মস্তিষ্কের সাথে মনোযোগের যোগসূত্র

মনোযোগ বলতে বোঝায়, মনকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে নিবিষ্ট করা। মনের সাথে সকল ইন্দ্রিয়ের যোগ ঘটিয়ে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করাই মনোযোগ শব্দকে বহন করে। এই সময় মন অন্যান্য সকল অপ্রয়োজনীয় বিষয়,অনুভূতি, চিন্তা-দুশ্চিন্তা,সংবেদনশীলতা  থেকে দূরে থাকে। একদম বলতে পারেন- আইসোলেটেড (isolated) অবস্থা আর কি। বাংলায় নির্বাসন বললেও বোধকরি ভুল হবে না। হা হা!

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার। এই দুই যন্ত্রের সুইচ অফ-অনের মাধ্যমে যেন অনেক কিছুই টিকটিক করে ঘুরছে। মোবাইল ফোনে ইন্সটল করা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এপস যেমনঃ- ফেসবুক,মেসেঞ্জার, হোয়াটসএপ, ইমো, ভাইভার, টেলিগ্রাম, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদিতে মশগুল মানুষ। অনলাইনে এসব এপসের নোটিফিকেশানের তালে, তাল মিলাতে গিয়ে  অফলাইনে মানে বাস্তবে অসামাজিক হয়ে উঠছে। যাই হোক, মূল কথায় আসি। 

আমাদের প্রয়োজনীয় কাজে মোবাইল ফোনে বা কম্পিউটারে তথ্য অনুসন্ধান করতে থাকি। অনুসন্ধান করতে গিয়ে, প্রায়শ বিচ্যুত হয়ে যাই মূল বিষয় থেকে। এই যে চিত্তবিক্ষেপ- তা প্রভাবিত করে আমাদের কর্মক্ষমতাকে। এর ফলে মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং দীর্ঘ সময় লাগে যেকোন কাজ সম্পাদনে। ধরুন, কেউ আপনাকে কিছু বলছে কিন্তু আপনি ফোন চালাচ্ছেন। ফলে কি হবে? তার কথায় মনোযোগ থাকবে না। ভাল ভাবে বুঝবেন ও না সে কি বোঝাতে চাইছে। এভাবে সহকর্মী বা সঙ্গীর সাথে ভুল বোঝাবুঝি হবে। এই যে ঠিক সময়ে মনোযোগ না দেয়ার কারণে, আমরা তথ্য ভুলে যাই; মনে করতে পারি না যখন দরকার হয়। যা মারাত্মকভাবে স্মৃতিকে প্রভাবিত করে। আর এটা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 

চলুন, এবার জানা যাক কি কি বিষয় সাধারণত মনোযোগকে প্রভাবিত করে থাকে। তার একটা সম্যক ধারণা নেয়া যাক-

যেসকল বিষয় মনোযোগকে প্রভাবিত করে

মানুষ আবেগী প্রাণী। মাঝে মাঝে সবারই মনে হয়, সকল প্রকারের চাপ সর্ব দিক দিয়ে আমাদের মনোযোগকে আক্রমণ করছে তুমুল আক্রোশে। বস্তুত, অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বিভিন্ন বিষয় মারাত্মকভাবে প্রভাবান্বিত করে। 

  • চিত্তবিক্ষেপ (Distraction): নতুন-পুরাতন তথ্যের বন্যায় আমরা প্লাবিত হই প্রতিনিয়ত।  গবেষকরা দেখেছেন যে, আমাদের মস্তিষ্ক এই চিত্ত বিক্ষেপের বিষয়ে এতটাই সংবেদনশীল যে, শুধুমাত্র স্মার্টফোন দেখলেই আমাদের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা বিঘ্নিত হয়। আমরা ক্রমাগত যাচাই করতে থাকি, আমাদের সংগৃহীত তথ্যের ভান্ডার কতটুকু পর্যাপ্ত, দরকারী বা নিষ্প্রয়োজন।
  • অপর্যাপ্ত ঘুম (Lack of sleep): গবেষকেরা দেখেছেন যে, অপরিমিত ঘুমের কারণে চিন্তায় ধীরতা আসে, কম সতর্কপ্রবণ হয়, মনোযোগে ঘাটতি ঘটে। মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ব্যক্তি ক্রমশ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে।  ফলস্বরুপ, যুক্তি দ্বারা সম্পাদিত কাজের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক প্রভাবিত হয় এবং  ব্যক্তি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। 
  • অপর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপঃ একটু খেয়াল করে দেখবেন, পরিশ্রম করলে বা জোরালো ব্যায়াম করার পরবর্তী সময়ে, শরীরে প্রশান্তি আসে। নতুনভাবে কর্মোদ্যমে ভরপুর হয়ে উঠে মন। আপনি যখন শারীরিক পরিশ্রম করবেন না, তখন আপনার পেশী টানটান হয়ে যেতে পারে। আপনার ঘাড়,হাঁটু,বুকে অসাড়তা অনুভব করতে পারেন – এই শারীরিক অস্বস্তি আপনার মনোযোগকে প্রভাবিত করে। 
  • খাদ্যাভ্যাসঃ খাবার গ্রহণের সাথে আমাদের মানসিক প্রশান্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি আমরা পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ না করি, তবে বিভিন্ন প্রকারের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দেয়। মস্তিষ্কের কর্মোদ্দীপনা কমে যায়।  স্মৃতিবিভ্রম,অবসাদ, ক্লান্তি এইসব উপসর্গ দেখা যায়। মনোযোগে ঘাটতি ঘটে থাকে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের জন্য কিছু অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিডের (fatty acid) প্রয়োজন হয়। লো-ফ্যাট ডায়েটের খাবারের ফলে একাগ্রতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
  • পরিবেশঃ আপনি কি করছেন, কোন পরিবেশে আছেন তার উপরে  মনোযোগ নির্ভর করে। অতিরিক্ত শব্দ দূষণের ফলে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়। কারো ক্ষেত্রে সুনসান নীরবতা মনোযোগে ভাল রকমের প্রভাব ফেলে। শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তীব্রতা মনোযোগে প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ গানের মৃদু সুরে বা বাদ্যযন্ত্রের ছন্দের তালে মনোযোগ আটকে রাখতে পারে। আলোর তীব্রতার  উপর মনোযোগ নির্ভর করে। কক্ষের তাপমাত্রা কম বা বেশি হলে অস্বস্তি হতে পারে।

মস্তিষ্কের তরঙ্গ ঢেউ এবং স্মৃতি

“ভুলে যেও না” – বাক্যটা শুনেছেন হয়ত! কেউ কোন কিছু বলেছে বা করতে দিয়েছে,পরক্ষণেই বলেছে প্রথম বাক্যটি। এই যে মনে করিয়ে দেয়ার কারণ হচ্ছে, আমরা ভুলে যাই। ভুল করেই, ভুলে যাই মনে রাখতে। তাই ‘মনে রাখা ‘ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে। মাঝেমাঝে ভুলে যাওয়া মানা যায় কিন্তু সচরাচর ভুলে যাওয়ার কারণে , নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা কোন রোগের কারণে , মানুষের ভুলে যাওয়াটা অভ্যাসে দাঁড়ায়। কোন দরকারী কাজ করবেন বলে যদি ভুলে যান করতে তবে তার ফলাফল অবশ্যই ভাল হয়না। মনে করার ব্যাপারটা মূলত ঘটে মস্তিষ্কে। মস্তিষ্কের কোষ যাদের নাম নিউরণ তারা তড়িৎ প্রবাহের মত তথ্য আদানপ্রদান করে থাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। আর এই কাজটি হয়ে থাকে সুনির্দিষ্ট মাত্রায় নির্দিষ্ট প্রবাহের গতিপথে। মস্তিষ্কের এই তরঙ্গপ্রবাহকে সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে তুলনা করা যায়। বিরামহীনভাবে ছোট বা বড় ঢেউ যেমন আঁচড়ে পড়ে সৈকতে, তেমনি মস্তিষ্কের তথ্য নিউরণের মাধ্যমে এভাবেই প্রবাহিত হয়। মস্তিষ্কের এই তরঙ্গপ্রবাহকে ফ্রিকোয়েন্সি (frequency) বলে। ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে কতটা সংকেত বা ঢেউ প্রবাহিত হয় তার পরিমাপ। ফ্রিকোয়েন্সিকে প্রকাশ করা হয় হার্টজ (hertz) এককে। এইতো জানা গেল, মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিমাপের একক নিয়ে। মূল কথায় আসি। মস্তিষ্কের ধীর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নাম হচ্ছে থিটা (theta) এবং এতে প্রতি সেকেন্ডে ৪-৮ টি করে তরঙ্গ প্রবাহিত হয় (4-8 Hz)। সাধারণত মানুষ যখন প্রশান্ত থাকে বা ঘুমের মধ্যে থাকে তখন এরকম তরঙ্গ মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়। মস্তিষ্কের দ্রুতগতির তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে বলে বিটা (beta) এবং এতে প্রতি সেকেন্ডে ১২-১৬ টি করে তরঙ্গ প্রবাহিত হয় (12-16 Hz)। যখন মানুষ জেগে থাকে বা সতর্ক থাকে তখন এরকম দেখা যায়। 

নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রবাহিত করতে মস্তিষ্ককে কি প্রশিক্ষণ দেয়া যায় ?

উত্তোর হচ্ছে , হ্যাঁ। মস্তিষ্কের ছন্দবদ্ধ ক্রিয়াকৌশলকে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়- যা এন্ট্রেইনমেন্ট (entrainment) নামে পরিচিত। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বাহ্যিক শব্দ, আলো নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করা যায় মস্তিষ্কে। প্রত্যাশিত ফ্রিকোয়েন্সিতে তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রবাহের ফলে মস্তিষ্ক থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়। ব্যাপারটা এমন, বাহ্যিকভাবে প্রয়োগকৃত আলো বা শব্দের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে প্রত্যাশিত তরঙ্গে আন্দোলিত করা। ধরুন, হেডফোনের মাধ্যমে কোন গানের সুর বা বাদ্যযন্ত্রের সুর শোনা। আমরা কিন্তু গান শোনার সময় এভাবেই মগ্ন হয়ে যাই ধীরে ধীরে। 

গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন, এই এন্ট্রেইনমেন্ট প্রক্রিয়ায় থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তিকে বেগবান করা যায় কিনা! এই পরীক্ষা করার পেছনে বেশ কিছু যুক্তি ছিল এরকম যে, থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যই মূলত কোন কিছু সঠিকভাবে মনে করতে মস্তিষ্কে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এই থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি বাড়ানো যায় কি না তা দেখার জন্য দুটো পরীক্ষা করা হয়। 

প্রথম পরীক্ষায়, প্রভাবিত থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে বিক্ষিপ্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (random pattern of wave) সাথে তুলনা করা হয়। এই বিক্ষিপ্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে হোয়াইট নয়েজ (White noise) নামে অভিহিত করা হয়। 

দ্বিতীয় পরীক্ষায়, প্রভাবিত থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে বিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনা করা হয়। 

উভয় পরীক্ষায়, স্বেচ্ছাসেবী মানুষদের প্রথমে ২০০ শব্দের লিস্ট একবার দেয়া হয় পড়ার জন্য। তারপর সেই শব্দগুলোকে নতুন আরো ১০০ শব্দের সাথে মিশ্রিত করে দেয়া হয় স্বেচ্ছাসেবীদের। এরপর বলা হয়, বাছাই করতে সেই শব্দগুলোকে যেগুলো তারা প্রথমবার পড়্রছে। এভাবে তাদের স্মৃতি শক্তি পরীক্ষা করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দুটো ঘটনার মাঝে গবেষকেরা বিশেষ একটি কাজ করেন স্বেচ্ছাসেবীদের উপর। আসুন, খোলাসা করে বর্ণনা করা যাক।

নতুন এবং পুরাতন শব্দগুলো পড়ার মাঝের সময়টাতে স্বেচ্ছাসেবীদের উপর ৩৬ মিনিট ব্যাপী দর্শণ ও শ্রবণের এনট্রেইনমেন্ট ঘটনা ঘটানো হয়।যেখানে বিশেষ এক প্রকারের চশমা (googles) এবং হেডফোন ব্যবহার করা হয়।  ঐ চশমাতে গবেষকেরা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আলো ছাড়া বাকি সব বন্ধ রাখেন এবং হেডফোনে পছন্দকৃত শব্দ তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রবাহিত করেন। দারুন না!

চিত্রঃ মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি পরীক্ষার তিনটি ধাপ। প্রথমদিকে শব্দ শেখানো হচ্ছে, দ্বিতীয় ধাপে এনট্রেইনমেন্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, তৃতীয়ধাপে স্মৃতিশক্তি যাচাই করা হচ্ছে।

প্রথম পরীক্ষায়, ১৮-২৫ বছর বয়সী ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক নেয়া হয় যেখানে ২৬ জন মহিলা এবং ২৪ জন পুরুষ। তাদেরকে দুইটা গ্রুপে ভাগ করা হয়। পরীক্ষণীয় গ্রুপকে (experimental group) আলো এবং শব্দ দ্বারা থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে  (৫ হার্টজ) প্রভাবিত করা হয়। একই সাথে, নিয়ন্ত্রিত গ্রুপকে (controlled group) এলোমেলো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো এবং কোলাহলপূর্ণ শব্দ  প্রবাহিত করা হয়।

দ্বিতীয় পরীক্ষায় ও ১৮-২৫ বছর বয়সী ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবককে বাছাই করা হয় যেখানে ২২ জন মহিলা এবং ১৮ জন পুরুষ। এখানেও দুই গ্রুপ করা হয়। এক গ্রুপকে দেয়া হয় বিটা এনট্রেইনমেন্ট (৫ হার্টজ) এবং অন্য গ্রুপকে দেয়া হয় বিটা এনট্রেইনমেন্ট (১৪ হার্টজ)। এই পরীক্ষা মূলত এই জন্য করা হয় যে, মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের তরঙ্গকে প্রভবিত করলে তারাও কি থিটা তরঙ্গের মত স্মৃতি শক্তির উন্নতিতে অংশগ্রহণ করে কিনা।

সুপ্রিয় পাঠক, আপনি হয়তো ভাবছেন- এই যে এত সব ঘটনা এগুলো কি এতোই সহজ করা কিংবা পর্যবেক্ষণ করা! একদমই না। গবেষকরা এইসব পরীক্ষা করেছেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং ফলাফল পর্যবেক্ষণ করছেন ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (electroencephalography) নামক যন্ত্রে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সহজেই মস্তিষ্কে প্রবাহিত তড়িৎকে পরিমাপ করা যায়।

চিত্রঃ ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি যন্ত্রে ফলাফল যাচাইকরন। A) বিশেষ চশমা এবং হেডফোনের সাহায্যে এনট্রেইনমেন্ট পদ্ধতি প্রয়োগ, B) যন্ত্রে মস্তিষ্কের তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিমাপ করা হচ্ছে C) লাল রঙের অংশগুলোত থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি সক্রিয় মনে রাখার ক্ষেত্রে পুরাতন শব্দ।

পরীক্ষার ফলাফল

প্রথম পরীক্ষায় দেখা যায়, থিটা এনট্রেইনমেন্ট গ্রুপের স্মৃতিশক্তি হোয়াইট নয়জে গ্রুপের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয় পরীক্ষায় ও দেখা যায়, থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রভাবিত গ্রুপের স্মৃতি শক্তি বিটা  তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রভাবিত গ্রুপ থেকে বেশি। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, শ্রবণ-দর্শন সংবেদনশীল থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য  স্মৃতিশক্তিকে বেগবান করে। যদি পরীক্ষার ঘটনা ব্যাখ্যা করে বলি, যারা থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের গ্রুপে ছিল তারা অন্য গ্রুপের তুলনায় সহজে নতুন এবং পুরাতন শব্দ বাছাই করতে পারে। পুরাতন শব্দগুলোকে মনে করতে পারে দ্রুত।

চিত্রঃ দুটো পরীক্ষায় থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ফল বেশি অন্যান্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে।

সহজ ভাবে যদি বলতে যাই, প্রশান্তিমূলক সুর (relaxing tone) যেমন মেডিটেশন সুর, নিম্ন কম্পাঙ্ক সুরের গান (soft music) আমাদের মস্তিষ্কের থিটা তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করে এবং তা স্মৃতিশক্তিকে প্রভাবিত করে দারুন ভাবে। ব্যাপারটার ব্যত্যয় ঘটতে পারে কারো কারো ক্ষেত্রে। তবে সাধারণ ভাবে অনুমেয় যে, দীর্ঘ সময়ের কাজের ফাঁকে একটু গান শোনা, চোখ বন্ধ করে রিল্যাক্স করা- নিঃসন্দেহে আমাদের মনোযোগকে ত্বরান্বিত করে। 

এইতো গেল পরীক্ষা নিরীক্ষার ফলাফলে প্রমাণিত তত্ত্ব। আসুন, এবার কিছু সাধারণ কিন্তু ম্যাজিকের মত কাজ করে; এমন কিছু  সূত্র জেনে নেই- যা মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। অবশ্য এগুলোও গবেষণার এই ফল। কিন্তু তবুও কাঠখোট্টাভাবে ব্যাখ্যায় যাবো না। 

মনোযোগ বাড়ানোর জন্য সহজ কিছু বিষয় 

  • সময়ের সুষম বন্টন করা। একটি নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট করে সময় বরাদ্দ করা। এই সময়ে সম্ভব হলে একা থাকা যেন কেউ বিরক্ত না করতে পারে। সকল ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এপস বন্ধ রাখা মোবাইলে। যথাসম্ভব মোবাইল থেকে দূরে থাকা।
  • একই সময়ে একাধিক কাজ করা থেকে বিরত থাকা (stopping multitasking)। যেমনঃ- পড়ার সময় ফোন না চালানো, কারো সাথে কথা বলার সময় ফোন ব্যবহার না করা। প্রায়োরিটি (priority)  লিস্ট করা কাজের। প্রয়োজনীয় কাজ করবার সময় অন্যান্য সকল প্রকার চিন্তা,কাজ না করা। কারণ একই সময়ে একাধিক কাজ করলে বস্তুত কোন কাজেই সঠিকভাবে মনোযোগ দেয়া যায় না। 
  • শারীরিক পরিশ্রম করা । ব্যায়াম করা নিয়মিতভাবে। মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে মনোযোগ বাড়ানো যায় দারুণভাবে।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো । ঘুমানোর আগে মোবাইল না চালানো, টিভি না দেখা। গল্প,কবিতা, উপন্যাসের বই পড়া। যেমনঃ একটি ভাবাবেগপূর্ণ কবিতা আপনার মনকে চিন্তার গভীরে নিয়ে যাবে। বিশ্বাস করুন, আপনার ঘুম আগের চেয়ে আরো গাঢ় হবে।  হা হা!
  • অতীত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কম ভাবা । বর্তমানের সময় গুরুত্ব দেয়া।  আমরা অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং ভবিষ্যতে কি ঘটবে তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে বর্তমানের মূল্যবান সময় নষ্ট করি। অতীত এবং ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা মূলত দুশ্চিন্তা। আর এই দুশ্চিন্তা বর্তমানের কর্মোদ্দীপনাকে আঘাত করে। অল্প ভাবুন,কাজ বেশি করুন বর্তমানে। যখন যা করছেন,তাতেই নিয়োজিত থাকুন। মনকে স্থির করে যদি বর্তমানে দরকারী কাজে মনোযোগ দেয়া যায়, তবে ভবিষ্যৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাল হবে। অযথা চিন্তা বন্ধ করুন (stop overthinking)। 
  • দীর্ঘ সময়ব্যাপী কোন কাজে আটকে না থেকে বিরতি নেয়া । একটু হেঁটে আসা, গান শোনা, চা-কফি পান করা। এই অল্প কিছু সময়ের বিরতি আপনাকে দ্বিগুণ উদ্যমে কাজে ফিরতে সাহায্য করবে। 
  • যথাসম্ভব প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকার চেষ্টা করা । সবুজ গাছ, রঙ-বেরঙের ফুল মনকে প্রফুল্ল রাখে, মনে সজীবতা আসে। যা আপনার মনোযোগকে বাড়াতে সহযোগিতা করবে। 
  • মনস্তাত্বিক খেলার অনুশীলন করা যেমনঃ দাবা খেলা, সুডোকু, ধাঁধা ইত্যাদি। 
  • সঠিক পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা । শাক-সবজি, প্রোটিন যুক্ত খাবার, আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা। অতিরিক্ত পরিমাণে চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ না করা। চিনিযুক্ত খাবার শরীরে অবসাদ অনুভূতির উদ্রেক করে। পরিমিত পরিমাণে খাবার শরীর ও মনকে রসদ যোগায় উৎফুল্ল থাকার। আর এটাই পরোক্ষভাবে মনোযোগকে প্রভাবিত করে থাকে। 

এছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয় কাজ করে মনোযোগের ক্ষেত্রে। এই নিবন্ধের মাধ্যমে একটা সাধারণ ধারনা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। আসুন, সুস্থ থাকি দেহ, মন ও মস্তিষ্কে। সুস্থধারার জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পজিটিভ চিন্তার লালন করি অন্তরে।

তথ্যসূত্রঃ

১) Boosting Brain Waves Improves Memory

২) 15 Ways to improve your focus and concentration skills

ফিচার ছবিসূত্রঃ The Two Brain Systems that Control Our Attention:The Science of Gaining Focus

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

মিঠুন পাল
পড়াশোনা করছি অণুজীব নিয়ে। স্নাতক শেষ করেছি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগে। একই বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত আছি। কবিতা লিখি অবসরে। বই পড়ি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ- বিমূর্ত বিজয়িনী(২০২০), প্রস্থানেই দেবো না বিদায়(২০২১)