লাইফ দ্যাট গ্লো’জ : জীবজগতে আলোকসজ্জার সন্ধানে

গরমের দিনে ঝোঁপ-ঝাঁড়ে টিম টিম করে জ্বলে এক বিশেষ আলো। আমাদের অনেকেরই দেখা-অনেকেরই চেনা,এই আলো জোনাকির। জোনাকির আলো দেখে আমাদের ভালো লাগে; যখন শয়ে শয়ে জোনাকি একসাথে আলো জ্বালে (যদিও এই দৃশ্য গ্রামাঞ্চল ছাড়া শহরে দেখা প্রায় অসম্ভব) তখন যেন মনে হয় আকাশের তারাগুলোই নেমে এসেছে জংলায়। জানেন কি, এই আলো মূলত জোনাকির সঙ্গী-নির্বাচন প্রক্রিয়া? আলো জ্বেলে পুরুষ জোনাকি তার প্রজাতির স্ত্রী পতঙ্গটির কাছে মিলনের আর্তি জানায়। স্ত্রী জোনাকি’ও তার উত্তর দেয় আলো জ্বেলে; এভাবে জোনাকির বংশবিস্তার এবং সমগ্র প্রজাতির অস্তিত্ব নির্ভর করে আলো জ্বালার এই বিশেষ জৈবিক ক্ষমতার ওপর। জীবদেহে আলো জ্বালার এই বিশেষ জীববৈজ্ঞানিক প্রপঞ্চটির পোশাকি নাম বায়োলুমিনেসেন্স!

📷আমাদের চোখে আলোর খেলা,ওদের কাছে ‘মেটিং ম্যাসেজ’

সহজ কথায় বললে,জীবন্ত জীবদেহ থেকে বিভিন্ন বর্ণের আলো উৎপাদন এবং ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনাকে বলে বায়োলুমিনেসেন্স। কার্যত এটি একধরনের জৈব-রাসায়নিক ঘটনা। যেসকল জীবের এই অদ্ভুত ক্ষমতা আছে,তাদেরকে বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্ট। বায়োলুমিনেসেন্সের জীব-রসায়নটা একটু জটিল (তার জন্য পড়তে পারেন এই লেখাটা)। আমাদের চারপাশে এরকম উদাহরণ কেবল জোনাকিই,বাস্তবে কিন্তু এরকম আলো-তৈরি-করতে-পারা জীবের সংখ্যা নেহাত কম নয়! উদ্ভিদ আর স্তন্যপায়ী প্রাণী ব্যতিত বহু কীটপতঙ্গ, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, প্লাঙ্কটন এবং অসংখ্য সামুদ্রিক মাছ বায়োলুমিনেসেন্সের মাধ্যমে মাধ্যমে আলো তৈরির ক্ষমতা রাখে। আশ্চর্যের কথা হলো, সামুদ্রিক জীবের মধ্যেই এর সংখ্যা বেশি। সামুদ্রিক প্রাণীদের শতকরা ৭৬ ভাগই বায়োলুমিনেসেন্ট এবং সমুদ্রের সকল স্তরেই এদের নিবাস! এই বায়োলুমিনেসেন্ট জীবদের জীবন এবং বাস্তুসংস্থানকে উপজীব্য করেই ২০১৬ সনে নির্মিতি হয়েছে বিবিসি প্রযোজিত ডকুমেন্টারি Life That Glows। ভাষ্যকার স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর অন্যতম সেরা কাজ এটি।

Life That Glows ডকুমেন্টারির পোস্টার

এই লেখার মতোই ডকুমেন্টারিটা শুরু হয়েছে আমাদের চেনা জোনাকির উদাহরণ দিয়ে। অ্যামেরিকার পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের এক জলালগ্ন বনে দাঁড়িয়ে অ্যাটেনবরো আমাদের জানাচ্ছেন জোনাকির প্রত্যেক প্রজাতির রয়েছে স্বতন্ত্র ‘ফ্ল্যাশ কোড’—অর্থাৎ কতবার সে ঝলক দেবে,কতটুকু বিরতি থাকবে তার মধ্যে,আলো জ্বালতে জ্বালতে সে কী ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে না ওড়াউড়ি করবে,উড়লে কীভাবে উড়বে—ডানে-বামে,না ওপরে-নিচে এই সবই সাধারণত প্রত্যেক জোনাকি প্রজাতিতে আলাদা। মজার ব্যাপার, এই আলোর ঝলক কেবল যৌন মিলনের সঙ্কেতই বহন করে না,আলোক-প্রজ্বলনের সূক্ষ্মতা ও উজ্জ্বলতা দিয়ে নির্ধারিত হয় ওই পুরুষ জোনাকির সামর্থ‌্য ও আকর্ষণীয়তা। এরপর অ্যাটেনবরোর ক্যামেরা ঢুকে যায় মাটির ভেতর,সেখানে দেখা মেলে বায়োলুমিনেসেন্ট ছত্রাকের। সবুজ আলো ব্যবহার করে ওরা আকৃষ্ট করে কীটপতঙ্গকে,আর তার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় নিজের স্পোর।

কালে কালে বায়োলুমিনেসেন্স নিয়ে বর্ণিত হয়েছে অনেক উপকথা। লোকমুখে ছড়িয়েছে কতো কাহিনী! বিখ্যাত লেখক জুল ভার্নের কল্পবিজ্ঞান ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’তে ‘মিল্কি সি’র বিবরণ মেলে। সমুদ্রের নাবিকেরা মাঝেমধ্যেই রাতের বেলা দেখতেন দুগ্ধফেননিভ জল যার পরিব্যাপ্তি হতো দৃষ্টিসীমার বাইরে। অ্যাটেনবরো দেখাচ্ছেন কীভাবে সহস্র বায়োলুমিনেসেন্ট ব্যাকটেরিয়া গভীর সমুদ্রে তৈরি করতে পারে আলোর রংমশাল, এবং তা এতোই তীব্র যে দূর মহাকাশের স্যাটেলাইট থেকেও বোঝা যায়!

📷 জুল ভার্নের লেখা থেকে মিল্কি-সি’র বিবরণ পড়ে শোনাচ্ছেন অ্যাটেনবরো

পুরো ডকুমেন্টারিতে অ্যামেরিকা থেকে ব্রাজিল হয়ে তাসমানিয়া,নিউজিল্যান্ড ঘুরে অ্যাটেনবরো পাড়ি দিয়েছেন প্রশান্ত মহাসাগরে। যাত্রাপথে নানা জাতের স্কুইড, ড্রাগনফিশ, ফ্ল্যাশলাইট ফিশ, অক্টোপাস, জেলিফিশ, ক্লিক বিটল, ডিনোফ্লাজেলাটিস-সহ কতোরকম জীবের কথা আলাপ করেছেন তার আলাদা তালিকা করতে বসতে হবে। বিচিত্র তাদের জীবন,ততোধিক বিচিত্র তাদের আলোর ব‌্যবহার। অ্যাটেনবরো দেখাচ্ছেন এই আলো জীবগুলো শিকার খোঁজা, শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ বা ক্যামোফ্লাজ সৃষ্টি, একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর সাথে যোগাযোগ, সঙ্গীকে আকৃষ্ট করা, বহিরাগতকে সর্তক করা সহ আরো কিছু কাজে ব্যবহার করে। সেসব কৌতুহলপ্রদ গল্প আগ্রহী দর্শকের জন্যেই তোলা রইলো।

📷সামুদ্রিক বায়োলুমিনেসেন্ট জীবদের একাংশ

শ‌ক্তিশালী ক্যামেরায় তোলা জীবজগতের অত্যন্ত চমৎকার,দৃষ্টিনন্দন সব ছবি রয়েছে এই ডকুমেন্টারিতে। সাথে ডেভিড অ্যাটেনবরোর ভারী গলার কাব্যময় বর্ণনাভঙ্গি সহজেই প্রাসঙ্গিক ব্যাপারগুলোকে বোধগম্য করে তোলে। অ্যাটেনবরোর স্বরে সম্ভবত বাগ্দেবীর বিশেষ আশীর্বাদ আছে,যার দরুণ উনি প্রকৃতি আর প্রাণিজগতের যেকোনো বিষয়ে আগ্রহ-মনোযোগ উসকে দিতে পারেন এবং সেই মনোযোগ ধরেও রাখতে পারেন। পৃথিবী তাকে সবসময় মনে রাখবে সারাবিশ্বের অজস্র উদাসীন মানুষের নজর প্রকৃতি ও জীবনজগতের অনাবিল রহস্যের দিকে ফেরাতে কাজ করে যাওয়া অক্লান্তকর্মা ব্যক্তি হিশেবে।

লাইফ দ্যাট গ্লো’জ একইসাথে বিনোদিত এবং আলোকিত করে আমাদেরকে,একইসাথে জাগায় সুন্দরকে দেখার মুগ্ধতা এবং অজানাকে জানার কৌতুহল। অ্যাটেনবরো সবিনয়েই জানিয়েছেন এই আলোর জগত সম্বন্ধে খুব সামান্যই আমাদের জানা হয়েছে,এখনো বিশাল অংশ রয়েছে অনাবিষ্কৃত,অভেদ্য। সেই অনাবিষ্কৃতকে আবিষ্কার আর অভেদ্যকে ভেদ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন যারা,ভাবলে অবাক হতে হয়,অনাগত দিনের সেই বিজ্ঞানীদের জন্য কী বিস্ময়ই না অপেক্ষা করে আছে!

প্রকৃতিপ্রেমী কিংবা জীবজগত নিয়ে আগ্রহী যে কারো জন্যে এই ডকুমেন্টারি হাইলি রেকমেন্ডেড!

Life That Glows দেখুন এখানে অথবা এখানে

একনজরে ডকুমেন্টারি’টার খুঁটিনাটি:

Name : Life That Glows
Host : Sir David Attenborough
Produced by : BBC
First Aired on : 2016
Episode count : 1
Total Duration : 1h
IMDb Rating : 8.3/10
Personal rating : 9/10

Anirban Maitra
আমি অনির্বান। জন্ম, বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়াতে। বর্তমানে পড়াশোনা করছি নটরডেম কলেজে, বিজ্ঞান বিভাগে। প্রিয় বিষয় বং‌শগতিবিদ্যা, বিবর্তন এবং জীবপ্রকৌশল।