ক্রিসপার-শিশুর জন্ম-বিতর্ক : পৃথিবী কি জিনোম-সম্পাদিত শিশুদের স্বাগত জানাবে?

তাদের নাম লুলু ও নানা। প্রকৃত নয়, ছদ্মনাম। ছদ্মনাম দেয়ার উদ্দেশ্য হলো এ দুই নবজাতকের প্রকৃত পরিচয় যাতে গোপন থাকে। কারণ তাদের জন্ম কোন সাধারণ জন্ম নয়, প্রকৃতির উপর বাড়াবাড়ি যেন, বিশ্ববাসীর কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত । লুলু ও নানা পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রথম শিশু যাদের জিনোম প্রকৃতির হাত থেকে ছিনিয়ে গবেষণাগারে সম্পাদিত করা হয়েছে। হে জিয়ানকুই নামক বিজ্ঞানী এ ঘোষণা দেয়ার পর সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানী-মহল তো বটেই, সাধারণ মানুষের মাঝেও হুলস্থুল ও নাটকীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তাই বোঝা কঠিন নয় কেন এই দুই শিশুর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

চিনের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনলজি এর প্রফেসর হে জিয়ানকুই সম্প্রতি তার গবেষণাগারের একটি ভিডিও এবং একজন সাংবাদিকের কাছে দেয়া সাক্ষাতকারে পৃথিবীবাসীর কাছে এ খবর প্রকাশ করেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে তারা ক্রিসপার (CRISPR) নামক একটি জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন যা গবেষণাগারে বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ ও ব্যক্টেরিয়ার জিনোম সম্পাদনায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবকোষের ডিএনএতে থাকা নির্দিষ্ট জিন নির্ভুল ভাবে বদলে দেয়া যায়। তবে এখনো পর্যন্ত কোন জিনোম বদলে দেয়া মানব-শিশু জন্ম দেয়ার সাহস কেউই করে নি। হে জিয়ানকুই টেস্ট টিউব পদ্ধতিতে জন্মানো দুজন শিশুর জিনোম কৃত্রিমভাবে বদলে দিতে এই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছেন। এ কাজে তিনি IVF পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু নিষেকের মাধ্যমে তৈরি ভ্রুণকোষ বদলিয়েছেন। তিনি মূলত ভ্রুণের একটি নির্দিষ্ট জিন নিষ্ক্রিয় করেছেন। এর ফলে অন্তত তাত্ত্বিকভাবে ঐ ভ্রুণ থেকে জন্মানো শিশুকে এইচআইভি ভাইরাস আক্রমণ করতে পারবে না। উল্লেখ্য, ঐ শিশুর পিতারা ছিলেন এইচআইভি-আক্রান্ত।

এই চিনা বিজ্ঞানীর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছেন তারা এ গবেষণা সম্পর্কে কিছু জানেন না। তাছাড়া হে জিয়ানকুই গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ছুটিতে ছিলেন। হে জিয়ানকুই এর এ ঘোষণার পর বিজ্ঞানী মহলে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। মানুষের মাঝে কিভাবে ও কখন ক্রিসপার প্রয়োগ করা হবে তা এখনো চলমান একটি বিতর্ক। এর কোন সমাধান এখনো আসে নি। এই প্রযুক্তি জিনোম সম্পাদনায় তুলনামূলক নতুন। মাত্র ২০১২ সালে এর আবিষ্কার হয়েছে। ক্রিসপারের মাধ্যমে নিখুঁত ভাবে ডিএনএর সুনির্দিষ্ট অংশ বদলিয়ে দেয়া যায়। এর মাধ্যমে রোগব্যাধীর জন্য দায়ী নির্দিষ্ট জিনকে সহজে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া যাবে। কিন্তু যেহেতু এই প্রযুক্তিটি বেশ নতুন, বিজ্ঞানীরা এখনো শিখছেন এসব সম্পাদনা বা পরিবর্তন আসলে কতটুকু পর্যন্ত নিখুঁত হতে পারে। তাছাড়া এসব কৃত্রিম পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব কি কি থাকতে পারে সেটাও পরিস্কার নয়।

বংশগতি নিয়ে কাজ করা প্রায় সকল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদল কিছু নীতিমালা মেনে চলেন। এসব নীতিমালায় মানব ভ্রুণে ক্রিসপার সম্পাদনা ও গর্ভধারণের জন্য প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেসব কোষ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে না (যেমন রক্ত বা ত্বক) সেসব কোষে বিশেষজ্ঞরা ক্রিসপার পরিবর্তন সমর্থন করেন। কারণ এখানে কৃত্রিম পরিবর্তন কেবলমাত্র পরিবর্তনকারীর দেহে — অর্থাৎ একটি প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু হে জিয়ানকুই জিনোম পরিবর্তন করেছেন ভ্রুণ কোষে। ভ্রুণকোষটি মানবগর্ভে প্রতিস্থাপনের পর বার বার বিভাজিত হয়েছে। ফলে সম্পাদিত পরিবর্তনটি সকল ধরণের কোষেই ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কোষের মধ্যে রয়েছে জননকোষও। ফলে ক্রিসপার-সম্পাদিত শিশুরা বংশবৃদ্ধি করলে এ পরিবর্তিত জিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানব জনপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়বে। তার ফলশ্রুতিতে কি কি ঘটতে পারে, তা আমরা একেবারেই জানি না। এটাও লুলু ও নানার জিনোম সম্পাদনা নিয়ে তৈরি বিতর্কের মধ্যে অন্যতম।

কয়েকদিন আগে হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ে মানব জিনোম সম্পাদনার উপর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সামিট হয়ে গেলো। সেখানে হে জিয়ানকি তার এই গবেষণার কিছু ফলাফল উপস্থাপন করেন। সেখানে উপস্থাপিত উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ক্রিসপার-পরিবর্তিত এ ভ্রুণ থেকে জন্ম নেয়া দুই শিশুর দেহেই মোজাইক-বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। তার মানে ভ্রুণ অবস্থা থেকেই তাদের দেহের কিছু কোষে ক্রিসপার সম্পাদনা ও অন্যান্য কোষে অসম্পাদিত জিনোমের উপস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ যে জন্য এসব শিশুর জন্মের আগে ক্রিসপার সম্পাদনা করা হলো, তা একেবারেই ভেস্তে যেতে পারে।

চীনা বিজ্ঞানি প্রফেসর হে জিয়ানকুই মানুষে জিনোম সম্পাদনার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সামিটে বক্তৃতারত (ছবি S.C. Leung/SOPA Images/LightRocket via Getty Images)।

আরো ঝামেলা হলো আমরা জানি না ক্রিসপার কি শুধু নির্দিষ্ট ঐ জিনেই পরিবর্তন করেছে, নাকি জিনোমের অন্যান্য জায়গাতেও অজানা পরিবর্তন করেছে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রিসপার অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তনও করে। এটা অনেকটা স্মার্টফোনের লেখার সময় অটোকারেক্ট সুবিধার মতো — যা মাঝে মাঝে ভুল শুদ্ধ করতে গিয়ে উল্টোপাল্টা লিখে ফেলে।

ভ্রুণ থেকে জন্ম নেয়া মানব শিশুর জিনোম সম্পাদনা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৭ সালের নীতিমালায় অনমনীয় কিছু নিয়মের উল্লেখ আছে। যেমন কিভাবে এসব সম্পাদনা ঘটবে, সামগ্রিক প্রক্রিয়া কিভাবে কড়া নজরদারীর মধ্যে থাকবে ইত্যাদি। এ নীতিমালা অনুসারে, এধরণের জিনোম সম্পাদনা তখনই করা যাবে যখন অন্য কোন প্রচলিত-চিকিৎসা সম্ভব নয়। কিন্তু চিনের এই ক্রিসপার-গবেষণায় এসব নীতিমালার কোনটাই মানা হয় নি। যে বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে এ সম্পাদনা করা হয়েছে, তারা বলছে এ বিষয়ে তারা কিছুই জানতো না। বৈজ্ঞানিক সমাজেও এ গবেষণা সম্পর্কে কিছুই জানানো হয় নি। যে জিন সম্পাদনা হয়েছে সেটাও ‘চিকিৎসা করা অসম্ভব’ এমন কিছু ছিলো না। তাছাড়া, এই শিশুদের পিতা এইচআইভি চিকিৎসার মাঝে আছেন যা তাদের শিশুতে ভাইরাসটির সংক্রামণ সম্ভাবনা একেবারেই কমিয়েছিলো।

লুলু ও নানার প্রকৃত পরিচয় এখন গোপন থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে লুকানোর সম্ভাবনা কম। প্রশ্ন উঠেছে, এই শিশুরা বড় হয়ে উঠলে কি তাদের সন্তান নিতে দেয়া উচিত হবে? তাদের সন্তানরা যদি পৃথিবীর মানবজনপুঞ্জে পরিবর্তিত জিনটি ছড়িয়ে দেয় তাহলে কি হবে? কিংবা সমাজ এ শিশদেরকে কিভাবে দেখবে? তা এই শিশুদের উপর কি ধরণের প্রভাব ফেলবে? বিজ্ঞান গবেষণার প্রচলিত রীতিকে পাশ কাটিয়ে, বিভিন্ন নীতিমালাকে বুড়োআঙ্গুল দেখিয়ে, সমাজ বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালকে অন্ধকারে রেখে হে জিয়ানকুই জিনোম-পরিবর্তিত শিশুর জন্ম দিলেন একটি অপ্রস্তুত ও অনিচ্ছুক পৃথিবীতে। এ শিশুদ্বয় বড়ো হওয়ার পর যে সিদ্ধান্ত নেয় এবং পৃথিবী ও সমাজকে যে দৃষ্টিতে দেখে, তার জন্য দায়ী থাকবেন হে জিয়ানকুই।

সূত্র: 
১. ‘They Will Be Studied for the Rest of Their Lives.’ How China’s Gene-Edited Twins Could Be Forever Changed By Controversial CRISPR Work,  by Alice Park, Time
২. A Reckless and Needless Use of Gene Editing on Human Embryos, Ed Yong, The Atlantic

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 75 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ Reply

    খুব ভালো লাগলো পড়ে। এটা অনেকটা মার্ভেলের X-men মুভির মতো হয়ে গেলো। আমরা মানুষেরা যেহেতু এখনও ম্যাচিউরিটি অর্জন করতে পারি নি, এই প্রযুক্তির অপব্যবহার হবে। মানুষ এখনও এই প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত নয় বলে মনে হচ্ছে।

    • আরাফাত রহমান Reply

      ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য! সকল প্রযুক্তির অপব্যবহার হয়েছে। ক্রিসপারেরও হয়তো হবে। সমস্যা হলো সমাজে প্রযুক্তিটির প্রভাব ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই এটা শুরু হয়ে গেলো।

আপনার মতামত