বুদ্ধিমত্তার পর্যায়সারণি 

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

পৃথিবীতে বাস করে হরেক রকমের জীব-জন্তু। যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিমান প্রাণ কোনটি? নিমেষেই আমাদের মনে উত্তরটা চলে আসে যে আমরাই সবচাইতে বুদ্ধিমান। সত্যিই কি তাই? একদম শতভাগ মানুষ কিন্তু এমনটা মনে করেন না। কিছু চিন্তক কিংবা দার্শনিকদের মতে, আমাদের এই জটিল মানবসভ্যতা গড়ে তোলাটা ছিল ইতিহাসের সবচেয় বড় ভুল। সবচেয়ে বড় বোকামি। আদিম মুক্ত শিকারি জীবন ছেড়ে আমরা আটকা পড়ে গেছি সভ্যতা নামক চক্রে। তাই কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এই আধুনিক বিশ্বে তুখড় বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ খুব একটা নেই। তবে এই কথা কিন্তু সর্বাঙ্গীণ সত্য নয়। মানবসভ্যতা হয়ত সামষ্টিক নির্বুদ্ধিতার মাশুল গুনছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের চারপাশে এখনো অনেক বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধান মিলবে।

আপনি নিশ্চয় শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং কিংবা নীল তিমি এবং ডলফিন’দের বুদ্ধিশালী অঙ্গভঙ্গির সাথে পরিচিত। কিন্তু আপনি কি বোলতাদের ব্যাপারে জানেন? এরা মানুষের চেহারা মনে রাখতে পারে। কিংবা কাঁকড়া? এরা বিষাক্ত অ্যানিমন ব্যবহার করে শিকারিদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে জানে। কুমির জলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকে। সাড়া শরীর পানির ভেতরে থাকলেও লম্বা করাতের মত মুখটা ভেসে থাকে পানির উপরেই। হঠাৎ কোনো উড়ন্ত বক নাগালে পেলেই মুখে পুড়ে দেয় তৎক্ষণাৎ। মশা’রা একবার কোন একটা কীটনাশকের সংস্পর্শে আসলেই শিখে যায় কি করে সেটাকে এড়িয়ে চলতে হবে। ডডার নামক এক জাতের পরাশ্রয়ী লতা আছে। শিকার’কে ধরাশায়ী করতে এরা ভীষণ পটু। স্লিম মোল্ড নামের হলুদ ছত্রাক শিখতে জানে এবং পরস্পরকে শেখাতে জানে। এমনকি ব্যাকটেরিয়া’দের তৈরি বায়োফিল্মও শর্ট টার্ম মেমরি প্রসেস করতে পারে, এদের আছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।

ডডার হচ্ছে জাতের পরাশ্রয়ী লতা। ছবিসূত্রঃ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

চারপাশের জীববৈচিত্র্যের মধ্যে এতসব দক্ষতা সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিমত্তা বলতে আসলে কি বোঝায়? এর উদ্ভবই বা হলো কি করে? কিংবা বিভিন্ন প্রাণের মধ্যে এই বুদ্ধিমত্তার তুলনা করা যায় কীভাবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া খুব সোজা কাজ না। প্রকৃতিতে বুদ্ধিমত্তার মূল্যায়ন করা খুবই কঠিন একটা কাজ। বিশেষ করে তা যদি আবার ভিন্ন গড়নের প্রাণ এর বেলায় হয়। কিন্তু তাই বলে রহস্য অনুসন্ধানকারী বিজ্ঞানীরা তো আর বসে থাকতে পারেন না। আজ থেকে কয়েক শতক আগে এমনই এক কঠিন কাজ ছিল সবকটা রাসায়নিক মৌল সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করা। রাসায়নিক পর্যায় সারণির আবিস্কার এই অসাধ্যকে সাধন করে দিয়েছে। এখন আপনি শুধু পর্যায় সারণিতে একটা মৌলের অবস্থান জানলেই বলে দিতে পারবেন এর ভৌত, রাসায়নিকসহ সবরকম ধর্ম।

১৮৬৯ সালে এই অসাধারণ আবিস্কারটা করেন রাশিয়ান রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। আবিষ্কৃত সবকটা রাসায়নিক মৌলকে সারি কলামে বিন্যস্ত করে তৈরি করেন রাসায়নিক পর্যায় সারণি। আর এভাবেই আলকেমি নামে আবির্ভূত হওয়া রসায়ন শাস্ত্র বিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রধান শাখায় রূপান্তরিত হয়। পর্যায় সারণি আবিষ্কার এর পর মেন্ডেলিভ তাঁর সমসাময়িক বিজ্ঞানী মহলে বেশ বাহবা পেয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানের এক অন্যতম বৈপ্লবিক আবিষ্কার হচ্ছে রাসায়নিক পর্যায় সারণি। বিজ্ঞানী মহলে এই সারণি “নেচারস রোজেটা স্টোন” হিসেবে সমাদৃত। পর্যায় সারণিতে একটা মৌলের শুধুমাত্র  অবস্থান জানলেই জানা যায় সেই মৌলের যাবতীয় ধর্ম-বৈশিষ্ট্য। এমনকি পরবর্তীতে আর কোনো মৌল আবিস্কৃত হবার সম্ভাবনা আছে কিনা সে সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবানীও করতে পারে এই সারণি।

দিমিত্রি মেন্ডেলিভ।

আচ্ছা কেমন হয় যদি বুদ্ধিমত্তারও এমন একটা পর্যায় সারণি বানানো যায়? একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক এবং দার্শনিক এমনটাই ভাবছেন। তারা ডাইভারস ইন্টিলিজেন্স নামে একটা গবেষণা প্রকল্প শুরু করেছেন। উদ্দেশ্য বুদ্ধিমত্তার একটা পর্যায় সারণি তৈরি করা। এই সারণির মাধ্যমে প্রকৃতিতে উপস্থিত বিভিন্ন রকমের বুদ্ধিমত্তাকে শ্রেণিবিভক্ত করা যাবে। ঠিক যেমনটা রাসায়নিক পর্যায় সারণিতে হয়। কিন্তু সমস্যা হল এই শ্রেণীকরণ কিংবা বিন্যস্তকরণটা হবে কিসের ভিত্তিতে? রাসায়নিক পর্যায় সারণিতে যেমন পারমাণবিক সংখ্যা কিংবা পারমাণবিক ভরকে ভিত্তি করে মৌল গুলোকে সাজানো হয়েছে। তেমনি বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণি বানাতে হলেও তো এমন কিছু একটা মানদণ্ড দরকার। সেই মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করেই সব রকম প্রাণের বুদ্ধিমত্তাকে একটা সারণিতে বিন্যস্ত করা হবে।  

কি হতে পারে সেই মানদণ্ড? মগজের আকার? একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মগজের ওজন হয়ে থাকে এক থেকে দেড় কিলো’র এর ভেতর। পুরো শরীরের ওজনের প্রায় দুই শতাংশ। এতে থাকে ৮৬ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ। কিন্তু একটা তিমির মগজের সাইজ হয় ৯ কিলোগ্রাম, একটা আফ্রিকান হাতির মগজে আড়াই শ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ থাকে। ইঁদুরের মতই দেখতে ছোট্ট একটা প্রাণী হল শ্রু (shrew)। মগজের সাইজটা হবে এর দেহের দশ শতাংশের সমান। একটা মৌমাছির ব্রেন এর সাইজ দুই কিউবিক মিলিমিটারের চাইতেও কম। তবুও এরা পাঁচ পর্যন্ত গুণতে পারে, বোঝতে পারে শূন্যের মানে। যদিও এদের গণিতের চর্চা হয় এদের মত করেই। কাজেই মগজের আকার এই মানদণ্ড হতে পারে না। 

তবে বুদ্ধিমত্তার শ্রেণীকরণ করার একটা দারুণ উপায় হতে পারে প্রাণীদের আচরণ। সামুদ্রিক সেফালোপড কাটলফিশ এর কথাই ধরা যাক। পুরুষ কাটলফিশেরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য পুরুষ কাটলফিশদের বোকা বানায় এক অভিনব উপায়ে। একটা পুরুষ কাটলফিশ তার কাঙ্ক্ষিত নারী কাটলফিশ এবং  প্রতিদ্বন্দ্বী কাটলফিশ এর মাঝখানে অবস্থান করে দেহের রঙ পাল্টাতে থাকে। দেহের যে অংশটা তার প্রতিদ্বন্দ্বীর অভিমুখে আছে সেই অংশের রঙ নারী কাটলফিশের মত আর যে অংশ নারী কাটলফিশের দিকে মুখ করা সে অংশের রঙ পুরুষ কাটলফিশের মতন ধারণ করে। কিংবা একটা দাঁড়কাক এর কথাই ভাবুন। একটা দাঁড়কাককে যদি পানি-ভরতি পাত্রে খাবার দেয়া হয়, সে খাবার সংগ্রহে করতে কাক এক দারুণ বুদ্ধি খাটায়। পাত্রের পানির উচ্চতা নাগালসমান করার জন্যে ঐ পাত্রে পাথর ফেলতে থাকে। যতক্ষণ না পাত্রের পানির উচ্চতা নাগালে আসে, ততক্ষণ পাথর ফেলতেই থাকবে।  

একটা পুরুষ কাটলফিশ তার কাঙ্ক্ষিত নারী কাটলফিশ এবং  প্রতিদ্বন্দ্বী কাটলফিশ এর মাঝখানে অবস্থান করে দেহের রঙ পাল্টাতে থাকে।

কিন্তু আচরণের উপর ভিত্তি করে বুদ্ধিমত্তার শ্রেণীকরণ করাটা এতটাও সহজ কাজ না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতবিম্ব চিনতে পারাকে একটা উন্নত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হিসেবে ধরা হয়। ডলফিন, ম্যাগপাই এবং মান্টা রে এই কাজটি করতে পারলেও কুকুর’রা পারে না। তাহলে এটা কি কুকুর’দের নিম্ন শ্রেণীর বুদ্ধিমত্তার পরিচয়? নাকি এর অন্য কোনো মানে আছে, হয়ত কুকুর’রা দেখার ক্ষমতার চাইতেও গন্ধ শোঁকার ক্ষমতার উপর বেশি নির্ভরশীল। তাছাড়া প্রকৃতিতে এমন অনেক প্রাণী আছে যাদের গড়ন আমাদের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। এরা হয়ত এমন কিছু ইন্দ্রিয় ধারণ করে যেগুলোর অস্তিত্বই আমাদের মধ্যে নেই। নীল গভীর সমুদ্রের হাঙ্গর’রা এদের ইলেকট্রিক ফিল্ড ব্যবহার করে কাছাকাছি কোন প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেতে পারে। এই অসাধারণ আচরণকে বুদ্ধিমত্তার কোন পর্যায়ে ফেলা যাবে?

ডাইভারস ইন্টিলিজেন্স এর গবেষকরা মনে করেন বুদ্ধিমত্তাকে আরও স্বচ্ছভাবে বোঝতে হলে প্রতিটা প্রাণীর আচরণগত এবং নিউরোঅ্যানাটমিক্যাল বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটাতে হবে। বুদ্ধিমত্তার শ্রেণিবিভাগ করা কি আসলেই সম্ভব? তার জন্যে চাই নির্ভরযোগ্য অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য। এমন কোনো বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা কি  আদৌ সম্ভব হবে? 

নিখুঁত নির্বাচন       

বিবর্তন এই ব্যাপারে পথ দেখাতে পারে। বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধিমত্তা বিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন রকমে। ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর মগজের গড়ন ভিন্ন ভিন্ন। বিজ্ঞানীরা মগজের এই বিচির গড়নের মধ্যে সূত্র খুঁজে চলেছেন। জেলিফিশ’দের নিউরনের নেটওয়ার্ক বিকেন্দ্রিক ধরণের। এই ধরণের নিউরাল নেটওয়ার্কে সবগুলো স্নায়ুকোষই পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে। অর্থাৎ এদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বলে কিছু নেই। কৃমি এবং সামুদ্রিক স্লাগ’দের বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত আকারে কতগুলো নিউরন গুচ্ছ থাকে। মেরুদণ্ডীদের স্নায়ুকোষ গুলো পরস্পরের সাথে লুপে কাজ করে এবং একে অপরকে ফিডব্যাক দেয়। এই সবকটা গড়নেই তথ্যের বিন্যস্তকরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রসার হয় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে।

অক্টোপাস এবং কাটলফিশদের মতন সেফালোপডদের কথাই ভাবা যাক। বিবর্তনের অভিযাত্রায় এদের সাথে মানুষদের বিচ্ছেদ ঘটে প্রায় ছ’শ মিলিয়ন বছর আগে। আমাদের সাথে এদের মগজের পার্থক্যও বিস্তর। একটা অক্টোপাস এর দেহে নিউরন সংখ্যা সাড়ে পাঁচ শ মিলিয়ন। তার মধ্যে ১৬০ মিলিয়ন থাকে এদের বৃহৎ অপটিক লোব এ আর ৪২ মিলিয়ন থাকে ব্রেন এর মতন দেখতে একটা ছোট অঙ্গে। অক্টোপাসদের আটটা হাত জুড়ে থাকে প্রায় সাড়ে তিন শ মিলিয়ন নিউরন। আর তাই অক্টোপাসের হাত চারপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ এবং তথ্য প্রসেস করতে পারে স্বাধীনভাবে।

অক্টোপাসরা খুব সহজেই কোনো  পাত্রের মুখ খুলে ফেলতে পারে।

সেফালোপডরা এখনো বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী। অক্টোপাসরা খুব সহজেই কোনো  পাত্রের মুখ খুলে ফেলতে পারে। এই গুণ তাদের বিবর্তনের সাথে কোনভাবে সম্পর্কিত নয়। কাটলফিশেরা পরবর্তীতে আরো ভাল খাবার পাবার আশায় ইতিমধ্যে পাওয়া খাবার এর লোভ সংবরণ করতে পারে। তারা প্রায় দুই মিনিট অবধি নিজেদের পরিতৃপ্ত হবার তাড়না দমন করে রাখতে পারে। এই দক্ষতায় এরা শিম্পাঞ্জি’দের সমপর্যায়ের।

ভিন্ন ভিন্ন স্নায়ুবিক গঠনের সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতাও আছে বিভিন্ন রকমের। যেমন বিকেন্দ্রিক নিউরাল নেটওয়ার্ক বেশ দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে। অপরদিকে একটা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র দিয়ে সবরকম তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বুদ্ধিবৃত্তিক বাধা তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রকমের নিউরাল গঠন নিয়ে গবেষণা চালাবেন। উদ্দেশ্য নিউরাল গঠনের সাথে কোনো প্রাণীর শিখনের সীমাবদ্ধতা এবং শনাক্তযোগ্য কোনো সক্ষমতার সম্পর্ক আছে কিনা তা খুঁজে বের করা। রাসায়নিক পর্যায় সারণিতে মৌল গুলোর গাঠনিক ধর্ম পর্যায় সারণিটা সাজাতে সাহায্য করেছে। ফলে সহজ হয়ে গেছে মৌল গুলোকে ব্যাখ্যা করার কাজটা। বিজ্ঞানীরা তাদের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণিতে স্থান দেবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও। পরীক্ষা করে দেখবেন কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা থেকে আলাদা হয়। এই সারণি বোঝতে সাহায্য করবে কীভাবে বিভিন্ন জীব পরিবেশ এর নানান তথ্য কে একত্রিত করে অর্থবহ করে তোলে।

যা হউক, বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণি তৈরির এই আইডিয়া কতটা সফল হতে পারে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সন্দিহান। সন্দেহাতীত ভাবে এই আইডিয়াটা দারুণ। কিন্তু কতটা বাস্তবসম্মত তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। বুদ্ধিমত্তাকে শ্রেণীকরণ করা খুবই কঠিন একটা কাজ।           

কতটা সফল হবেন বিজ্ঞানীরা?  

বুদ্ধিমত্তার বৈচিত্র্যতায় কোনো সীমারেখা আছে কিনা এই ব্যাপারে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। তাই অনেকেই মনে করেন, “বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণি” বানানো একটা উদ্ভট ধারণা। আসলেই বিজ্ঞানীরা বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণি বানাতে কতটা সফল হবেন সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, এই গবেষণা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিমত্তা বিষয়টা খানিকটা হলেও বোঝা যাবে। শেখা যাবে অনেক কিছুই। সাধারণত অন্য কোনো প্রাণী প্রজাতির সাথে কেমন আচরণ করা উচিত তা অনেকাংশেই নির্ভর করে এরা কতটা বুদ্ধিমান তার উপর। 

সুতরাং এই প্রকল্প অন্যান্য প্রাণী প্রজাতির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাবে। ব্যক্তিত্ববোধ জাগ্রত হতে হলে দরকার হয় স্বকীয়তাবোধের। আর স্বকীয়তা আসে স্বাধীনভাবে এবং নমনীয় ভাবে কোনো কিছু করার সক্ষমতা থেকে। আর এই ব্যক্তিত্ববোধই একটা প্রাণীকে আইনি সুরক্ষার অধিকার দেয়। ইতিমধ্যেই আদালতে আইনজীবীরা দাবী করেছেন, শিম্পাঞ্জিদের মানুষদের জন্যে সংরক্ষিত সবরকম অধিকারই পাওয়া উচিত। 

বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণিতে মানুষদের অবস্থান কোথায় হবে? আমরা যেমনটা ভাবি, মানুষরা কিন্তু অন্যান্য প্রাণীদের থেকে ততটাও এগিয়ে নয়। টেক আয়ুমু নামের একটা শিম্পাঞ্জির সামনে মাত্র ৬০ (চোখের পলক ফেলবার চাইতেও কম সময়) মিলিসেকেন্ড সময়ের জন্যে নয়’টা এলোমেলো ক্রম সংখ্যা পর্দায় দেখানো হয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে আয়ুমু এই নয়’টা সংখ্যাই সঠিক ক্রম অনুসারে লিখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু মানুষ এই পরীক্ষায় খুব ভালো দক্ষতা দেখাতে পারে নি। এমনকি সে স্মৃতিশক্তির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বেন প্রিডমোরকেও হারাতে সক্ষম হয়। 

এসব স্বত্ত্বেও, মানব বুদ্ধিমত্তা অন্য সবার চেয়ে আলাদা এবং অসাধারণ। কেননা এই গ্রহের অন্য কোনো প্রাণীর দল নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে আজকের বিষয় নিয়ে আলোচনায় মত্ত হচ্ছে না। কিন্তু আমরা মানুষেরা হচ্ছি। নিশ্চয় মানুষের বুদ্ধিমত্তার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। সেই বিশেষত্বটা কি, সেটা বোঝতেই বুদ্ধিমত্তার পর্যায় সারণি আমাদের সাহায্য করবে।

বি. দ্র. লেখাটি পূর্বে দৈনিক বাংলার ইউরেকার পাতায় ছাপা হয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ নিউ সায়ন্টিস্ট ম্যাগাজিন এর ডিফরেন্টস মাইন্ড প্রবন্ধ অবলম্বনে লেখা।

লেখাটি 85-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Response

  1. লেখাটা নিসন্দেহে অসাধারণ। কিন্তু আমার মনে হয় রসায়নের পর্যায় সারণি থেকেও অনেক বেশি ব্যতিক্রম এই সারণিতে ঘটবে। বুদ্ধিমত্তা পরিবর্তনশীল।

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers