মিশন লুসি: ট্রোজান গ্রহাণুতে নাসার যাত্রা

বৃহস্পতির কক্ষপথে রয়েছে ট্রোজান গ্রহাণু, যাদের সৌরজগতের ফসিল হিসেবে মনে করা হয়। মিশন লুসির উদ্দেশ্য হলো এই সব গ্রহাণুকে পর্যবেক্ষণ করা।

গত ২০২১ সালে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে  বৃহস্পতি গ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে মহাকাশযান লুসি।

গন্তব্য সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির কক্ষপথে ঘুরতে থাকা গ্রহাণুর ঝাঁক। লুসি একটি মহাকাশ প্রোব। লুসি সেই গ্রহাণুগুলো পর্যবেক্ষণ করবে। এই অভিযানকে বলা হচ্ছে  সৌরজগতের জীবাশ্ম খোঁজার অভিযান। 

বৃহস্পতির কক্ষপথে ঘুরতে থাকা এইসব গ্রহাণুগুলি ট্রোজান গ্রহাণু নামে পরিচিত। ট্রোজান গ্রহাণুগুলো বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথে ৬০ ডিগ্রি কোণে ঘুরতে থাকে। ট্রোজান গ্রহাণু দু’টি আলাদা দলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, যার একটি দল বৃহস্পতির সামনে, অন্য দল বৃহস্পতির পিছনে থাকে।

সূর্য এবং বৃহস্পতি থেকে সমান দূরত্বে অবস্থিত দুটি ল্যাগ্রেঞ্জ বিন্দুর চারপাশে গুচ্ছবদ্ধ করা। সূর্য এবং এর বৃহত্তম গ্রহ দ্বারা ট্রোজানরা একটি মহাকর্ষীয় ভারসাম্য ক্রিয়ায় স্থির থাকে। সৌরজগতের মধ্যে ট্রোজানদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যা আছে বৃহস্পতিতে, ৬,১৭৮ টি (জানুয়ারী ২০১৫ পর্যন্ত)। 

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র বিজ্ঞানীরা বলছেন, আজ থেকে চার বিলিয়ন বছর আগে আমাদের সৌরজগত এবং গ্রহগুলোর গঠন হওয়ার সময় এসব বস্তু অবশিষ্টাংশ হিসাবে রয়ে গেছে।

ফলে ট্রোজান নামের এই আদিম বস্তুগুলির ভিতরে  সৌরজগতের ইতিহাস জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র থাকতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতির সাথে যুক্ত ট্রোজান গ্রহাণুর ঝাঁকগুলি বহিরাগত গ্রহ গঠনকারী আদি উপাদানগুলির অবশিষ্টাংশ বলে মনে করা হয়। লুসি ট্রোজান গবেষনার প্রথম মহাকাশ মিশন। 

আফ্রিকা থেকে পাওয়া মানবদেহের একটি সুপরিচিত জীবাশ্মের নাম লুসি। ওই নাম থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে নাসার এই মিশন এবং মহাকাশযানের নাম রাখা হয়েছে লুসি নামে। লুসির মিশনের দৈর্ঘ্য ১২ বছর।এই ১২ বছরে লুসি আটটি ভিন্ন গ্রহাণু সেইসাথে, প্রধান গ্রহাণু বেল্ট, সাতটি ট্রোজান গ্রহানু (যার মধ্যে চারটি বাইনারী সিস্টেম) পর্যবেক্ষণ করবে। লুসি তার ভ্রমণের সময় গ্রহের গঠনের এই জীবাশ্ম অনুসন্ধান করবে।

লুসির জটিল যাত্রাপথে এই ট্রোজান গ্রহানুর প্রধান তিনটি ঝাঁক (সি, পি এবং ডি) পর্যবেক্ষণ করবে এবং এর প্রথম ক্লোজ-আপ ভিউ দেবে। গাঢ়-লাল পি- এবং ডি-টাইপ ট্রোজানগুলি (দুইটি ভিন্ন ধরনের ট্রোজান) কুইপার বেল্টে পাওয়া বরফযুক্ত দেহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যা নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে। সি-টাইপগুলি বেশিরভাগই গ্রহাণুর প্রধান বেল্টের বাইরের অংশে, মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মধ্যে পাওয়া যায়।

সমস্ত ট্রোজান প্রচুর অন্ধকার কার্বন যৌগ দিয়ে ঢাকা বলে মনে করা হয় এর নীচে সম্ভবত পানি এবং অন্যান্য উদ্বায়ী পদার্থে সমৃদ্ধ। লুসি আমাদের প্রথমবারের মতো দেখাবে সৌরজগতের আদিম বস্তুর বৈচিত্র্য যা থেকে বিভিন্ন গ্রহ তৈরি হয়েছিলো।

মহাকাশযানটি তৈরি করছে লকহিড মার্টিন। মেরিল্যান্ড এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জনস হপকিন্স অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি দ্বারা লুসির যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। আলবামার হান্টসভিলের নাসার মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের প্ল্যানেটারি মিশন প্রোগ্রাম অফিস থেকে মিশন তত্ত্বাবধান করা হবে।

এই মিশন চালাতে খরচ হবে ৯৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। এই মহাকাশ অভিযানে লুসি ছয়শো কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে। মহাকাশযানটি এখন প্রায় ৬৭,০০০ মাইল (১০৮,০০০ কিঃমিঃ প্রতি ঘন্টায়) বেগে একটি পথে ভ্রমণ করছে, যা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে এবং ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রথম  মহাকর্ষ সহায়তার জন্য পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে।

প্রথম মহাকর্ষ সহায়তায় মঙ্গলের কক্ষপথের বাইরে লুসির গতিপথকে ত্বরান্বিত করবে এবং পরিচালনা করবে। 

২০২৪  সালে দ্বিতীয় মহাকর্ষ সহায়তার জন্য পৃথিবীর দিকে ফিরে  আসবে। এই মহাকর্ষ সহায়তা লুসিকে ডোনাল্ডজোহানসন গ্রহাণুর দিকে নিয়ে যাবে – যা সৌরজগতের প্রধান গ্রহাণু বেল্টের মধ্যে অবস্থিত।

মাধ্যাকর্ষণ সাহায্য।

লুসি বৃহস্পতির সামনে ট্রোজান গ্রহানুর ঝাঁকের মুখোমুখি হবে ২০২৭ সালে। তার প্রথম চারটি টার্গেটেড ফ্লাইবাই সম্পন্ন করার পর, মহাকাশযানটি ২০৩১ সালে তৃতীয় মহাকর্ষ সহায়তার জন্য পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে এবং মহাকর্ষ সহায়তা নিয়ে এটি ২০৩৩ সালে ট্রোজানদের পিছনের  ঝাঁকে উপস্থিত হবে।

মহাকাশযানটি খুব কাছ থেকে গ্রহাণুগুলিকে স্ক্যান করবে এবং দূরবর্তী সেন্সিং এবং অত্যাধুনিক রেডিও যন্ত্র ব্যবহার করে তাদের ভূতত্ত্ব, পৃষ্ঠ বৈশিষ্ট্য, ভর এবং ঘনত্ব, তাপ এবং অন্যান্য ভৌত বৈশিষ্ট্যর তথ্য সংগ্রহ করবে।

নাসার সদর দপ্তরের বিজ্ঞান মিশনের সহযোগী প্রশাসক থমাস জুরবুচেন বলেন, “২০১৭ সালে নাসাতে যোগদানের কয়েক মাস পরেই লুসি আমার অনুমোদিত প্রথম মিশন ছিল। আশা করি লুসি এই রহস্যময় ট্রোজান গ্রহাণু সম্পর্কে আরও জানতে এবং সৌরজগতের প্রাথমিক গঠন এবং বিবর্তনকে আরও ভালভাবে বোঝার সুযোগ করে দিবে।”

তথ্যসুত্রঃ

Lucy: The First Mission to the Trojan Asteroids | NASA