বিজ্ঞান কল্পগল্প: অতিথি

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

এক.

রাত দু’টা।

বাসার ছাদের চিলেকোঠায় বসে নানা এলোমেলো ভাবনা ভেবে চলেছি। অনেকদিন ধরেই রাইটার্স ব্লকে ভুগতে থাকায় লেখালেখিটাও একটু নেতিয়ে পড়েছে। তাই নতুন কিছু আইডিয়ার কথাও ভাবছিলাম। আবছা চাঁদের আলোয় কেমন যেন একটা নেশার মতো লাগছে। ছাদবাগানের হাস্নাহেনার মাতাল করা ঘ্রাণ সেই নেশার ঘোরকে যেন আরও বাস্তব করে তুলেছে। সবমিলিয়ে লেখালেখির ভাবনার জন্য চমৎকার এক পরিবেশ।

আমি পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও লেখালেখি করি হরেক রকম বিষয়ে। সর্ববিদ্যাবিশারদ শব্দটা যেদিন শুনেছি সেদিন থেকেই লেখালেখির জগতে সর্ববিদ্যাবিশারদ হতে চেয়েছি। আর তাই গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের বই, সায়েন্স ফিকশন কোনো কিছু লেখা বাদ দেইনি। আসলে মাথায় এত আইডিয়া কিলবিল করে যে সেগুলো লিখে না ফেলা পর্যন্ত মনে মনে শান্তি পাই না। আজও কিছু আইডিয়া কিলবিল করছে। তবে এই মোহময় মুহুর্তে কেবল কবিতাই আসছে। কিন্তু কবিতা শুনাবো কাকে? শুভ্রা তো দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরের ভিতর ঘুমাচ্ছে। কি আর করা! ওকে উদ্দেশ্য করেই মোবাইলের নোটে দু লাইন লিখেই ফেললাম-

আকাশ থেকে জ্যোস্না ঝরে, দরজা কপাট খুল,

আয় দেখে যা জোনাকগুলো, আনন্দে মশগুল!

বাহ, শুরুটা বেশ ভালোই হল। বাস্তব ঘটনা থেকে লিখে ফেলা কবিতা। জ্যোস্না আছে, দরজা কপাট বন্ধ, জোনাক আছে। এক মিনিটি! জোনাক তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল! দেখি একটু এদিক সেদিক কোথাও জোনাক দেখতে পাওয়া যায় কিনা। হ্যাঁ বাগানের গাছের ফাঁকে কিছু জোনাক দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা জোনাকের রেশ ধরেই এবার পরের লাইনে যাওয়া যাক-

জোনাকগুলো পুতির মতন, মালা গেঁথে যায়,

মনের মাঝে কথার মালা, আনন্দে লুটায়।

আরে জোনাকগুলো তো দেখি মালার মতই জড়ো হচ্ছে। দারুণ! এবার এর পরের লাইনে যাওয়া যাক-   

তেপান্তরের জ্যোস্না ঝরে, আমার বাগান ধারে,

ঝিলমিলিয়ে ওঠে তারা, আমার প্রাণের সুরে।

আরে আমার বাগানেও দেখি আলো ঝলমল করে উঠেছে। বুঝলাম না। প্রকৃতি কি আমার কথামতো কাজ করা শুরু করলো, নাকি আমিই প্রকৃতি অবলোকন করে লেখাগুলো লিখে ফেলছি? কেমন যেন একটা ঘোরবন্দী হয়ে গেলাম বলে মনে হল। কিন্তু এত রাতে বাগানে এমন আলো ঝলমল করে ওঠার কারণটাও তো পর্যবেক্ষণ করে দেখা দরকার। আগুন টাগুন এসে পড়লো কিনা আবার। আমি ধীর পায়ে আলোর উৎসের দিকে এগুতে থাকলাম। 

আলোক উৎসটিকে আমি বাগানের হাস্নাহেনা গাছের নিচে খুঁজে পেলাম। কাছে যেতেই দেখি এক থেকে দেড় হাত সাইজের একটা জিনিস থেকে আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। জিনিসটা দেখতে ক্যাপসুল জাতীয় ওষুধের মত তবে এর এক প্রান্তে লেজের মত একটা বস্তুও নড়তে চড়তে দেখা যাচ্ছে। বস্তুটি ঠিক কি তা আমি অনুমান করতে পারছিলাম না। ঘুড়ি নাকি? এখন তো আলোযুক্ত নানা প্রকারের ঘুড়ি আকাশে উড়ে বেড়াতে দেখা যায়। কিংবা ড্রোন জাতীয় কিছু কি হতে পারে? কিংবা এলিয়েন? এই মুহুর্তে এমনটা হবার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে। এটা যদি সত্যিই এলিয়েন হয় তাহলে তো আমি বিখ্যাত হয়ে যাবো। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত কেউই এলিয়েন দেখতে পায় নি। আমি হব পৃথিবীতে এলিয়েনের প্রথম আবিষ্কর্তা। ঠিক এন্টনি ভ্যান লিউয়েনহুকের মতো, যিনি প্রথম সচক্ষে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে অণুজীবকে দেখতে পেয়েছিলেন। বেশ মজার হবে ব্যাপারটা।

কিন্তু এখন আমার কি করা উচিৎ? শুভ্রাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবো নাকি একাই এই এলিয়েনের সাথে বাতচিত করবো? আমি কি ওর কথা বুঝবো, কিংবা ও আমার কথা? আবার এটা যদি ক্ষতিকর এলিয়েন হয় তাহলে তো আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, তখন আমি কি করবো? এ কথা ভাবতে ভাবতে আমি নিরাপত্তার জন্য পাশ থেকে একটা লাঠি হাতে তুলে নিলাম। এরপর লাঠিটি দিয়ে আমি ক্যাপসুলটাকে একটু খোঁচা দিলাম। খোঁচা খেয়ে ক্যাপসুলটি হাতখানেক গড়িয়ে গিয়ে থেমে গেল। আর পরক্ষণেই হঠাৎ করে এর একটা অংশ খসে পড়ে গেল। আমি তখন কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম।

আমার লাঠির গুঁতোয় আঘাত পেয়ে এটা এখন আবার আমার দিকেই তেড়ে আসবে কিনা ভাবতে ভাবতেই দেখতে পেলাম ক্যাপসুলের ভাঙ্গা অংশ থেকে দুটো ছোট আকারের বস্তু বের হয়ে এলো। আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। জিনিসগুলো আকারে ছয় ইঞ্চির মতো হবে। একটা ছোট লাঠির মাথায় কিছু কাপড় বেঁধে দিলে দেখতে যেমন লাগে অনেকটা তেমন, তবে মোটের উপর মাথাটা ষড়ভুজ আকৃতির বলেই মনে হচ্ছে। আর নিচ দিকে ঘাসফড়িং এর পায়ের মতো চোখা পা রয়েছে। ওগুলো দিয়েই সুড়সুড় করে ওরা এগিয়ে আসছে। কিন্তু এদের মাথায় কোনো চোখ টোখ দেখা যাচ্ছে না। হতে পারে পুরো মাথাটাই হয়তো চোখের কাজ করে, ঠিক মাছির মতো। সবলিমিয়ে এগুলোকে ছোটখাটো পোকার মতই মনে হচ্ছে। কিন্তু এরা উপকারী নাকি অপকারী তা বুঝা যাচ্ছে না। আমাকে সতর্ক থাকতে হবে।    

আমি লাঠি হাতে নিয়ে সতর্ক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি দেখলাম আমার দিকে কিছুদূর এগিয়ে আসার পর প্রায় মিটার দুয়েক দূরে এসে পোকা দুটো থমকে গেল। আমি তখন সাহস করে পোকাগুলোর দিকে একটু এগিয়ে যেতেই ওরা একটু পিছিয়ে গেল। আবার আমি একটু পিছিয়ে যেতেই ওরা আমার দিকে এগিয়ে এলো। তবে প্রতি ক্ষেত্রেই ওরা আমার সাথে দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে বলেই আমার মনে হল। এটা দেখার পর এদেরকে আমার বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী বলেই মনে হল। আমি ওদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চেষ্টা শুরু করলাম। 

প্রথমে আমি বাংলায় তারপর ইংরেজিতে এবং হিন্দিতে ওদের বলতে লাগলাম, হ্যালো, আমি শুভ্র। তোমাদের নাম কি? তোমরা কোথা থেকে এসেছো?  

দেখলাম ওরা আমার কথার জবাবে মাথা দুলিয়ে কিচির মিচির শব্দ করে কি যেন বুঝাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওদের কথার আগা মাথা কিছুই আমি বুঝতে পারলাম না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ প্রাচীন গুহাবাসীদের কথা মাথায় চলে এলো। তারা গুহার দেয়ালে চিত্র এঁকে যেভাবে নানা জিনিস বুঝাবার চেষ্টা করতো তেমন করলে কেমন হয়? ভাষায় কাজ না হলেও চিত্রকলায় তো কাজ হতে পারে। কাগজে ছবি এঁকে এদের বুঝাতে হবে। কিন্তু এদের কাগজের সামনে নিয়ে যাবো কিভাবে? হ্যাঁ ওরা তো সবসময় আমার থেকে দুই মিটার দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আবারও এক বুদ্ধি বের করলাম। আমি পিছন দিকে পিছাতে থাকলাম। দেখলাম ওরাও আমার সাথে দুই মিটার দূরত্ব বজায় রেখে এগুতে থাকলো। সূতরাং, এই বুদ্ধিতে কাজ হয়ে গেল। এভাবে এগুতে এগুতে ছাদে থাকা চেয়ার টেবিলের কাছে আমরা চলে এলাম। টেবিলের এক প্রান্তে আমি একটি চেয়ারে বসে কাগজ কলম হাতে তুলে নিলাম। কিন্তু এদেরকে টেবিলের উপর উঠাবো কি করে এ কথা ভাবতে ভাবতেই দেখি ওরা টুক করে টেবিলের উপর উঠে বসে আছে। তার মানে এরা আমার উদ্দেশ্য ঠিকই বুঝতে পেরেছে। বুদ্ধিমান এলিয়েন বটে!

দুই.

রাত তিনটা। পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। শহরের এক কোনায় এক বাড়ির ছাদে জেগে আছে কেবল তিনজন। এক টেবিলের এক প্রান্তে আমি আর অপর প্রান্তে ভিনগ্রহবাসী দুটো এলিয়েন। কি চমৎকার মহাজাগতিক এক ব্যাপার! ভিন্ন গ্রহের দুটি প্রাণীর সাথে এক পৃথিবীবাসী এখন আলাপচারিতা করবে। এ যেন মানবজাতির জন্য এক ঐতিহাসিক মূহুর্ত হতে চলেছে।   

কিন্তু কাগজে কি আঁকবো? প্রথমেই তো নাম, ধাম, পরিচয় এসব আলাপ দিয়েই শুরু করতে হয়। কিন্তু কাগজে এঁকে এটা কিভাবে বলা সম্ভব? সারা জীবন জীববিজ্ঞান ফাঁকি দিয়ে এসেছি। জীববিজ্ঞানকে কেবল মুখস্তবিদ্যা হিসেবেই গণ্য করেছি আর জীববিজ্ঞানের ছবি আঁকাকে ভয় পেয়েছি সবচেয়ে বেশি। এখন জীবনের এই পর্যায়ে এসে এই ধরণের অভিনব জীবের পাল্লায় পড়ে চিত্রকলাই যে অন্ধের যষ্ঠি হবে সে কথা কি ভেবেছিলাম কখনও?

কি করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। কোথায় যেন দেখেছিলাম যে পৃথিবী থেকে একবার পাইওনিয়ার নামের একটি মহাকাশযান মহাশূণ্যে পাঠানো হয়েছিলো যেটিতে এই পৃথিবী, পৃথিবীর মানুষ আরো কি কি সাংকেতিক চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়েছিলো যাতে করে কোনো উন্নত বুদ্ধিমান প্রাণী সেই মহাকাশযানের সংস্পর্শে এলে তারা যেন সেই চিত্রটি দেখে পৃথিবী এবং এতে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পায়। সেই ছবির অবয়ব কিছুটা মাথায় আছে। তাই দিয়ে যদি কিছু হয়। আঁকিবুঁকি তো পারি না, তারপরও মনে মনে পাবলো পিকাসো আর জয়নুল আবেদিনের নাম স্মরণ করে কলম ঘুরানো শুরু করলাম। কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং এর মতো করে হলেও কিছু একটা দাঁড়ালো বলে মনে হল। শুভ্রা এই ছবি দেখলে নিশ্চই হেসে কুটিকুটি হয়ে যেত।

যাক, ছবিটা আমি এলিয়েনদের দেখার জন্য তাদের কাছে ঠেলে দিলাম। এবার ওরা নিশ্চই ছবিগুলো দেখে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে বুঝতে পারবে। ওরা ছবিটা দেখে নিজেদের মধ্যে কিচির মিচির করে কি কি যেন বললো। তারপর ওদের অঙ্গভঙ্গি দেখে আমার মনে হল ওরা যেন আমার কাছে কলম আর কাগজ চাইছে। আমি কলম আর কাগজ ওদের কাছে এগিয়ে দিতেই ওরা দুজন দুটা কলম নিয়ে আমার মতই এবড়ো থেবড়োভাবে ঘষাঘষি করে কাগজের উপর আঁকিবুঁকি শুরু করে দিল। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ওদের একজন আমার আঁকা ছবিটাকেই নকল করার চেষ্টা করছে।

শুধু আমার ছবিতে যেখানে আমি মানুষের ছবি এঁকেছি সেখানে ওদের নিজেদের ছবি বসিয়ে দিয়েছে। আর আরেকজন ভিন্ন একটা ছবি এঁকেছে যেখানে যেটিতে ওরা যে ক্যাপসুলের মত বাহনটা নিয়ে এসেছে সেটির ছবি এঁকেছে আর ছবির পাশে ১, ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪ সংখ্যাগুলো লিখেছে। এগুলো দিয়ে ওরা কি যে বুঝাতে চাইলো আমি তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। মাথা চুলকে আমি ভাবতে লাগলাম কি করা যায়। শুভ্রাকে ডাকা ছাড়া আর তো কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। ও জীববিজ্ঞানের তুখোর মেধাবী ছাত্রী ছিল। এখন জীববিজ্ঞানেরই শিক্ষক। ওই পারবে এই ছবির মর্মার্থ খুঁজে বের করতে আর এই এলিয়েন দুটোকে শনাক্ত করতে। এতক্ষণে যেহেতু বুঝে গেছি যে এরা কোনো ক্ষতি করবে না তাই ওদেরকে সেখানে রেখে আমি শুভ্রাকে ঘুম থেকে জাগাতে যাই। শুভ্রাও এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাক। 

তিন.

রাত চারটা। আমি ঘরে গিয়ে শুভ্রাকে ডাক দিলাম, শুভ্রা, এই শুভ্রা, ওঠো।

শুভ্রা আমার ডাকে হকচকিয়ে ঘুম থেকে উঠে বললো, কি হয়েছে?

আমি বললাম, ছাদে চলো। দেখবে আমাদের বাসায় কোন অতিথি এসেছে।  

শুভ্রা বললো, এতো রাতে কে আসবে? তাও আবার ছাদে?

আমি বললাম, উফ বেশি কথা বলার সময় নেই। আগে ছাদে চলো।

শুভ্রা আমার টানাটানিতে ছাদে উঠে এলো। আমি ওকে নিয়ে ছাদের সেই টেবিলের কাছে আসতেই অবাক হয়ে দেখি এলিয়েন দুটো নেই। আমি শুভ্রাকে বললাম, এই তো, এই টেবিলের উপরই ওরা এতক্ষণ বসে ছিল।

শুভ্রা জিজ্ঞেস করলো, কারা?

আমি বললাম, দুটো এলিয়েন। আর ওই তো ওইখানে হাস্নাহেনা গাছের নিচে ওদের স্পেসশিপটা পড়ে ছিল। চলো দেখবে।  

আমি শুভ্রাকে নিয়ে হাস্নাহেনা গাছের নিচে গিয়ে দেখি সেখানে ওই ক্যাপসুলটিও আর নেই। তাজ্জব ব্যাপার! কোথায় গেল ওরা? শুভ্রাকে দেখে পালিয়ে গেল নাকি? উহ কি বিশাল ভুল হয়ে গেল। এবার ওদের কোথায় পাই?

শুভ্রা ছাদে এসে কোনো কিছু দেখতে না পেয়ে আমাকে বললো, আচ্ছা অনেক হয়েছে এখন চলো, ঘুমুতে যাবে।

আমি বললাম, ঘুমুতে যাবো মানে? একটু আগে কি এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেল তুমি জানো? পৃথিবীতে এই প্রথম একজন মানুষ একটি এলিয়েনের সাক্ষাৎ পেয়েছে, তাদের সাথে কথা বলেছে। আর সেই মানুষটি হলাম আমি।

শুভ্রা বললো, আচ্ছা বাবা, বুঝেছি তো। সায়েন্স ফিকশন লিখতে চাও তো? লিখো। কিন্তু তার জন্য সেটা কি বাস্তবেও প্রমাণ করতে হবে নাকি? এখন অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘরে চলো। কাল আবার সকাল সকাল উঠতে হবে।

আমি বললাম, বিশ্বাস করো শুভ্রা। এইখানে, ঠিক এইখানে এই টেবিলের উপর ওরা বসে ছিল। আমার কথা বিশ্বাস না করলে নাও এই কাগজগুলোতে তার প্রমাণ দেখো। আমি টেবিলের উপর রাখা কাগজগুলো শুভ্রার কাছে এগিয়ে দিলাম।   

শুভ্রা বললো, কিসের প্রমাণ? কি আছে এই কাগজে?

আমি বললাম, নাও দেখো। এই ছবিটা আমি এঁকেছিলাম। আর এই দুটো ছবি, দুটো এলিয়েন এঁকেছিল।

শুভ্রা ছবিগুলো হাতে নিয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর শুভ্রা বলে উঠলো, উফ এবার বুঝেছি সব। নাও, আগে শান্ত হয়ে বসো। সব বুঝিয়ে বলছি।

বলো।

তুমি যে এলিয়েন টেলিয়েনের কথা বলছো এগুলো আসলে কিছুই না। এসবের পুরোটাই ছিল তোমার ভ্রম।  

ভ্রম? মানে?

মানে এখানে কোনো এলিয়েন আসেনি। তোমার মস্তিষ্ক কাল্পনিকভাবে এসব তৈরি করে এই মায়াবী আলোয় তাকে বাস্তবভাবে তোমার সামনে উপস্থাপন করেছে। একে হ্যালুসিনেশনও বলতে পারো।

কিন্তু কেন এমন হবে? এই দেখো, এই কাগজে আঁকা ছবিগুলো তো এখনও রয়েছে। এগুলো তো এলিয়েন দুটো নিজ হাতে এঁকেছে। এটাই তো এলিয়েন আসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। 

না ঐ ছবিগুলো কোনো এলিয়েন না, তুমি নিজেই এঁকেছো। এই দেখো কাগজে আঁকা ১, ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪ এই সংখ্যাগুলো। এগুলোর স্টাইল তোমার হাতের লেখার স্টাইলের মতই। এলিয়েনই যদি আঁকত তাহলে তাদের হাতের লেখার স্টাইল নিশ্চয়ই তোমার হাতের লেখার স্টাইলের মতো হত না। আর প্রথম ছবিদুটোও দেখো না। হুবুহু একই রকম হয়েছে। 

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম শুভ্রা তো ঠিক কথাই বলেছে। কিন্তু আমি কেন এসব আঁকতে বা লিখতে যাবো?

শুভ্রা বললো, অনুশোচনা থেকে।

অনুশোচনা? কিসের অনুশোচনা।

ছোটবেলায় জীববিজ্ঞানকে ফাঁকি দেবার অনুশোচনা তোমার মনের মধ্যে সবসময় ছিল। সেটা এতদিন অবদমিত ছিল। সেদিন আমি যখন অনলাইন ক্লাশে আমার ছাত্রছাত্রীদের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ব্যাকটেরিওফেজ এসব পড়াচ্ছিলাম তখন তুমি কিন্তু আমার পাশেই ছিলে। ঘুম ঘুম চোখে তুমি মাঝে মাঝে আমার ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকাচ্ছিলে আর কিছু কিছু লেকচারও শুনতেও পাচ্ছিলে। 

আরে হ্যাঁ। সেদিন তোমার ল্যাপটপে তো ওই এলিয়েন দুটোর মত ছবিই দেখতে পেয়েছিলাম।

হ্যাঁ। সেটি ছিল ব্যাকটেরিওফেজের ছবি। ব্যাকটেরিওফেজ হল ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী ভাইরাস। এরা ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে এদের ভিতর নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে তারপর ব্যাকটেরিয়াটিকে ছিদ্র করে বাইরে বের হয়ে আসে। তুমি বাগানের হাস্নাহেনা গাছের নিচে ক্যাপসুল আকৃতির যে স্পেসশিপের কথা বলছিলে সেটি আসলে আর কিছুই না, সেটি ছিল এই ব্যাকটেরিওফেজের পোষক কোনো ব্যাকটেরিয়ারই কল্পনা।    

প্রথম কাগজে তুমি মহাশূন্যে পাঠানো সাংকেতিক চিহ্নের ছবিটি এঁকেছ। পরের কাগজে সেখানে মানুষের জায়গায় ব্যাকটেরিওফেজের ছবি এঁকে এরাও যে পৃথিবীর অধিবাসী তা বুঝাতে চেয়েছো। আর শেষ কাগজটিতে তুমি ব্যাকটেরিয়ার ছবি এঁকে এদের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি বুঝাতে ১, ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪ এই সংখ্যাগুলো লিখেছো। ব্যাকটেরিয়া সাধারণত দ্বি-বিভাজন পদ্ধতিতে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে থাকে। অর্থাৎ একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে দুটি ব্যাকটেরিয়া জন্মলাভ করতে পারে। নতুন উৎপন্ন ব্যাকটেরিয়া দুটি আবার দুটি করে বিভাজিত হয়, ফলে তখন ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ টি। ৪ টি ব্যাকটেরিয়ার প্রত্যেকে আবার দুটি করে বিভাজিত হয়ে মোট ৮টি ব্যাকটেরিয়ায় পরিণত হয়।

এভাবে ৮ টি থেকে ১৬ টি, ১৬ টি থেকে ৩২ টি, তারপর ৬৪ এভাবে চলতেই থাকে। ফলে খুব অল্প সময়েই অনেক ব্যাকটেরিয়া জন্মলাভ করতে পারে। এই চমৎকার মজার বিষয়গুলোই তুমি ছাত্রজীবনে ফাঁকি দিয়ে এসেছিলে। ভালো ছবি আঁকা পারতেনা বলে জীববিজ্ঞানকে ভয় পেতে। আর সেই সাথে বুঝে বুঝে না পড়ে মুখস্ত করে পরীক্ষায় পাশ করার চেষ্টা করতে। ফলে পরীক্ষায় কোনভাবে পাশ করে গেলেও জীববিজ্ঞানে তোমার ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল আর এটা তোমার মনের গহীনে তোমাকে পোড়াতো। আজ যেটা তোমার সাথে হয়েছে সেটা তোমার স্বপ্নের মাধ্যমেও ঘটে যেতে পারতো কিন্তু আজকের এই জ্যোস্নাময় পরিবেশ, তোমার মাথার এলোচিন্তা সবকিছু মিলিয়ে এটাকে অনেকটা বাস্তবতার রূপ দিয়ে দিয়েছে।  

তার মানে তুমি বলতে চাইছো সত্যিই কোনো এলিয়েন আসেনি। আমি ভুল দেখেছি।

হ্যাঁ, ভুল দেখেছো। তবে এই ভুল দেখা তোমার অনুশোচনাকে একটু হলেও কমিয়ে দিবে। দেখো এরপর থেকে তোমার কাছে জীববিজ্ঞানকে আর এত কঠিন বলে মনে হবে না।

ঠিক আছে। আমিও এরপর থেকে তোমার কাছ থেকে একটু একটু করে জীববিজ্ঞান শিখে নিবো, কেমন?

আচ্ছা।

চলো এখন ঘুমুতে চলো। ভোর তো প্রায় হয়েই এলো।

আচ্ছা, চলো।

ছাদ থেকে ঘরের দিকে যাবার সময় শুভ্র শেষবারের মতো পিছন ফিরে সেই হাস্নাহেনা গাছের দিকে একবার ফিরে তাকালো। কি অদ্ভুত! শুভ্র সেখানে ক্যাপসুলটিকে ঠিক আগের মতই  দেখতে পেল। আর টেবিলের উপর দেখতে পেল সেই আজব প্রাণীদুটোকেও। ওরা যেন শুভ্রকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছে। ঘটনাটি দেখে শুভ্র আবারও চমকে উঠে শুভ্রাকে কিছু একটা বলতে গিয়েও পরমুহুর্তে থেমে গেল। আর মনে মনে ভাবলো, থাক আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই। বৈচিত্র্যময় এই পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই হয়তো রয়েছে যা বিজ্ঞান কখনও ব্যাখ্যা করতে পারে না। আর সবকিছুর ব্যাখ্যা না জেনেও একটা জীবন বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে দেয়া যায়।

লেখাটি 764-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 903 other subscribers