যেভাবে মঙ্গল গ্রহ তার চৌম্বক ক্ষেত্র (ও মহাসাগর) হারালো

কোনো গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো সেই গ্রহকে তার মহাসাগর ধরে রাখতে সহায়তা করে। কোন গ্রহ তার চৌম্বক ক্ষেত্র হারানোর পরে তার বায়ুমণ্ডলও হারিয়ে যায়। এরপর সমুদ্রও। যদি পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকতো, তাহলে পৃথিবীকে মঙ্গল গ্রহের মতোই বিরান দেখাত। পৃথিবীর মতো শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র মহাবিশ্বে বিরল।

মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ অনুর্বর এবং শুষ্ক। গ্রহটির বরফক্যাপে  কিছু জল  জমাটবাঁধা রয়েছে। সেগুলি সম্ভবত গ্রহটির পৃষ্ঠের নীচে অবস্থিত। কিন্তু আপনি যদি মঙ্গলপৃষ্ঠভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে আপনি দেখতে পাবেন যে এর ভূপৃষ্ঠে তীর বা গিরিখাতের মতো গঠন আছে যা পূর্বের ব্যাপক বন্যার অবশিষ্ট প্রমাণ। 

বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল ঘন ছিল বলে ধারণা করা হয়। বায়ুর তাপমাত্রা সামান্য উষ্ণ ছিল। মঙ্গল গ্রহে উপস্থিত ব-দ্বীপগুলি দেখতে পৃথিবীর নদীর ব-দ্বীপের মতো। কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন যে মহাসাগরগুলি গ্রহটিকে আংশিকভাবে আবৃত করে রাখতো ( মানচিত্র #1043 দেখুন)। অন্য বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে প্রাপ্ত উল্কাপিণ্ডের যৌগিক গঠন দেখেছেন, যেখানে বিলিয়ন বছর আগের মঙ্গলগ্রহ কেমন ছিলো তা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমানের মঙ্গল গ্রহের সাথে তুলনা করেন। দুই গবেষণাই ইঙ্গিত দেয়, যে প্রায় চার বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধ একটি বিশাল সমুদ্র দ্বারা আবৃত ছিল।

তবে বর্তমানে এটি কেবল একটি স্মৃতি।সম্প্রতি জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাপত্র Nature Communications  জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে: বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলগ্রহ তার চৌম্বকক্ষেত্র হারিয়ে ফেলেছে। চৌম্বকক্ষেত্রের অভাবে বায়ুমণ্ডল ভীষণভাবে সংকুচিত হয়ে যায়, এবং শেষপর্যন্ত মহাসাগর জলীয়বাস্পে পরিণত হওয়ার পর তা মহাকাশে হারিয়ে যায়।

​​

চৌম্বকক্ষেত্র এবং মহাসাগরের সম্পর্ক 

সৌরজগৎ একটি কঠোর স্থান। আমাদের জীবনদাতা সূর্য জীবন কেড়েও নিতে পারে। সূর্যের বিকিরণের পরিমান এতো বেশী যে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রগুলো আমাদের সুরক্ষা না দিলে আমাদের গ্রহ পুড়ে ভাজি হয়ে যেত। চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকলে সূর্য থেকে বিকিরিত অজস্র ক্ষুদে কণার প্রবাহ আমাদের বায়ুমণ্ডলকে সংকুচিত করে দিতো। ফলে আমাদের সাগরগুলো বাস্পায়িত হয়ে মহাকাশে হারিয়ে যেত। অর্থাৎ, পৃথিবীর পরিণতি হতো মঙ্গলগ্রহের মতো।

পৃথিবীই সৌরজগতের একমাত্র পাথুরে গ্রহ যার শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র আছে। এই শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রই  হল পৃথিবী আর মঙ্গলগ্রহের মধ্যে বড় পার্থক্য। কিন্তু বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলগ্রহেরও শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ছিল, কিন্তু তার কি হলো?! 

চিত্র: পৃথিবী ও মঙ্গলের গ্রহকেন্দ্রের তুলনা

কিভাবে মঙ্গলগ্রহ তার চৌম্বকিয়ক্ষেত্র হারালো ? 

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার  জন্য টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুনপেই ইয়োকুরনেতৃত্বে পৃথিবীতে একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয় যেখানে মঙ্গলগ্রহকে অনুকরণ করা হয়েছে। এই দলটি লোহা, সালফার, এবং হাইড্রোজেনের সংমিশ্রণ তৈরী করেন, যা মঙ্গলের কেন্দ্রে উপস্থিত বলে ধরা হয়। 

সালফার সম্ভবত মঙ্গলের কেন্দ্রে রয়েছে। কারণ মঙ্গলগ্রহের উল্কাপিন্ডে বা ভূত্বকে সাধারণত সালফারের পাশাপাশি অন্যকোনো উপাদান পাওয়া যায় না। মঙ্গলগ্রহ সৌরজগতের “তুষার রেখার” কাছাকাছি থাকায় তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন অনেক বেশি হতে পারে।তুষার রেখা বলতে আমাদের সৌরজগতের সেই অঞ্চল বোঝানো হয় যেখানে গ্রহ গঠনের সময় প্রচুর পানি ও বরফ ছিল। গবেষক ইয়োকো (Yokoo) বলেন যে- “আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে অনুমান করতে পারি যে মঙ্গলের কেন্দ্রটি  Fe-S-H এর তরল। কিন্তু আমাদের আরোকিছু মঙ্গলগ্রহের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই করা দরকার। নাসার চলমান InSightমিশন অদূর ভবিষ্যতে আমাদের আরোকিছু বলতে পারে।”

দলটি এরপরে সেই লোহা, সালফার এবং হাইড্রোজেনের মিশ্রণটিকে দুটি হীরার মধ্যে স্থাপন করে একটি লেজার দিয়ে উত্তপ্ত করেন। এটি পাথুরে গ্রহের কেন্দ্রে উচ্চতাপমাত্রা ও চাপকে অনুকরণ করে।। এর ফলে উপাদানগুলো দুটি স্বতন্ত্র তরলে পরিণত হয়। একটি লোহা আর সালফার দিয়ে তৈরী আর অন্যটি লোহা আর হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরী। হাইড্রোজেন ধারণকারী তরলের ঘনত্ব কম হওয়ায় এটি উপরে ভেসে উঠে। তরলগুলো পৃথক হওয়ার সাথে সাথে সংবহনশীল স্রোত তৈরী হয়।  

এটা ছিল মঙ্গলগ্রহের শুরুর দিকের ইতিহাসের সাথে তুলনীয়। লোহা-সালফার-হাইড্রোজেন তরলের হাইড্রোজেন থেকে সালফার আলাদা হওয়ার কারণে সংবহনশীল স্রোত তৈরি করবে। এই স্রোতগুলো গ্রহের চারপাশে একটি প্রতিরক্ষামূলক চৌম্বকক্ষেত্র তৈরী করবে। কিন্তু এই স্রোতগুলো স্বল্প-আয়ু সম্পন্ন। দুটি তরল পৃথক হওয়ার সাথে সাথে স্রোত বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র যাবে হারিয়ে।

চিত্র: পৃথিবীর চৌম্বক-ক্ষেত্র যেভাবে আমাদের সৌর-বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। ছবি AntarcticArctic

পৃথিবীর কেন্দ্রের পদার্থবিদ্যা 

মঙ্গলগ্রহের আয়রন-সালফার এবং আয়রন-হাইড্রোজেন তরলের বিচ্ছেদ পৃথিবীর ভূ-কেন্দ্রেও দেখা যায়। তবে দুই গ্রহের মধ্যে একটা মূল পার্থক্য হলো তাপমাত্রা। 

ইয়োকু বলেন “পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপমাত্রা (~6,740 F°) মঙ্গল গ্রহের তাপমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। এই উচ্চ তাপমাত্রার জন্য আয়রন-সালফার এবং আয়রন-হাইড্রোজেন তরল একসাথে মিশে যায়। তবে, আমরা  পৃথিবীকেন্দ্রের একটু উপরে স্তরবিন্যাস দেখতে পাই, যেখানে তাপমাত্রা কম। এই কারণেই পৃথিবীর কেন্দ্রটি কেবল তার শীর্ষে স্তরিত হয়, যেখানে মঙ্গল গ্রহের কেন্দ্রটি সম্পূর্ণভাবে স্তরীভূত হয়। পৃথিবীর মূল অংশ সম্পূর্ণরূপে স্তরীভূত হতে অনেক দীর্ঘ সময় (এক বিলিয়ন বছরের মতো) লাগবে।”

তাই আমাদের কাছে সময় আছে।

এই ফলাফলগুলি বাসযোগ্য বহির্গ্রহের অনুসন্ধানেও প্রভাব ফেলে। সচরাচর কোন এক্সোপ্ল্যানেট জীবন উপযোগী কি না তা নির্ধারণ করার জন্য এর পৃষ্ঠে  তরল জলের উপস্থিতি খোঁজা হয়।তবে গ্রহটি আদৌ তার জল ধরে রাখতে পারে কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র আরেকটি মূল অনুসন্ধানীয় বিষয় হওয়া উচিত। 

আরো পড়ুন: মঙ্গলে কি পানির প্রমাণ পাওয়া গেলো?

কিভাবে বায়ুমণ্ডল আর জলের সাথে পৃথিবীর প্রাণের সৃষ্টির সম্পর্ক আছে তা জানতে পড়ুন বিজ্ঞানীরা কিভাবে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজেন? 

তথ্যসূত্র:অনুবাদঃ How Mars lost its magnetic field — and then its oceans

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

অন্তর চন্দ্র
আমি অন্তর চন্দ্র, বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় আমাকে অনেক আকৃষ্ট করে। তাই জানতে ও জানাতে পছন্দ করি। আমি গবেষণা করতে পছন্দ করি।