হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়লো সবচেয়ে দূরের নক্ষত্র: সানরাইজ আর্ক

হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়লো সবচেয়ে দূরের নক্ষত্র
ছবি: হাবল টেলিস্কোপ

নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ একটি যুগান্তসৃষ্টিকারী আবিস্কার করেছে।

এই প্রথমবার মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্বের জন্মের প্রথম বিলিয়ন বছরের মধ্যে বিদ্যমান একটি নক্ষত্রের আলো শনাক্ত করেছে। আর এখন পর্যন্ত দেখা এটি সবচেয়ে দূরবর্তী স্বতন্ত্র নক্ষত্র। নক্ষত্রটির দাপ্তরিক নাম WHL0137-LS। এছাড়াও নক্ষত্রটির ডাক নাম ” Earendel ” নামটি একটি পুরানো ইংরেজি শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ “সকালের তারা” বা “উদীয়মান আলো”।

ইরান্ডেল নক্ষত্রকে একটা তীরচিহ্ন দিয়ে দেখানো হচ্ছে যা স্থানকালের এমন একটি তরঙ্গে (রিপল) অবস্থিত যেটা বহুগুণ বিবর্ধন দেয়। পুরো ছবিটা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর মাধ্যমে তোলা। ছবি হাবল।

হাবল ফটোতে এটি দেখতে খুব আহামরি কিছু নয় – ক্লাস্টারের মহাকর্ষীয় লেন্সটি দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলোকে একটি দীর্ঘ, পাতলা অর্ধচন্দ্রাকারে বিকৃত করেছে যার ফলে একে “সানরাইজ আর্ক” বলা হয়। পূর্ববর্তী একক- নক্ষত্রের রেকর্ডটি ছিলো Icarus নক্ষত্র যা ২০১৮ সালে হাবল দুরবীন শনাক্ত করেছিলো৷পৃথিবী থেকে Icarus এর দূরত্ব ছিলো ৯ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।মহাবিশ্বের বয়স যখন প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর, বা তার বর্তমান বয়সের ৩০ শতাংশ ছিল।

হাবল দুরবীনের মহাকর্ষীয় লেন্সিং পদ্ধতি ব্যাবহার করে সনাক্ত করা নতুন নক্ষত্রটি থেকে আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ১২.৯ বিলিয়ন বছর সময় নিয়েছে, আমরা এটিকে বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৯০০ মিলিয়ন বছর পরে বা এমন একটি সময়ে দেখছি যখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান বয়সের মাত্র ৭ শতাংশ ছিল, (redshift 6.2)।

বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রায়ান ওয়েলচ বলেন “প্রথমে এটি প্রায় বিশ্বাস করিনি, এটি পূর্ববর্তী সবচেয়ে দূরবর্তী, সর্বোচ্চ রেডশিফ্ট নক্ষত্রের চেয়ে অনেক বেশি দূরে ছিল,” 

বাল্টিমোরের স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউট (STScI) এর গবেষক ড্যান কোয়ের নেতৃত্বে হাবলের RELICS (Reionization Lensing Cluster Survey) প্রোগ্রামের সময় সংগৃহীত ডেটা থেকে এই আবিষ্কারটি করা হয়েছিল।

Credits: Science: NASA, ESA, Brian Welch (JHU), Dan Coe (STScI); Image processing: NASA, ESA, Alyssa Pagan (STScI)

ওয়েলচ বলেছেন, “সাধারণত এই দূরত্বে, লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের আলো একসাথে মিশ্রিত হওয়ার সাথে সমগ্র ছায়াপথগুলিকে ছোট ছোট দাগের মতো দেখায়, কিন্তু সমস্ত ছায়াপথ একইভাবে বিবর্ধিত এবং বিকৃত হয় না। ঢেউ খেলানো পানির মধ্য দিয়ে যাওয়া আলো যেমন সুইমিং পুলের তলদেশে নিজস্ব তরঙ্গ তৈরি করে, তেমনি গ্যালাক্সির আলোর ঢেউও বয়ে যায়, এর কিছু অংশ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত।”

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যেগুলিকে critical curve বলে থাকেন সেইগুলিই সবচেয়ে বেশি বিবর্ধিত বিন্দু। বস্তুগুলি critical curve  এর কাছে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের বিবর্ধন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়,ধারনা করা হয় এই প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রটি কমপক্ষে ১ হাজার বার বিবর্ধিত হয়েছে।

Earendel এর আকার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এটি আমাদের সূর্যের ভরের অন্তত ৫০ গুণ, এবং সূর্যের থেকে মিলিয়ন গুন বেশী উজ্জ্বল।কিন্তু বিবর্ধনের সঠিক পরিমাণের উপর নির্ভর করে এটি আরো অনেক বড় হতে পারে। এমনকি ৫০ সৌর ভরেরও বেশী, এটি এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা বৃহত্তম নক্ষত্রগুলির মধ্যে একটি হবে।এটা খুবই সম্ভব যে ইরেন্ডেল আসলে একটি বাইনারি নক্ষত্র অর্থাৎ, এটি আসলে দুটি নক্ষত্র যা একে অপরের কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করছে।

ওয়েলচ আত্মবিশ্বাসী যে হাবল একটি, বা সর্বাধিক, দুটি নক্ষত্র সনাক্ত করেছে। ইরেন্ডেলকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনার আকর্ষণীয় অংশ হল এর সৃষ্টি।এমন একটি উপায় আছে যেখানে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে এটি একটি অগ্রগামী নক্ষত্র, যা বিগ ব্যাং-এ সৃষ্ট আদিম গ্যাস থেকে তৈরি একটি বস্তু।

তত্ত্ব আমাদের বলে যে মহাবিশ্বে প্রথম নক্ষত্র যেগুলি উজ্জ্বল হয়েছিল তা শুধুমাত্র হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম নিয়ে গঠিত।জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের Population III নক্ষত্র বলে।শুধুমাত্র যখন এই নক্ষত্র এবং তাদের বংশধররা ভারী উপাদানগুলিকে একত্রিত করেছিল তখনই মহাজাগতিক পরিবেশ পরিবর্তন হয়েছিল যা আমরা আজকে আমাদের চারপাশে দেখি।

“হ্যাঁ, আমরা আশা করি যে ইরেন্ডেল এমন একটি নক্ষত্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যেটি ভারী উপাদানে কিছুটা সমৃদ্ধ হয়েছে, তবে আজকে আমাদের চারপাশের স্থানীয় নক্ষত্রদের মতো নয়,” ওয়েলচ বলেছিলেন।

এটি একটি Population III নক্ষত্র হওয়ার ছোট সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যান্য কিছু গবেষণা ভবিষ্যদ্বাণী করে যে আপনি কিছু ছায়াপথের প্রান্তে এগুলি পেতে পারেন। তবে এটি এমন কিছু যা আমাদের জেমস ওয়েবের মতো অন্যান্য টেলিস্কোপ থেকে আরও বিস্তারিত ফলো-আপের প্রয়োজন। এই প্রাথমিক ফলাফলগুলি হাতে নিয়ে, দলটি এখন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের দিকে তাকাবে নক্ষত্রের আসল প্রকৃতি এবং কীভাবে এটি মহাবিশ্বের বিবর্তনের সাথে খাপ খায় তা জানতে।  

“জেমস ওয়েব হাবলের উত্তরসূরি। ডিসেম্বরে উৎক্ষেপন করা হয়েছে, এতে অনেক বড় আয়না এবং উচ্চতর বিশ্লেষণী যন্ত্র রয়েছে। এটি হাবলের বাইরের আরো বিশদ বিবরণ দিতে সক্ষম হবে।”

নাসা প্রকল্পের বিজ্ঞানী ডঃ জেনিফার উইজম্যান বলেন, “হাবল স্পেস টেলিস্কোপ খুব ভালো কাজ করছে, আগামী বছরগুলিতে হাবল আরো নতুন অজানা ঘটনা আবিষ্কার করবে তার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। মহাকাশে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এবং হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এই দুটি আশ্চর্যজনক সুবিধা থাকার মাধ্যমে, আমরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আগে যা শিখতে পেরেছি তার চেয়ে বেশি শিখতে যাচ্ছি।”

আবিষ্কারটি এ বছর ৩১শে মার্চ নেচারে প্রকাশিত হয়েছে।

তথ্যসুত্রঃ

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?