২০,০০০ বছর পূর্বেও করোনা ভাইরাসের মহামারি?

পাঠসংখ্যা: 👁️ 201

 কিংবদন্তি বিজ্ঞান লেখক, গবেষক, কলামিস্ট কার্ল জিমার New York Times ম্যাগাজিন এ সম্প্রতি পূর্ব এশিয়ান জনগোষ্ঠির শরীরে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধি প্রকট ৪২ টি জিনের উপস্হিতি ছিলো এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন  প্রকাশ করেছেন। কী ছিলো সেই লেখার বিষয়বস্তু চলুন চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।   

গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে করোনা ভাইরাস ধ্বংসাত্মক একটি মহামারি  প্রায় ২০,০০০ বছর পূর্বে পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলো  যা আজ জীবিত মানুষের ডিএনএর উপর একটি বিবর্তনীয় ছাপ রেখে যেতে যথেষ্ট ছিলো।  

গবেষকরা বলেছেন নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে একটি প্রাচীন করোনভাইরাস এই অঞ্চলটিকে বহু বছর ধরে জর্জরিত করেছে। অনুসন্ধানে বলা হয় কোভিড -১ মহামারিটি যদি টিকাদানের মাধ্যমে শীঘ্রই নিয়ন্ত্রণে না আনা হয় তবে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ডেভিড এনার্ড, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি বলেছেন,

আমাদের উদ্বেগজনক হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ” যেটি গত বৃহস্পতিবার Current Biology  জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিলো। “এখনই যা চলছে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্ত ধরে চলতে পারে।”

চিত্র: প্রজন্মের নির্বাচিত মিউটেশন এর গ্রাফ ( গবেষণা পত্র থেকে নেওয়া)

জনসংখ্যার ঘনত্বের সাথে মিউটেশনের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে মূল গবেষণাপত্রে।

এখন অবধি গবেষকরা এই রোগজীবাণুর পরিবারের ইতিহাসের খুব বেশি পিঁছনে ফিরে তাকাতে পারেননি। গত ২০ বছরে, তিনটি করোনাভাইরাস মানুষকে সংক্রামিত করেছে। গুরুতর শ্বাস প্রশ্বাসের রোগের কারণ হিসাবে করোনার ভূমিকা রয়েছে। কোভিড -১৯ , সার্সএবং মার্স এর। এই করোনা ভাইরাসগুলোর  প্রত্যেকটির উপর গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে তারা বাদুড় বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর কাছ থেকে আমাদের প্রজাতির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো।

অন্য চারটি করোনাভাইরাসও মানুষকে সংক্রামিত করতে পারে তবে এগুলো সাধারণত কেবলমাত্র হালকা সর্দি সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীরা বলেন এই করোনা ভাইরাসগুলো সরাসরি মানুষের প্যাথোজেন হয়ে ওঠেননি, তাই তারা কখন স্হানান্তরিত হয়েছিলো তা অনুমান করার জন্য অপ্রত্যক্ষ ক্লুগুলোর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে । প্রায় নিয়মিত হারে করোনাভাইরাসগুলো নতুন রূপান্তর লাভ করে।  তাই তাদের জিনগত প্রকারণের সাথে তুলনা করে কখন তা সাধারণ পূর্বপুরুষের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল তা নির্ধারণ করা সম্ভব। 

গবেষণাপত্র

HCoV-HKU1 এইচসিওভি-এইচকিউ 1 নামে পরিচিত এই হালকা করোনা ভাইরাসগুলোর মধ্যে অতি সাম্প্রতিক ১৯৫০ এর দশকে প্রজাতির বাঁধা পেরিয়েছিল। প্রাচীনতম, বলা হয় HCoV-NL63, ৮২০ বছর পর্যন্ত পুরানো হতে পারে।

তবে এই বিন্দুটির আগে, যতক্ষণ না করোনাভাইরাস ট্রায়াল আশানুরূপ হয়েছিলো – ডঃ এনার্ড এবং তার সহকর্মীরা অনুসন্ধানে একটি নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। করোনাভাইরাসের জিনগুলো দেখার পরিবর্তে গবেষকরা তাদের মানব পোষকের  ডিএনএতে প্রভাবগুলো দেখেছিলো।

প্রজন্ম ধরে, ভাইরাসগুলো মানব জিনোমে প্রচুর পরিমাণে পরিবর্তন এনে দেয়। একটি রূপান্তর যা ভাইরাল সংক্রমণের বিরুদ্ধে রক্ষা করে তার অর্থ জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে এবং এটি বংশধরদের মধ্যে চলে যাবে। একটি জীবন রক্ষাকারী পরিব্যক্তি, উদাহরণস্বরূপ, লোকেরা ভাইরাসের প্রোটিন কে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। 

তবে ভাইরাসগুলোও বিকশিত হতে পারে। কোনও পোষকের প্রতিরক্ষা কাটিয়ে উঠতে তাদের প্রোটিন এর আকার পরিবর্তন করতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো পোষককে আরও বেশি আক্রমণাত্মক (কাউন্টারঅফেনসিভ) হতে উৎসাহিত করতে পারে, যার ফলে আরও পরিবর্তন ঘটবে। 

যখন কোনও এলোমেলো নতুন রূপান্তর কোনও ভাইরাসের প্রতিরোধের জন্য ঘটে তখন তা দ্রুততার সাথে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে আরও সাধারণ হয়ে উঠতে পারে। এবং সেই জিনের অন্যান্য সংস্করণগুলো পরিবর্তে বিরল হয়ে যায়। সুতরাং যদি কোনও জিনের একটি সংস্করণ লোকের বৃহত গোষ্ঠীতে অন্য সকলকে প্রাধান্য দেয় তবে বিজ্ঞানীরা জানেন যে এটি সম্ভবত অতীতে দ্রুত বিবর্তনের চিহ্ন ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে , ডাঃ এনার্ড এবং তার সহকর্মীরা ভাইরাসগুলোর একটি অ্যারের ইতিহাস পুনর্গঠন করার জন্য জিনগত পরিবর্তনের এই নিদর্শনগুলোর  জন্য মানব জিনোম অনুসন্ধান করেছেন। মহামারিটি আঘাত হানলে তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন যে প্রাচীন করোনভাইরাসগুলো  তাদের নিজস্ব একটি আলাদা চিহ্ন রেখে গেছে কী না?  

বিশ্বের ২৬ টি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার মানুষের ডিএনএ তুলনা করেছেন, জিনের সংমিশ্রণটি দেখে যা করনোভাইরাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্য ধরণের রোগজীবাণু নয়। পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীতে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছিলেন যে এর মধ্যে ৪২ টি জিনের একটি প্রকট সংস্করণ রয়েছে। এটি একটি দৃঢ়  সংকেত ছিলো যে পূর্ব এশিয়ার লোকেরা একটি প্রাচীন করোনা ভাইরাস প্রজাতিকে অভিযোজিত করে নিয়েছিলো। 

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডেলাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টোরাল গবেষক যিনি নতুন গবেষণার সহ-লেখক ইয়াসিন সৌলমি বলেছিলেন।

তবে পূর্ব এশিয়ায় যা ঘটেছিল তা মনে হয়েছিল কেবল সে অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলো। “যখন আমরা তাদেরকে বিশ্বজুড়ে জনগোষ্ঠীর সাথে তুলনা করি, তখন আমরা সংকেতটি খুঁজে পেলাম না।

এরপরে বিজ্ঞানীরা অনুমান করার চেষ্টা করেছিলেন যে কতকাল আগে পূর্ব এশিয়রা   কোনও করোনভাইরাসকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো। তারা এই সত্যটির সুযোগ নিয়েছিলো যে একবার কোনও জিনের প্রকট সংস্করণ প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে যেতে শুরু করলে, এটি ক্ষতিকারক এলোমেলো রূপান্তর লাভ করতে পারে। যত বেশি সময় যায়, তত বেশি রূপান্তর জমতে থাকে।

 এনার্ড এবং তার সহকর্মীরা দেখতে পান যে ৪২ টি জিনের প্রায় একই সংখ্যক রূপান্তর ছিলো। এর অর্থ হলো তারা প্রায় একই সময়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছিলো। গবেষক  এনার্ড বলেছিলেন

“এটি এমন একটি সংকেত যা আমাদের হঠাৎ পাওয়া বস্তু হিসেবে প্রত্যাশা করা উচিত নয়।

তারা অনুমান করেছিলেন যে এই সমস্ত জিনগুলো তাদের অ্যান্টিভাইরাল মিউটেশনগুলো ২০,০০০থেকে ২৫,০০০বছর আগে একসময় বিকশিত হয়েছিল, সম্ভবত কয়েক শতাব্দীর পরে এটি সম্ভবত। এটি একটি আশ্চর্যজনক অনুসন্ধান, যেহেতু পূর্ব এশীয়রা তখন ঘন বসতি  সম্প্রদায়ের মধ্যে বাস করতো না বরং এর  পরিবর্তে শিকারী-সংগ্রহকারীদের ছোট ছোট দল তৈরি করেছিলো।

University College London এর

বিবর্তনীয় জিনতত্ত্ববিদ আইদা  যিনি এই নতুন গবেষণায় জড়িত ছিলেন না, তিনি বলেছিলেন যে এই কাজটি অমোঘ বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এখানে বেশ কিছু সুনিশ্চিত ব্যাপারে বিমোহিত হয়েছি।”

তিনি বলেছিলেন,

তবুও, তিনি ভাবেননি যে প্রাচীন মহামারীটি কত দিন আগে সংঘটিত হয়েছিল তার দৃঢ় অনুমান করা এখনও সম্ভব হয়েছিলো। “সময় একটি জটিল জিনিস”। “এটি কয়েক হাজার বছর আগে বা পরে ঘটেছে কী না?  আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটি এমন একটি বিষয় যা সম্পর্কে আমরা আত্মবিশ্বাসী হতে পারি না।

ডক্টর  সৌলমি বলেছিলেন,

নতুন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ওষুধের সন্ধানকারী বিজ্ঞানীরা প্রাচীন মহামারির প্রতিক্রিয়ায় বিবর্তিত ৪২ জিনের যাচাই-বাছাই করতে চাইতে পারেন”।

তিনি বলেছিলেন,”এটি ভাইরাস প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া সামঞ্জস্য করার জন্য আণবিক নবগুলো আসলে আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে”। 

ডক্টর অ্যান্ডার্স একমত হয়ে বলেছিলেন,

যে নতুন গবেষণায় চিহ্নিত জিনগুলো ড্রাগের লক্ষ্য হিসাবে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। “আপনি জানেন যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, ইহাই বিবর্তন এর সৌন্দর্য।”

 তথ্য সূত্র :

১.A Coronavirus Epidemic Hit 20,000 Years Ago, New Study Finds

https://nature.us17.list-manage.com/track/click?u=2c6057c528fdc6f73fa196d9d&id=1930d66b7d&e=d4300d7f89

২.An ancient coronavirus-like epidemic drove adaptation in East Asians from 25,000 to 5,000 years ago

https://doi.org/10.1101/2020.11.16.385401

বিজ্ঞাপন

জান্নাতুল ফিজা
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছি অণুজীব বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে। লেখালেখি করতাম শখের বসে। এখন করি আত্নার প্রশান্তির জন্য