BAM উন্মোচন (গেম অব জিনোমস)

গেম অব জিনোমস

মূল: কার্ল জিমার
অনুবাদ: আরাফাত রহমান

[আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

খন্ড-১, অধ্যায়-৩

আমি জানলাম, জিনোম সিকোয়েন্সিং করার পর প্রাথমিক উপাত্ত যাচাই বাছাই করে যে ফাইল তৈরি করা হয় তা হলো BAM। এই ফাইলগুলো আকারে দৈত্যাকার — ৭০ গিগাবাইটের মতো, যার মাঝে অন্তত চারশতাধিক পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচিত্র আঁটবে। যতবড়ই হোক না কেন আকারে, অন্য কোন ফাইল দিয়ে বিজ্ঞানীরা জিনোমকে তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জটিলতায় বিশ্লেষণ করা যায় না।

অদ্ভূত হলেও সত্য, আপনার নিজের জিনোমের BAM ফাইল হাতে পাওয়াটা প্রায় অসাধ্য একটা ব্যপার।

ইল্যুমিনা আমার জিনোম অনুক্রম করার পর আমাকে একটি মেডিকেল রিপোর্ট পাঠায়। এছাড়া একটা ওয়েবসাইটের লিঙ্ক দেয় যেখান থেকে আমি জিনোমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য জানতে পারবো। কিন্তু ইল্যুমিনা BAM ফাইল দেয় নি। আমি জিজ্ঞেস করার পড়েও। কাগজপত্র ঘেঁটে বুঝতে পারি কেন। ইল্যুমিনা কেবলমাত্র “চিকিৎসা-গবেষণার ব্যবহারের প্রয়োজনে” BAM ফাইল হস্তান্তর করবে।

কেন ইল্যুমিনার মতো কোম্পানী সাধারণ মানুষের হাতে BAM ফাইল তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক তা বোঝা কঠিন নয়। ২০০৭ সালে 23andMe নামের একটি কোম্পানী সাধারণ ভোক্তার কাছে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই সরাসরি বিভিন্ন বংশগতির পরীক্ষা বিক্রয় করা শুরু করে। সকল ভোক্তার জন্য কোম্পানীটি কয়েক হাজার বংশগতির বৈচিত্র্য নিরীক্ষা করে বের করার চেষ্টা করে বিভিন্ন রোগের জন্য প্রত্যেকের কতটুকু ঝুঁকি আছে। এরপর ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Food and Drug Admistration (FDA) কোম্পানীটিকে এসব পরীক্ষা বিক্রি করা বন্ধ করতে বলে — কারণ কোম্পানীটি এসব পরীক্ষার যথার্থতা প্রমাণ করে নি।

এসব পরীক্ষার জন্য 23andMe কোম্পানী মাত্র কয়েক শত-হাজার বংশগতির চিহ্ন বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে একটি BAM ফাইলে তিনশো-কোটি বেসে লিখিত জিনোম উপাত্ত ধারণ করা হয়। তাছাড়া, এ সকল প্রাথমিক কাঁচা-উপাত্ত অজস্র ত্রুটিতে ভরপুর যা কেবল একজন বিশেষজ্ঞ-গবেষকই আগাছা-মুক্ত করতে পারবেন। সাধারণ ভোক্তার হাতে ভুলে ভরা বিশাল আকারের কাঁচা-উপাত্ত দিয়ে দেয়া হতে পারে একটা বড়সড় বিপর্যয়ের কারণ। হয়তো তারা BAM ফাইল নিজেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভুল করে নিজের রোগ চিকিৎসা শুরু করতে পারে, যে ব্যাধী হয়তো তার নেই।

সমস্যা হলো এসব সাবধানতা কৌতূহলী ব্যক্তিদের একটি জটিল অবস্থায় ফেলে দেয়। এসব ক্ষেত্রে একজন জিনোম-বিশেষজ্ঞও ভুক্তভোগী হতে পারেন।

যেমন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পিএইচডি গবেষক ব্র্যাড গুল্কোর কথা শোনা যাক। ব্র্যাড তার গবেষণায় জিনোম বিশ্লেষণের নতুন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে তিনি নিজের জিনোম অনুক্রম বের করার জন্য টাকা জমাচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য নিজ জিনোমের BAM ফাইল হাতে নিয়ে বিশ্লেষণ করা। ব্র্যাড বলেন, “আমি প্রতি দিনই এসব ফাইল নিয়ে কাজ করি। মূলত আমার জিনোম ঠিক কোন জায়গায় পড়ছে তাই দেখতে চাই।”

ব্র্যাড বেশ ধৈর্য্য নিয়ে অপেক্ষা করে আছেন কবে তার বিশেষ “তহবিল” বড় হবে আর ডিএনএ অনুক্রমকরণের খরচ কমবে। সময় যখন উপযুক্ত মনে হলো, তখন একটা জিনোম অনুক্রমকরণ কেন্দ্রের সাথে তিনি যোগাযোগ করলেন নিজের জিনোম অনুক্রম বের করার জন্য। তখন তিনি জানতে পারলেন, কোন গবেষণা প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর গবেষণার মূল্যায়ন করার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন বোর্ড থেকে অনুমোদন পেতে হবে। বহু চেষ্টার পড়েও ব্র্যাড সঠিক জায়গার যোগাযোগ বের করতে পারেন নি। তিনি নিজের জিনোম সম্পর্কে জানা ছাড়াই একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে রইলেন।

যদি ব্র্যাডের মতো গবেষক নিজের জিনোমের উপাত্ত নিজের হাতে নিতে না পারেন, তাহলে আমার মতো সাধারণ নাগরিক কিভাবে সেটা করবেন? সেজন্য আমি আবার বংশগতিবিদ রবার্ট গ্রিনের সাথে যোগাযোগ করি, যিনি ব্রিগহাম ও মহিলা হাসপাতালে আমার জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রকল্পের দেখভাল করেছিলেন। তিনি বললেন, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে হলেও এটা করা সম্ভব।

রোগীদের চিকিৎসা করার সাথে সাথে ড. গ্রীন গবেষণা করছেন কিভাবে জিনোম অনুক্রমকরণ ঔষুধ-পথ্যকে প্রভাবিত করবে। তার একটি প্রকল্প হলো PeopleSeq। এই গবেষণাপ্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সুস্থ-নিরোগ মানুষ কিভাবে নিজেদের জিনোম অনুক্রমের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়।

এই গবেষণায় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী তাদের ডাক্তারের মাধ্যমে নিজস্ব জিনোমের নির্বাচিত তথ্য জানতে পারেন। কেউ কেউ ইল্যুমিন্যার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জিনোমের রিপোর্ট দেখেন। তবে ড. গ্রীন সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার গবেষণাটি আরেকটু বিস্তৃত করবেন। তিনি ঠিক করেছেন অংশগ্রহণকারীদের হাতে একটি হার্ডড্রাইভ দেবেন যেখানে জিনোমের BAM ফাইল থাকবে। ড. গ্রীন আমাকে ইমেইলে জানালেন, এজন্য তাদের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে, যা এর আগে কখনো ব্যবহৃত হয় নি। আমিও হতে পারি এই প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রথম ব্যক্তি!

আমি PeopleSeq প্রকল্পে যুক্ত হলাম। ড. গ্রীনের গবেষকদল ইল্যুমিনাকে আমার BAM ফাইলগুলো সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করলেন। আমাকে আরো কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে হলো যে এসব উপাত্ত উপযুক্ত মান-পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায় নি সেটা আমি জানি ও বুঝি।

ড. গ্রীনের সাথে এসব কথা হয়েছিলো আগস্টে। তখন ছিলো গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মকাল থেকে শরৎ হলো, শরৎ থেকে শীতকাল। শেষপর্যন্ত জানুয়ারির মাঝামাঝি UPS কুরিয়ার সার্ভিস আমার বাসায় একটা ছোট বাক্স বিলি করে দিয়ে গেলো। বাক্সের ভেতরে ছিলো সবুজ রঙের মোড়ক, যার মাঝে কালো কাপড়ে তৈরি কিডনী-আকৃতির ব্যাগ। ব্যাগটির জিপার খুললাম। সেখানে আমি একটা ধাতব-সবুজ আভার হার্ড ড্রাইভ পাই। ড. গ্রীনের প্রক্রিয়াটি বেশ প্যাঁচানো হলেও আমি অবশেষে নিজের জিনোমের কাঁচা-উপাত্ত হাতে পেলাম।

আমার BAM ফাইল বিশ্লেষনের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীদের সাহায্য নেয়ার জন্য আমি এখন তৈরি।

এই অভিযানে আমি প্রথমে যার সাথে দেখা করবো তিনি হলেন কনরাড কারসেজওস্কি। ম্যাসাচুসেটেস শহরের বিখ্যাত ব্রড ইন্সটিটিউটের একজন বিজ্ঞানী হলেন কনরাড। BAM ফাইল এতোটাই বড়ো আকারে, যে সেটা ইমেইলে পাঠানো সম্ভব নয়। সবচেয়ে সোজা হলো এই পুরনো শিক্ষাঙ্গনে নিজে হাজির হয়ে হাতে হাতে নিজের জিনোম পৌঁছে দেয়া।

তাই আমি হার্ডড্রাইভটিকে পিঠের ব্যাগে নিয়ে বোস্টনগামী ট্রেনে উঠে পড়ি। নিজের জিনোমের ব্যক্তিগত কুরিয়ার হয়ে যাই আমি নিজেই।

প্রচ্ছদ ছবি: Molly Ferguson, মূল সিরিজ থেকে নেয়া।

[আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

লেখাটি 95-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 902 other subscribers