লন্ডনের মরণ কুয়াশার ভয়ঙ্কর ইতিহাস

অনেক সময়েই দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলো পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারে তাদের দেশে কোন বড় ধরনের মানবসৃষ্ট সংকট তৈরি হওয়ার পর। যেমনটা হলো লন্ডনের মরণ কুয়াশা। এই দূর্যোগ পরে লন্ডনের বায়ুদূষণ কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য একটা ধাক্কা হিসেবে কাজ করেছিলো।

৫ ই ডিসেম্বর ১৯৫২ সাল প্রতিদিনের মতন লন্ডনের আরেকটি সুন্দর সকাল,আস্তে আস্তে ব্যাস্ত হয়ে উঠছে লন্ডনের নাগরিক জীবন।কিন্তু তারা কেউ জানতেও পারেনি লন্ডনের পরিস্কার আকাশের বুক চিরে ছুটে আসছে ভয়ংকর এক বিপদ।

গ্রেট স্মোগের সময় ট্রাফালগার স্কোয়ার।

লন্ডনের পরিস্কার আকাশ আস্তে আস্তে হালকা কুয়াশায় ঢেকে যেতে থাকে। লন্ডনের আকাশে সারাবছর কমবেশী কুয়াশা থাকেই। কাজেই জনগন এই কুয়াশা নিয়েও মাথা ঘামায়নি।(১৯ শতকে এবং ২০ শতকের গোড়ার দিকে লন্ডন ঘন কুয়াশার জন্য কুখ্যাত ছিল যা প্রায়ই শরৎকালে শহরের উপর নেমে আসে)।

কিন্তু সময় যত বাড়তে থাকে কুয়াশার চাঁদর ততো গাঢ় হতে থাকে।, সেই সাথে লন্ডনের বিখ্যাত ল্যান্ডমার্কগুলো –  বিগ বেন, সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রাল, লন্ডন সেতু এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো কুয়াশার চাঁদরে ঢেকে যেতে থাকে।

পিকাডিলি সার্কাস।

বিশাল কুয়াশার চাঁদরটি কয়েকঘন্টার মধ্যেই পুরা লন্ডন শহরকে ঢেকে ফেলে।কুয়াশার এই বিশাল চাঁদরের নাম দেয়া হয়েছিলো গ্রেট স্মগ। কুয়াশা এতটাই ঘন হয়ে যায় যে কয়েকফুট দুরের জিনিসও চোখে দেখা যায় না। রাস্তায় চলাচলরত যানবাহন হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতো।

গ্রেট স্মোগ’-এর সময় লন্ডন, ১৯৫২।

আর কুয়াশার রঙটাও যেন কেমন হলুদ আর কালো রঙের মিশ্রন সেই সাথে কেমন যেন রাসায়নিক গন্ধ মিশ্রত, দেখলেই গা ঘিনঘিন করে উঠে। অন্য সময় নদী এবং সাগর থেকে প্রচুর বাতাস প্রবাহিত হতো কিন্তু সেইসময় তেমন কোন বাতাস ছিলো না। যার ফলে কুয়াশা আরো ঘন হয়ে জেকে বসে।

আসল বিপদ শুরু হয় তখন যখন এই কুয়াশার কারনে রাস্তায় চলেফেরা করা লোকজন শ্বাস নিতে পারছিলো না ।অক্সিজেনের অভাবে তাদের হাসফাস অবস্থা।

লন্ডনের অধিবাসীরা তখনো বুঝতে পারেনি তারা পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ দূর্যোগের মুখে পরতে যাচ্ছে। পাঁপাচদিন স্থায়ী এই দূর্যোগে প্রায় ১২,০০০ হাজার মানুষ মারা যায়। যার মধ্যে বেশীরভাগ শিশু এবং বয়স্ক ব্যাক্তি।, বিশেষ করে যাদের ব্রোঞ্চিয়াল হাঁপানি ও নিউমোনিয়া ছিলো। এবং ১,৫০,০০০ মানুষ  হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাজার হাজার প্রাণীও মারা যায়।

খামার মালিকরা ঘোড়া এবং গবাদিপশুদের বাচানোর জন্য শস্যের বস্তা কেটে মুখোশ বানিয়ে তা হুইক্সির মধ্যে ভিজিয়ে ঘোড়া এবং অন্য গবাদি পশুর মুখে বেধে দিয়ে এদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাচানোর চেস্টা করে। ঘন কুয়াশায় পথ হারিয়ে প্রচুর পাখি বড় বড় বিল্ডিং এর সাথে ধাক্কা খেয়ে মারা যেতে থাকে।

পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে এই কুয়াশার মধ্যে সালফিউরিক অ্যাসিড উচ্চ মাত্রায় থাকার ফলে মৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল  ব্যাপকভাবে। সেদিন এই সালফিউরিক এসিড ঠিক কতোটা বাতাসে পৌঁছেছিল প্রায় ৬৫ বছর ধরে সেটি রহস্যজনক ছিল।

১৯৫২ সালের গ্রেট স্মোগের সময় লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে নেলসন স্তম্ভ।

 নভেম্বর ২০১৬ সালে বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন যে তারা অবশেষে রহস্যটির সমাধান করতে  পেরেছেন।বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন যে সালফার ডাই অক্সাইড বেশিরভাগ জ্বলন্ত কয়লার ধোঁয়ার মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে।

এই কুয়াশা তৈরীর পিছনে সালফেট একটি বড় ভুমিকা রেখেছে। সালফিউরিক অ্যাসিডের কণাগুলি এসেছে সালফার ডাই অক্সাইড থেকে। আর এই সালফার ডাই অক্সাইড  এসেছে বাসাবাড়ি, বিদুৎকেন্দ্র এবং অনান্য কাজে ব্যবহার করা কয়লা থেকে।

কিন্তু কিভাবে সালফার ডাই অক্সাইড সালফিউরিক এসিড পরিণত হয়েছে স্পষ্ট ছিল না।, কিন্তু ফলাফল দেখায় যে এই প্রক্রিয়াটিকে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড দ্বারা সহায়তা করা হয়েছে।, আর এই নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডও জলন্ত কয়লা থেকে উৎপন্ন হয়।

লন্ডনের গ্রেট স্মোগ।

লন্ডনের কুয়াশার দুটি মূল কারণ ছিল মানুষের তৈরি কয়লার ধোঁয়া এবং নিখুঁত আবহাওয়া। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগে, শহরটিতে  অস্বাভাবিক ঠান্ডা পরা শুরু করে আর এই ঠান্ডার হাত থেকে মানুষ বাচার জন্য বাসাবাড়ি, ব্যবসায়িক স্থান গরম রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণন কয়লা পোড়ানো শুরু করে।

আর এই কয়লা ছিলো নিম্মমানের এবং এর ভিতরে উচ্চমাত্রার সালফার ছিলো। যা পরবর্তীতে বড় বড় চিমনির মাধ্যমে লন্ডনের বাতাসে ধোঁয়ায় সাথে সালফার ডাই অক্সাইড যোগ করে।

শুধু অফিস এবং বাসাবাড়ি নয়, বড় বড় কারখানা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদুৎকেন্দ্র যেমন বাটার্সিয়া, ফুলহাম, ব্যাংকসাইড এবং কিংস্টন  বিদ্যুৎকেন্দ্র গুলির জ্বলন্ত কয়লার চুল্লিগুলো এই দূষণে বিশাল অবদান রাখে।

মেট অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জ্বলন্ত কয়লা ১,০০০ টন ধোঁয়া কণা, ২,০০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড, ১৪০ টন হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ১৪ টন ফ্লুরিন যৌগ এবং ৩৭০ টন সালফার ডাই অক্সাইড বায়ুমন্ডলে মুক্ত করে।

ভারী কুয়াশায় টাওয়ার ব্রিজের কাছে টেমসের উপর একটি টাগবোট।

প্রাকৃতিকভাবে কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থায়, সালফেট ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের মধ্যে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার কারণে কুয়াশার ভিতরে সালফেট তৈরি হবে।এই সালফেট কুয়াশার ভিতরের পানির কনাকে ঘন এবং বিষাক্ত করে তুলে।আর এর ফলে মানুষের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

লন্ডনের গ্রেট স্মোগের মাত্র চার বছর পরে, ইউ কে ১৯৫৬ সালের ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট গঠন করে।, এবং যুক্তরাজ্য জুড়ে কয়লাসহ সমস্ত দূষণকারী আগুন নিষিদ্ধ করে। সেই সাথে আস্তে আস্তে সব কয়লা চালিত কারখানা, বিদুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়।

কিন্তু এই বিপর্যয় পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে ৬৫ বছর সময় লেগেছে। দেখা যাচ্ছে পুরা ঘটনার পিছনে মানুষের কর্মকান্ড দায়ী। প্রকৃতির বিপক্ষে গিয়ে এই মানব সভ্যতা ঠিকে থাকতে পারবে না এটাই হলো বড় সত্য।

তথ্যসুত্রঃ 

Great Smog of London | Facts, Pollution, Solution, & History | Britannicahttps://www.britannica.com/event/Great-Smog-of-London

The Great Smog of 1952 – HISTORY

Great Smog of 1952 | National Geographic Societyhttps://www.nationalgeographic.org/thisday/dec5/great-smog-1952/

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?