নিউক্লিক এসিড এর বিবর্তন-২

পাঠসংখ্যা: 👁️ 118

প্রিয় স্যাপিয়েন্স সকলে, কেমন আছেন? নিউক্লিক এসিড এর বিবর্তন নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে আপনাদের স্বাগতম। আপনাদের বলছিলাম কি করে আরএনএ-ডিএনএ এর আগমন ঘটে। গত পর্বে বলেছিলাম আরএনএ বিশ্ব হাইপোথিসিস বলছে আরএনএ ই পৃথিবীর প্রথম বংশগত বস্তু। আরএনএ থেকেই ডিএনএ বিবর্তিত হয়। আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরির প্রথম ধাপ হচ্ছে আরএনএ থেকে ইউ-ডিএনএ (U-DNA) এর উদ্ভব। এবং এর পরে কি করে টি-ডিএনএ আসে সেটাও বলেছি। আজকের পর্বে এর পর থেকে শুরু হবে। আজকে জানাব আরএনএ বিশ্ব প্রকল্পের বাকী অংশটুকু এবং সেই সাথে এই প্রকল্পকে নাড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু গবেষণা আর মতামত নিয়েও।

আরএনএ কয়েল। ছবিসুত্রঃ সায়েন্টিফিক এমেরিকান ডট কম

কোষে ডিইউএমপি তৈরি হয় ডিইউটিপি থেকে ডিএনএ এজ এনজাইমের প্রভাবে। এছাড়া ডিসিএমপি (ডিঅক্সি সাইটোসিন মনোফসফেট) থেকেও ডিসিএমপি অ্যামিনেজ এনজাইমের প্রভাবে ডিইউএমপি তৈরি হয়। সুতরাং দেখা যায় আরএনটিপি থেকে সরাসরি ডিঅক্সি থাইমিডিন নিউক্লিয়টাইডস তৈরি হতে পারে না। আরএনটিপি থেকে আগে ডিইউটিপি (ইউ-ডিএনএ এর গাঠনিক উপাদান) তৈরি হয়। তারপর ডিইউটিপি থেকে ডিটিটিপি (টি-ডিএনএ বা আধুনিক ডিএনএ এর গাঠনিক উপাদান) তৈরি হয়। সুতরাং বলা যায় টি-ডিএনএ বা আধুনিক ডিএনএ তৈরির আগে ইউ-ডিএনএ তৈরি হয়েছিল যা ইউরাসিল ব্যবহার করে। ডিএনএ গঠনের জন্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সেসকল এনজাইমের উপস্থিতি যেগুলোর প্রিবায়োটিক যুগে থাকা যেকোন একটি আরএনএ সুতাকে কপি করে ডিএনএ সুতা গঠনের (আরএনআর এনজাইম) এবং সেই সাথে নতুন সৃষ্ট ডিএনএ সুতাকে কপি করে (ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম) আরেকটি পরিপূরক ডিএনএ সুতা গঠনের ক্ষমতা রয়েছে। সকল জীবে (ভাইরাসহ) এই এনজাইম গুলো ডিএনএ এবং আরএনএ সুতার ৫ নং প্রান্ত থেকে ৩ নং প্রান্ত এর দিকে কাজ করে। এনজাইম গুলো কখনই ৩ নং প্রান্ত থেকে ৫ নং প্রান্তের দিকে কাজ করে না। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, এই প্রক্রিয়া যে কোষীয় বিপাকীয় প্রক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেখানে তৈরি ডিএনটিপি গুলোর পেন্টোজ শর্করার ৫ নং কার্বনে ট্রাইফসফেট থাকে ৩ নং এ থাকে না।

টি-ডিএনএ এর রাসায়নিক গঠন।

প্রকৃতপক্ষে আরএনএ অণুকে নাইট্রোজেনাস ক্ষারগুলোর পূর্বসূরি অণু বলা যায়। সুতরাং বলা যায় ডিএনএ সৃষ্টি ছিল আরএনএ বিশ্বের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার একটি বিবর্তনীয় অগ্রগতি। ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম এর অনেক গুলো গ্রুপ এর মধ্যে দুটি গ্রুপ এ এবং বি রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম এবং আরএনএ পলিমারেজ (ভাইরাস ও কোষ উভয়ই)- এরা গঠনগত দিক দিয়ে একই রকম। তাহলে বলা যায় রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম সমূহ কোন প্রাচীন আরএনএ পলিমারেজ থেকেই বিবর্তিত হয়েছে।

রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম এর ক্রিয়া

যদি ডিএনএ আরএনএ বিশ্বেই তৈরি হয়ে থাকে তাহলে এটি মনে হতেই পারে আরএনটিপি হতে ডিএনটিপি তৈরি প্রক্রিয়া রাইবোজাইম দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলে রাইবোজাইম এই ধরণের বিক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে না। আগেই বলা হয়েছে এই ধরণের বিক্রিয়া আরএনআর দ্বারা পরিচালিত হয়। বিক্রিয়ার শুরুতে আরএনআর এনজাইমে থায়োল মুক্তমূলক তৈরি হয়। এই মুক্তমূলক গুলো আরএনএ তে থাকা ফসফো ডাই এস্টার বন্ধন কে ভেঙ্গে ফেলে। এটি জানান দেয় যে ডিএনএ সৃষ্টি হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রোটিন গুলো তৈরি হবার পরেই। এবং সে সময় পূর্বসূরি অণু হিসেবে আরএনএ পলিমারেজ উপস্থিত ছিল। আরএনআর এনজাইম গুলোর তিনটি গ্রুপ আছে যথা আরএনআর-১, ২, ৩। গবেষণা বলে সব ধরণের আরএনআর এনজাইমই একই ধরণের পূর্বসূরী কোষ থেকে এসেছে। আরএনআর-২ ও ৩ গঠনগত দিক দিয়ে পূর্বসুরী কোষ এর সাথে মিলসম্পন্ন কিন্তু আরএনআর-১ এর গঠন বিবর্তিত হয়ে নব্য রূপ লাভ করেছে।

রাইবোনিউক্লাইটাইড রিডাকটেজ এনজাইম এর ক্রিয়া।

ইউ-ডিএনএ এর আবির্ভাবের পরের ধাপ হচ্ছে থাইমিডিন সংশ্লিষ্ট ডিএনএ অর্থাৎ আধুনিক টি-ডিএনএ এর সৃষ্টি যার জন্যে দরকার থাইমিডাইলেট সিন্থেজ এনজাইম। ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার থাইএ (ThyA) নামক একটি প্রোটিন এর সাথে এর বেশ মিল আছে। কিন্তু অন্যান্য অনেক ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়ায় থাইএক্স (ThyX) নামক এনজাইম আছে যার সাথে থাইমোডাইলেট সিন্থেজ এনজাইম এর গঠনগত অমিল রয়েছে। কিন্তু এদের কাজের ক্ষেত্র একই। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে টি-ডিএনএ এর উদ্ভব হয়েছে কি একই সাথে আলাদা দুটি কোষে? নাকি আগে থেকেই টি-ডিএনএ জিনোম থাকা কোন কোষে থাইমোডাইলেট সিন্থেজ এনজাইমটি গাঠনিকভাবে বিবর্তিত হয়ে থাইএ এবং থাইএক্স হয়েছে? প্রথম ক্ষেত্রে একই সাথে টি-ডিএনএ দুবার তৈরি হবার কথা এবং এতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে প্রতিযোগীতা তৈরি হত। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আগে থেকেই টি-ডিএনএ বিশিষ্ট কোষে নতুন সৃষ্ট থাইএ এবং থাইএক্স এনজাইম বিবর্তনের ধারায় টিকে থাকার জন্যে নতুন সুবিধা সৃষ্টি করত।

একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বংশগত বস্তু হিসেবে কেন ডিএনএ ই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচিত হল? প্রচলিত জবাব হচ্ছে ডিএনএ আরএনএ থেকে অনেক বেশি স্থায়ী এবং এর প্রতিলিপন প্রক্রিয়ায় (পরবর্তীতে আলোচনা করা হয়েছে) ভুল শনাক্তকরণ পদ্ধতি রয়েছে যা আরএনএ তে নেই। রাইবোজ শর্করা থেকে একটা অক্সিজেন পরমাণু কম থাকায় ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা আরো বেশি স্থায়ী গঠন লাভ করে। কেননা সক্রিয় অক্সিজেন ফসফো-ডাই-এস্টার বন্ধন কে ভেঙ্গে ফেলতে পারে। আরএনএ এর বদলে ডিএনএ বংশগত বস্তু হিসেবে স্থান দখল করায় দীর্ঘ জিনোম তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যা আধুনিক প্রকৃত কোষ তৈরির পূর্বশর্ত।

আরএনএ বিশ্ব প্রকল্প বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক

নাকি প্রিবায়োটিক বংশগত বস্তুটি ছিল আরএনএ-ডিএনএ সংকর?

আরএনএ বিশ্ব প্রকল্প (হাইপোথিসিস) মতে এটা ধরেই নেয়া হয়েছে যে, আরএনএ নিজেই নিজের অনুলিপন তৈরির এবং সেই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকায় একটি আরএনএ থেকেই প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে। তারপর বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে ডিএনএ-ই প্রায় সকল প্রাণের একমাত্র বংশগত বস্তু হিসেবে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। এই হাইপোথিসিস এর পক্ষে যুক্তি আছে অবশ্যই এবং তা পূর্বে আলোচনা করেছি। এর গ্রহণযোগ্যতাও আছে ব্যপক। কিন্তু এর বিপক্ষে অনেক বিতর্কও আছে। জর্জিয়ার  প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের উদ্ভব নিয়ে গবেষণারত নিকোলাস হুড, আরএনএ বিশ্ব হাইপোথিসিস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে জীবনের উদ্ভব আরএনএ থেকে নয় বরং প্রিবায়োটিক যুগে থাকা অ্যামিনো এসিড থেকে তৈরি প্রোটিন থেকে প্রথম প্রাণের সৃষ্টি। এবং প্রোটিনই বংশগত তথ্য সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে। তারপর বিবর্তনের ধারায় বর্তমান বংশগত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

পৃথিবীর প্রথম বংশগত বস্তুটি ছিল আরএনএ এবং ডিএনএ এর সমন্বয়ে তৈরি একটি বংশগত সিস্টেম অর্থাৎ বলা যায় আরএনএ-ডিএনএ সংকর ।ছবিসুত্রঃ phys.org

সম্প্রতি নেচারে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা আরএনএ বিশ্ব হাইপোথিসিস এর অবস্থানকে শক্তভাবে নাড়িয়ে দেয়। কেমব্রিজের মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল এর আনবিক জীববিজ্ঞানীরা এই গবেষণা কাজ সম্পাদনা করেন। এদের নেতৃত্ব দেন জন সাদারল্যানড। গবেষণাটি বলে একক ভাবে আরএনএ কিংবা ডিএনএ থেকে প্রাণ সৃষ্টি হয় নি। বরং পৃথিবীর প্রথম বংশগত বস্তুটি ছিল আরএনএ এবং ডিএনএ এর সমন্বয়ে তৈরি একটি বংশগত সিস্টেম অর্থাৎ বলা যায় আরএনএ-ডিএনএ সংকর। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়, স্ক্রিপস রিসার্চের সহকারী প্রধান গবেষক রামনারায়ণ কৃষ্ণমারথি এবং তার সহযোগী গবেষকরা একটি রাসায়নিক যৌগ খুঁজে পান যা সম্ভবত প্রিবায়োটিক যুগে প্রচুর পরিমাণে ছিল।

রামনারায়ণ কৃষ্ণমারথি
জন সাদারল্যানড

এই যৌগটি নিউক্লিয়টাইড অনুগুলো কে যুক্ত করে লম্বা চেইন তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে জন সাদারল্যানড এবং তার সহযোগী গবেষকরা মিলে থায়োইউরিডিন নামের একটা রাসায়নিক যৌগ খুঁজে পান। এটি প্রিবায়োটিক যুগে প্রচুর পরিমাণে ছিল এবং আরএনএ এর গঠন উপাদান গুলো তৈরিতে পূর্বসূরি অনু হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। সাদারল্যানড এবং রামনারায়ন একসাথে থায়োইউরিডিন থেকে রাইবোজ সাইটোডিন ট্রাইফসফেট, রাইবোজ ইউরিডিন ট্রাইফসফেট এবং ডিঅক্সিরাইবোজ এডিনোসাইন ট্রাইফসফেট, ডিঅক্সিরাইবোজ ইনোসাইন ট্রাইফসফেট তৈরি করতে সক্ষম হোন। এর মধ্যে প্রথম দুইটি হচ্ছে আরএনটিপি এবং পরের দুইটি ডিএনটিপি। বলে রাখা ভাল ইনোসাইন কে বলা যায় গুয়ানিন এর প্রতিরূপ নাইট্রোজেনাস ক্ষার। গবেষকরা বিশ্বাস করছেন যে প্রাণ সৃষ্টির পূর্বে এই চারটি নিউক্লিয়টাইড একত্রে একটি হাইব্রিড বংশগত বস্তু হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ ডিএনএ-আরএনএ হাইব্রিড। পরবর্তীতে অনুলিপনের মাধ্যমে এই আরএনএ-ডিএনএ সংকর হতে পৃথক পৃথক বিশুদ্ধ আরএনএ এবং ডিএনএ তৈরি হয়। এই গবেষণার বিতর্কে বলা হয় এইরকম সংকর বংশগত বস্তুর স্থায়িত্ব কম হবার কথা এবং যেহেতু বর্তমানে এইরকম সংকর বংশগত বস্তুবিশিষ্ট প্রাণ পাওয়া যায় নি সুতরাং এরা বংশগত বস্তু হিসেবে কাজ করতে পারে না।

এই বিতর্কের প্রতিজবাবে রামনারায়ণ এবং সাদারল্যান্ড বলেন তারা গবেষণাগারে একটি কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যা এইরকম ডিএনএ-আরএনএ সংকর জিনোম নিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। এই গবেষণা এটাই জানান দেয় যে পৃথিবিতে প্রায় চার বিলিয়ান বছর পূর্বে প্রথম বংশগত বস্তু ছিল ডিএনএ-আরএনএ সংকর। যদিও একটা টাইম মেশিন দিয়ে চার বিলিয়ান বছর পূর্বে গিয়ে পর্যবেক্ষণ ছাড়া বিষয়টা একেবারেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

তথ্যসুত্রঃ

Sujoy Kumar Das
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগে ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত।