বইয়ের গল্পঃ এক্সোপ্লানেটের সাতকাহন

বইয়ের গল্পঃ এক্সোপ্লানেটের সাতকাহন

মহাকাশ বিজ্ঞান এবং মহাবিশ্ব নিয়ে তেমন কোন বই আমার বাসায় ছিল না। এই আক্ষেপ থেকে এমরান ভাইয়ের এক্সোপ্লানেটের সাতকাহন বইটা সংগ্রহ করা। মজার বিষয় হলো বইটায় মহাজাগতিক আলোচনার সাথে জীববিজ্ঞানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রয়েছে। আমার মতো জীববিজ্ঞানের ভক্তদের জন্য এটা বেশ চমৎকার একটা সারপ্রাইজ!

বইয়ের ব্যবচ্ছেদ

বইটাতে ১০টা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উপর তথ্যবহুল প্রবন্ধ রয়েছে। প্রথম প্রবন্ধ সুপারনোভাকে নিয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের এমন কোন পাঠক নেই যে সুপারনোভার কথা শুনে বিস্মিত হবে না ‌। সুপারনোভার সাথে যে কত ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িয়ে আছে তা আগে জানতাম না, প্রবন্ধটি পড়ার পরেই জানতে পেরেছিলাম। এই প্রবন্ধটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় আলোচনাগুলো ক্র্যাব নেবুলা, ক্যাসিওপিয়া সুপারনোভা এবং সিগনাস লুপকে নিয়ে করা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের যেকোনো পাঠক এগুলো পড়ে অবাক হতে বাধ্য।

এরপরের অধ্যায়টি হাবল স্পেস টেলিস্কোপকে নিয়ে, যাকে লেখক “পৃথিবীর অতন্দ্র প্রহরী” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই টেলিস্কোপের প্রধান অর্জনগুলো হলো সুপারনোভার সন্ধান, আমাদের নিকটবর্তী গ্যালাক্সি সমূহের সঠিক দূরত্ব পরিমাপ, ব্ল্যাকহোলের গবেষণায় গতি প্রদান ইত্যাদি। গবেষকেরা হাবল টেলিস্কোপের কল্যাণে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে প্রায় ১৫,০০০ গবেষণাপত্র তৈরি করেছেন।

হাবল টেলিস্কোপ। ছবিঃ New Scientist

পরবর্তী প্রবন্ধটি লালবাগের গ্রহ মঙ্গলকে নিয়ে। এখানকার বায়ুমন্ডলীয় চাপ পৃথিবীর প্রায় ০.৬ গুণ। মঙ্গলে প্রাপ্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান গুলোর একটি হলো পারক্লোরেট সল্ট, যার ভেতরে যে পরিমাণ শক্তি ও অক্সিজেন সঞ্চিত আছে তা রকেট প্রপালশনের জন্য যথেষ্ট। এর পাশাপাশি মঙ্গলের পৃষ্ঠে মিথেন পাওয়া গেছে, যা বিজ্ঞানীদেরকে বেশ কৌতুহলী করে তুলেছে। আর এসব জটিল বিষয়কে খুবই সহজে লেখক উপস্থাপন করেছেন বইটির তৃতীয় প্রবন্ধটিতে।

চতুর্থ প্রবন্ধটি এই পৃথিবীতে এলিয়েনকে নিয়ে যার আটটি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম পা, তিনটি হৃদপিণ্ড, উন্নত ডিফেন্স মেকানিজম, শরীরের আকৃতি বদলে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এতক্ষণে কি কিছু অনুমান করতে পেরেছেন?

পরবর্তীতে একটি তিমির ফসিল নিয়ে কথা বলা হয়েছে। তিমিটি চতুষ্পদী, ৪ মিটার লম্বা এবং ৬০০ কেজি বিশিষ্ট একটি বিশাল প্রাণী ছিল। এই আবিষ্কারকে অনেকে বিবর্তনের একটি প্রমাণ মনে করছেন। এই ধারণা পোষণকারীদের মতে, আজকের তিমিদের পূর্বপুরুষরা মাংসাশী ছিল, যারা একইসাথে স্থলে ও জলে শিকার করতে পারত।

ষষ্ঠ প্রবন্ধটি পুরানো অণুজীবদেরকে নিয়ে। প্রাচীনকালের বেশকিছু অণুজীব দুই মেরুর বরফের পার্মাফ্রস্টে সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পারমাফ্রস্টের বরফ মিশ্রিত মাটি গলে যেতে পারে। তখন ঐ মাটি ও বরফ থেকে প্রাচীন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস অবমুক্ত হতে শুরু করবে। হয়ত বা অণুজীবগুলো পরবর্তী যুগে নতুন কোনো মহামারীর কারণ হবে।

পরবর্তীতে “অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স” নিয়ে একটি প্রবন্ধ চোখে পড়লো। প্রতিবছর শুধু আমেরিকাতেই ২.৮ বিলিয়ন মানুষ এসব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্ট প্যাথোজেন দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যারা বিভিন্ন ধরনের অটোইমিউন রোগে ভুগছেন, তাদেরকে এ ধরনের জীবাণু সহজেই আক্রমণ করতে পারে। আমাদের দেশে ডিস্পেন্সারিতে বসে থাকা অদক্ষ লোকদের কারণে এ সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কারণে ব্যাকটেরিয়ারা এসব ওষুদের কার্যকারিতার বিরুদ্ধে অধিক শক্তিশালী হচ্ছে

অষ্টম প্রবন্ধটি এমন এক অণুজীবকে নিয়ে লেখা হয়েছে যেটি ভাইরাসকে ধ্বংস করতে পারে। বিজ্ঞানীরা উত্তর আমেরিকার সমুদ্র উপকূলে দুটি বিশেষ প্রজাতির এককোষী অণুজীবের সন্ধান পেয়েছেন, যারা ভাইরাসের উপর প্রভাব বিস্তার করে তাদেরকে ধ্বংস করতে পারে। এদেরকে সাধারণভাবে ভাইরোফাজ বলা হচ্ছে।

জীববিজ্ঞানের  আলোচনা তো অনেক হলো। এবার লেখক সেখান থেকে বেরিয়ে এক্সোপ্লানেটে ঢুকলেন। এবারে প্রবন্ধে এক্সোপ্লানেটের অস্তিত্ব, শনাক্তকরণ এবং কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলা হয়েছে। একদম শেষ প্রবন্ধে “ওইমুয়ামুয়া” নামের এক মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে আলোচনা চোখে পরলো। এটা আসলে কী? এ ব্যাপারে আমি কিছু বলবো না। যদি বইটা পড়েন তাহলে স্বয়ং লেখকই আপনাকে সেই গল্প শোনাবেন।

তো বইটা তো মোটামুটি এগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

মতামত ও সমালোচনা

বইটা আসলে কেমন লাগলো? আমার কাছে ভালোই লেগেছে। কারণ লেখক এখানে অনেক জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। আর সাধারণ বিজ্ঞান পাঠকদের কাছে বইটা নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। আরেকটা কথা, “বিজ্ঞান জনপ্রিয়তাকরণ” বলে যে বিষয়টা বিজ্ঞানের দরবারে ঘুরঘুর করে, এই বইয়ে সে বিষয়টার যথার্থ প্রকাশ ঘটেছে।

এবার আসি কিছু সমস্যা ও ত্রুটি ভিত্তিক কথাবার্তায়। প্রতিটি প্রবন্ধে গবেষণাভিত্তিক তথ্য, যুক্তিভিত্তিক বর্ণনা এবং ভাবিয়ে তোলার মতো আলোচনার পরিমাণ আরও বাড়ানো উচিৎ ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বানানের ত্রুটি বেশ চোখে পড়েছে।

বইয়ের মাঝে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয় চোখে পড়েছে, যা ছিল সত্যিই হতাশাজনক

এছাড়াও কিছু তথ্য-ভ্রান্তিও ছিল। যেমনঃ ৩৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, অক্টোপাস ভালগারিসের দেহে ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি নিউরন থাকে। কিন্তু ৩৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, অক্টোপাস ভালগারিসের দেহে ১০ মিলিয়ন নিউরন থাকে। এ ধরণের অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য সত্যিই হতাশাজনক। আবার ৬২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, সুডোমোনাস অ্যারিজোনোসা প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া কোষপ্রাচীরের পাম্পের মাধ্যমে ফ্লোরোকুইনোলন, বিটা ল্যাকটাম, ক্লোরামফেনিকল গ্রুপের ব্যাকটেরিয়াগুলোকে বাইরে বের করে দেয়। আসলে ব্যাকটেরিয়াদেরকে নয়, বরং অ্যান্টিবায়োটিককে বের করে দেয়।

তো, “এক্সোপ্লানেটের সাতকাহন” বইটার রিভিউ এ পর্যন্তই। সবশেষে একটা কথাই বলব, বইটি সংগ্রহ করে পড়া শুরু করুন। একজন পাঠক হিসেবে আমার মতো আপনিও বইটি পড়ে উপকৃ্ত হবেন! Happy Reading!

তাহসিন আলম উৎস
লিখতে লিখতে শিখতে চাই। বর্তমানে বিজ্ঞান ব্লগের পাশাপাশি সায়েন্টিয়া সোসাইটি, বিজ্ঞান পত্রিকা, হিগজিনো সায়েন্স সোসাইটি এবং বোসন বিজ্ঞান সংঘ এর সাথে যুক্ত আছি। আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রতিটা সমাজে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের জয়ধ্বনি বাজবে। আর এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানের একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।