ওয়াটসন-ক্রিক কি রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের উপাত্ত চুরি করেছিলেন? 

১৯৪০-র দশকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল ডিএনএ-ই হলো জীবনের সংকেতবাহী রহস্যময় অণু। ডিএনএতেই কোন ভাবে লেখা থাকে বংশগতির নির্দেশনা। কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা জানতেন না ডিএনএ-তে জীবনের রহস্য কিভাবে লেখা থাকে। হ্যাঁ, ডিএনএতে চারটি নিউক্লিওটাইড বেস রয়েছে। কিন্তু ডিএনএ-র গঠন কি রকম? আর ডিএনএ কিভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতির তথ্য বহন করে?

১৯৪০-র দশক এমন একটা সময় যখন পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে জীববিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উন্নত-প্রযুক্তি গবেষণার লক্ষ্যই ছিলো যুদ্ধে কিভাবে সুনিপুণ হওয়া যায় অর্থাৎ ধ্বংস।  এসব গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক পদার্থবিজ্ঞানী জড়িত ছিলেন। এজন্য যুদ্ধের সময়ে ও পরে একটি প্রবণতা তৈরি হয় পদার্থবিজ্ঞান থেকে সরে জীববিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার জন্য। এর কারণটা অনেক সুক্ষ্মভাবে ভাবলে ধ্বংস থেকে সৃষ্টির দিকে নিয়োজিত করা মনে হতে পারে। এই ধারার মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রডিঞ্জারের “What is Life?” বইটি যেখানে তিনি এক রহস্যময় অনিয়মিত-ক্রিস্টালের কথা তোলেন। তার ধারণা, কোষের মধ্যে কোন “অপর্যায়-ভিত্তিক ক্রিস্টাল” রয়েছে যা বংশগতির তথ্য ধারণ করে। তার মূল আগ্রহ ছিলো কিভাবে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের জ্ঞান ব্যবহার করে জীবন্ত কোষের মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া যায়।

শ্রডিঞ্জারের What is life? বইটি পড়ে এক প্রজন্ম বিজ্ঞানী জীববিজ্ঞান গবেষণায় উৎসাহিত হয়ে ওঠেন।

শ্রডিঞ্জারের বইটি পড়ে উদ্দীপ্ত একজন জীববিজ্ঞানী ছিলেন জেমস ওয়াটসন। তিনি ১৯৫০ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা শুরু করেন। সে সময়ে জীববিজ্ঞানে এটা পরিষ্কার হয়ে ছিলো ডিএনএ-র মাঝেই লুকায়িত থাকে বংশগতি-সংকেত। সমসাময়িক অনেকের মতোই তিনি এ সমস্যাটি নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে, তার অফিসে একজন পিএইচডি ছাত্র ছিলো, যার নাম ফ্রান্সিস ক্রিক। ক্রিক নিজেও ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। তিনিও শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি চুম্বক- ও শব্দ-মাইনবোমা গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধের পরে সমসাময়িক অনেকের মতো আগ্রহে পরিবর্তন আসে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি দেখে তিনি চান নি সারা জীবন মারণাস্ত্র তৈরি করে কাটিয়ে দিতে। শেষে, তিনি জীববিজ্ঞানে থিতু হন।

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আসা এই নতুন পিএইচডি গবেষক তখন কাজ করতেন বিভিন্ন প্রোটিনের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির মাধ্যমে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বের করা নিয়ে। জেমস ওয়াটসনের সাথে কথাবার্তার পর তিনিও ডিএনএ-র গঠন নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েন। ওয়াটসন ও ক্রিক দুজনেই তৎকালীন প্রকাশিত অন্যান্য গবেষণা থেকে তথ্য নিয়ে ডিএনএ-র ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা শুরু করেন। সে সময় বিজ্ঞানীদের মধ্যে ধারণা ছিলো ডিএনএ তিন-সূত্রক দিয়ে তৈরি প্যাঁচানো-সিড়ির মতো কোন গঠন হবে। এই ট্রিপল-হেলিক্স বংশগতির তথ্য কিভাবে ডিএনএ-তে লিখিত থাকে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কিভাবে তথ্য প্রবাহিত হয় তা ব্যাখ্য করতে পারতো না। তারা অবশেষে একটি মডেল তৈরি করলেন। এটি দুইটি-সূত্র দিয়ে প্যাঁচানো-সিড়ির মতো। তাদের এই মডেলটি ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় ও ডিএনএ-র গঠন রহস্যের সমাধান করে।

তবে, তাদের এই সমাধানের পেছনে নিজেদের করা কোন পরীক্ষা ছিলো না। তারা মূলত অন্যদের পরীক্ষালব্ধ উপাত্ত থেকে মডেল তৈরি করেছিলেন। এর মধ্যে ছিলো রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন নামক এক প্রতিভাবান নারী-বিজ্ঞানীর করা ডিএনএ-তন্তুর উচ্চ-রেজুলেশনের ডিএনএ-ক্রিস্টালোগ্রাফির ছবি। আমরা যখন ডিএনএ-র গঠনের কথা বলি, তখন সবাই ওয়াটসন ও ক্রিকের নাম বলি। কিন্তু রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের অবদানের কথা উল্লেখ করতে ভুলে যাই অনেক সময়। ফ্রাঙ্কলিন ১৯৫৮ সালে ক্যান্সারে ধুঁকে মারা না গেলে ১৯৬২ সালে হয়তো ওয়াটসন ও ক্রিকের সাথে ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কারের পুরষ্কৃত হতেন। ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারে আরো যাদের নাম উল্লেখ করতে হয় তারা হলেন লিনাস পলিং, শারগাফ ও মরিস উইলকিনস।

বাম থেকে ডানে: ফ্রান্সিস ক্রিক, জেমস ওয়াটসন, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন, মরিস উইলকিনস, ও লিনাস পউলিং

১৯৫৩ সালের এপ্রিলে বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচারে ডিএনএর কাঠামোর উপর তিনটি গবেষণা-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।  

প্রথমটি প্রবন্ধটি একেবারেই তাত্ত্বিক। ওয়াটসন-ক্রিকের ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স মডেল নিয়ে প্রকাশিত এ গবেষণাপ্রবন্ধে গবেষণাগারের কোন পরীক্ষা-ফলাফল ছিলো না। পরের দুইটি প্রবন্ধ ছিলো লন্ডনের কিং’স কলেজের কয়েকজন গবেষকের দুইটি পরীক্ষা থেকে পাওয়া উপাত্ত-সমৃদ্ধ গবেষণাপত্রপত্র। একটি ছিলো মরিস উইলকিনস ও অন্য দুই সহকর্মী দ্বারা লিখিত। অন্যটি রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন এবং তার পিএইচডি শিক্ষার্থী রে গসলিংয়ের।

কেমব্রিজের ওয়াটসন-ক্রিক জুটি যে মডেলটি প্রস্তাব করলেন তা ডিএনএ অণুকে কেবল একটি ডাবল হেলিক্সের প্যাচানো সিড়ির মডেল বললে ভুল হবে। এটি ছিলো অত্যন্ত নিখুঁত। বিভিন্ন রাসায়নিক বন্ধনের মধ্যকার কোনগুলির সূক্ষ্ম পরিমাপের উপর ভিত্তি করে, গণিতের শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো এই মডেলটি। কিন্তু এই সব নিখুঁত পরিমাপগুলো আসলে কে করলো? সেটার পেছনের পরীক্ষামূলক উপাত্তই বা আসলো কোথায়? রোজালিন্ডের উপাত্ত চুরি হলো নাকি? এইসব প্রশ্ন ঐতিহাসিক এই গবেষণাপত্রকে কেন্দ্রে করে জন্ম নেয়া শুরু করে।

এই চারজন কোন উপন্যাসের চরিত্র হলে টান টান উত্তেজনার সৃষ্টি করতো। ওয়াটসন কম বয়সী, সাহসী আর ডিএনএর কাঠামো অনুসন্ধানে মগ্ন একজন। ক্রিক ছিলেন মেধাবী আর কৌতুহলী মনের অধিকারী, আবার উলকিন্সের সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো তার। উইলকিন্স ছিলেন খানিকটা লাজুক আর কুন্ঠিত-স্বভাবের।

এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির বিশেষজ্ঞ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ১৯৫০-এর শেষদিকে কিং’স কলেজে নিযুক্ত হন। উইলকিন্স ভেবেছিলেন, যে রোজালিন্ড তার সাথে কাজ করবেন। তবে কিংস কলেজের গবেষণা দলটির প্রধান জন র্যান্ডাল আবার রোজালিন্ডকে বলেছিলেন যে তিনি স্বাধীনভাবেই কাজ করতে পারবেন।

প্রোটিনের গঠন জানার জন্য এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি একটি নিখুঁত প্রক্রিয়া। এজন্য প্রথমেই প্রোটিনের ক্রিস্টাল তৈরি করতে হয়। কিন্তু প্রোটিনের ক্রিস্টাল তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। ক্রিস্টাল তৈরি হলে সেটা দিয়ে এক্স-রে আলোর যে অপবর্তন হয়, তা থেকে আণবিক গঠন বোঝা যায়। এখন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি থেকে আণবিক গঠন বোঝার জন্য কম্পিউটারের সহায়তা নিতে হয়। কিন্তু রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন যখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ডিএনএ-র আণবিক গঠনের ছবি তোলেন, তখন এ জটিল হিসেবগুলো খালি হাতেই করতে হতো।

শুরু থেকে ফ্র্যাঙ্কলিন এবং উইলকিন্সের মধ্যে সম্পর্ক তেমন ভালো বোঝাপড়া  ছিলো না। উইলকিনস ছিলেন শান্ত প্রকৃতির আর যুক্তিতর্ক থেকে দূরে থাকতেন। অন্যদিকে রোজালিন্ড ছিলেন তেজস্বী প্রকৃতির। তিনি বৌদ্ধিক বিতর্কের মধ্যে বড়ো হয়েছিলেন। বন্ধুরা তার স্মরণে বলেছিলেন যে রোজালিন্ডের আচরণ অনেক ক্ষেত্রে রূঢ়ই ছিলো। মাঝে মাঝেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়ায় অনেকের মাঝেই বৈরিতা জাগিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এতে তার তেমনকিছু এসে যেতো না।

ওয়াটসন এবং ক্রিক ডিএনএর কাঠামো উদ্ঘাটন করার প্রথম চেষ্টা করেছিলেন ১৯৫১ সালে।  প্রথম মডেলটি ছিলো একটি বিপর্যয় । তাদের প্রথম মডেলে ছিলো তিনটি সূত্রক। তাদের প্রথম মডেলটি এতোই বাজে ছিলো যে ফ্র্যাংকলিন এক নজরে তা নাকচ করে দেন। কিংস কলেজের গবেষণাদলের পক্ষ থেকে কেম্ব্রিজে অভিযোগও যায় যে ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের গবেষণাক্ষেত্রের মধ্যে অযাচিত আগ্রহ দেখিয়ে বিরক্ত করছে। কেমব্রিজে ল্যাব-এর প্রধান স্যার লরেন্স ব্র্যাগ তখন ওয়াটসন-ক্রিক যুগলকে ডিএনএ সংক্রান্ত সমস্ত কাজ বন্ধ রাখতে বললেন।

তবে ১৯৫৩ সালের শুরু দিকে যুক্তরাষ্ট্রে লিনাস পউলিং ডিএনএ-র গঠন নিয় নিয়ে কাজ করা শুরু করলেন। ব্র্যাগ তখন প্রতিযোগিতার গন্ধ টের পেয়ে ওয়াটসন-ক্রিককে পুনরায় অনুমতি দেন এই গবেষণাটা শুরু করার।

রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের তোলা ফটো ৫১।

১৯৫৩ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে ওয়াটসন কিংস কলেজে গিয়েছিলেন। সেখানে উইলকিন্স তাকে এক্স-রে ছবি দেখালেন যা পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কলিনের ন্যাচারে প্রকাশিত নিবন্ধে ব্যবহৃত হয়। এই ছবিটি তৈরি করেছিলেন পিএইচডি শিক্ষার্থী রেমন্ড গসলিং। এটি ‘ফটো ৫১’ নামে পরিচিত। তিনি এর আগে মূলত উইলকিন্সের সাথে কাজ করেছিলেন। তারপরে ফ্রাঙ্কলিনের অধীনে বদলি হয়েছিলেন যা আবার উইলকিন্স জানতেন না। সে সময়ে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন কিংস কলেজে গবেষণার জন্য বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কিংস কলেজ ও ডিএনএ সংশ্লিষ্ট সকল কাজ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে কারণে রেমন্ড গসলিং পুনরায় আবারো উইলকিন্সের অধীনে বাকি গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

ওয়াটসন ছবি দেখেই বুঝতে পারলেন এটি তখন পর্যন্ত ডিএনএ কেলাসের সবচেয়ে পরিস্কার আর বিস্তারিত ছবি। ছবি দেখেই তিনি হা-হয়ে গেলেন আর তার হৃদপিন্ডের গতি দ্রুত হয়ে গেলো। ওয়াটসন বুঝতে পারলেন ডিএনএ মূলত ডাবল-হেলিক্স — ছবি ৫১ থেকে তা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যান্য ধাঁধাঁ যেমন ডিএনএ-সূত্রের সংখ্যা কয়টি এবং সর্বোপরি অণুর যথাযথ রাসায়নিক অবস্থান তখনো রহস্যই ছিলো। ৫১ ফটোতে এক নজর দেখে সেই বিস্তারিত বোঝা যায় নি।

হেলিক্সের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দরকার ছিলো এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন ছিল। এই পর্যবেক্ষণ অজান্তেই ফ্রাঙ্কলিন নিজেই সরবরাহ করেছিলেন। রোজালিন্ড একটি সংক্ষিপ্ত অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্স পেরুৎজকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেরুৎজ এই রিপোর্টটি ব্রাগকে এবং সেখান থেকে ওয়াটসন ও ক্রিক এই প্রতিবেদনটি হাতে পান।

ক্রিকের কাছে এখন হিসাব করার জন্য সকল প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে চলে এসে গেছে। এই উপাত্তগুলির মধ্যে ছিলো ডিএনএ অণুর পুনরাবৃত্তি হওয়া গাঠনিক এককগুলির আপেক্ষিক দূরত্ব, এবং ক্রিস্টালের মনোক্লিনিক ইউনিট সেলের মাত্রা। এই উপাত্ত থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিলো যে বিপরীত বরাবর দুইটি অংশ খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে।

বিভিন্ন ধরনের ক্রিস্টাল গঠনের একক। নিচে মনোক্লিনিক ক্রিস্টাল গঠন দেখানো হচ্ছে।

তবে প্রতিবেদনটি কিন্তু গোপনীয় ছিল না। আর কেমব্রিজের জুঁটি যে এই রিপোর্ট অসাধুভাবে চুরি করেছে এরকম কোন ঘটনা ঘটে নি। কিন্তু, তারা কি করছে তা কিংস কলেজের কাউকে জানায়নি। তাছাড়া তারা ফ্রাঙ্কলিনের কাছে তার উপাত্ত ব্যাখ্যা করার অনুমতিও চান নি। তাদের এই আচরণ দাম্ভিক ও কিছুটি শিষ্টাচারবর্জি ছিলো বলা চলে। অবশ্য রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ১৯৫১ সালের হেমন্তে কিংস কলেজের একটি সেমিনারে প্রায় একইরকম একটি উপাত্ত উপস্থাপন করেন। সেখানে জেমস ওয়াটসনও উপস্থিত ছিলেন — ওয়াটসন ঠিকমতো খেয়াল করলে ফ্রান্সিস ক্রিককে তিনি পনের মাস আগেই এই প্রমাণ সরবরাহ করতে পারতেন!

ফ্রাঙ্কলিন যে উপাত্ত তৈরি করেছিলেন তার গবেষণাতে, সেটাও ঘটনাক্রমে ফ্রান্সিস ক্রিকের পিএইচডি গবেষণার বিশেষায়িত অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। ডিএনএতে পাওয়া মনোক্লিনিক ইউনিট সেলের রকম ক্রিকের পিএইচডি গবেষণায় ঘোড়ার হিমোগ্লোবিনেও উপস্থিত ছিল। তার মানে হলো ডিএনএ আসলে দুইটি চেইন বা শৃঙ্খল দিয়ে তৈরি যা একে অপরের সাথে মিলে যায়। ক্রিকের এই পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই উপাত্তের তাৎপর্য দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে ফ্রাঙ্কলিনকে একই উপসংহারে আসতে কয়েক মাস সময় লেগেছে।

ওয়াটসন ও ক্রিক যখন কেমব্রিজে রাতদিন তাড়া নিয়ে কাজ করছিলেন এই ভয়ে যে লিনাস পলিং হয়তো তাদের আগেই এই উদ্ভাবন করে ফেলবেন। অন্যদিকে ফ্র্যাঙ্কলিন কিংস কলেজের গবেষণাগার ছেড়ে যাওয়ার আগের ডিএনএ নিয়ে তার কাজ শেষ করছিলেন। ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা আর অন্য কারও সাথে কোন চিন্তাভাবনা বিনিময় না করেই তিনি যে অগ্রগতি করতে পেরেছিলেন তা ছিলো এক কথায় অসাধারণ।

ফ্রাঙ্কলিনের ল্যাবনোট থেকে বোঝা যায় যে প্রথম প্রথম এই জটিল হিসাব-নিকাশ করতে তাকেও বেগ পেতে হয়েছিলো। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তিনি বুঝতে পারলেন যে ডিএনএ-র দ্বিসূত্রক প্যাচানো কাঠামো রয়েছে। এটাও তিনি ধরতে পারলেন যেভাবে প্রতিটি সূত্রের নিউক্লিওটাইড উপাদান সংযুক্ত, তার মানে সূত্র দুইটি একে অপরের পরিপূরক ছিল যা ডিএনএ অণুটিকে সহজেই প্রতিলিপি করার ক্ষমতা দেয়।

রোজালিন্ড এ সময়ে আরো খেয়াল করলেন যে ডিএনএর মধ্যে নিউক্লিওটাইড এর অনুক্রমের অসীম সংখ্যায় বিন্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্ধকারে একঝলক আলো দেখার মতো তিনি বংশগতির সবচেয়ে অজ্ঞেয় ধাঁধাঁ সমাধানের খুব কাছে চলে গেলেন যে এই অনুক্রমেই বংশগতির জৈব সংকেত বহন করে।

কিন্তু এই অন্তর্দৃষ্টি প্রমাণ করার জন্য তাকে একটি সূক্ষ্ম, গাণিতিক এবং রাসায়নিকভাবে সুনির্দিষ্ট মডেল তৈরি করতে হবে। তিনি এটি করার সুযোগ পেলেন না, কারণ ওয়াটসন এবং ক্রিক ইতিমধ্যেই সে সমাধানটি সুচারুভাবে করে ফেলেছেন। কেমব্রিজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জুটি একটি গাঠনিক মডেল তৈরির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট স্থানিক সম্পর্ক এবং রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স কাঠামো ব্যাখ্যা করে ফেলেছেন ততোদিনে।

১৯৫৩ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে উইলকিনস এবং ফ্র্যাঙ্কলিনকে মডেলটি দেখার জন্য কেমব্রিজে আমন্ত্রণ জানানো হলো। তারা সাথে সাথেই সম্মতি দিলেন, আর ঠিক করলেন যে এটি সুন্দরভাবে শেষ হওয়া উচিত। তারা একমত হলেন যে দ্বিসূত্রক-প্যাঁচানো মডেল কেবল ওয়াটসন ও ক্রিকের কাজ হিসাবে প্রকাশিত হবে। উইলকিনস এবং ফ্রাঙ্কলিন তাদের মডেল সমর্থনকারী উপাত্ত প্রকাশ করবেন – অবশ্যই, পৃথকভাবে। তিনটি গবেষণাপত্রই প্রকাশিত হলো। ২৫ এপ্রিল ন্যাচারের তিনটি নিবন্ধ প্রকাশের উদযাপনের জন্য কিংস কলেজে একটি পার্টির আয়োজন করা হলো। ফ্র্যাঙ্কলিন উপস্থিত ছিলেন না। তিনি ততোদিনে ব্রিকবেকে চলে গেছেন কিংস কলেজে ডিএনএ সম্পর্কিত গবেষণা ছেড়ে দিয়ে। ফ্রাঙ্কলিন ১৯৫৮ সালে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সকে নোবেল পুরষ্কার প্রদানের মাত্র চার বছর আগে এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। তিনি জানতেন না ওয়াটসন এবং ক্রিক তাদের মডেল তৈরিতে রোজালিন্ডের উপাত্তের উপর ভীষণ নির্ভরশীল ছিলো। আর জেনে থাকলেও বা কোন সন্দেহ করে থাকলেও তা নিয়ে কখনোই কোন তিক্ততা বা হতাশা প্রকাশ করেন নি। পরবর্তী বছরগুলিতে ফ্রান্সিস ক্রিক এবং তার স্ত্রী ওডিলের সাথে ফ্রাঙ্কলিন বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন।

[লেখাটি আমার জেনেটিক্স: বংশগতিবিদ্যার সহজপাঠ বইটি থেকে নেয়া। বইটি পাওয়া যাচ্ছে বাতিঘর, রকমারীচন্দ্রদ্বীপ সহ বিভিন্ন বইয়ের দোকানে।]

সংযুক্তি: আমরা কেন রোজালিন্ড নয় বরং ওয়াটসন-ক্রিকের নাম বেশি জানি সেটা নিয়ে চমৎকার একটা প্রবন্ধ আছে মার্টিন টবিন এর লেখা এই গবেষণা-প্রবন্ধে: April 25, 1953 Three Papers, Three Lessons। সংক্ষেপে তিনি তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন: (১) বিজ্ঞানে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগীতা বেশি লাভজনক, (২) অপ্রকাশিত গবেষণার কোন মূল্য নেই, এবং (৩) সহজবোধ্যভাবে গবেষণা উত্থাপন করা একটা বড় পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারে। ওয়াটসন-ক্রিকের লেখা গবেষণাপত্র অত্যন্ত সহজবোধ্য। অন্যদিকে একই জার্নালের একই সংখ্যায় উইলকিনস বা রোজালিন্ডের গবেষণা পরপর প্রকাশিত হলেও তাদের গবেষণা তুলনামূলক কম পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এর কারণ হলো তাদের গবেষণাপত্রে খুব সুন্দর গবেষণাভিত্তিক উপাত্ত থাকলেও তা বেশ জটিলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো।

এ বিষয়ে আরো পড়তে পারেন:

ইংরেজিতে কন্টেন্ট রাইটার হয়ে গড়ে তুলতে পারেন নিজের ফ্রিল্যান্স-ক্যারিয়ার। কীভাবে? দেখুন ফ্রি-মাস্টারক্লাস ভিডিও

আরাফাত রহমান
অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি গবেষক। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।