ভ্যাকসিন, ব্যাকটেরিয়া এবং আমরা

বিশ্বজুড়ে পাবলিক হেলথের প্রধান অবলম্বন হল শিশুদের দেয়া ভ্যাকসিন । কিন্তু ভ্যাকসিন সব শিশুর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয়না । কেন হয়না? অন্ত্রে বাস করা অনুজীব এক্ষেত্রে একটা বড় কারণ হতে পারে।

২০০৬ সালে ওরাল ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগে ব্যাপকভাবে বাচ্চাদের মধ্যে রোটাভাইরাস (Rotavirus) সংক্রমণ হত । এর ফলে বাচ্চাদের প্রচন্ড ডায়রিয়া হত। জীবনাশংকা সৃষ্টিকারী এই পানিশূণ্যতার কারণে সারাবিশ্বে এখনো প্রতিবছর সাড়ে চার লক্ষ্যের বেশি শিশু মারা যায়। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকায়।

কারণ ভ্যাকসিন সবসময় কাজে আসে না । আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির ভেনিসা হ্যারিস খুঁজে বের করতে চাইলেন কেন এই অঞ্চলের শিশুরা এত উচ্চমাত্রার নন-রেসপন্ডার ( ভ্যাকসিনে সাড়া দেয়না ) ।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সম্ভবত এইসব শিশুদের বৃহদান্ত্রে বসবাসকারী জীবাণুদের একটা ভূমিকা আছে। ভেনিসা, তার সহকর্মীরা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সম্বনয়কারীগণ ৬৬ জন পাকিস্তানি শিশু এবং ৬৬ জন ডাচ শিশু নিয়ে গবেষণা করেন যারা সবাই ওরাল রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন নিয়েছিল । নেদারল্যান্ডসের অধিকাংশ শিশুর থেকে আশার চেয়েও বেশি প্রতিরক্ষা সাড়া (Immune response ) পাওয়া যায়। কিন্তু মাত্র ১০ জন পাকিস্তানি শিশু সাড়া দেয়।

good-bacteria-720x466

প্রত্যেক শিশুর থেকে পূর্বে সংগৃহীত স্টুলের নমুনার জেনেটিক স্ক্যান থেকে দেখা যায় যে, সাড়াদানকারী শিশুরা তাদের আন্ত্রিক অঞ্চলে অনেক বৈচিত্র্যময় জীবাণুকে আশ্রয় দেয় ।

এর মধ্যে প্রোটোব্যাকটেরিয়া গ্রুপের অনেক জীবাণুও ছিল।

অনেক আদিকোষী ব্যাকটেরিয়া চালিত হয় লেজের মতো ফ্ল্যাজেলার সাহায্যে । এই লেজে থাকে ফ্ল্যাজেলিন নামক প্রোটিন যা প্রতিরক্ষাদানকারী কোষকে কাজ করার শক্তি দেয় । “শরীরে এই ধরনের আধিক্য একটা স্বাভাবিক অনাক্রম্যতা গড়ে তোলে এবং ভ্যাকসিন এখান থেকে শক্তি পায়” – বলেন বালি পুলানড্র্যান । ইনি হলেন ইমোরি ইউনিভার্সিটির একজন ইমিউনোলজিস্ট । কলোরাডোয় অনুষ্ঠিত কিস্টোন সিম্পোজিয়ার একটি সম্মলনে ভেনিসার গবেষণাপত্রটি প্রদর্শিত হয়। পুলানড্যান এতে যুক্ত ছিলেন না ।

তবে গত বছর পুলানড্যান এবং তার সহকর্মীরা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের সফলতার ক্ষেত্রে ফ্ল্যাজেলাওয়ালা ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা দেখান ।

তিনি জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বসবাসকারী কিছু ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করেন। এই ইঁদুরগুলোর অন্ত্রে কোনো ব্যাকটেরিয়া ছিল না ।

তাদের মধ্যে ফ্ল্যাজেলাহীন ব্যাকটেরিয়ার অণুপ্রবেশ ঘটানো হয়। ফলাফল – তারা এন্টিবডি উৎপন্ন করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, ব্যাকটেরিয়া অনুপ্রবেশকৃত সাধারণ ইঁদুররা স্বাভাবিক শক্তিশালী অনাক্র্যমতা গড়ে তোলে । তাদের দলের মানুষের উপর একটি ছোট্ট গবেষণা দেখাতে পারে যে তিনটি ভিন্ন ব্রডস্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক (একটি অ্যান্টিবায়োটিক একাধিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে ) নেয়া মানুষের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব একইরকম।

২০১৪ সালে পেডিয়াট্রিকসে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায় যে, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া বাংলাদেশী শিশুদের ধনুষ্টংকার, যক্ষ্মা এবং ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের সাথে আন্তঃসম্পর্কিত ।

সবমিলিয়ে অনুজীব নিয়ে এইসব গবেষণায় দেখা যায় যে,আমাদের শরীরের স্বদেশী ব্যাকটেরিয়াসমূহই আমাদের ভ্যাকসিনের প্রতি প্রতিরক্ষা সাড়া নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে।

এই আবিষ্কার শেষ পর্যন্ত মাইক্রোবায়োম স্ক্রিন ( কোনো রোগলক্ষণ ছাড়া যে কৌশলের সাহায্যে নতুন কোনো রোগ নির্ণয় করা হয় ) এবং বিশেষত ভ্যাকসিন নেয়ার পূর্বে উপকারী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা তৈরীকৃত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের কতদুর নিয়ে যাবে তা দেখার বিষয় ।

সবকিছুর পরেও আমাদের শরীরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবগুলো নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীদেরকে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধনে সাহায্য করতে পারে। আর এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই পারে হাজার হাজার জীবন রক্ষা করতে।

তথ্যসূত্রঃ Our Personal Vaccine Helpers, Katherine Harmon Courage, Scientific American Magazine.

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

সাবরিনা সুমাইয়া
অলস, উদাসীন । অলসতা থেকে রেহাই পাওয়ার অবিরত চেষ্টার অংশ হিসেবে বিজ্ঞান লেখা ও ভাবার চেষ্টা করা।