদ্ভিদ সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করা যায়। এছাড়া এই পদ্ধতিতে উদ্ভিদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে  বিভাগ থেকে প্রজাতি পর্যন্ত ধাপে ধাপে উদ্ভিদেসমূহকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এর সমগ্র উদ্ভিদজগৎকে সহজে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
যদিও লিনিয়াসের প্রদত্ত শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক, তবে তার শ্রেণীবিন্যাসে উদ্ভিদের বিবর্তন সম্পর্কে কোন তথ্য প্রদান করে না। ফলে উদ্ভিদেও শ্রেণীবিন্যাসে আধুনিক যুগ গবেষণা চলছে নিরন্তর। লিনিয়াস পরবর্তী সময়ে যে সকল বিজ্ঞানী উদ্ভিদেও শ্রেণীবিন্যাস নিয়ে যে সকল বিজ্ঞানী গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানীরা হলেন- অগস্টিন পিরেমাস ডি ক্যান্ডেল, জর্জ বেন্থাম, জন হাচিনসন, আরমেন তাখতাজান।

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.