অতীতের দর্পণ

আলো আমাদের সুন্দর বিশ্বকে দেখতে সাহায্য করে। আলো ছাড়া এ জগৎ সংসার অন্ধকারেই নিমগ্ন রয়ে যেত । যদিও আমরা আলোকে দেখতে পাই না কিন্তু আলো কোন বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করলেই তবেই আমরা সেই বস্তুকে দেখতে পাই। আলো ছাড়া আমাদের মূল্যবান ইন্দ্রিয় চোখগুলি ব্যবহারহীন হয়ে পড়ত। তবে আজ আমরা আজ আলোকে একটু অন্যভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করব। 

কী ব্যবহার? তোমরা জিজ্ঞেস করতেই পারো। আসলে আজ আমরা আলোকে দর্পণ হিসাবে ব্যবহার করবে , বা আরেকটু সঠিকভাবে বলতে , ‘অতীতের দর্পণ’ হিসাবে ব্যবহার করব ।  মাথা চুলকোবার কোন প্রয়োজন নেই , আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই সব সহজ করে বোঝাবার চেষ্টা করব। 

আগে চলো জেনে নিই , অতীতের দর্পণ বলতে আমি কি বলছি। এককথায় বলতে গেলে অতীতের দর্পণ হল এমন একটি দর্পণ বা আয়না যার সাহায্যে অতীতকে দেখতে পাই। 

না না বন্ধু , কোনও আজগুবি গল্প বলছি না , একেবারে বাস্তব ঘটনা, কিছুক্ষণের মধ্যেই তার প্রমাণ দেব , তবে তার আগে আমাদের আলো সম্পর্কে আরও কিছু জানা উচিত যাতে করে আমরা সহজভাবে বুঝতে পারব যে আমাদের বিশেষ অতীতের দর্পণ কিভাবে কাজ করবে – 

আলো হচ্ছে একধরনের তরঙ্গ , আলো যখন কোনো উৎস থেকে নির্গত হয় তখন সেটি ছোট ছোট শক্তির প্যাকেট হিসাবে নির্গত হয় , একে বলে ফোটন । অর্থাৎ আলো হল এই শক্তির প্যাকেট বা ফোটনের স্রোত । আলোর গতিবেগ সাধারণত মাধ্যমের ঘনত্বের ব্যস্তানুপাতিক অর্থাৎ মাধ্যমের ঘনত্ব যত গাড় হবে আলোর গতিবেগ তত কম হবে। শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩x১০মিটার বা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ লক্ষ কিলোমিটার। 

এবার যদি আমরা কিছুক্ষণের জন্য এই নিবন্ধকে সহজে বোঝার স্বার্থে, আলোকে সাদা বা ব্ল্যাংক ফটোগ্রাফের (আলোকচিত্রের) স্রোত ধরে নিই তাহলে ব্যাপারটা বুঝতে সহজ হবে। আবার কল্পনা করে নাও যে স্রোতটির সাথে কোনো বস্তুর ধাক্কা লাগলে সেই বস্তুর ছবি ফটোগ্রাফে উঠে যায় এবং সেই স্রোত যখন আমাদের চোখে এসে পড়ে তখন আমরা সেই বস্তুটির ছবি দেখতে পাই। 

উপরের ছবিটা মন দিয়ে দেখ। প্রথমে আলোক উৎস থেকে আলো বা আমাদের কাল্পনিক সাদা ফটোগ্রাফের স্রোত গাছের দিকে যেতে শুরু করল এরপর কাল্পনিক স্রোতটি গাছের সাথে ধাক্কা খেল ও গাছের ছবি ফটোগ্রাফে ছাপা হয়ে গেল। এবার সেই স্রোত যখন প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে প্রবেশ করল তখন আমরা গাছের ছবি দেখে বুঝতে পারলাম যে অনতিদুরে একটি গাছ আছে। আশা করি ব্যপারটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছি । কিছু না বুঝতে পারলে কমেন্ট করতে পার , আমি আবার সহজভাবে বোঝাবার চেষ্টা করব। 

উপরের আলোচনাগুলো থেকে এইটুকু অন্তত পরিষ্কার হয়েছে যে , আলোর কোন বস্তুর ফটোগ্রাফ বা ছবি নিয়ে আমাদের চোখ পর্যন্ত আসতে ক্ষুদ্র হলেও কিছুটা সময় লাগে। বস্তু ও চোখের দূরত্ব খুব কম হলে সময়টা হয়তো খুব একটা বোঝা যায় না কিন্তু দূরত্ব যদি সুবিশাল হয় তাহলে সময়ের ব্যপারটা একটু হলেও বোঝা যায় । 

চলো আরেকটা ছোট্ট উদাহরণ দেখি , 

ধরো , ‘ক’ বিন্দু থেকে ‘খ’ বিন্দু পর্যন্ত আলো যেতে সময় লাগে পুরো ১ মিনিট বা ৬০ সেকেন্ড। অর্থাৎ আমাদের ভাষায় ‘ক’ বিন্দুর একটি ফটো ‘খ’ বিন্দুতে আসতে সময় লাগে ১ মিনিট, অর্থাৎ ১ মিনিট পর যখন ‘ক’ বিন্দুর ফটোটি ‘খ’ বিন্দুতে পৌঁছাবে সেটি হবে ১ মিনিট আগের ছবি। বুঝতে অসুবিধা হল? চলো তাহলে আরেকটু সহজ ভাবে বোঝার চেষ্টা করি। 

ধরো, ‘ক’ বিন্দুতে রাখা একটি খেলনা গাড়ির ফটো তুলে আমি ‘খ’ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা তোমার দিকে আলোর পিঠে চাপিয়ে প্রেরণ করলাম ঠিক সকাল ৯ টা বেজে ১০ মিনিটে । আমি কিন্তু মনে করে ফটোটার পেছনে “৯ঃ১০AM” লিখে রেখেছিলাম যাতে তোমার বুঝতে অসুবিধা না হয় । 

এবার যেহেতু , ‘ক’ বিন্দু থেকে ‘খ’ বিন্দু পর্যন্ত আলো যেতে সময় লাগে ১ মিনিট তাই , ঠিক সকাল ৯ টা বেজে ১১ মিনিটে তুমি সেই ছবিটা পাবে। মানে তুমি ৯ টা বেজে ১১ মিনিটে ৯ টা বেজে ১০ মিনিটে তোলা ছবিটা দেখবে অর্থাৎ তুমি ১ মিনিটে অতীতে দেখবে। 

আসলে আলোও কিন্তু কিছুটা একইভাবে কাজ করে । কোন বস্তুতে আলো পড়ে এবং সেই আলো যখন প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ে তখন আমরা সেই বস্তুর কিছু সময় অতীতের ছবি দেখি, কারণ বস্তু থেকে চোখ পর্যন্ত আলো আসতে খুব ক্ষুদ্র হলেও কিছুটা সময় তো লাগে। সঠিকভাবে বলতে কোন বস্তু থেকে আমাদের চোখ পর্যন্ত আলো আসতে যে পরিমাণ সময় লাগে সেইটুকু সময় অতীতে দেখি আমরা।

যেমন ধরো , আমার প্রতিবেশীর বাগানের লম্বা পেয়ারা গাছ থেকে যদি আমার চোখ পর্যন্ত আলো আসতে ২ সেকেন্ড (কাল্পনিক) সময় লাগে তাহলে আমি সেই গাছটিকে সবসময় ২ সেকেন্ড অতীতে দেখব। 

আশা করি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ । কোন বিষয়ে কোন প্রশ্ন বা কোথাও কিছু অসুবিধা থাকলে কমেন্ট করতে পারো। 

এবার চলো , আমাদের অতীতের দর্পণের কিছু প্রত্যাহিক জীবনে ব্যবহার দেখব – 

পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার এবং সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে আলো সময় নেয় প্রায় ১.৩ সেকেন্ড । নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পেরেছ আমি ঠিক কোনদিকে যাচ্ছি। আগের আলোচনাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে , রাত্রিবেলা যখন আমরা আকাশে চাঁদের দিকে তাকাই তখন আসলে আমরা ১.৩ সেকেন্ড আগেকার চাঁদকে দেখি। 

একইভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে প্রায় ৮ মিনিট , অর্থাৎ আমরা দিনের বেলায় যে সূর্যকে দেখি সেটা আসলে ৮ মিনিট আগের সূর্য। 

কি এবার বিশ্বাস হচ্ছে তো , অতীতের দর্পণে? আপাতত এখন আমাদের এইভাবেই সময়ের যাত্রা করতে হবে যতদিননা সত্যিকারের টাইম মেশিন আবিষ্কার হচ্ছে।

এবার তোমাদের আরেকটা মজার জিনিস জানাব- 

তুমি যদি পৃথিবী থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ আলোকবর্ষ দুরের কোনো গ্রহে দাঁড়িয়ে অকল্পনীয় শক্তিশালী একটি টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকাও তবে তুমি পৃথিবীর বুকে ডাইনোসরদের ঘোরাফেরা করতে দেখতে পাবে। 

জানি একটু হয়তো বুঝতে অসুবিধা হতে পারে , চিন্তা নেই আমি আছি তো , সহজ করে বুঝিয়ে দেব তোমাদের – 

প্রথমে জানতে হবে, আলোকবর্ষ কী?

আলোকবর্ষ হচ্ছে মিটার , কিলোমিটার , ফুটের মতোই একটি দৈর্ঘ্যের একক। আলো ১ বছরে যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে সেই দূরত্বকেই বলে ১ আলোকবর্ষ। ১ আলোকবর্ষ প্রায় ৯.৪৬x১০১২ বা ৯ লক্ষ ৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটারের সমান। কি বিশাল দূরত্ব! 

এবার আমরা যদি একটু খোঁজখবর লাগাই তাহলে জানতে পারব যে , পৃথিবীতে প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লক্ষ ও ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছরের মধ্যবর্তী সময়ে ডাইনোসরদের বসবাস ছিল। অর্থাৎ এই সময়ে আলো যতদূর যাবে সেই দূরত্বের কোন স্থানে যদি আমরা আমাদের অকল্পনীয় শক্তিশালী টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র বসিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকাই তবে আমরা পৃথিবীর বুকে ডাইনোসরদের ঘোরাফেরা করতে দেখতে পাবো।

ভেবে দেখো কি মজার ব্যাপার তাই না?

ফিচার ইমেজ সোর্স: Starwalk.space

পলাশ বাউরি
লেখক, শিক্ষার্থী ও প্রোগ্রামার। আমি বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে কলেজে পড়াশুনা করছি। এছাড়া আমি গল্প, কবিতা ও বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ প্রবন্ধ লেখালেখি করি। এছাড়া ফাঁকা সময়ে আমি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার তৈরি করতে এবং অন্যদের কোডে কন্ট্রিবিউট করতে পছন্দ করি।