করোনা ভাইরাস আবিষ্কারের নেপথ্যের রাণী জুন আলমেইডার গল্প

পাঠসংখ্যা: 👁️ 128

কোভিড-১৯ একবিংশ শতাব্দীর এক কালো থাবা। পুরো বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে একটা জীবাণুর কাছে আমরা কতোটা অসহায়। কিন্তু ২০১৯ এ চীনের হুবেই প্রদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগে করোনা ভাইরাস ছিলো কীনা এ নিয়ে বিজ্ঞান মহলে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। করোনা ভাইরাস আবিষ্কারের নেপথ্যে কে ছিলেন তা নিয়ে ১৫ এপ্রিল ২০২০ এ কলামিস্ট স্টিভেন বি.বি.সি নিউজ স্কটল্যাণ্ডে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন । যেই নারী প্রথম করোনা ভাইরাস অনুসন্ধান করেছিলেন তিনি ছিলেন একজন স্কটিশ বাস চালক এর মেয়ে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যিনি স্কুল জীবন থেকে ছিটকে পড়েন। ভাইরাসের কল্পবিজ্ঞানে জুন আলমেইডা অগ্রদূত হয়ে আছেন বিশেষ করে করোনা মহামারিতে তার নামের গর্জন শোনা যাচ্ছে বেশ জোরালোভাবেই । কোভিড -১৯ একটি নতুন অসুস্থতা, তবে এটি ১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতালের ডক্টর আলমেইডার পরীক্ষাগারে প্রথম চিহ্নিত করোনা ভাইরাস এ রোগের মূল হোতা। এই ভাইরাসবিদ ১৯৩০ সালে জুন হার্টে জন্মগ্রহণ করেন।

গ্লাসগোয়ের উত্তর-পূর্বের আলেকজান্দ্রাপার্কের নিকটে একটি আবাসস্থলে বেড়ে উঠেন। আর্থিক অনটনে জুন যত সামান্য পড়াশোনা করে স্কুল ছেড়ে দেন। তবে গ্লাসগো রয়্যাল ইনফার্মারি (Glasgow Royal Infirmary)হিস্টোপ্যাথলজিতে পরীক্ষাগার প্রযুক্তিবিদ ( Laboratory technician) হিসাবে চাকরি পান। পরে তিনি তার কর্মজীবন আরও এগিয়ে নিতে লন্ডনে চলে যান। ১৯৫৪ সালে ভেনিজুয়েলার শিল্পী এনরিক্সআলমেইডাকে এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন।

সাধারণ ফ্লু নিয়ে গবেষণা

এই দম্পতি তাদের অল্প বয়সী কন্যাকে নিয়ে কানাডার টরন্টোতে চলে এসেছিলেন। চিকিৎসক লেখক জর্জ এর ভাষ্য মতে, অন্টারিও ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে ডঃ আলমেইডা একটি ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে তাঁর অসামান্য দক্ষতার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি এমন একটি পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন যা অ্যান্টিবডিগুলি সংহত করার জন্য ভাইরাসকে আরও ভালোভাবে ঠাহর করতে পেরেছিলো। মিস্স্টার উইন্টার বিবিসি রেডিও স্কটল্যান্ডে বলেছিলেন যে তার প্রতিভা যুক্তরাজ্যে স্বীকৃত হয়েছিলো। পরে ১৯৯৮সালে তাকে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের মেডিকেল স্কুল কর্তৃপক্ষ কাজ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একই হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যখন কোভিডে ভুগছিলেন এমন সময় চিকিৎসা করেছিলেন। ফিরে এসে তিনি ডঃ ডেভিড টাইরেলের সাথে উইল্টশায়ারের স্যালসবুরিতে। (Salisbury in Wiltshire) সাধারণ ফ্লু নিয়ে গবেষণারত ছিলেন। উইন্টার বলেছেন যে ডঃ টাইরেল স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে নাসারন্ধ্রের তরল নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁর দলটি দেখেছিলো যে তারা বেশ কয়েকটি সাধারণ সর্দি-সম্পর্কিত ভাইরাস বৃদ্ধি করতে পেরেছিল তবেএরাই সব ভাইরাস নয়।

বিশেষত একটি নমুনা, যা বি – ৮১৪ নামে পরিচিত। ১৯৬০ সালে একটি বোর্ডিং স্কুলের ছাত্রের নাকের ভাঁপথেকে নেওয়া হয়।তারা দেখতে পেল যে তারা স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে সাধারণ সর্দির লক্ষণ সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছিল তবে তারা সেল কালচারের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেতে অক্ষম ছিলো।যাহোক স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গবেষণার পরে অঙ্গানু বাড়তে দেখা যায় তখন ডঃ টাইরেল আশ্চর্য হয়েছিলেন যে এটি কোনও ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা যায় কীনা।

ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপে গবেষণারত জুন

তারা জুনকে নমুনা প্রেরণ করেছিলে যেসব নমুনায় ভাইরাসের কণাগুলো দেখেছিলেন। যা দেখে তিনি বলেন ঐগুলো দেখতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো তবে হুবুহু এক নয়। তিনি ভাইরাসকে চিহ্নিত করেছিলেন যা প্রথম মানব করোনা ভাইরাস হিসাবে পরিচিত। করোনাভাইরাস হলো ভাইরাসগুলোর একটি গ্রুপ যা একটি মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখলে মুকুট জাতীয় (করোনার) কিছু দৃশ্যত হয়। উইন্টার বলেছেন যে ডক্টর আলমেইডা ইঁদুরের হেপাটাইটিস এবং মুরগির সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস তদন্তকালে এই জাতীয় কণাগুলি আসলে আগে দেখেছিলেন। তবে তিনি বলেছিলেন যে পিয়ার-রিভিউ জার্নালে তার গবেষণাপত্রটি প্রত্যাখ্যিত হয়েছিলো। কারণ তারা বলছিলেন যে তিনি যে ছবিগুলো ধারণ করেছিলেন তা কেবল ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কণার খারাপ ছবি। স্ট্রেইন বি -৮১৪ থেকে নতুন আবিষ্কারটি ১৯৬৫ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে লেখা হয়েছিল ।

তিনি দেখলেন তার প্রথম ফটোগ্রাফ দুটি বছর পরে জেনারেল ভাইরোলজিতে প্রকাশিত হয়েছিল।মিস্টার উইন্টার এর মতে এটি ডঃটাইরেলে এবং ডক্টর আলমেইডা সহ সেন্ট থমাসের ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রফেসর টনি ওয়াটারসন ছিলেন। যিনি ভাইরাসের ছবির চারপাশে মুকুট এর কারণে করোনা ভাইরাস নামকরণ করেছিলেন । ডক্টর অলমেইডা লন্ডনের স্নাতকোত্তর মেডিকেল স্কুলে কাজ করেছিলেন সেখানে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত হোন। তিনি ওয়েলকাম ইনস্টিটিউটে তার কর্মজীবন শেষ করেছিলেন, যেখানে ভাইরাস ইমেজিং এর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পেটেন্টে তার নাম ছিলো। ওয়েলকাম ত্যাগ করার পরে জুন ইয়োগা শিক্ষক হয়ে উঠেন। তবে ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে তিনি এইচআইভি ভাইরাসটির অভিনব ছবি তুলতে সহায়তা করেছিলেন, তখন তিনি একজন উপদেষ্টার ভূমিকায় ফিরে আসেন ভাইরোলজিতে। 

২০০৭ সালে ৭৭ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর অন্ত প্রয়াণ ঘটে। তাঁর মৃত্যুর ১৩ বছর পরে তিনি একজন ভাইরাস আবিষ্কার এর অগ্রদূত হিসাবে প্রাপ্য স্বীকৃতি পাচ্ছেন। যার কাজটি তরাণ্বিত করেছে বর্তমানে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের গতি প্রকৃতি জানতে।

তথ্য সূত্রঃ https://www.bbc.com/news/uk-scotland-52278716

বিজ্ঞাপন

জান্নাতুল ফিজা
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছি অণুজীব বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে। লেখালেখি করতাম শখের বসে। এখন করি আত্নার প্রশান্তির জন্য