পরমাণুর আভ্যন্তরীন মহাবিশ্বে ভ্রমণ-৯

internet connection school technology
Photo by Tara Winstead on Pexels.com
পাঠসংখ্যা: 👁️ 222

পরমাণুর অাভ্যন্তরীন মহাবিশ্বে ভ্রমণ
মূল: আইজ্যাক আসিমভ
অধ্যায়-২ : আলো
অনুচ্ছেদ-৪: বর্ণালীর বিবর্ধন

ম্যাক্সওয়েল তাঁর সমীকরণে কোনো ক্ষেত্রের তরঙ্গের স্পন্দনকাল সম্পর্ক কোনো সীমাবদ্ধতা রাখেন নি। একটি স্পন্দনের সময় এক সেকেন্ডেরও কম হতে পারে, সেই ক্ষেত্রে তরঙ্গের দৈর্ঘ্য হবে তিন লক্ষ কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশী। এমনি প্রতি সেকেন্ডে ডেসিলিয়ন পরিমান (১০^৩০) স্পন্দনও হতে পারে যেই ক্ষেত্রে একেকটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে এক সেন্টিমিটারের ট্রিলিয়নের ট্রিলিয়নের ভগ্নাংশ। এবং এর মধ্যবর্তী যেকোন মানই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আমরা যে আলো দেখি সেই আলোর তরঙ্গ যদিও এই সম্ভাবনার অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। সবচেয়ে দীর্ঘ দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ০.০০০৭ মিলিমিটার, এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্রটির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হচ্ছে এই দৈর্ঘটির অর্ধেক। এ থেকে কি বোঝা যায় এমন অনেক তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ আছে যা আমরা দেখি না?

তবে সমগ্র মানব ইতিহাসে এই প্রশ্নটি স্ববিরোধী হিসেবেই দেখা হয়েছে যে, এমন কোনো আলো আছে কিনা যা আমরা দেখি না? কেননা, সংজ্ঞা অনুযায়ী, আলো তাকেই বলা হয় যা দেখা যায়। জার্মান-ব্রিটিশ জোতির্বিদ উইলিয়াম হার্শেল ১৮০০ সালে প্রথমবারের মতো দেখালেন এটি আসলে স্ববিরোধী নয়। সেই সময় ধারনা ছিলো যে সূর্য হতে প্রাপ্ত আলো এবং তাপ দু’টি ভিন্ন ধরনের ঘটনা। হার্শেল ভেবেছিলেন যদি আলোর মত তাপকেও আলাদা বর্ণালীতে বিশ্লেষন করা যেতো।

কিন্তু তাপের বিশ্লেষণ করা যায় নি। তাপ বেগুনী রংয়ের দিক থেকে ক্রমান্বয়ে লালের দিকে যেতে যেতে ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবং লালের একেবারে প্রান্তে গিয়ে সর্বোচ্চ হয়। চমৎকৃত হয়ে হার্শেল চিন্তা করলেন যদি থার্মোমিটারের বাল্বটিকে লালের পরে স্থাপন করা হয় তাহলে কী ঘটতে পারে? আরো বেশী চমৎকৃতির সাথে তিনি আবিষ্কার করলেন থার্মোমিটারের তাপমাত্রা দৃশ্যমান অংশের আলোর যেকোনো অংশের চেয়ে আরো বেড়ে যাচ্ছে। হার্শেল ভাবলেন তিনি তাপীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেছেন।

এই পর্যবেক্ষণের কয়েক বছরের মধ্যেই অবশ্য আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো এবং আরো ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া তাই সম্ভব ছিলো। সূর্যালোক একটি নির্দিষ্ট সীমার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ধারন করে যা একটি প্রিজমের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। আমাদের রেটিনা একটি নির্দিষ্ট সীমার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায় কিন্তু সূর্যালোক সেই সীমার বাইরে, লালের চেয়েও বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ধারন করে এবং তাই এদেরকে বর্ণালীর লাল আলোর সীমার বাইরেও পাওয়া যায়। আমাদের চোখ এতো দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি কোনো সাড়া দেয় না তাই আমরা তাদের দেখি না কিন্তু যেভাবেই হোক তাদের উপস্থিতি আছে। এদের বলা হয় অবলাল (infrared, infra উপসর্গটি ল্যাটিন হতে এসেছে যার অর্থ ‘নীচে’ যদি আপনি বেগুনী থেকে লালকে উপর থেকে নীচের দিকে দেখে থাকেন।)

সকল আলোই যখন চামড়ায় আঘাত করে তখন হয় প্রতিফলিত হয় অথবা শোষিত হয়। যখন শোষিত হয় তখন এর শক্তি আমাদের চামড়ার অণুগুলোর গতিবৃদ্ধি করে তাই আমরা তাপ অনুভব করি। আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যতো বেশী হয় ততোই এটি আমাদের চামড়া বেশী ভেদ করতে পারে তাই শোষিতও হয় বেশী। এই কারনে যদিও আমরা অবলাল দেখিনা আমরা এটিকে তাপ হিসেবে অনুভব করতে পারি। এবং একই কারনে থার্মোমিটারেও এর প্রতি সাড়া পাওয়া যায়।

যদি দেখানো যেতো অবলাল সত্যিই তরঙ্গ দিয়ে গঠিত যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল আলোর চেয়ে বেশী তাহলে নিশ্চয় ভালোই হতো । কেউ চাইলে দু’টি চিরের মধ্য দিয়ে অবলাল আলো চালিয়ে হয়তো ইন্টারফেরেন্স ডোরা পেতে পারে কিন্তু সেগুলো সে দেখতে পাবে না। হয়তোবা এগুলোকে থার্মোমিটারের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে যেখানে উজ্জ্বল ডোরায় উচ্চ তাপমাত্রা এবং অনুজ্জ্বল ডোরায় নিন্ম তাপমাত্রা দেখাবে।

লিওপোলদো নোবিলি
মেসিডোনিও মেলোনি

১৮৩০ সালে ইতালিয় পদার্থবিদ লিওপোলদো নোবিলি (Leopoldo  Nobili ১৭৮৪-১৮৩৫) একটি থার্মোমিটার উদ্ভাবন করলেন যা এই কাজের জন্য উপযুক্ত। তাঁর একজন সহকর্মী ছিলেন ইতালিয় পদার্থবিদ মেসিডোনিও মেলোনি (Macedonio Melloni, ১৭৯৮-১৮৫৪)। যেহেতু কাচ অবলাল রশ্মির একটি বড় অংশ শোষন করে নেয় তাই মেলোনি কাচের বদলে রকসল্টের প্রিজম ব্যবহার শুরু করলেন যা অবলাল রশ্মির জন্য স্বচ্ছ। ফলশ্রুতিতে ইন্টারফেরেন্স ডোরা উৎপন্ন হলো এবং নোবিলির থার্মোমিটারে তাপমাত্রার হ্রাস বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেগুলোর উপস্থিতি প্রমাণিত হলো। মেলোনি দেখালেন যে অবলাল রশ্মি কোনো রকম ব্যাক্তিক্রম ছাড়াই আলোর সব বৈশিষ্ট্য ধারন করে- শুধুমাত্র পার্থক্য হলো এদের খালি চোখে দেখা যায় না।