দেশী ক্যাম্পেবল বায়োলজি

বই পর্যালোচনাঃ ক্যাম্পেবল বায়োলজি। ছবিঃ উৎস

তখন বইয়ের মৌসুম। বইমেলাও নতুন বইয়ে মেতে উঠেছে, আবার রকমারিতেও বইয়ের ঝড় বইছিল। এমন সময়ে বিজ্ঞান ব্লগ থেকে রফিকুল ইসলাম ভাইয়ের ‘ক্যাম্পেবল বায়োলজি (প্রাণরসায়ন ইউনিট) এর ২য় সংস্করণ গিফট পাই। প্রচ্ছদ দেখে বইয়ের প্রেমে পড়ে যাই। বইটা খুলে দেখার পর বুঝলাম যে এর মূলত ৫টি অধ্যায় রয়েছে।

বইয়ের ব্যবচ্ছেদ

বইটার প্রথমেই রয়েছে অভিযোজনের আলোচনা। এই প্রক্রিয়া ছাড়া জীবদের অস্তিত্বই থাকত না। অভিযোজনের কারণেই জীবের বৈচিত্র্যময় হয়। এ ব্যারটিকেই কিছু জীবের বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। এ অধ্যায়ে আরও যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেগুলো হলো জীবজগতের বিভিন্ন স্তর, জীবের গঠন ও তার কাজের সম্পর্ক, বংশগতি, সিস্টেমস বায়োলজি, জৈব অভিব্যক্তি, ইমারজেন্ট বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। লেখক সহজ ভাষায় এসব বিষয় বইতে তুলে ধরেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে খাঁটি রসায়নের আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের নামটা বেশ সুন্দর-‘জীবনের রাসায়নিক নকশা’। মূলত এই নকশাগুলো হলো পরমাণুর গঠন ও মৌলের ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক, রাসায়নিক বন্ধন, জৈব পদার্থ, রাসায়নিক বিক্রিয়া ইত্যাদি। জীবন মানেই পানি। এই পানি আর জীবন নিয়েই ৩য় অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তুগুলো হলো এসিড-ক্ষার, জীবদেহের অম্লীয়-ক্ষারীয় পদার্থ, বাফার দ্রবণ, পৃথিবীর বাইরে পানির সন্ধান ইত্যাদি। আমাকে এই আলোচনাগুলো নতুন কিছু জানতে অনুপ্রাণিত করেছে।

শেষ দু’টি অধ্যায়ের লেখাগুলো মূলত জৈব যৌগ নিয়ে। প্রাণরসায়ন পড়তে গেলে জৈব যৌগ সম্পর্কে জানতেই হবে। এখানে জীবনের উদ্ভব ও জীবদেহের ক্রিয়ায় জড়িত বিভিন্ন রাসায়নিক গ্রুপ নিয়ে মৌলিক আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ের শেষ দিকে এসে ATP নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা তুলে ধরা হয়েছ। লেখক শেষ অধ্যায়ে সহজ ভাষায় পলিস্যাকারাইড, লিপিড, প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিড নিয়ে লিখেছেন। অধ্যায়টির শেষ দিকে এসে জিনোমিক্স ও প্রোটিওমিক্সের কথা লেখা হয়েছে। এ দুটোর ব্যাপারে আমি কিছু বলব না, এগুলো জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে বইটির মূল অংশের শেষ অধ্যায়ের শেষাংশ।

জ্ঞানগর্ভ এই লেখাগুলোর পরেই স্থান পেয়েছে দুজন বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার দু’টি থেকে পরিবেশ ও জীববিজ্ঞানের গবেষকদের গবেষণার ব্যাপারে কিছু বিষয় সংক্ষিপ্তভাবে জানা যায়। তো, এইত্তো! মোটামুটি এগুলো নিয়েই বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে।

মতামত ও সমালোচনা

বইটা পড়ে আমি কিছু প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। যেমনঃ
১. জীবজগতের মাঝে বৈচিত্র্য দেখা যায় কেন?
২. পৃথিবীর বাইরে কোনো জীব পাওয়া গেলে সেখানকার পরিবেশ কেমন হবে?
৩. জীববিজ্ঞানে জিনোমিক্স ও প্রোটিওমিক্স কী কী অবদান রেখেছে?
৪. কীভাবে মাইক্রো মলিকিউল ও ম্যাক্রোমলিকিউলের সমন্বয়ে কোষ গঠিত হয়?

সব মিলিয়ে বলতে গেলে এই বই থেকে জানার মতো অনেক কিছুই আছে। আবার আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো বক্স মার্ক দিয়ে চিহ্নিত করা। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে সারসংক্ষেপ ও জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের জন্য সহায়ক কিছু প্রশ্ন রয়েছে। এগুলো বেশ দারুণ সংযোজন। আমার কাছে চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায় সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।

বই নিয়ে যেমন ভালো মন্তব্য থাকে, তেমনি থাকে সমালোচনার কথা

পর্যালোচনা মানে ভালো-মন্দ সবকিছু মিলেই কথা বলা। আমি বুক রিভিউয়ের শেষে গিয়ে বই নিয়ে কিছু সমালোচনা করে থাকে। এই বইও তার ব্যতিক্রম নয়। ক্যাম্পেবল বায়োলজি (প্রাণরসায়ন ইউনিট) এর কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ দিক আমার চোখে পড়েছে। যেমনঃ

১. কিছু কিছু জায়গায় বানান বিভ্রাট এবং একই কথার পুনরাবৃত্তি হতাশাজনক ছিল।
২. ৪১ পৃষ্ঠায় DNA কে জিনের অংশবিশেষ বলা হয়েছে। প্রকৃ্তপক্ষে জিন DNA এর অংশ।
৩. ১১২ পৃষ্ঠার শেষ থেকে ২য় লাইনে বলা হয়েছে যে প্রকৃ্তিতে প্রাপ্ত মৌলের সংখ্যা। তবে মাধ্যমিক স্তরের রসায়ন বইয়ে এ সংখ্যা ৯৮।
৪. ১২২ পৃষ্ঠার শেষ থেকে ৩য় লাইনে বলা হয়েছে যে ইউরেনিয়াম-২৩৮ আইসোটোপের Half-life বা অর্ধায়ু ৪.৫ বছর। আসলে এটি হবে ৪.৫ বিলিয়ন বছর।
৫. বইয়ের প্রচ্ছদে “প্রাণরসায়ন ইউনিট” কথাটি লেখা থাকলেও বইয়ের এক-তৃ্তীয়াংশ জুড়ে প্রাণরসায়নের বাইরের আলোচনা করা হয়েছে।
৬. বলা হয়েছে যে বইটি ইংরেজী “ক্যাম্পেবল বায়োলজি” এর অনুবাদ। কিন্তু প্রকৃত ক্যাম্পেবল বায়োলজির সাথে এর তেমন কোনো মিল নেই। এটা আসলে কিছুটা “ছলনা” বলা চলে। একারণেই হতাশ হয়ে এই ব্লগ পোস্টের টাইটেল দিয়েছি “দেশী ক্যাম্পেবল বায়োলজি’।

তো, সবশেষে বলব, সাধারণ কৌতুহলী পাঠক অথবা শিক্ষার্থী হিসেবে যদি কেউ এই বইটা পড়ে, তবে সে নিশ্চয়ই নতুন কিছু জানতে পারবে এবং উপকৃ্ত হবে। বইটি পড়লে শুধুমাত্র কৌতুহলই মিটবে না, বরং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নতুন সব ভাবনাও জন্ম নিবে। পড়ুন, জানুন এবং শিখুন। বিজ্ঞানের জয়ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে।

তাহসিন আলম উৎস
লিখতে লিখতে শিখতে চাই। বর্তমানে বিজ্ঞান ব্লগের পাশাপাশি সায়েন্টিয়া সোসাইটি, বিজ্ঞান পত্রিকা, হিগজিনো সায়েন্স সোসাইটি এবং বোসন বিজ্ঞান সংঘ এর সাথে যুক্ত আছি। আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রতিটা সমাজে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের জয়ধ্বনি বাজবে। আর এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানের একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।