দেজাভু কেন হয় 

কখনো কি এমন হয়েছে? যে কোনো সময়ে একটি মুহূর্ত  যা আপনি প্রত্যক্ষ করছেন, কিন্তু আপনার মনে হলো যে ঠিক একই মুহূর্ত আপনি আগেও কখনো অনুভব করেছেন। যদিও আপনি এই বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত যে আপনি আগে কখনো এ ধরনের মুহূর্তের সম্মুখীন হননি! ব্যাপারটা হয়তো এখনো পরিস্কার হয় উঠেনি আপনার কাছে। চলুন একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন আপনি আপনার কোনো এক দূর সম্পর্কের  আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছেন যেখানে আপনার প্রথম বার যাওয়া। সেখানে গিয়ে কোনো এক মুহূর্তে আপনার মনে হলো যে এটা আগেও আপনি দেখেছেন।

কোনো এক সময় একদম অনুরূপ-চারপাশের মানুষ, জিনিসপত্র সবকিছুই হুবহু অবিকল। ফ্রান্সের ভাষায় এ ধরনের অনুভূতিকে “দ্যাজা ভ্যু (Déja vu)” বলা হয় যার অর্থ হলো “পূর্বেই দেখা হয়েছে” (already seen)। এটিকে এক ধরনের ইল্যুশন (অবচেতন ধারণা) বলা যায়। আবার এটিকে অনেকে সিজার (মস্তিষ্কে স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সিগন্যালের ব্যাঘাত) হিসেবে গণ্য করেন। গবেষণায় জানা গিয়েছে যে প্রতি ১০০জন লোকের মধ্যে ৬০-৮০জন লোক এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সব বয়সের লোকেরাই দ্যাজা ভ্যু অনুভব করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বয়সী ব্যক্তিরাই এ ধরনের পরিস্থিতির বেশি সম্মুখীন হয়। আবার যারা বেশি ভ্রমণ করে থাকে তাদের ক্ষেত্রে দ্যাজা ভু হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

দ্যাজা ভ্যু হলে মনে হয় যেন আপনি সামান্য কিছু সময়ের জন্য ভবিষ্যত অনুমান করে বসেছেন! যদিও এটি খুব দ্রুতই ঘটে যায় এবং আপনি যদি প্রথম প্রথম দ্যাজা ভ্যুর সম্মুখীন হয়ে থাকেন, আপনার যদি এই ইল্যুশন সম্পর্কে ধারণা না থাকে তাহলে আপনি বুঝতেই পারবেন না মুহূর্তের মাঝেই আপনার সাথে কি ঘটে গেলো। যারা প্রায়ই এর মুখোমুখি হয়ে থাকে অর্থাৎ এটাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তারা  এ ব্যাপারটাকে খতিয়ে না দেখেই রীতিমতো উপেক্ষা করে থাকে। এই ধরনের অনুভূতির আসল কারণ কি তা এখনো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরিষ্কারভাবে  উঠে আসেনি। তবে এটি হওয়ার পিছনে কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখা রয়েছে। প্রথমত “দ্যাজা ভ্যু” আমাদের মস্তিষ্কের অ্যাবনরমালিটির সাথে জড়িত। 

হিপোক্যাম্পাস।

আমাদের মস্তিষ্কের একটি অন্যতম অংশ হলো টেম্পোরাল লোব (Temporal lobe)। এই টেম্পোরাল লোবের একটি অংশ হলো হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)। হিপোক্যাম্পাস  আমাদের মস্তিষ্কের  ফ্যামিলিয়ারিটির (Familiarity-আগে থেকে কোনো বিষয় চেনা থাকা) সাথে গভীরভাবে জড়িত। এজন্য হিপোক্যাম্পাস ”দ্যাজা ভ্যু” হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে বলে অনুমান করা হয়। এর পিছনের যৌক্তিক কারণ হলো ”টেম্পোরাল লোব সিজারস” বা মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সিগনালের ব্যাঘাত। এর মূল উৎপত্তি ঘটে হিপোক্যাম্পাস এ। এই ধরনের সিজার হয় মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশটি কোনো কারণে উদ্দীপিত হলে। আবার কোনো মুহূর্তে মস্তিষ্কের একটি অংশে সিগন্যাল অপর অংশের তুলায় তাড়াতাড়ি (খুব ক্ষুদ্র সময় ব্যবাধানে) পৌঁছালে মনে হয় যেন ওই মুহূর্তটি আমাদের সামনে ঝাপসা স্মৃতি হিসেবে উঠে এসেছে।

যদিও আমরা ওই মুহূর্তটি বর্তমান হিসাবে প্রত্যক্ষ করছি। আবার এমনও হতে পারে যে ঠিক এ ধরনের বা এর কাছাকাছি মিল আছে এমন কোনো মুহূর্ত আমরা আগে কখনো অনুভব করেছি কিন্তু মস্তিষ্ক তা পুরোপুরি মনে রাখতে পারেনি। এই ধরনের মুহুর্তে আগের  স্মৃতি অস্পষ্টভাবে আমাদের সামনে উঠে আসে। ফলে আমরা দ্যাজা ভ্যুর সম্মুখীন হই। কিন্তু ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের লিডস্ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর গবেষণা থেকে জানা যায়, জন্মান্ধ ব্যক্তিরাও দ্যাজা ভ্যুর সম্মুখীন হয়ে থাকে! মস্তিষ্কের শর্ট-টার্ম মেমোরি (যেসব স্মৃতি খুব কমই স্থায়ী হয় বা আমাদের মনে থাকে) এবং লং-টার্ম মেমোরি (যেসব স্মৃতি দীর্ঘসময় ধরে মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়) এর গোলযোগের কারণে দ্যাজা ভ্যু হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়।এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক কোনো স্মৃতিকে প্রথমত শর্ট-টার্ম মেমোরি হিসেবে নেয় এবং তা গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসাবে বিবেচিত হলে লং টার্ম মেমোরি হিসাবে গণ্য করে।

যেই মুহূর্তটি ওই সময় প্রত্যক্ষ করছি ওই মুহূর্তটি খুব দ্রুত শর্ট-টার্ম থেকে লং-টার্ম এ পরিণত হয় যায়, ফলে আমাদের মনে হয় যেন আগেও এ ধরনের পরিস্থিতি উপলব্ধি করেছি। সহজ ভাষায় বললে আমাদের মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য অতীত আর বর্তমানকে গুলিয়ে ফেলে। আবার এটাও হতে পারে আপনি ওই মুহূর্তটি  খুব কম গুরুত্বের সাথে দেখছিলেন এবং মস্তিষ্ক আপনার অনুভূত ওই মুহূর্তটাকে আপনি  স্বেচ্ছায় স্পষ্ট  ভাবে দেখার আগেই  আপনার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে। আর এতে করে আপানর মনে হতে পারে আপনি বুঝি কিছু সময়ের জন্য টাইম ট্রাভেল করে ভবিষ্যৎ দেখে এসেছেন! আবার অনেকে এটাকে মস্তিষ্কের এক ধরনের “গ্লিচ (Glitch)” হিসেবে বিবেচনা করে থাকে যেখানে শনাক্তকারী নিউরন ও ফ্যামিলিয়ারিয়াটি নিউরনগুলোর মধ্যে এক ধরনের জড়তা সৃষ্টি হয়।

যার ফলে মস্তিষ্কে বর্তমান অতীত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এক্ষেত্রে এসব ব্যাখার পুরোপুরি সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠা পায়নি। শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা দ্যাজা ভ্যুর আসল রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করে আসছেন। তবে এর  আসল কারণ খুঁজে বের করার পিছনে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কারণ হলো দ্যাজা ভ্যু হুট করেই হয়ে থাকে আর পূর্ব কোনো উপসর্গ দেখা যায়না। তাই গবেষণাগারে এ বিষয়ে পরীক্ষা করা কঠিন। “টেম্পোরাল লোব এপিলেপ্সি (এক ধরনের মৃগীরোগ)”-তে আক্রান্ত রোগীদের এপিলেপ্সি হওয়ার পূর্ব ধারণা (aura) হিসেবে দ্যাজা ভ্যু দেখা যায়। তবে এক্ষেত্রে টেম্পোরাল লোব এপিলেপ্সি হওয়ার সাথে দ্যাজা ভ্যুর গভীর কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয়না। কারণ বেশিরভাগ এই ধরনের মৃগীরোগীর ক্ষেত্রে এপিলেপ্সি হওয়ার আগে দ্যাজা ভ্যু হয়না।

এক সময় মনে করা হতো দ্যাজা ভ্যু অন্যসব স্নায়ুবিক ব্যধি যেমন-হ্যালুসিন্যাশন এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।অবশ্য পরে জানা গেছে এ ধরনের সম্পর্ক থাকার কেনো যৌক্তিক কারণ নেই। আবার যারা বেশি দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকে তাদের ক্ষেত্রে দ্যাজা ভ্যু হওয়ার হার কিছুটা বেশি দেখা যায়। ডিমেনশিয়া (Dementia) নামক সিন্ড্রোম এর উপসর্গ হিসেবেও দ্যাজা ভু দেখা দিতে পারে। অনেকের মতে, কোনো এক প্যারারাল ইউনিভার্স এ আপনি এই মুহূর্তটি আগেই অনুভব করে ফেলেছিলেন এবং পরবর্তীতে একই মুহূর্ত পৃথিবীতে  পুনরায় অনুভব করছেন ফলে আপনার এই মুহূর্তটি পরিচিত বলে মনে হয়! আবার কারো হাইপারভিজিল্যান্স বা অতি সংবেদনশীলতা থাকলে মনে করা হয় যে তার পূর্বপুরুষেরা এই মুহূর্তটির  সম্মুখীন হয়েছে  যা জেনেটিক্যালি তার মস্তিষ্কে অস্পষ্ট স্মৃতি হিসেবে থেকে গিয়েছে! অবশ্য এ ধনের লজিকগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক  ভিত্তি নেই। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই দ্যাজা ভুর আসল রহস্য উন্মোচিত হবে।

 তথ্যসূত্রঃ: 

ইংরেজিতে কন্টেন্ট রাইটার হয়ে গড়ে তুলতে পারেন নিজের ফ্রিল্যান্স-ক্যারিয়ার। কীভাবে? দেখুন ফ্রি-মাস্টারক্লাস ভিডিও