গ্রীনহাউজ গ্যাস যেভাবে তাপ ধরে রাখে

গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা ভূ্‌-পৃষ্ঠ হতে বিকীর্ণ তাপ বায়ুমণ্ডলীয় গ্রীনহাউজ গ্যাসসমূহ দ্বারা শোষিত হয়ে পুনরায় বায়ুমন্ডলের অভ্যন্তরে বিকিরিত হয়। এই বিকীর্ণ তাপ বায়ুমন্ডলের নিম্নস্তরে ফিরে এসে ভূ-পৃষ্ঠের তথা বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়। মূলত সৌর বিকিরণ দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বায়ুমন্ডলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে ভূ-পৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে এবং ভূ-পৃষ্ঠ পরবর্তীকালে এই শক্তি নিম্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে অবলোহিত রশ্মি আকারে নির্গত করে। এই অবলোহিত রশ্মি বায়ুমন্ডলস্ত গ্রীনহাউজ গ্যাসসমূহ দ্বারা শোষিত হয়ে অনেক বেশি শক্তি আকারে ভূ-পৃষ্ঠে ও বায়ুমন্ডলের নিম্নস্তরে পুনঃবিকিরিত হয়।

চিত্রঃ পৃথিবীর গ্রীনহাউজ গ্যাস প্রক্রিয়া

শীত প্রধান দেশগুলোতে সাধারণত কাচ নির্মিত গ্রীনহাউজ তৈরি করে উদ্ভিদ উৎপাদন করার পদ্ধতি অনুসরণ এই প্রক্রিয়ার নামকরণ করা হয়। একটি গ্রীনহাউজে সৌর বিকিরণ কাচের মধ্য দিয়ে গমন করে গ্রীনহাউজটিকে উত্তপ্ত রাখে,এখানে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে গ্রীনহাউজটি বাতাসের প্রবাহ হ্রাস করে উত্তপ্ত বাতাস কাচের কাঠামোর মধ্যে পরিচলন ব্যতিরেকে ধরে রাখতে পারে।

এই গ্রীনহাউজ গ্যাস না থাকলে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হত -১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস ,যেখানে বর্তমান গড় তাপমাত্রা হলো ১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস । তাই  বুঝাই যাচ্ছে এই গ্রিনহাউজ গ্যাসসমূহ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে গ্রিনহাউজ গ্যাস এর পরিমাণ স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করলেই দেখা দেয় বিপত্তি এবং শুরু হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ (Global Warming) ও জলবায়ু পরিবর্তন। আমাদের বায়ুমণ্ডলে শুষ্ক বাতাসে আয়তনভিত্তিক বিভিন্ন গ্যাসের পরিমাণ হল ৭৮.০৮ %  নাইট্রোজেন (N₂), ২০.৯৫ % অক্সিজেন (O₂) , ০.৯৩ % আর্গন (Ar), ০.০৪ % কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এবং সামান্য পরিমাণে আরও কিছু গ্যাস। আর পৃথিবীতে যে প্রধান ৪ টি গ্যাস গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে তারা হলো জ্বলীয় বাষ্প (H₂O), কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂), মিথেন (CH₄) ও ওজোন (O₃)। গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির জন্য মেঘ হচ্ছে প্রধান অগ্যাসীয় উপাদান যা অবলোহিত রশ্মি শোষন ও নির্গত করে।

এখন প্রশ্ন হলো, বায়ুমন্ডলে N₂ ও O₂ এর মত গ্যাস এত অধিক পরিমাণে থাকলেও খুব অল্প পরিমাণে থাকা CO₂ ও CH₄ কেন গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে ? N₂, O₂ কেন নয়? গ্রীনহাউজ গ্যাসগুলো কেন গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে এবং কিভাবে? এসব উত্তরের সন্ধানেই এই লিখা। গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়ার সংজ্ঞায় আমরা শুরুতেই জেনেছি যে গ্রীনহাউজ গ্যাসগুলো সৌর বিকিরণ শোষন করে। কিভাবে তারা এই কাজটি করে তা জানার জন্য আমাদের যেতে গ্যাসগুলোর হবে আণবিক পর্যায়ে।

আমরা জানি, ইলেকট্রন উচ্চ শক্তির অর্বিটাল থেকে নিম্ন শক্তির অর্বিটালে পতনের সময় শক্তি হিসেবে বিচ্ছিন্ন রঙিন আলোক রেখা বিকীর্ণ করে যাকে পারমাণবিক বর্ণালী রেখা বলে। বিপরীতভাবে, পরমাণু কর্তৃক একই তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো শোষিত হলে ইলেকট্রন পুনরায় নিম্ন শক্তির অর্বিটাল থেকে উচ্চ শক্তির অর্বিটালে গমন করে। অণুতেও একইরূপ শোষণ ঘটে থাকে, তবে সেক্ষেত্রে ইলেকট্রন পারমাণবিক অর্বিটালের পরিবর্তে আণবিক অর্বিটালের মধ্যে স্থান বিনিময় করে। কিন্তু গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে শোষিত অবলোহিত বিকিরণ গ্রীনহাউজ গ্যাস অণুর নিম্ন অর্বিটাল থেকে উচ্চ অর্বিটালে ইলেকট্রনের স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে এই শোষণের ফলে গ্রীনহাউজ গ্যাস অণুর অভ্যন্তরে এক ধরণের ‘বন্ধন কম্পন’-এর সৃষ্টি হয়।

বন্ধন কম্পন আবার কি জিনিস ?

এই ‘বন্ধন কম্পন’ কি তা অনুধাবনের জন্য আমরা একটি স্প্রিং কল্পনা করতে পারি । স্প্রিংটির দুইপ্রান্তে পরমাণুরূপী দুটি বল যুক্ত আছে। স্প্রিংটি সংকোচিত ও প্রসারিত হতে পারে। গ্রীনহাউজ গ্যাস অণু অবলোহিত বিকিরণ শোষণ করলে অণুর অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বন্ধনে কম্পন সৃষ্টি হয় । বন্ধনটি স্প্রিং এর ন্যায় প্রসারিত ও সংকোচিত হতে থাকে।

চিত্রঃ অবলোহিত বিকিরণ শোষণের ফলে সৃষ্ট বন্ধন কম্পনের স্বরূপ

চলুন প্রধান গ্রীনহাউজ গ্যাস কার্বন ডাই ওক্সাইডে সৃষ্ট বন্ধ কম্পন পর্যবেক্ষণ করি। CO₂ অণুতে দুটি C=O দ্বি বন্ধন বিদ্যমান যার ফলে এর আণবিক গঠন একটি রৈখিক জ্যামিতিক বিন্যাস লাভ করে। কিন্তু এই বন্ধনগুলো স্থির নয়, এরা নিম্নে উল্লেখিত তিনটি ভিন্ন পদ্ধতিতে কম্পিত হতে পারে।

প্রতিসম প্রসারণে, C=O বন্ধন দুটি প্রসারিত হয় এবং অক্সিজেন দুটি পরস্পর বিপরীত দিকে গমন করে।

অপ্রতিসম প্রসারণে, একটি C=O বন্ধন সংকোচিত ও অপরটি প্রসারিত হয়। ফলে অক্সিজেন দুটি একই দিকে গমন করে।

ক্র কম্পনে, CO₂ অণু রৈখিক জ্যামিতিক বিন্যাস থেকে বক্র বিন্যাস লাভ করে।

চিত্রঃ CO₂ তে বন্ধন কম্পনের ফলে সৃষ্ট নতুন বন্ধন বিন্যাস

একবার পরমাণুসমূহ তাদের নতুন অবস্থানে পৌঁছানোর পর পুনরায় আবার তাদের পুরাতন অবস্থানে ফিরে আসতে শুরু করে। এভাবে তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলিত হতে থাকে। প্রতিটি CO₂ পরমাণু প্রতিনিয়ত এধরণের কম্পন সম্পন্ন করতে থাকে।

বন্ধন কম্পনের পরেও কোন একটি অণু অবলোহিত বিকিরণ থেকে একটি ফোটন শোষণ করবে কি করবে না তা দুটি শর্তের উপর নির্ভরশীল।

শর্ত ১ – নিম্ন কম্পন দশা ও উচ্চ কম্পন দশার শক্তি পার্থক্য, অবলোহিত  ফোটনের শক্তির সমান হলে। অর্থাৎ একটি ফোটন তখনই শোষিত হবে যখন ফোটনের শক্তি কম্পন দশাদ্বয়ের শক্তির পার্থক্যের সমান হবে।

শর্ত ২ – কম্পনের ফলে অণুর ডাইপোল মোমেন্ট এর পরিবর্তন হবে।

এই ডাইপোল মোমেন্ট আবার কি জিনিস?

তা জানতে হলে আমাদের জানতে হবে তড়িৎ ঋণাত্মকতা ও ডাইপোল কি। সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ একটি পরমাণু শেয়ারকৃত ইলেকট্রনকে নিজের দিকে টানার ক্ষমতাই হল তড়িৎ ঋণাত্মকতা! অর্থাৎ, কোন একটা বন্ধন যদি দুটি ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু দিয়ে তৈরি হয় তবে অধিক তড়িৎ ঋণাত্মক পরমাণু শেয়ারকৃত ইলেকট্রনজোড় নিজের দিকে টেনে নিবে। ফলে তখন অণুটা বিশুদ্ধ সমযোজী যৌগ থাকবে না, কিছুটা বিকৃতি ঘটবে। অধিক তড়িৎ ঋণাত্মক পরামাণু নিজের দিকে ইলেকট্রন টেনে নেয়ার ফলে ওই পরমাণুর উপর আংশিক ঋণাত্মক চার্জ আর যেইটা কম তড়িৎ ঋণাত্মক ঐটার উপর আংশিক ধনাত্মক চার্জ তৈরি হবে। ধরি, A ও B ২ টা পরমাণু সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ। B এর তড়িৎ ঋণাত্মকতা A এর চেয়ে বেশি। তাই বন্ধনের শেয়ারকৃত ইলেকট্রন B এর দিকে বেশি ঝুঁকে থাকবে বিধায় B এর উপর আংশিক ঋণাত্মক (-δ)আর A এর উপর আংশিক ধনাত্মক (+δ) চার্জ সৃষ্টি হয়েছে।

চিত্রঃ AB একটি ডাইপোল যৌগ

ইলেকট্রনের এই অসম বিন্যাসে ফলে আংশিক ধনাত্মক ও ঋণাত্মক প্রান্ত বিশিষ্ট যে অণু (বা বন্ধন) গঠিত হয় তাকে বলা হয় ডাইপোল অণু (বা ডাইপোল বন্ধন) ।

তাহলে এই ডাইপোল মাপা হয় কিভাবে??

দৈর্ঘ্য যেমন মাপা হয় মিটার এককে। ঠিক এরকমই ডাইপোলের তীব্রতা মাপা হয় যেই রাশি দিয়ে তার নাম হল ডাইপোল মোমেন্ট! ডাইপোল মোমেন্ট, μ = Q x r (একক হল C.m) । সমীকরণে Q হল উভয় প্রান্তে সৃষ্ট চার্জের পরিমাণ এবং r হলো বন্ধন দৈর্ঘ্য।

কোন একটা অণুর যেকোনো বন্ধনের ডাইপোল মোমেন্ট আসলে নির্ণয় করা হয় কিভাবে?

এর জন্যও উপরের সূত্রটা প্রযোজ্য। কিন্তু এই ক্ষেত্রে যেহেতু পরমাণুর মধ্যে দূরত্ব এতটাই কম তাই এদের ডাইপোল মোমেন্টও আসে খুব খুব ছোট। তাই হিসাবের সুবিধার জন্য আমরা অণুর জন্য ডাইপোল মোমেন্টের একককে একটু পরিবর্তন করে নেই। আর রসায়নে অণুর ডাইপোল মোমেন্টের এই এককটা হল D (debyes)।

1D=3.33×10-30C.m

বন্ধন গঠনকারী ২ টা পরমাণুর তড়িৎ ঋণাত্মকতার পার্থক্য যত বেশি হবে ওই বন্ধনের Q এর মানও তত বেশি হবে! আর দূরত্ব হল এদের মধ্যকার বন্ধনদৈর্ঘ্য। ডাইপোল মোমেন্ট এর দিক প্রকাশে   চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।

তাহলে কোন একটা অণুর ডাইপোল মোমেন্ট আর বন্ধন ডাইপোল মোমেন্টের মধ্যে সম্পর্কটা কি? উত্তরটা হলো অণুতে যতগুলা ডাইপোল বন্ধন থাকে সবগুলার ডাইপোল মোমেন্টের ভেক্টর সমষ্টিই হল অণুর ডাইপোল মোমেন্ট যদি অণুতে একটাই বন্ধন থাকে (যেমন আমাদের AB যৌগ) তাহলে অণুর ডাইপোল মোমেন্ট হল বন্ধন ডাইপোল মোমেন্টের সমান। কিন্তু যদি কোন অনুতে ২ টা বন্ধন থাকে আর ২ টা ডাইপোল বিপরীত (1800 তে) দিকে কাজ করে? তখন ২ টা ডাইপোল মোমেন্টের লদ্ধি হবে 0 অর্থাৎ সমগ্র অণুর কোন ডাইপোল মোমেন্ট থাকবে না (যেমন CO2)। CO2 অণুতে দুটি C=O বন্ধন আছে। আর ২ টা “বন্ধন”ই পোলার বা ডাইপোল বন্ধন। কিন্তু তারপরও CO2 অণুটা কিন্তু ডাইপোল অণু না! কারণ এই ২ টা বন্ধনের আলাদা আলাদা ২ টা একই মানের ডাইপোল বন্ধন (যেহেতু ২ টা বন্ধনই C=O বন্ধন) বিপরীত দিকে কাজ করায় এরা একে অপরকে বাতিল করে দেয়। তাই সমগ্র অণুর কোন ডাইপোল (বা ডাইপোল মোমেন্ট) থাকে না। অর্থাৎ CO2 এর প্রত্যেকটা বন্ধন ডাইপোল বন্ধন হলেও অণুটা ডাইপোল না!

চলুন দেখি উপর্যুক্ত দুটি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে CO2 অণুতে বন্ধন কম্পন সৃষ্টির ফলে কি ধরণের অবস্থা হয়ঃ

প্রতিসম প্রসারণঃ উপরে বর্ণিত হয়েছে যে CO2 অণুতে দুটি C=O বন্ধন বিপরীত দিকে কাজ করে বলে CO2 অণুর ডাইপোল মোমেন্ট শূন্য। প্রতিসম প্রসারণ প্রক্রিয়ায় বন্ধন কম্পনের ফলে দুটি C=O বন্ধ পরস্পর বিপরীত মুখী হয়ে প্রসারিত হয় ফলে ডাইপোল মোমেন্ট এর কোন পরিবর্তন হয় না। যেহেতু প্রতিসম প্রসারণে কোন শর্ত পূরণ হয়নি তাই এই প্রক্রিয়ায় CO2 অণু কোন অবলোহিত বিকিরণ (বা ফোটন) শোষণ করবে না।

অপ্রতিসম প্রসারণঃ এ প্রক্রিয়ায় বন্ধন কম্পনের মাধ্যমে CO2 অণুতে আংশিক ঋণাত্মক চার্জ বিশিষ্ট দুটি অক্সিজেন পরমাণু একই দিকে গমন করে। ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড অণুর ঋণাত্মক চার্জ একটি প্রান্তের দিকে সরে যায় এবং ডাইপোল মোমেন্ট এর পরিবর্তন ঘটে। এ প্রক্রিয়ায় শর্ত পূরণ হয়েছে বলে কার্বন ডাই অক্সাইড অণু অবলোহিত বিকিরণ শোষণ করে।

বক্র কম্পনঃ বক্র কম্পনের ফলে CO2 এর গঠন রৈখিক জ্যামিতিক বিন্যাস থেকে বক্র জ্যামিতিক বিন্যাসে পরিবর্তিত হয়। এক্ষেত্রে CO2 অণুর দুটি অক্সিজেন পরমাণুতে আংশিক ঋণাত্মক চার্জ ও কার্বন পরমাণূতে আংশিক ধনাত্মক চার্জের সৃষ্টি হয়। বক্র কম্পনের ফলে CO2 অণুর ডাইপোল মোমেন্ট পরিবর্তিত হয় (শর্ত ২) এবং CO2 অণু অবলোহিত বিকিরণ শোষণ করে।

চিত্রঃ অপ্রতিস প্রসারণ ও বক্র কম্পনের ফলে অণুতে ডাইপোল মোমেন্ট এর পরিবর্তন

সুতরাং শুধুমাত্র সেসকল গ্যাসই (জলীয় বাষ্প, CO2, CH₄, O₃) গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে যারা উপরোক্ত বন্ধন কম্পন ও পরিবর্তিত ডাইপোল সৃষ্টির মাধ্যমে অবলোহিত বিকিরণ শোষণ করতে সক্ষম। জলীয় বাষ্প বিকিরণ শোষণ করে বলেই পরিষ্কার আকাশের রাত্রি অপেক্ষা মেঘলা আকাশের রাত্রি অধিক উষ্ণ হয়। একই কারণে মরুভূমির রাত্রি অপেক্ষা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের রাত্রি অধিক উষ্ণ হয়।

আমরা শুরুতেই জেনেছি প্রাকৃতিক গ্রীনহাউজ প্রক্রিয়ায় জলীয় বাষ্প, CO2, CH₄, O₃ প্রভৃতি গ্যাস অবলোহিত বিকিরণ শোষণের করে। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবীপৃষ্ঠ ও বায়মন্ডল উষ্ণ থাকে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি জীবজগৎটিকে থাকার  জন্য অত্যাবশকীয়। গ্রীনহাউস প্রক্রিয়া না থাকলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা -১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে চাঁদের মত ঠাণ্ডা শিলায় পরিণত হত, যা জীবদের টিকে থাকার জন্য অনুপযোগী । আবার স্বাভাবিক থেকে অধিক পরিমাণ গ্রীনহাউজ গ্যাসও কাম্য নয়। কেননা তা পৃথিবীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রা থেকে বারিয়ে দিবে।  শনি গ্রহে বায়ুমণ্ডলের ৯৬% CO₂ যা এর ভূমির তাপমাত্রাকে ৪৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস করে দেয়, তাই শনিও বসবাসের অনুপযোগী।

সূর্য থেকে যে তাপশক্তি বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে আসে তার ২৬ ভাগ প্রতিফলিত হয়ে মহাশুন্যে ফিরে যায়, ১৯ ভাগ মেঘ, গ্যাস (ওজোন) ও নানা কণিকা দ্বারা শোষিত হয়, যে ৫৫ ভাগ ভূমির কাছাকাছি আসতে পারে তার ৪ ভাগ ভূমি থেকে প্রতিফলিত হয়ে মহাশুন্যে ফিরে যায়। শেষ পর্যন্ত তাপশক্তির ৫১ ভাগ ভূমির কাছাকাছি থাকতে পারে, যা ভূমির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ গলানো, জলীয়বাষ্প তৈরী ও সালোক-সংশ্লষণে কাজে লাগে। ভূমি থেকে প্রতিফলিত তাপের প্রায় ৯০ ভাগই গ্রীনহাউজ গ্যাসগুলো দ্বারা শোষিত হয়। দেখাই যাচ্ছে গ্রীনহাউজ গ্যাসগুলো তাপ ধরে রাখে । অতএব, তাদের পরিমাণ যত বেশী হবে পৃথিবীর তাপমাত্রা ততই বাড়তে থাকবে।

মানব সৃষ্ট নানা কারণে বিভিন্ন গ্রীনহাউজ গ্যাস যেমন, এর পরিমাণ আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার ও নানা কল-কারখানা থেকে CO₂ নির্গত হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানী খনি, কৃষি ব্যবহার, গবাদি পশু কার্যক্রম থেকে নির্গত হচ্ছে CH₄। অণুজীব থেকে শুরু করে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত সার N₂O এর প্রধাণ উৎস। তাছাড়া কারখানা, এসি, রেফ্রিজারেটর প্রভৃতি থেকে হাইড্রোফ্লোরোকার্বন বা সালফার হেক্সাফ্লোরাইড নামক কৃত্রিম গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গত হয়।

যদি পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়ে তাহলে আন্দিজ পর্বতমালার ছোট হিমবাহগুলো উবে যাবে। কানাডা, সাইবেরিয়া ও আলাস্কাতে বরফের নীচে প্রচুর CH₄ গ্যাস আছে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে এই CH₄ গ্যাসের নিঃসরণ বেড়ে যায়। CH₄ বায়ুমন্ডলে খুব কম থাকলেও এর তাপ সংরক্ষণ করার ক্ষমতা CO₂ এর প্রায় ২৫ গুণ। গত পাচ বছরে এই নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে গেছে প্রায় ৩ গুণ। পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ, মানে ৭০ কোটি লোক সমুদ্র থেকে মাত্র ১০ ফুট উচ্চতায় বাস করে। সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে তা তাদের জীবণ যাত্রায় বিরাট প্রভাব ফেলে। এই শতকে সাগরের উচ্চতা বাড়ার পরিমাণ হতে পারে ০.৭৫ থেকে ১.৯ মিটার। এই বৃদ্ধির পরিমাণ আরো বেশিও হতে পারে, তা নির্ভর করব কতটুকু গ্রীনহাউস গ্যাস প্রকৃতিতে উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। যদি সাগরের উচ্চতা মাত্র ১ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধি পায় তাহলে বাংলাদেশ, ভিয়েতনামের মত  দরিদ্র দেশগুলোতে প্রায় ৬ কোটি লোক  তাদের ঘরবাড়ি, আবাদি জমি হারিয়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। আবার মালদ্বীপের মত দেশগুলো পুরোপুরি সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। বুঝাই যাচ্ছে স্বাভাবিক মাত্রা থেকে অধিক গ্রীনহাউজ গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রধান কারণ। সম্ভাবনার বিষয় হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের মধ্যে চুক্তি সাক্ষতির হচ্ছে । চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হলো সামগ্রিকভাবে মানব সৃষ্ট কারণে গ্রীনহাউজ গ্যাসের নির্গমণ হ্রাস করা।

চিত্রঃ স্বাভাবিক থেকে অধিক গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রভাবসমূহ।

 

তথ্যসূত্রঃ

১। Chemistry et al John McMurry

২। www.physicalgeography.net/fundamentals/7h.html

৩। shodalap.org/shams/10650

 

 

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    এটা একটা অসাধারণ গোছানো লেখা! কেন কিছু কিছু গ্যাস গ্রিন হাউজ গ্যাস হিসেবে কাজ করে, কিন্তু অন্যরা না, তার একটা চমৎকার বর্ণনা পেলাম। তুমি ছবিগুলো যেভাবে বাংলাতে লেবেল করো, তা খুবই উপযোগী।

আপনার মতামত