চাঁদের অন্ধকার প্রান্তেই কেন?

চাঁদের অন্ধকার প্রান্তে পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে, চাঁদের অন্ধকার প্রান্তে টেলিস্কোপ বসানো হচ্ছে, চাঁদের অন্ধকার প্রান্তেই ল্যান্ড করেছে চন্দ্রযান-৩। প্রশ্ন হচ্ছে হঠাৎ করে সবাই চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠের পিছনেই লেগে পড়ল কেন? কী-ই বা আছে এমন এখানে? 

চাঁদের অন্ধকার প্রান্ত

পৃথিবী থেকে কখনই পুরো চাঁদকে আমরা দেখতে পাই না। আমরা সবসময় চাঁদের এক পাশই দেখতে পাই। চাঁদের যে অংশকে আমরা কখনই পৃথিবী থেকে দেখতে পাই না ঐ অংশকে আমরা বলি চাঁদের অন্ধকার প্রান্ত (Far Side)। 

চাঁদের কেবল একপাশকেই সবসময় দেখতে পাওয়ার কারণ হচ্ছে চাঁদ নিজ অক্ষের উপর যতদিনে ঘুরে আসে ঠিক ততদিনেই সে পৃথিবীর চারপাশেও একবার ঘুরে আসে। চাঁদের এই আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি সমান হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত চাঁদের কেবল এক পাশকেই আমরা সবসময় দেখতে পাই। পৃথিবী থেকে চাঁদের কেবল একপাশকে দেখতে পাওয়ার এ ঘটনাকে কেতাবি ভাষায় বলা হয় ‘টাইডাল লকিং’। 

(বামে) পৃথিবীর সাথে চাঁদের টাইডাল লকিং এর কারণে চাঁদের কেবল এক পাশ দেখা যাচ্ছে। (ডানে) পৃথিবীর সাথে চাঁদের টাইডাল লকিং না থাকার কারণে চাঁদের সব পাশই দেখা যাচ্ছে। ছবি স্বত্ব – উইকিমিডিয়া/Stigmatella Aurantiaca 

ধারণা করা হয় থিয়া নামে একটি প্রাচীন গ্রহ ছিল। কোনো এক সময়ে থিয়া নামক ঐ গ্রহের সঙ্গে আমাদের পৃথিবীর সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে থিয়ার অবশিষ্টাংশ থেকেই সৃষ্টি হয় আমাদের চাঁদ। চাঁদ যখন প্রথম সৃষ্টি হল তখন চাঁদের সাথে পৃথিবীর এ টাইডাল লকিং ছিল না। ফলে পৃথিবী থেকে চাঁদের সকল জায়গা মাসের কোনো না কোনো সময়ে দেখা সম্ভব ছিল। তবে ধীরে ধীরে চাঁদের উপর পৃথিবী তার মহাকর্ষ বলের আধিপত্য দেখানো শুরু করে। পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের প্রভাবে চাঁদের নিজ অক্ষের উপর ঘুর্ণন গতি নিয়ন্ত্রনে আসে। ধীরে ধীরে চাঁদ পৃথিবীর সাথে টাইডালি লক হয়ে যায়।  

চাঁদের পৃষ্ঠে পানি

বলা হয়ে থাকে পানিই জীবন। মানুষসহ অধিকাংশ জীবের কোষের একটি বিশাল অংশ জুড়ে পানি থাকে। ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি নেই তা আন্দাজ করার আগে আমরা খুঁজে দেখি ঐ গ্রহে পানি রয়েছে কি না! সৌরজগতের গোল্ডিলকস জোনে আমাদের পৃথিবী অবস্থিত। এই অঞ্চল থেকে যদি পৃথিবী সূর্যের দিকে একটু বেশি এগিয়ে থাকত তাহলে তাপমাত্রা অধিক থাকার কারণে সব পানি আয়নিত হয়ে যেত। যদি পৃথিবী সূর্যের থেকে আরেকটু দূরে থাকত তাহলে তাপমাত্রা কম থাকায় পৃথিবীর পানি জমে বরফ হয়ে যেত। মূলত এসব কারণেই মঙ্গল গ্রহে জমাটবাধা বরফ থাকলেও জীবনধারণের জন্য কোনো পানির উপাদান নেই। সূর্যের অতি কাছে থাকা এবং অতি দূরে থাকা উভয়ই জীবন ধারনের জন্য প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি করে। এমন অবস্থায় যদি কোনোভাবে বরফগুলোকে গলিয়ে এসব প্রতিকূল পরিবেশকে উপযুক্ত করা যায় তাহলে সেখানেও জীবন ধারণ সম্ভব। 

চাঁদের অন্ধকার প্রান্তে বরফের (নীল রঙ দিয়ে চিহ্নিত) অস্তিত্ব রয়েছে। ছবি স্বত্ব: Smithsonian Magazine

২০০৮ সালে ভারতের প্রথম মহাকাশযান ‘চন্দ্রযান-১’ চাঁদে পৌঁছায়। নাসা চন্দ্রযান-১ এ করে মুন মিনারলজি ম্যাপার (Moon Mineralogy Mapper) নামে একটি যন্ত্র পাঠায়। সংক্ষেপে এ যন্ত্রটিকে M3 ও বলা হয়। এক কথায় বলতে গেলে যন্ত্রটির কাজ হচ্ছে চাঁদের পৃষ্ঠে কী কী মৌল ও যৌগ রয়েছে তা শনাক্ত করা। চন্দ্রপৃষ্ঠে ঘোরাঘুরির সময়ে  M3 একদিন বরফরূপে পানি ও হাইড্রক্সিল আয়নের সন্ধান পায়। ২০০৯ সালে চন্দ্রপৃষ্ঠে পানির অস্তিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করে নাসা। মজার বিষয় হচ্ছে চন্দ্রপৃষ্ঠের অন্য কোনো জায়গায় নয় বরং অন্ধকার প্রান্তেই বরফরূপী পানির খোঁজ পাওয়া যায়। চাঁদের পৃষ্ঠে কেন এই পানি তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা এখনও আমরা পাই নি। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, সূর্য থেকে আসা উচ্চশক্তি সম্পন্ন ইলেকট্রন চাঁদের মাটিতে থাকা প্রোটনের সাথে মিলে এক পর্যায়ে হাইড্রোক্সিল এবং পানির বরফ সৃষ্টি করে। 

ধারণা করা হয়, চাঁদ সৃষ্টির সময় চাঁদের অন্ধকার প্রান্তে অনেক বেশি গ্রহাণু আছড়ে পড়ত। ফলে চাঁদের অন্ধকার প্রান্তে অনেক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। চাঁদের অন্ধকার প্রান্ত এরূপ এবড়ো-থেবড়ো হওয়ার কারণে সেখানে কোনো মহাকাশযান অবতরণ করানো বেশ জটিল।  এসব গর্তে বেশিরভাগ সময়ই ছায়া থাকে। তাই সূর্যের আলোক রশ্মি এসব জায়গায় পৌঁছায় না বলেই এসব গর্তে পানি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। চাঁদের অন্ধকার প্রান্তে পানির খোঁজে যাওয়া সকল মহাকাশযান তাই শুরুতেই এসব গর্তগুলো নিয়ে কাজ করে, খুঁজে দেখে এখানে পানি রয়েছে কি না। 

চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠে ল্যান্ড করা চন্দ্রযান-৩ এর ছবিটি তুলেছে ‘প্রজ্ঞান’ রোভার। ছবি স্বত্ব – ISRO

গত ২৩ আগস্ট চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলে অবতরণ করে চন্দ্রযান-৩। এ মিশনে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এ বরফরূপী পানি নিয়ে আরো বিস্তারিত জানতে কাজ করবে এ নভোযানটি। চাঁদে পানির সন্ধান শুধুমাত্র যে জীবনধারনে সক্ষমতার সম্ভাবনা দেয় এমন না। চাঁদে বিদ্যমান পানি ব্যবহার করে বানানো যেতে পারে রকেটের ফুয়েল। ফলে পরবর্তীতে চাঁদের ভূমি থেকেই সহজে রকেটকে আরো দূরবর্তী স্থানে পাঠানোর অভিযানগুলো সহজ হবে। 

ভবিষ্যতের টেলিস্কোপ

আমরা সচরাচর অপটিক্যাল টেলিস্কোপ দেখে থাকি। অপটিক্যাল টেলিস্কোপ তৈরিতে লেন্স বা আয়না ব্যবহার করা হয়। বস্তু থেকে আসা আলো লেন্স বা আয়নাতে এসে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফোকাস বিন্দুতে পড়ে। এরপর আমরা বস্তুটিকে দেখতে পাই। অনেক বস্তু এমনও আছে যেগুলো থেকে দৃশ্যমান আলো বের হয় না। যেমন ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন অঞ্চল, পালসারের রেডিও জেট কিংবা আমাদের সূর্যেরই সৌরঝড়ের চিহ্ন। এগুলো থেকে দৃশ্যমান আলো বের হয় না বলে আমরা এদেরকে খালি চোখে দেখতেও পারি না। এসকল আপাত দৃষ্টিতে ‘অদৃশ্য’ বস্তুগুলোকে দেখার জন্য প্রয়োজন বিশেষ একপ্রকার টেলিস্কোপ। অধিকাংশ সময়েই এসকল আপাত দৃষ্টিতে ‘অদৃশ্য বস্তু’ রেডিও সিগন্যাল বিচ্ছুরণ করে। এসকল রেডিও সিগন্যাল দেখার জন্য আমাদের কাছে থাকে বিভিন্ন রেডিও টেলিস্কোপ। 

একটি আধুনিক রেডিও টেলিস্কোপ। রেডিও তরঙ্গের প্রতিফলনের ধর্মকে ব্যবহার করে এধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করা হয়েছে। সূত্র- NRAO/AUI/NSF

এসব রেডিও টেলিস্কোপে অধিকাংশ সময় একটি প্যারাবোলিক আকৃতির একটি ডিশ থাকে। মহাকাশের বিভিন্ন বস্তু থেকে আসা রেডিও সিগন্যাল একটি বিন্দুতে ফোকাস করে এই পরাবৃত্ত আকৃতির ডিশ। ফোকাসের পর সিগন্যালগুলোকে রেকর্ড করা হয়। অতঃপর সিগন্যালগুলোকে একটি কো-এক্সিয়াল তারের মাধ্যমে ট্রান্সফার করে নিয়ে আসা হয় কম্পিউটারে। এসব সিগন্যালকেই পরে বিশ্লেষণ করে আমরা ঐ বস্তুর ছবি তৈরি ও নানা তথ্য পেয়ে থাকি। 

চাঁদের অন্ধকার প্রান্তের একটি গর্তে (ক্রেটার) এলসিআরটি (LCRT) নামে একটি রেডিও টেলিস্কোপ বানানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ক্যালটেক/নাসা জেট প্রপালশন ল্যাব। এলসিআরটি দিয়ে বুঝায় লুনার ক্রেটার রেডিও টেলিস্কোপ। বানানোর পর এই টেলিস্কোপের ব্যাস হবে প্রায় এক কিলোমিটার। তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে মানুষের বানানো সবচাইতে বড় রেডিও রেডিও টেলিস্কোপের খেতাব পাবে এটি। 

চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠে এই টেলিস্কোপটি বসানোর কারণ হচ্ছে সূর্য থেকে আসা বিকিরণ থেকে মুক্ত থাকবে এই টেলিস্কোপ। তাই সরাসরি বাইরের জগতের নক্ষত্রগুলো অবাঞ্ছিত কোনো সিগন্যাল ছাড়াই দেখতে পারবে এই টেলিস্কোপ দিয়ে। আমাদের মহাবিশ্বের ‘ডার্ক এইজ’ পর্যবেক্ষণে ভূমিকা রাখবে এই টেলিস্কোপটি। 

শিল্পীর চিত্রে লুনার ক্রেটার রেডিও টেলিস্কোপ। সূত্র – Vladimir Vustyansky

তথ্যসূত্র

  1. চাঁদের Tidal Locking নিয়ে বিস্তারিত জানতে Tidal Locking | Earth & Tides – Moon: NASA Science 
  2. M3 নিয়ে আরো বিস্তারিত জানার জন্য Moon Mineralogy Mapper – Wikipedia
  3. চাঁদে পানির অস্তিত্বের খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানতে Character and Spatial Distribution of OH/H2O on the Surface of the Moon Seen by M3 on Chandrayaan-1 | Science 
  4. https://solarsystem.nasa.gov/news/853/how-ingredients-for-water-could-be-made-on-the-surface-of-moon/ 
  5. S. Bandyopadhyay et al., “Conceptual Design of the Lunar Crater Radio Telescope (LCRT) on the Far Side of the Moon,” 2021 IEEE Aerospace Conference (50100), Big Sky, MT, USA, 2021, pp. 1-25, doi: 10.1109/AERO50100.2021.9438165

লেখাটি 138-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Response

  1. মুনেম শাহরিয়ার Avatar
    মুনেম শাহরিয়ার

    লেখককে ধন্যবাদ এত সুন্দর করে লিখে বোঝানোর জন্য।

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 906 other subscribers