একটুখানি ক্রিসপার

Share
   
পাঠ সংখ্যা : 309

আমি জেনিফার ডাউডনা। পেশায় একজন গবেষক—কাজ করি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়াতে। কয়েক বছর আগে আমি এবং আমার সহকর্মী ইম্যানুয়েল শারপ্যান্টিয়ে একসাথে জিনোম সম্পাদনার একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি। এর নাম ক্রিসপার-ক্যাস নাইন। আপনারা জেনে খুশি হবেন ক্রিসপার ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা কোষের ডিএনএ’তে নিখুঁত পরিবর্তন করতে পারেন। আমাদের বিশ্বাস এই প্রযুক্তি আমাদেরকে-বহুকাল-ধরে-ভোগানো অনেক সমস্যার সমাধান দিতে পারবে। এই লেখায় আমি ক্রিসপার আসলে কী,এর ক্ষমতা কতদূর,এই প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের ভাবনা কী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,এর ভবিষ্যত কী—তা নিয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই।

আপনারা জেনে অবাক হবেন ক্রিসপার আবিষ্কারের ঘটনা মোটেই খুব পরিকল্পিত কিছু ছিলো না,খুব সাধারণ একটা গবেষণা থেকে এর চিন্তাটা আমরা পাই। জীববিজ্ঞানের গবেষণায় বিভিন্ন জীব,অণুজীবের জিন নিয়ে নাড়াচাড়া করা খুব সাধারণ ব্যাপার। আমরাও সেরকম একটা গবেষণাই করছিলাম,আমাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিলো ব্যাকটেরিয়া কীভাবে ভাইরাস-আক্রমণ প্রতিরোধ করে,সেটা মোটামুটি জিনতাত্ত্বিক স্তরে পর্যবেক্ষণ করা। আপনারা জানেন ব্যাকটেরিয়া আমাদের দেহে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে থাকে,যেমন লেপ্রোসি,নিউমোনিয়া ইত্যাদি। ‘চোরের ওপর বাটপারি’ করার জন্য ব্যাকটেরিয়ারও একটা জাতশত্রু আছে,তার নাম ভাইরাস। ব্যাকটেরিয়াকে তার পরিবেশে টিকে থাকতে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ব্যাকটেরিওফেজ বা ফেজ ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। একটা ফেজ ভাইরাস যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে,তখন প্রথমে সে ঐ ব্যাকটেরিয়ার দেহে ইঞ্জেকশনের মতো করে নিজের জেনেটিক বস্তু(ডিএনএ বা আরএনএ)প্রবেশ করিয়ে দেয়। এই জেনেটিক বস্তুই ব্যাকটেরিয়ার দেহে নানারকম ক্ষতি করে থাকে। আক্রমণটাকে মোটামুটি একটা টাইম বোমার সাথে তুলনা করা যায়-ব্যাকটেরিয়ার হাতে অল্প কিছু সময় থাকে বোমাটাকে নিষ্ক্রিয় করতে,নতুবা বোমাটা ফেটে যাবে এবং ব্যাকটেরিয়াটা মারা পড়বে। বিবর্তনের পথ-পরিক্রমায় বহু ব্যাকটেরিয়া তাদের দেহে এই আক্রমণের বিরুদ্ধে একরকম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে,যার নাম ক্রিসপার। 

ক্রিসপারের কর্মপদ্ধতি, ছবি : cambridge.org

ক্রিসপার(CRISPR) আসলে  একটা শব্দসংক্ষেপ,এর পূর্ণরূপ হচ্ছে Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats। এর বাংলা করা যেতে পারে নিয়মিত-ব্যবধানযুক্ত-গুচ্ছবদ্ধ-ক্ষুদ্র-প্যালিনড্রোমিক পুনরাবৃত্তি।এটা আসলে কী একটু ভেঙে বলি। বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন যে জিনোমের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে কিছু প্যালিনড্রোমিক সিকুয়েন্স,অর্থাৎ A,T,C,G দিয়ে লিখিত এমন কিছু জেনেটিক কোড—যা বাম থেকে ডানে পড়লে যা হবে,বাম থেকে ডানে পড়লেও তা-ই হবে‌। দেখা গেলো, ‌বেশ বড়ো অংশ জুড়ে এরকম প্যালিনড্রোমিক সিকুয়েন্স,এরপর কিছু এলোমেলো সিকুয়েন্স,আবার একটা প্যালিনড্রোমিক সিকুয়েন্স-এটা আবার পূর্বেরটা থেকে ভিন্ন। বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের সীমা রইলো না,যখন তারা এই প্যালিনড্রোমিক সিকুয়েন্সগুলির সাথে ফেজ ভাইরাসের বিশেষ কিছু জেনেটিক সিকুয়েন্সের মিল খুঁজে পেলেন!

আসল ব্যাপারটা বলি আপনাদের,ধরুন,একটা ব্যাকটেরিয়া একটা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে—ব্যাকটেরিয়াটা জখম হয়েছে বেশ,কিন্তু মারা যায় নি। আঘাত সামলে নিয়ে সে ঐ ভাইরাসের ফেলে যাওয়া অস্ত্র,অর্থাৎ তার জেনেটিক বস্তু-ধরা যাক ডিএনএ’ থেকে কিছু অংশ আলাদা করে নিজের ডিএনএ’র একটা বিশেষ জায়গায় রেখে দেয়। শুধু রাখেই না,বংশগতীয় প্রক্রিয়ায় এই অংশগুলো পরের প্রজন্মেও স্থানান্তর করে। এই যে বিশেষ জায়গাগুলোতে ঐ ভাইরাসের ডিএনএ’র খণ্ডবিশেষ রাখা হলো,ঐ জায়গাটাকেই বলা হয় ক্রিসপার—জেনেটিক্সের পরিভাষায় বলা ভালো ক্রিসপার সাইট বা ক্রিসপার লোকাস। এই ক্রিসপার কিন্তু অনেকটা রেকর্ডখাতার মতো,যেখানকার প্যালিনড্রোমিক সিকুয়েন্সগুলো দেখে বলে দেওয়া যায় এই-এই ভাইরাসের সাথে এই প্রজাতির ব্যাকটেরিয়াটার পারিবারিক শত্রুতা আছে,এদের মধ্যে মাঝেমাঝেই ‘গণ্ডগোল’ হয়। এই রেকর্ডখাতা আবার ব্যাকটেরিয়া তার সন্তানকে দিয়েও যাচ্ছে,যাতে করে তারাও পুরোনো শত্রুকে চিনে রাখতে পারে। এবারে হচ্ছে আসল মজা,শুধু কি রেকর্ড রাখলেই চলবে? শত্রুকে ধ্বংস করতে হবে না? ব্যাকটেরিয়া এরপর ঐ সংরক্ষিত ডিএনএ থেকে একটা অনুষঙ্গী ‘গাইড’ আরএনএ তৈরি করে রাখে,যার সাথে ভাইরাসের ডিএনএ সিকুয়েন্স মিলে যায়। অনেকটা ছবি তুলে রাখার মতো ব্যাপার আর কি! এই আরএনএ খণ্ডটাই ব্যাকটেরিয়াকে সাহায্য করে ঐ ভাইরাস আবার আক্রমণ করলে,তাকে চিনে প্রতিহত করতে(এইজন্যে এর নাম ‘গাইড’)। প্রতিহত করার কাজে আরএনএ’টা একটি বিশেষ প্রোটিন—ক্যাস নাইনের সাথে যুক্ত হয়। ক্যাস নাইন-গাইড আরএনএ একসাথে পুরো কোষজুড়ে টহল দিতে থাকে,পরবর্তীতে যখনই একইরকম কোনো ভাইরাস(মানে একই জেনেটিক সিকুয়েন্স!) আক্রমণ করে-তখনি ঐ যুগলবন্দী ভাইরাসটিকে চিনে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ভাইরাসের ডিএনএ’র ঐ মিলে যাওয়া অংশটুকু ক্যাঁচ করে কেটে দেয়! ভাইরাস তখন আর কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

Loading...

ক্রিসপারের ডিএনএ কর্তনের আণবিক প্রক্রিয়া,ছবি : labiotech.eu

ক্যাস নাইন-আরএনএ’র এই যুগলবন্দীকে(বলে রাখি,এই যে যুগলবন্দীর কথা বলছি,এটিকেই পুনঃপ্রকৌশল করে আমরা সাধারণভাবে  ক্রিসপার প্রযুক্তি বলতে শুরু করেছি) মোটামুটি একটা আণবিক কাঁচির সাথে তুলনা করা যায়,যেটা কি না গাইড আরএনএ’র সাথে মিলিয়ে অন্য ডিএনএ’র উপযুক্ত স্থানে কেটে দিতে পারে। ডিএনএ যেহেতু দ্বিসূত্রক,তাই দুই সুতাই একসাথে কাটা পড়ে। ক্রিসপার নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারি যুগলবন্দীর গাইড আরএনএ’টাকে আমরা ইচ্ছেমতো বদলে দিতে পারি,অর্থাৎ এই পুরো ব্যাপারটা,কম্পিউটারের ভাষায় বললে,’প্রোগ্রামেবল’। তার মানে এই আরএনএ,যা কি না ক্যাস প্রোটিনকে চিনিয়ে দিচ্ছে কোথায় কাটতে হবে,সেটি বদল করে আমরা যেকোনো ডিএনএ সিকুয়েন্সই সম্পাদনা করতে পারবো—আর সেটাও কেবল আদিকোষী ব্যাকটেরিয়াতে নয়,সবরকম কোষেই ডিএনএ’তে নিখুঁত পরিবর্তন করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে। আমরা বিস্মিতই হয়েছিলাম যে, এই ‘সরল’ পদ্ধতিটার মাধ্যমেই জিনপ্রযুক্তির জগতে বেশ বড়সড় বিপ্লব আনা সম্ভব!

আণবিক কোষবিজ্ঞান থেকে আমরা জানি,ডিএনএ’র কোনো অংশ ভেঙে গেলে বা কোথাও ছেদ পড়লে,কোষ নিজে থেকেই তা খুঁজে বের করে জোড়া লাগাতে চেষ্টা করে। এই জোড়া লাগানোটা হতে পারে নতুন কোনো ডিএনএ খণ্ড এনে ঐ ছেদপ্রাপ্ত জায়গায় বসিয়ে অথবা কিছু প্রোটিন দিয়ে আঠা লাগানোর মতো করে ডিএনএ জোড়া দিয়ে—এরকম বিভিন্ন আণবিক প্রক্রিয়া কোষ নিজে থেকেই করে থাকে। এই ব্যাপারটাই ক্রিসপার ব্যবহারে আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। আগেই বলেছি ক্রিসপার প্রযুক্তিটা ‘প্রোগ্রামেবল‘। পৃথিবীতে এখনো এমন অনেক রোগ আছে,যাদের কারণ বিরাট ডিএনএর সামান্য একটি কি দুটি অক্ষরের হেরফের(এই হেরফেরকে বলে মিউটেশন),যেমন হান্টিংটন ডিজিজ,সিসটিক ফাইব্রোসিস কিংবা সিকল সেল এনিমিয়া। আমরা যদি ক্যাস প্রোটিন-গাইড আরএনএ’ যুগলটাকে এমনভাবে তৈরি করতে পারি,যা কি না ডিএনএর বিশেষ কিছু সিকুয়েন্সে,ধরা যাক এনিমিয়া কিংবা সিসটিক ফাইব্রোসিসের মতো রোগ যেসব মিউটেশনের কারণে হয়,সেইসব মিউট্যান্ট সিকুয়েন্সগুলোতে কাঁচি চালাতে পারে,তাহলে আমরা ঐ কোষটাকে ক্ষতিকর মিউটেশন মুক্ত করতে পারবো এবং ঐ অংশটুকু নতুন করে তৈরি করতে কোষকে প্রণোদিত করতে পারবো। অর্থাৎ,আমরা এতোদিন যেসব রোগের নিশ্চিত পরিণতি মৃত্যু বলে জেনে এসেছিলাম,ক্রিসপারের মাধ্যমে সেগুলো নিরাময় করার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে! আপনারা জেনে খুশি হবেন,২০১৫তেই বিজ্ঞানীরা ক্রিসপার ব্যবহার করে এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত কোষকে আবার সুস্থ করতে সক্ষম হয়েছেন। আমাদের আশা ক্রিসপার থেরাপি ব্যবহার করে এইচআইভির মতো অন্যান্য রেট্রোভাইরাস,বিশেষত হার্পিসের মতো যেসব ভাইরাস আমাদের ডিএনএ’ ব্যবহার করেই আত্মগোপন থাকে—আর কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো তাদের চিরতরে ‌পরাস্ত করা সম্ভব হবে!

ক্রিসপার ব্যবহৃত হতে পারে মারণঘাতি জেনেটিক রোগ নিরাময়ে, ছবি : technologynetworks.com

ওপরে যে কোষের ডিএনএ জোড়া লাগানোর কথা বললাম,অনেক সময় এই জোড়া লাগানোর প্রক্রিয়াতেও ভুল হতে পারে এবং এই ভুল হওয়ার কারণে কোনো বিশেষ জিন,যেটা হয়তো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রোটিন তৈরি করছে,সেই জিনটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ক্রিসপার ব্যবহার করে সচেতনভাবেই সেটা করা যায়। আর যদি তা না করে আমরা চাই,একটা খারাপ জিন পুরোপুরি অপসারণ করে সেখানে সঠিক জিন পুনঃস্থাপন করা দরকার—সে কাজেও ক্রিসপার সহায়তা করতে পারে।বিশেষ প্রক্রিয়ায় ক্যাস প্রোটিনের কাটাকুটির ক্ষমতাটাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যায়(বৈজ্ঞানিক ভাষায় বললে প্রোটিনটার ‘অ্যাক্টিভ সাইট ডোমেইন’কে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যায়) এবং এই অবস্থায় ক্যাস প্রোটিন আর ডিএনএ কাটতে পারে না,এর মাধ্যমে তখন আমরা সঠিক ডিএনএ খণ্ডের একটা ছাঁচ তৈরি করে পূর্বের ছেদপ্রাপ্ত এলাকায় পাঠাতে পারি। কোষের “কাঠমিস্ত্রি” প্রোটিনগুলো তখন সেই ছাঁচ দেখে ঠিক ঠিকভাবে ডিএনএ জোড়া লাগায়!

নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী—শারপ্যান্টিয়ে এবং ডাউডনা, ছবি: pharmaceuticalintelligence.com

Loading...

আপনাদের মনে হতে পারে, জিনোম-প্রকৌশলে ক্রিসপারই বুঝি একমাত্র প্রযুক্তি। আদতে তা নয়,বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে সেই ১৯৭০ সন থেকেই কাজ করছেন। এর মধ্যে আমরা জিনোম সিকুয়েন্সিং এর প্রযুক্তি পেয়েছি,ডিএনএ’র কপি তৈরি করার পিসিআর মেশিন পেয়েছি এবং সেই সাথে উদ্ভাবিত হয়েছে ডিএনএ সম্পাদনার বিভিন্ন প্রযুক্তিও। ক্রিসপার আসার আগে বিজ্ঞানীরা জিঙ্ক ফিঙ্গার নিউক্লিয়েজ,ট্যালেন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএ সম্পাদনার কাজ করতে পারতেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো এখনও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সমস্যা যেটা ছিলো—হয় এই প্রযুক্তিগুলোর নিপুণতার মাত্রা ছিলো অপেক্ষাকৃত কম,অথবা এগুলো ব্যবহার করতে বেগ পেতে হতো বেশ খানিকটা। সেদিক দিয়ে ক্রিসপারের গঠন এবং এর ব্যবহারশৈলী বেশ সহজ। এর আগের প্রযুক্তিগুলোকে যদি খসখসে কাগুজে ম্যাপের সাথে তুলনা করি,তাহলে ক্রিসপার হবে এখনকার জিপিএস সিস্টেম!

সারাবিশ্বে এর মধ্যেই ক্রিসপার নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে এবং হচ্ছেও। মানবদেহে ক্রিসপার কিভাবে কাজ করে,তা বোঝার জন্য অন্যান্য জীববৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মতো সরাসরি মানুষের ওপর প্রয়োগ না করে আগে ইঁদুর বা বানর, এরকম নমুনা প্রাণীতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এই পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে ডিএনএ’র সামান্য পরিবর্তন কিভাবে অন্যান্য টিস্যু,অন্যান্য বৈশিষ্ট্য তথা পুরো জীবটাকেই প্রভাবিত করতে পারে—সে বিষয়গুলো বুঝতে দারুণভাবে সহায়তা করছে। যেমন একটা গবেষণায় আমরা একদল ইঁদুরের গায়ের কালো রঙের জন্য দায়ী জিনটিকে পাল্টে দিয়েছিলাম। জীবদ্দশায় ইঁদুরগুলোর বিশেষ পরিবর্তন হয় নি,তবে তারা যে বাচ্চাকাচ্চার জন্ম দিয়েছে তাদের অধিকাংশের গায়ের রঙই আর কালো থাকে নি,যদিও তারা স্বাভাবিক ভাবেই চলাফেরাসহ অন্যান্য কাজ করেছে। বাচ্চা ইঁদুরগুলোর জিনোম সিকুয়েন্স করে আমরা দেখেছি,ক্রিসপার ঠিক সেই জিনটাকেই বদল করেছে,যেটা আমরা চেয়েছি। এছাড়া বানরের ওপর করা বিভিন্ন পরীক্ষা আমাদের ক্রিসপার বিভিন্ন টিস্যুতে কীভাবে ঠিকঠাক পৌছাতে পারে,কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কি না,ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়া কীভাবে আরো ত্রুটিহীন করা যায়—এই বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে আরো উন্নতির দিকে যেতে সহায়তা করেছে। আবিষ্কারের পর আমাদের ধারণা ছিলো মোটামুটি দশ বছরের মধ্যেই আমরা এর ‘ক্লিনিকাল অ্যাপ্লিকেশনে’ যেতে পারবো,অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্কদের ওপরে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিভাগ ২০১৬র জুনে সর্বপ্রথম ক্যান্সার চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। এর কয়মাস যেতে না যেতেই চীন থেকে ঘোষণা আসে তারা ফুসফুসের ক্যান্সারে ক্রিসপার প্রযুক্তি দিয়ে বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা কোষ ব্যবহার শুরু করেছে। ক্রিসপারের এরূপ উত্তরোত্তর সাফল্য বৃদ্ধিতে বড় বড় স্টার্ট-আপ করপোরেশন এবং ধনকুবেররা ইতোমধ্যেই এর বাণিজ্যিকরণের ব্যাপারে বে‌শ আগ্রহ দেখিয়েছেন!

টেডের মঞ্চে বক্তব্য রাখছেন জেনিফার ডাউডনা, ছবি: ted.com

ক্রিসপার দিয়ে যে মানব ইতিহাসে আগে যা কখনো ঘটেনি,সেরকম অসাধারণ কিছু করা সম্ভব আশা করি এতোক্ষণ আপনাদের তা বোঝাতে পেরেছি। এবার মুদ্রার উল্টো পিঠের গল্প। আমরা,বিজ্ঞানীরাও সবার মতোনই মানুষ; সমাজ-সভ্যতা-নৈতিকতার কাছে আমরাও আপনাদের মতোনই দায়বদ্ধ। আমরা এমন কিছু করতে বা করতে সমর্থন দিতে পারি না,যা বিশ্বমানবতার ক্ষতি,অসাম্য কিংবা অধোগামীতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোপূর্বে বিজ্ঞানের অসাধারণ কিছু আবিষ্কার মানুষের হাতে পড়ে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্রিসপারের ভবিষ্যতচিন্তায় আমাদের বিবেচনা করতে হবে ক্রিসপারেরও ‘অন্যরকম’ ব্যবহার হতে পারে। এই প্রযুক্তির যে অসীম ক্ষমতার কথা আমরা জেনেছি,তাতে হয়তো পরে ক্রিসপার দিয়ে আমরা এমন মানুষ তৈরি করতে চেষ্টা করবো,যাদের হাড় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়,যাদের রোগ-সংবেদনশীলতা কম কিংবা তাদের চোখের রং পেশির গড়ন,উচ্চতা অন্যদের চেয়ে আলাদা। অর্থাৎ আমরা যেসব বৈশিষ্ট্যকে আকর্ষণীয় বলে বিবেচনা করি,আমরা চাইবো সেগুলোর সমন্বয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে। আপনারা হয়তো সায়েন্স ফিকশনে এমন দেখে থাকবেন যে ভবিষ্যত পৃথিবীতে এলিটরা টাকার বিনিময়ে তাদের সন্তানদের অধিকতর বুদ্ধিমান,সুদর্শন করিয়ে নিচ্ছেন। ‘ডিজাইনার বেবি‘ বলা হয় এদেরকে। আজকে পর্যন্ত এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর জিনগত কার্যকারণ অনেকাংশেই আমাদের অজানা। তার মানে এই নয় যে,আমরা তা কখনো জানবো না। তাৎপর্যপূর্ণ এটাই,আমাদের কাছে এমন একটা উপকরণ আছে-যা সত্যিই এরকম পরিবর্তনের কাজে ব্যবহৃত হতে পারি,জিনগত তথ্য আমরা যখনই বের করি না কেনো। ‘ডিজাইনার বেবি’ পর্যন্ত আমরা যেতে পারি নি এখনো; কিন্তু এটা আর সায়েন্স ফিকশন নয়,নিকট ভবিষ্যত। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে আমরা কি ক্রিসপারের মাধ্যমে বিশ্বকে নতুন এক অসাম্য,নতুন এক বিভেদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি না? 

ক্রিসপারের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, ছবি : medium.com

এখানেই নৈতিকতার ব্যাপারটা চলে আসে,যেটা কোনো মতেই উপেক্ষণীয় নয়। আমি এবং আমার সহকর্মীরা এখনি মানবভ্রূণে ক্রিসপার ব্যবহার না করবার ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীদের আহ্বান জানিয়ে আসছি,যাতে করে আরো আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ‌্যমে আমরা এর নিরাপত্তা এবং নৈতিক-সীমাবদ্ধতাগুলোর সুরাহা করতে পারি। বস্তুত ক্রিসপার আমাদেরকে মানব-বিবর্তনের এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে রয়েছে মিউটেশন,বৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন—প্রাণবিকাশের বিগত চার বিলিয়ন বছরে যাদের যুগপৎ ক্রিয়ায় পৃথিবী ভরে উঠেছে নানা জীববৈচিত্র্যে। অন্যদিকে আছে আফ্রিকার মরুদ্যান থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে-পড়া বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে-উন্নত-এপ প্রজাতি,হোমো স্যাপিয়েন্স,যাদের হাতে আছে এমন এক প্রযুক্তি যা দিয়ে তারা নিজেরাই হয়ে উঠতে পারে নিজেদের বৈচিত্র্য এবং নির্বাচনের নিয়ন্ত্রক—ছাড়িয়ে যেতে পারে চেনা ছকে বিবর্তনের সমস্ত গতিপ্রকৃতি ও শক্তিমত্তা! তারা তা পারবে কী না,সে প্রশ্ন এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়—প্রাসঙ্গিক হলো তারা তা করবে কি না! তাদের দায়িত্ববোধ,মানবিকতা আর শুভবুদ্ধির ওপরেই যে ভর করে আছে গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যত!

জেনিফার ডাউডনা ২০২০ সালে রসায়নশাস্ত্রে নোবেলজয়ী প্রাণরাসায়নিক। আলোচ্য ক্রিসপার প্রযুক্তির তিনি একজন সহ-উদ্ভাবক। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্যে তিনি এবং ইম্যানুয়েল শারপ্যান্টিয়ে যুগ্মভাবে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন। ‘A Crack in Creation: Gene Editing and The Unthinkable Power to Control Evolution’ নামক বইয়ের সহ-রচয়িতা তিনি,যেখানে তিনি তার এই আবিষ্কারের যাত্রার পাশাপাশি মানুষকে ক্রিসপারের ব্যাপারে দিয়েছেন কিছু সতর্কবার্তাও। ক্রিসপার সম্বন্ধে ২০১৫ সালে করা তার টেড-টক'(নিচে প্রথম লিংক দ্রষ্টব্য)টি বিজ্ঞান ব্লগের পাঠকদের জন্যে বাংলায় অনুবাদ করা হলো।

প্রয়োজনীয় উৎসাবলি :    

১)মূল বক্তব্য: 
২)জিন এডিটিং- কী কেন কীভাবে
৩)Genetic Engineering will change everything forever: 
৪)What is crispr cas-9

ছড়িয়ে দেয়ার লিঙ্ক: https://bigganblog.org/2021/04/একটুখানি-ক্রিসপার/

Anirban Maitra

আমি অনির্বান। জন্ম, বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়াতে। বর্তমানে পড়াশোনা করছি নটরডেম কলেজে, বিজ্ঞান বিভাগে। প্রিয় বিষয় বং‌শগতিবিদ্যা, বিবর্তন এবং জীবপ্রকৌশল।

অন্যান্য লেখা | অন্তর্জাল ঠিকানা
4.4 10 ভোট
Article Rating
আলোচনার গ্রাহক হতে চান?
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

6 Comments
পুরানো
নতুন সবচেয়ে বেশি ভোট
লেখার মাঝে মতামত
সকল মন্তব্য