জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ক্ষুদ্র উল্কার আঘাত

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বানানোর সিদ্ধান্ত ৩০ বছর আগে ঠিক হয়। প্রায় ২০ বছর ধরে এর নির্মাণ কাজ শেষে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ গত  ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখেপৃথিবী থেকে ১.৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে (L2 Point, Lagrange point) কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের সৌরজগতের অভ্যন্তর থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণযোগ্য ছায়াপথ, ছায়াপথের জন্ম ও বিবর্তন, এবং নক্ষত্র ও গ্রহসমূহের সৃষ্টি এবং এর মধ্যবর্তী সবকিছু বিষদ গবেষনা এবং জানার  জন্য এই টেলিস্কোপটির নির্মাণ।

ওয়েব টেলিস্কোপ।

এ বছর ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে  নাসা ওয়েবের তোলা  একটি ছবি প্রকাশ করেছে। ছবিটিতে ২৫৮ আলোকবর্ষ দূরের একটি নক্ষত্রের আলো ওয়েবের ক্যামেরায় ধরা পরেছে। এই নক্ষত্রটির নাম এইচডি-৮৪৪০৬ এটি উরসা মেজর নক্ষত্রপুঞ্জের একটি নক্ষত্র। এখন পর্যন্ত চালু হওয়া বৃহত্তম এবং সবচেয়ে জটিল মানমন্দির হিসাবে  মহাকাশে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ শুরু করার আগে ছয় মাসের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এজন্য তার যন্ত্রগুলিকে মহাকাশ পরিবেশে ক্যালিব্রেট করছে এবং এর আয়নাগুলিকে সারিবদ্ধ করছে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অংশীদার ESA (ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি) এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি (CSA) ঘোষণা দিয়েছে আগামী ১২ জুলাই, ২০২২-এ তার প্রথম পূর্ণ-রঙের ছবি এবং বর্ণালীবীক্ষণিক ডেটা প্রকাশ করবে।

উল্কার আঘাতপ্রাপ্ত সিগমেন্ট।

এই পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে একটি খবর প্রকাশিত হলো যেখানে বলা হয়েছে একটি ছোট পাথরের টুকরো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের প্রধান আয়নায় আঘাত করেছে। ধুলো-আকারের মাইক্রোমেটিওরয়েড দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি মানমন্দিরের ডেটাতে একটি লক্ষণীয় প্রভাব তৈরি করছে। কিন্তু মিশনের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা সীমিত করবে না বলে আশা করা যায়।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা বলেছে প্রাথমিক মূল্যায়নের পরে নাসার গবেষক দলটি খুঁজে পেয়েছে যে টেলিস্কোপটি এখনও এমন একটি স্তরে পারফর্ম করছে যা ডেটাতে একটি সামান্য সনাক্তযোগ্য প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সমস্ত মিশনের প্রয়োজনীয়তাকে ছাড়িয়ে গেছে।

নাসা বলছে, “ওয়েবের জীবনের শুরুর কর্মক্ষমতা এখনও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এবং মানমন্দিরটি যা অর্জনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল তা সম্পাদন করতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম”

বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া যায় যে C3 নামের প্রাথমিক মিরর সেগমেন্ট মাইক্রোমেটিওরয়েডের প্রভাবের শিকার হয়েছে। এটি ১৮টি বেরিলিয়াম-সোনার টাইলের মধ্যে একটি যা ওয়েবের 6.5m-প্রশস্ত প্রাথমিক প্রতিফলক তৈরি করে। নাসা রয়টার্স নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছে, মাইক্রোমেটিওরয়েড সেগমেন্টে একটি “ডিম্পল” বা টোল রেখে গেছে। মাইক্রোমেটিওরয়েড হলো একটি মহাকাশ কণা যা সাধারণত বালির দানার চেয়ে ছোট। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল নিয়মিতভাবে লক্ষ লক্ষ উল্কা এবং মাইক্রোমেটিওরয়েডের সংস্পর্শে আসে।

আমাদের বায়ুমণ্ডল একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর হিসাবে কাজ করে এবং বেশিরভাগ কণাকে বাষ্পীভূত করে। বিপরীতে, মহাকাশযান এবং টেলিস্কোপগুলিতে এই একই বায়ুমণ্ডলীয় বুদবুদ নেই, যা এই উল্কার প্রভাবগুলি এড়ানো প্রায় অসম্ভব করে তোলে।

মহাকাশের মধ্য দিয়ে জিনিসগুলি যে গতিতে চলে,  তাতে ক্ষুদ্রতম কণাগুলিও অন্য বস্তুর সাথে সংঘর্ষের সময় প্রচুর শক্তি সরবরাহ করতে পারে। উল্লেখ্য গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর চালু হওয়ার পর থেকে ওয়েব টেলিস্কোপ  চারটি ছোট মাইক্রোমেটিওরয়েড স্ট্রাইকের সম্মুখীন হয়েছে। তবে এই সাম্প্রতিক স্ট্রাইকের প্রভাব আগের চেয়ে বড়।

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার পল গেইথনার বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই জানতাম, জেমস ওয়েবকে মহাকাশে নানারকম প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে সূর্যের শক্তিশালী অতিবেগুনি রশ্মি, সূর্যের আধানযুক্ত কণা,গ্যালাক্সির বাইরে থেকে আসা মহাজাগতিক রশ্মি, এবং আমাদের সৌরজগতের মধ্যে মাইক্রোমেটিওরয়েড দ্বারা মাঝে মাঝে আঘাত। আমরা এই সব কিছু মাথায় রেখেই ওয়েবকে এমনভাবে ডিজাইন করেছি এবং তৈরি করেছি যাতে মহাকাশে নানা প্রতিকুল পরিবেশ মোকাবিলা করে  দীর্ঘসময় কাজ করে যেতে পারে।”

প্রকৌশলীরা বিকৃত হওয়া মিরর সেগমেন্টের অবস্থান সামঞ্জস্য করবে। কিন্তু তারা এটিকে সরাতে পারবে না। প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যেই সম্প্রতি প্রভাবিত সেগমেন্ট C3-এর জন্য এই ধরনের প্রথম সামঞ্জস্য সম্পাদন করেছেন। 

ছোটখাটো বিপত্তির মধ্যেও, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ তার প্রারম্ভিক লঞ্চের পর থেকে প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শীঘ্রই এটি এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল এবং অস্তিত্বে থাকা প্রথম ছায়াপথগুলির ভিতরে দেখতে ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। এই টেলিস্কোপ নির্মানে ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যায় হয়েছে। 

তথ্যসুত্রঃ  

James Webb telescope hit by micrometeoroid: NASA

James Webb Space Telescope hit by tiny meteoroid – BBC News



মন্তব্য

Leave a Reply