তিয়াংগং – চাইনিজ স্পেস স্টেশনের গল্প

চীনকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। তাই তারা নিজেরাই একটা মহাকাশ স্টেশন বানিয়ে ফেলেছে!
তিয়ানগঙ স্পেস স্টেশন

আমরা যারা সাইফাই সিনেমা দেখি, তারা সবাই একটা জিনিস প্রায়ই দেখতে পাই যে মহাকাশে মানুষ নানা মহাকাশযানে থাকছে এবং চলাচলও করছে। বাস্তবে কিন্তু এমন একটি মহাকাশযান সত্যি রয়েছে যা হলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা ইংরেজিতে International Space Station (ISS)। বর্তমানে একটি নতুন মহাকাশ স্টেশনের নাম শোনা যাচ্ছে। আর তা হলো চাইনিজ স্পেস স্টেশন তিয়াংগং (Tiangong).

এই লেখায় আমি এই নতুন স্পেস স্টেশন সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব।

তিয়াংগং সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা

তিয়াংগং একটি চাইনিজ শব্দ যার ইংরেজি অর্থ Palace in the sky আর বাংলা করলে দাড়ায় স্বর্গের রাজপ্রাসাদ। তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনটি পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৪০ থেকে ৪৫০ কিমি উপরে অবস্থিত। অর্থাৎ এটি একটি লোয়ার আর্থ অরবিট (lower earth orbit) স্টেশন। লোয়ার আর্থ অরবিট হলো পৃথিবী থেকে যে কক্ষপথের উচ্চতা ১৬০ থেকে ১০০০ কিমি এর মধ্যে অর্থাৎ কক্ষপথ গুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থিত। একইভাবে “ISS” ও একটি লোয়ার আর্থ স্টেশন। তিয়াংগং স্টেশনটি একটি তৃতীয় প্রজন্মের স্টেশন। প্রথমদিকের স্পেস স্টেশন যেমন স্কাইল্যাব একটি ১ম প্রজন্মের স্টেশন। এটি ওগুলোর চেয়ে আধুনিক ।

এর গঠন অনেকটা ISS এর মত হলেও এর আকার ও ওজন ISS হতে অনেক কম। ISS এ যেখানে আছে ১৬ টি মডিউল, সেখানে তিয়াংগংয়ে থাকবে মাত্র ৩টি মডিউল। সম্পূর্ণ তৈরী হলে এর ওজন হবে ৪০০ টন যা ISS এর চেয়ে অনেক কম। তাছাড়া এর আয়তনও ISS এর ৪ ভাগের ১ ভাগ। এটির গঠন হবে অনেকটা ISS এর মতো। এটির আকার আসলে অনেকটা রাশিয়ার মির স্টেশনের মত।মির স্পেস স্টেশনকে ২০০১ সালে ধ্বংস করা হয়। সম্পূর্ণ হলে এই স্টেশনে থাকবে একটি কোর মডিউল, দুটো ল্যাবরেটরি। তাছাড়া সোলার প্যানেল ও ডকিং পোর্ট, রোবোটিক হাত এগুলোও থাকবে।

তিয়াংগং স্পেস স্টেশনের মডেল  তথ্যসূত্রঃ wikipedia

তিয়াংগংয়ের যে কোর মডিউল আছে তার নাম হলো তিয়ানহে (Tianhe)।এর অর্থ হলো স্বর্গের পথ। এটি হলো ৫৯ ফুট লম্বা এবং ২৪ টন ওজনের একটি মডিউল। এটিকে ২৮ শে এপ্রিল ২০২১ সালে March 5B রকেটে করে পাঠানো হয় মহাকাশে। যার মাধ্যমে আসলে শুরু হয় তিয়াংগং এর যাত্রা।

এই মহাকাশ স্টেশনে বসানো হবে ওয়েনটিয়াং (Wentian) ও মেনটিয়াং (Mengtian) নামে দুটি ল্যাবরেটরি। এখন যেমন ISS এ নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা হয়, সেই রকম গবেষণা কার্যক্রম চালানো হবে।

চায়না কেন তাদের নিজেদের নিজস্ব স্পেস স্টেশন বানালো

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনটি যখন পৃথিবীর প্রায় সব বৃহৎ শক্তির দেশ ব্যবহার করে তাহলে চায়না কেন ব্যবহার করে না এমন প্রশ্ন হয়তো আপনার মনে আসতেই পারে।

চায়না তাদের প্রথম স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাতে সক্ষম হয় ১৯৭০ সালের ২৪ এপ্রিল এবং তাদের স্যাটেলাটের নাম ছিল Dong Fang Hong-1। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ১৫ই অক্টোবর তারা তাদের নিজেদের রকেটে করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার পর ৩য় দেশ হিসেবে মহাকাশে মানুষ পাঠাতে সক্ষম হয়। প্রথম চাইনিজ মহাকাশচারির নাম ছিলো ইয়াং লিউই (Yang Liwei)। এরপর তারা মহাকাশে নানা মহাকাশযান পাঠায় এবং এক পর্যায়ে আমেরিকার সাথে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করে।

কিন্তু এরই মাঝে আমেরিকা তাদের মহাকাশ আইনে এক বিশাল সংশোধন আনে যার নাম দেয়া হয় wolf amendment। এই সংশোধনের কারণে নিরাপত্তার কথা ভেবে আমেরিকার মহাকাশ গবেষনা প্রতিষ্ঠান (যেমন নাসা) কখনো কোনো চাইনিজ প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিতে যেতে পারবে না। এই চুক্তির ফলে কোনো চাইনিজ মহাকাশচারীর ISS এ যাওয়া এবং কোনো আমেরিকান মহাকাশচারীর তিয়াংগংয়ে যাওয়া সম্ভব না। এর পর থেকেই চাইনিজরা নিজেদের মহাকাশ স্টেশন বানানো শুরু করে।

তিয়াংগং প্রকল্পের পেছনের ইতিহাস

মহাকাশ স্টেশন বানাতে চাইলেও এটা সহজ কাজ নয় কারন এক্ষেত্রে প্রায় ২৮,০৮০ কিমি/সেকেন্ড গতিতে মহাকাশযানগুলো চলতে থাকে আর এই গতিতে দুটো যানকে ডকিং করা বা জোড়া লাগানো সহজ কাজ নয়। চায়না প্রথমে তিয়াংগং-১ ও তিয়াংগং-২ নামে দুটো পরীক্ষামূলক ও ছোট স্পেস স্টেশন প্রেরণ করে। তিয়াংগং-১ কে মহাকাশে পাঠানো হয় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। এই প্রোটোটাইপ স্পেস ল্যাবে ২০১২ ও ২০১৩ সালে মহাকাশচারী পাঠানো হয় এবং তারা সেখানে ২ সপ্তাহ অবস্থান করে।

তিয়াংগং-১ এর ল্যাব

তিয়াংগং-২ কে প্রেরণ করা হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আর এখানেও মহাকাশচারীরা অবস্থান করে । পরে ২০১৭ সালের এপ্রিলে এদের পরীক্ষামূলকভাবে জোড়া লাগানো হয়।

তিয়াংগং-১ অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ২০১৮ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে পতিত হয়। আর তিয়াংগং-২ কে নিয়ন্ত্রিত ভাবে ধ্বংস করা হয়। এই তিয়াংগং-১ কে যে রকেটে পাঠানো হয়েছিলো, তার কোর অংশ ২০২১ সালের মে মাসে ১০ দিন পৃথিবীর মানুষকে চিন্তায় ফেলে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ভারত মহাসাগরে পতিত হয়।

তিয়াংগং এর যাত্রা শুরু হয় ২০২১ সালের ২৮ শে এপ্রিল – এর কোর মডিউল তিয়ানহে মহাকাশে পাঠানোর মাধ্যমে। এই কোর মডিউল পাঠানোর পরই মে মাসে পাঠানো হয় তিয়ানঝু-২ (Tianzhou-2)। এই তিয়ানঝু হলো চায়নার মহাকাশে পণ্য পরিবহনের মডিউল। এই মডিউল স্পেস স্টেশনে মানুষ থাকার পণ্য পরিবহন করে নিয়ে যায়।

এরপর ১৭ই জুন পাঠানো হয় শিয়ানঝু-১২ তে করে তিনজন মহাকাশচারী নি হাইসেং (Nie Haisheng), লিঊ বোমিং (Liu Boming) এবং ট্যাং হোংবো (Tang Hongbo)। তারা স্টেশনটিতে ৩ মাস অবস্থান করেন। শিয়ানঝু হলো চায়নার মহাকাশে মানুষ পাঠানোর প্রোগ্রাম। এর আগে তিয়াংগং-১ ও তিয়াংগং-২ এও এই মিশনের আওতায়ই মানুষ পাঠানো হয়।

শিয়ানঝু-১২ থেকে মহাকাশচারী ট্যাং হোংবো (Tang Hongbo)এর তোলা ছবি

২০২১ সালের ১৫ই অক্টোবর শিয়ানঝু-১৩ তে করে তিনজন মহাকাশচারী Zhai Zhigang, Wang Yaping, Ye Guangfu মহাকাশে গমন করেন। তাদের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রায় ৬ মাস মহাকাশে থাকতে হবে।

শিয়ানঝু-১৩ তে মহাকাশচারী Zhai Zhigang, Wang Yaping, Ye Guangfu

ইয়াং ইয়াপিং হলেন প্রথম মহাকাশে হাটা চাইনিজ মহিলা। চায়না এই বছরের মধ্যেই তাদের স্পেস স্টেশনের সব কাজ শেষ করার পরিকল্পনা করেছে। কার্গোযান ও অন্যযানগুলোকে সাহায্য করার জন্য যে রোবোটিক হাত বসানোর কথা ছিলো, তা ইতিমধ্যেই বসানো হয়েছে। এখন শুধু ওয়েনটিয়াং (Wentian) ও মেনটিয়াং (Mengtian) নামে দুটি ল্যাবরেটরি বসানো হলেই পুরোদমে কাজ করতে পারবে।

তিয়াংগং স্টেশনের ভবিষ্যত

এখন এই স্টেশনে শুধু চাইনিজরাই গবেষনা কার্যক্রম চালনা করতে পারছে তবে ভবিষ্যতে তারা এটা অন্যদেশের জন্যও খুলে দেয়ার ঘোষনা দিয়েছে। তাছাড়া চায়না যে সিল্করোডের পরিকল্পনা করেছে তার অন্তর্ভূক্ত দেশগুলোও এখানে কাজ করার সুযোগ পাবে।

নাসা অফিসিয়ালি ঘোষনা দিয়েছে তারা ২০৩০ সাল নাগাদ ISS কে ধ্বংস করে দেবে। নাসার আপাতত কয়েক বছরে নতুন করে কোনো স্পেস স্টেশন তৈরীর পরিকল্পনা নেই তাই  ২০৩০ সালের পর তিয়াংগংই হতে যাচ্ছে পৃথিবীর উপর ঘুরতে থাকা একমাত্র মহাকাশ স্টেশন।

তথ্যসূত্রঃ

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

অনিক কুমার সাহা
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ