যার নামে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নাম রাখা

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি তখন তার বাসভবনে বসে আছেন। আলাপ চলছে একজনের সাথে। ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করতে ভালই লাগছে মি. প্রেসিডেন্টের। আর হবে নাই বা কেন? তিনি তার প্রিয় বন্ধু, আলাপ-আলোচনার সঙ্গী। একজন জ্ঞানী ব্যক্তিত্বও বটে। হঠাৎ ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপকালে একসময় উঠে আসে টেক্সাসে মৌখিক ইতিহাসচর্চার আলোচনা। তখন সে ভদ্রলোকের চোখে দেখা যায় আশার ঝিলিক। আবেগঘন কন্ঠে বললেন,

“আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন শুধুমাত্র অর্জনের জন্য নয় বরং দেশেরও যাতে উপকার হয় তাও নিশ্চিত করবো।”

ভদ্রলোকের সে কথায় জন এফ কেনেডি খুশি হয়েছিলেন কি না জানা নেই তবে ভদ্রলোকটি তার সে কথায় পুরোপুরি সফল হয়ে সমগ্র জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের আনন্দে ভাসিয়ে ছিলেন পরবর্তীতে তা বলাই বাহুল্য।

প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এবং জেমস ই. ওয়েব।

নিজ বন্ধু জন এফ কেনেডির সাথে আলাপরত সেই ভদ্রলোকটিই হচ্ছে জেমস ই. ওয়েব। যার নামেই নামকরণ হয়েছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের। আসুন জেনে নিই সে ভদ্রলোকটি সম্পর্কে। সাধারণ হতে অনন্য অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার গল্প।  জেমস ওয়েবের পুরো নাম জেমস ই. ওয়েব বা জেমস এডুইন ওয়েব। ১৯০৬ সালের ৭ অক্টোবর তিনি নর্থ ক্যারোলিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন সেখানকার একটি পাবলিক স্কুলের অধীক্ষক। ছোটবেলা থেকে জাহাজের পাইলট ও তাদেরই একজন হওয়ার প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা  ছিল তার মধ্যে। এর আরেকটি কারণ ছিল যে, তার ভাই হেনরি ওয়েবও ছিল জাহাজের একজন করপস অফিসার। তাই তিনি সেখানকার সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে নিয়োগ লাভের প্রচেষ্টা চালান এবং সেখানকার পাইলট হিসেবে তিন বছর ১৯৩০-১৯৩২ সাল পর্যন্ত ভূমিকা পালন করেন। সেখান থেকে ফিরে আইন নিয়ে পড়াশুনা করেন জর্জ ওয়ামিংটন আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পড়াশুনা শেষে কৃতিত্বের সঙ্গে লাভ করেন জেডি ডিগ্রি যাকে ডক্টরস অব ল বা জুরিস ডক্টরস ডিগ্রি বলা হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি বিয়ে করেন এবং ব্যক্তিগতজীবনে তিনি ছিলেন দুই ছেলের জনক। 

মূলত ওয়েবের জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে যে বিষয়টা বারবার সবাইকে নাড়া দেয় সেটা হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে তার বহুমাত্রিক দক্ষতা। ১৯৩২-১৯৩৪ সাল পর্যন্ত যিনি ছিলেন নর্থ ক্যারোলিনার মার্কিন প্রতিনিধি এডওয়ার্ড পাউ এর সেক্রেটারি, নর্থ ক্যারোলিনার গভর্নর গার্ডনারের সহকারী, আবার কখনো বাজেট ব্যুরোর পরিচালক, স্পেরি গাইরোস্কোপের কোম্পানিতেও তিনি পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সবশেষে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান তাকে স্টেট ডিপার্টমেন্টে আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এসকল বহুমাত্রিক দক্ষতার পাশাপাশি তার কর্মদক্ষতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক গভর্নর ও রাষ্ট্রপতির প্রিয়পাত্র হওয়ায় তিনি সে সময় পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কেও বেশ ভালো জ্ঞান রাখতেন।

দেশপ্রেমিক নাগরিকদের সম্ভবত একটি দায়িত্বই হল যে প্রশাসনই ক্ষমতায় আসুক নিজ দেশের জন্য কাজ করে যাওয়া। তাই ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রুম্যান প্রশাসনের বিদায় ঘণ্টা বাজার পর জেমস ওয়েব ওয়াশিংটন ছেড়ে ওকলাহোমা সিটিতে একটি অয়েল কোম্পানিতে কাজের জন্য ছুটে যান। ১৯৬১ সালে ক্ষমতার পালাবদল হয়ে আবার যখন ডেমোক্র্যাটরা হোয়াইট হাউজে আসে তখন জেমস ওয়েব এবার পেলেন গুরু দায়িত্ব। আর তা হলো নাসায় প্রশাসক হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব পালন। দায়িত্ব পাবার পরপরই ওয়েব নাসাকে ঢেলে সাজানোর দিকে মন দেয়। তিনি সে সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৬১ সালে ওয়াশিংটনে নতুন প্রতিষ্ঠিত নাসার হেড কোয়ার্টারে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এর সাথে জেমস ই. ওয়েব।

নাসায় বিজ্ঞান গবেষণার উপর সবসময় জোর দিয়েছেন ওয়েব। বিভন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে এ বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয় তাই সেখানে গবেষণাগার তৈরি ও ফেলোশিপের ব্যবস্থাও হয়েছিল তার হাত ধরে। তার সময়ে নাসা ৭৫টির মতো মিশন হাতে নেয়। এই মিশনগুলোর মাধ্যমে জ্যেতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন অংশ নিয়ে গবেষণা করা হয়। অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল স্যাটেলাইট ও সোলার অবজারভেটির মতো প্রজেক্ট তৈরি হয় জেমস ওয়েবের নেতৃত্বে। শুধুমাত্র তার বড় বড় অবদানগুলির কথাই বললাম। এছাড়াও আরো অসংখ্য অবদান তো বাকিই রইলো। এছাড়াও নাসায় কাজ করা ছাড়াও তিনি পররাষ্ট্র দপ্তর সহ আরো যেখানে যেখানে কাজ করতেন সেখানে বিভিন্ন সেক্টরে তিনি যে সব ধরণের অবদান রেখেছিলেন সেগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম।

জেমস ওয়েব তার গবেষণার কাজকে এগিয়ে নিতে তিনটি বই রচনা করেন যে বইগুলোতে ম্যানেজমেন্ট ম্যানপাওয়ার (জনশক্তি) সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বই তিনটি হলো যথাক্রমে : Government Manpower for Tommorrow’s Cities (১৯৬২), Space Age Management (১৯৬৮), Management Leadership and Relationship (১৯৭২)। দেশের প্রশাসন ও তার অভ্যন্তরের অনেক প্রথিতযশা মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে তার সকল সেক্টরে দক্ষতা ছিল। আর এ জন্য তিনি ৩২ টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হতে সম্মানসূচক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এছাড়াও আরো সম্মাননার মধ্যে রয়েছে, প্রেসিডেন্ট এওয়ার্ড ফর ফ্রিডম, স্টেট এওয়ার্ড ফ্রম নর্থ ক্যারোলিনা ইত্যাদির মত বাঘা বাঘা পুরস্কার। 

তার ব্যক্তিগতজীবনের আরেকটি দিক এ ফাঁকে উল্লেখ করতে চাই। আর তা হলো তার সরলতা।প্রেসিডেন্ট কেনেডি যখন তাকে নাসায় কাজ করতে বলেছিলেন তখন তিনি বলেন যে, “আমি কোন বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী নই। আমার অভিজ্ঞতা ট্রুম্যান প্রশাসনে আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার।” আরো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “নাসার এ পদের জন্য আমি সেরা লোক নই। এ পদে কোন বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলীকে নেওয়া যেত।” নিজকে অন্যান্য সাধারণ কর্মচারীদের মত মনে করার দায়িত্ব তার এই অনুভূতিই তাকে করেছে মহান।  এবারে আসলেই টেলিস্কোপ নিয়ে তার ভাবনায়। বলে রাখা ভাল, নাসায় জেমস ওয়েবের নিযুক্ত হবার পর পৃথিবীর মানুষ প্রথম মহাকাশের ছবি দেখতে পায়! তার এই উদ্যোগ পরবর্তীতে মঙ্গল ও শুক্র গ্রহের দিকে গবেষণার করার প্রতি বিজ্ঞানীদের আগ্রহী করে তোলে। তার উদ্যোগেই শুরু লার্জ স্পেস টেলিস্কোপ তৈরির কাজ যা হাবল টেলিস্কোপ নামে পরিচিত লাভ করে।

হাবল টেলিস্কোপ।

আপনারা কি জানেন, অ্যাস্ট্রোনমির অন্যতম যুগান্তকারী উদ্যোগ কোনটি? হ্যাঁ, সেটা হলো চাঁদে প্রথম মানুষের প্রেরণ। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ যেটার জন্য স্বপ্ন দেখে এসেছে। স্বপ্ন দেখেছিল যে তারা একসময় চাঁদে পা রাখবে। ১৯৬০-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত জেমস ওয়েবের দায়িত্ব পালনকালে চাঁদে আমেরিকানদের পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের পর তিনি অবসরে যান নাসায় তার দায়িত্ব থেকে। কিন্তু ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল পরের বছরই। চাঁদে প্রথম পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই।

জেমস ই. ওয়েব এর নামে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নাম রাখা হয়।

পরিশেষে বলব, জেমস ওয়েব একজন প্রথিতযশা ও মানবিক ব্যক্তিত্ব। দেশের সকল সেক্টরে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কাজের প্রতি ভালবাসা ও স্বপ্ন থাকলে সবকিছুই সম্ভব। জন এফ কেনেডির সাথে সাক্ষাৎকারে দেশের জন্য কাজ করার যে ওয়াদা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন তা তিনি প্রতিটি ধাপে পূরণ করেছিলেন। এমনকি অবশেষে তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে এর জন্য। মৃত্যুর পূর্বে পারকিনসন নামক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর ৮৫ বছর বয়সে তিনি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে মারা যান। সালটি তখন ১৯৯২ সালে ২৭ মার্চ।  আলোচনা খুব বড় করতে চাইনা। বরং চাই সংক্ষিপ্ত আলৈাচনা করেই যেন পাঠকদের তাকে জানার তৃষ্ণাটা বাড়িয়ে দিতে পারি। আমি সেই কাজে কতটুকু সফল হয়েছি কিনা জানি না। তবে সবার হয়তো জানা আছে যে, সদ্য যে টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশের প্রাচীন ছবিগুলো তোলা হয়েছিল তার বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি হিসেবে সেই টেলিস্কোপটি এখন জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ নামে পরিচিত। যাকে বলা হচ্ছে মানব প্রযুক্তির উন্নতির মাইলস্টোন। যার নামে নামকরণ এ টেলিস্কোপের সেই জেমস ওয়েব এর মাধ্যমে তিনি সকল অ্যাস্ট্রো লাভারসের হৃদয়ে সফল ব্যক্তিত্ব হয়েই বেঁচে থাকবেন ।

তথ্যসুত্রঃ

লেখাটি 181-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 903 other subscribers