IMEl নম্বর কী এবং কেন?

pexels-photo-404280.jpeg
Photo by Noah Erickson on Pexels.com
পাঠসংখ্যা: 👁️ 176

দেশের সকল অবৈধ ফোন অচল হবে, এমন প্রস্তাবনা আসার পর থেকে IMEI নম্বরের কথা আমরা কম বেশি সবাই জানি। এ বছরের মধ্যে সেলুলার নেটওয়ার্ক থেকে অনিবন্ধিত সকল মোবাইল সংযোগ বিছিন্ন (সিম লক) করে দেওয়া হবে। শুধু দেশের এবং বাহির থেকে আসা বিটিআরসিতে নিবন্ধিত ফোনের সংযোগ অব্যহত থাকবে। সেলুলার নেটওয়ার্ক এর সাথে আপনার ফোনটি যুক্ত থাকবে কিংবা কোন ফোন যুক্ত থাকবে না, তার পুরোটা IMEI নম্বরের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এই IMEI নম্বর কী, এবং এর কাজই বা কী?

মোবাইল ডিভাইস মানুষের মাঝে প্রচলনের পর থেকে একটা প্রশ্ন আসলো, মোবাইল ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট করে সনাক্তকরণে কোনো উপায় আছে কী? প্রতিটা ফোনেই সিমকার্ড রয়েছে কিন্তু সহজে তা বের করে ফেলা যায়। পরিচয় গোপন সহজে করা যায়। তখন শীর্ষস্থানীয় পুলিশ সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের সরকারী পর্যায়ের লোকজন এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেন। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যে ডিভাইস সেলুলার নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত থাকবে, তার নির্দিষ্ট নম্বর থাকবে। সেই নম্বর দিয়ে ডিভাইসকে সনাক্ত করা যাবে, যতবার সিমকার্ড পরিবর্তন করা হোক না কেন! পরবর্তীতে একে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের আওতায় আনা হয়, যা সকল সেলুলার নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারী ডিভাইসের ক্ষেত্রে আবশ্যক।

IMEI নম্বর কী?

IMEI এর পুর্ণরূপ হলো International Mobile Equipment Identity। এটি একটি ইউনিক নম্বর যা সনাক্ত করে GSM, WCDMA এবং iDEN মোবাইল আর স্যাটেলাইট ফোনগুলো। বেশিরভাগ সময়ই একটি ডিভাইসে একটি IMEI নম্বর থাকে, দুইটা সিমে দুটো। ২০০৪ সালে বর্তমান IMEI নম্বরের ফরমেট নির্ধারণ করা হয়।

IMEI ব্যবহার শুধুমাত্র ডিভাইস সনাক্তকরণের জন্য ব্যবহার করা হয়, যেখানে ব্যবহারকারীর সম্পর্কে কোনো প্রকার তথ্য থাকে না। অবশ্য ডিভাইস সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ রাখলে ব্যবহারকারীর সম্পর্কের জানাটা সম্ভব হয়। কোনো ডিভাইস যদি সেলুলার নেটওয়ার্ক যুক্ত হতে চায়, তবে IMEI নম্বর সেই ডিভাইস সনাক্তকরণের কাজে আসে। এই নম্বরকে সিম অপারেটর বন্ধ করতে পারে, যাতে চুরি হওয়া ফোনে সেদেশের নেটওয়ার্ক এক্সেস বন্ধ করে দেওয়া যায়। অন্যান্য দেশে তখন ডিভাইসটি কাজ করলেও, সে দেশে আর করবে না।

তবে নম্বরটি কীভাবে কাজ করে?

IMEI নম্বর সাধারণত ১৭ ডিজিট বা ১৫ ডিজিটের সংখ্যা হয়। এই কোড ডিক্রিপ্ট করা সহজ কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষ দরকার হয় না। কিন্তু কিছু দেশে IMEI নম্বর চেক করে দেখা যায় নম্বরটি ব্লক বা ব্লাক লিস্টে আছে কিনা। এবং IMEI নং দিয়ে ফোনের মডেল ও স্পেসিফিকেশন সম্পর্কে জানা যায়।

নাম্বার ফরমেটের ধরণ কিছুটা এমন- AA-BBBBBB-CCCCCC-D বা D এর জায়গায় EE হয়।

A ও B বা প্রথম ৮ টি সংখ্যাকে বলা হয় Type Allocation Code বা TAC। এই TAC অংশ থেকে ফোন কোম্পানি এবং ফোনটির মডেল নম্বর সম্পর্কে জানা যায়।

AA বা প্রথম দুই সংখ্যা দিয়ে মূলত কোন GSMA সংস্থা থেকে ডিভাইসটি রেজিস্ট্রার হয়েছে তা বোঝায়। প্রথম দুই কোড 86 এবং ডিভাইসটি চীনে রেজিস্ট্রার হয়েছে। তবে এটি কান্ট্রি কোড নয় বরং সংস্থার কোড।

BBBBBB বা পরের 6 টি নম্বর হলো ডিভাইস কোড। অর্থাৎ কোন মেন্যুফেকচার এই ফোনটি বানিয়েছে এবং তার মডেল উল্লেখ করা আছে। ধরা যাক, অ্যাপল নতুন একটি ডিভাইসের জন্য আবেদন করল। এবং সেই ডিভাইসের জন্য স্পেসিফিক একটি কোড দেওয়া হলো। ধরা যাক আবেদন করার পর তারা যে কোডটি পেল তা নিচের 949302 বা এটি দিয়ে তাদের নতুন ডিভাইসকে বোঝাবে।

আর CCCCCC বা পরের ছয়টি সংখ্যা হলো সিরিয়াল রেডিয়ো মডিউল নম্বর। একে SNR বলা হয়। এসএনআর একটি পৃথক সিরিয়াল এমন নম্বর যা TAC এ থাকা ডিভাইসের প্রতিটা স্পেসিফেশন স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করে।

D -এ থাকা নম্বরটি পুরো IMEI নম্বরকে ভেরিফাই করে। আর EE হলো সফটওয়্যার ভার্সন নম্বর যা ডিভাইস মেনুফেকচাররা ফোনের সফটওয়্যার ভার্সনটি সনাক্ত করতে বরাদ্দ রেখেছে।

IMEI নম্বর দেখার উপায়

  • এন্ড্রয়েড এ *#06# ডায়াল করলে স্ক্রিনে শো করবে। এবং সেটিংসে গিয়ে এই সিকুয়েন্স ফলো করলেও পেয়ে যাবেন- 

About device > Status > IMEI information

  • ফিচার ফোনগুলোতে IMEI নম্বর মূলত ব্যাটারির নিচে লিখা থাকে।
  • অ্যাপল ইউজাররা সিম ট্রে বা ব্যাকে IMEI নম্বর পেয়ে যাবে। এবং সেটিংস এ গিয়ে ওপরের সিকুয়েন্স ফলো 

Settings > General > About

ফোনের IMEI নম্বরটি আসলে ফোনের কিনা তা যাচাই করা দরকার। কারণ অসাধুপায়ে এটি পরিবর্তন করা যায়। এক্ষেত্রে এন্ড্রয়েড হলে IMEI নম্বরটি এই সাইটে চেক করবেন-

https://www.imei.info/

এবং তথ্য যদি ডিভাইসের সাথে মিল থাকে তবে IMEI নম্বরটি আসল।

আইফোন হলে এখানে চেক করতে পারেন- https://checkcoverage.apple.com/ 

আর আপনার ফোনটি বাংলাদেশে নিবন্ধন আছে কিনা তা বোঝার উপায়-

৩০ জুন ২০২১ এর আগের সকল ফোন ব্যবহৃত সিমের নামে রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ায় নিবন্ধন করার প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে চালু করা হয়েছে, যেন অবৈধ ফোন দেশে আনা ও বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব হয়। অক্টোবর ২০২১ এর পর থেকে সকল অনিবন্ধিত ফোনের সিম লক করে দেওয়া হবে। নতুন অনিবন্ধিত ফোনের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক এ যুক্ত হলে নিবন্ধন এর জন্য সাময়িক নেটওয়ার্ক সেবা (তিন মাস) গ্রহণের অনুমতি থাকবে।

এখন আপনার স্মার্টফোনটি নিবন্ধিত কিনা জানতে ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে KYD লিখে স্পেইস দিয়ে IMEI নম্বরটি লিখবেন এবং 16002 নম্বরে পাঠাবেন। ফিরতি ম্যাসেজ এ রেজিস্ট্রার বা আনরেজিস্ট্রার তা জানা যাবে।  এছাড়াও neir.btrc.gov.bd সাইটের মাধ্যমে এবং মোবাইল ফোন অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে এ সেবা নেওয়া যাবে।

আপনার ফোনটি আনরেজিস্ট্রারড হলে বিটিআরসি এর নির্দেশনাগুলো ফলো করুন।

এক ফোনে একাধিক ব্যক্তির সিম রাখা যাবে কিনা না নিয়ে পরবর্তীতে সিধান্ত আসবে। এছাড়া অন্য সিম প্রবেশ করালে নেটওয়ার্ক সুবিধা হতে বিচ্ছিন্ন হবে। আবার ইউজার চেন্জ বা সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন হলে পুনঃনিবন্ধন করতে হবে। neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইট এ সকল তথ্য মিলবে।

বিদেশ থেকে কেনা বা উপহার পাওয়া মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধন

১. বিদেশ থেকে বৈধভাবে কিনে আনা বা উপহার পাওয়া ফোন ১০ দিনের মধ্যে অনলাইনে তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করার জন্য এসএমএস পাঠানো হবে। এর মধ্যে নিবন্ধন না হলে জানিয়ে দেওয়া হবে।

২. নিবন্ধনের জন্য neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে গ্রাহককে একাউন্ট খুলতে হবে। সাইটের Special Registration সেকশনে গিয়ে হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বরটি দিতে হবে।

৩. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসের ছবি/স্ক্যান কপি (যেমন পাসপোর্টের ভিসা/ইমিগ্রেশনের তথ্য, ক্রয় রশিদ ইত্যাদি) আপলোড করে Submit করতে হবে।

৪. হ্যান্ডসেটটি বৈধ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। বৈধ না হলে জানিয়ে দেওয়া হবে।

চুরি বা হারিয়ে যাওয়া ফোন তিনমাস সময়ের মাঝে সিম লক হবে। এর মাঝে প্রয়োজনীয় তথ্য বিটিআরসি এর সাইটে গিয়ে অভিযোগ দেওয়া যাবে, যার সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফোন হারালে যেভাবে কাজ করে

মোবাইল ফোন হারিয়ে গেলে দেশের নিরাপত্তাবাহিনী ফোনের লোকেশন সনাক্ত করতে পারে, যদি ফোন সিমযুক্ত থাকে। এক্ষেত্রে IMEI নম্বরটা স্থানীয় স্টেশনে পাঠানো হয় এবং সহজে ডিভাইস সনাক্ত করা যায়। সাথে একটা জিডি করে সিম অপারেটরকে জানালে তারা IMEI নম্বর সে দেশ থেকে অফ করে রাখবে যাতে কোনো সিম ডিভাইসে চলবে না বা সিম ব্লক থাকবে।

ফিচার ফোনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকরী, কারণ এখানে লোকেশন বের ও ট্রেস কঠিন। অন্য উপায় অবলম্বন সম্ভব নয়।

এন্ড্রয়েড ফোনের ক্ষেত্রে সহজে লোকেশন বের করা সম্ভব। যদি ফোনের ডেটা কানেকশন থাকে, তবে এই সাইটে গিয়ে লগইন করে এক ক্লিকেই লোকেশন দেখা যাবে-

https://www.google.com/android/find

যদি এতে সম্ভব না হয় তবে সাইটে ফোন লক অপশন সিলেক্ট করা বেটার। আর একেবারে হারানোর ভয় থাকলে Erase all data অপশনে গিয়ে ফোনের সকল ডেটা ইরেজ করা যাবে।

আর ঘরের আসেপাশে হলে ওয়েবসাইট এ ‘রিং’ অপশন আছে, যা ফোন সাইলেন্ট করা থাকলেও উচ্চ ভলিউমে বেজে উঠবে।

ব্যবহৃত ডিভাইসটি আইফোন হলে i cloud এ সেম অপশন পেয়ে যাবেন-

https://www.icloud.com/find

এবং যদি কোনো সময় IMEI নম্বর মনে না থাকে, তবে গুগল একাউন্টে লগ ইন ইনফরমেশনে ডিভাইসের IMEI নম্বর দেখা যায়।

আইফোন এর ব্যাকআপ itunes এ নেওয়া থাকলে সহজে ফোনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

সোর্সঃ

GSMA এবং IMEI সম্পর্কে বিস্তারিত- 

১.A Uniform Resource Name Namespace    for the Global System for Mobile Communications Association (GSMA)      and the International Mobile station Equipment Identity (IMEI)

২.What is IMEI code in the phone decoder, explained

৩.What is IMEI and why should you care?

৪.এপ্রিলেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অবৈধ মোবাইল ফোন

৫.What is IMEI Number?

৬.How to Track Stolen Phone? IMEI Tracking? Find IMEI of Stolen Phone? What to do?

৭.International Mobile Equipment Identity – Wikipedia.

৮.What is IMEI Number and how does it work?

লেখাটি ব্যাঙাচি ফেব্রুয়ারী (প্রযুক্তি) সংখ্যায় প্রকাশিত।

বিজ্ঞাপন

রওনক শাহরিয়ার
রওনক শাহরিয়ার। মূল আকর্ষন প্রযুক্তি নিয়ে। সাথে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনেও কিছুটা রয়েছে। তবে সবার শুরুতে রয়েছে ধর্মীয় বিষয়ে প্রবল আগ্রহ।