চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বে নোবেল ২০২৩

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

৩০ জানুয়ারি, ২০২০ সাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক ভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করে। কারণ, চীনের উহান প্রদেশ থেকে পুরো বিশ্বে বেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সার্স কোভ-২ (SARS-CoV-2) নামে করোনা ভাইরাস। কিন্তু কোনো লাভ হল না। এই ভাইরাস পুরো পৃথিবীতে মহামারি বাধিয়ে দিল। সারা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা পড়ল করোনার সংক্রমণে। পৃথিবীর মানুষকে বাঁচানোর গুরু দায়িত্ব তখন সকল স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে সারা বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাঁধে। ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মোক্ষম উপায় হল আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্যে প্রস্তুত করা। আর সেই কাজটা করা হয় টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে। বিশ্বের বিজ্ঞানীরা তখন উঠে পড়ে লেগেছেন করোনার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে।

প্রাণরসায়নবিদ ক্যাতালিন ক্যারিকো

বলা যায় খুব দ্রুত সফলও হয়েছিলেন গবেষকরা। এত দ্রুত হারে টিকা প্রস্তুত করতে পারার একটা প্রধান কারণ এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার। এভাবে প্রস্তুতকৃত টিকাকে বলা হয় এমআরএনএ ভ্যাকসিন। করোনার প্রকোপ থেকে মানুষকে বাঁচাতে বেশ বড় ভূমিকা রেখেছে এই এমআরএনএ ভ্যাকসিন। আর এই ধরনের টিকা আবিষ্কারের পেছনে সবচাইতে বড় ভূমিকা রেখেছে হাঙ্গেরীয় প্রাণরসায়নবিদ ক্যাতালিন ক্যারিকো এবং মার্কিন বিজ্ঞানী ড্রু ওয়াইজম্যান এর যুগান্তকারী গবেষণা। এমআরএনএ এর নাইট্রোজেনাস ক্ষার পরিবর্তন করে তারা দেখিয়েছিলেন এমআরএনএ কি করে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলে। এই কালজয়ী গবেষণার জন্যেই এবছর শারীরতত্ত্ব ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলটা তাদের ঝুলিতে যায়। 

ড্রু ওয়াইজম্যান

করোনা মহামারির আগে কী করে টিকা বানানো হতো?   

আগেই বলেছি, কোনো প্যাথোজেন (রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া) এর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে টিকা প্রদান করা হয়। আগে সাধারণত টিকা তৈরি করতে দুর্বল কিংবা মৃত ভাইরাসকে ব্যবহার করা হত। রোগসৃষ্টির আগেই নির্দিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা সৃষ্টি করতে ঐ ভাইরাসটাকে দুর্বল কিংবা মেরে ফেলে শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হত। ফলে আগে থেকেই আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা ঐ ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকত। পোলিও, হাম ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুত টিকা গুলো এই গতানুগতিক পদ্ধতিতেই তৈরি করা হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে টিকা তৈরি করতে সম্পূর্ণ ভাইরাসটাকেই ব্যবহার না করে কোনো অংশ যেমন প্রোটিন, কিংবা ভাইরাসের জিনোমের কোনো অংশ ব্যবহার করা হয়। যেমন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ভ্যাকসিন এভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিংবা ভাইরাসের জিনোমের কোনো অংশ ক্ষতিকর না এমন কোনো ভাইরাল বাহকের ভেতর প্রবেশ করিয়েও টিকা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ ভাইরাস, প্রোটিন কিংবা বাহক ব্যবহার করে তৈরি টিকার একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে- বেশ বড় পরিসরে কোষ কালচার করা লাগে। যার জন্যে অনেক সময়ের দরকার হয়। কিন্তু মহামারির সময় টিকা প্রস্তুত করতে হয় বেশ দ্রুত। সেই সাথে অল্প সময়ে প্রচুর পরিমাণে টিকা উৎপাদন করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। 

এমআরএনএ ভ্যাকসিন কি করে বিপ্লব ঘটালো

আমাদের কোষে প্রোটিন তৈরি হয় বার্তাবাহক আরএনএ (mRNA-messenger RNA) থাকা জিনোম সংকেত থেকে। আর এই এমআরএনএ তৈরি হয় ডিএনএ থেকে ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়ায়। ১৯৮০ সালে বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে কোনোরকম কোষ কালচার ছাড়াই কি করে এমআরএনএ প্রস্তুত করতে হয় সেই পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেন। এই আবিষ্কারই এমআরএনএ ব্যবহার করে টিকা তৈরির দ্বার খুলে দেয়। কিন্তু একটা বড় বাঁধা রয়ে গেল। গবেষণাগারে বানানো এমআরএনএ-র স্থিতিশীলতা খুব কম হয়। ফলত এভাবে তৈরি এমআরএনএ কোষের ভেতর প্রবেশ করানোটা একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। পাশাপাশি গবেষণাগারে তৈরি এমআরএনএ প্রয়োগে শরীরের ভেতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু এইসব বাঁধা থামাতে পারেনি হাঙ্গেরিয়ান প্রাণরসায়নবিদ ক্যাতালিন ক্যারিকো কে। 

ক্যারিকোর জন্ম ১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরির শোনাক শহরে। ১৯৮৯ সালে তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ২০১৩ সাল অবধি তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি করোনার এমআরএনএ টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক আরএনএ ফার্মাসিউটিক্যালস-এ সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি হাঙ্গেরির সেগেড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেরেলম্যান স্কুল অফ মেডিসিন-এ সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ক্যারিকো এমআরএনএ কে চিকিৎসা থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে তার সাথে দেখা হয় মার্কিন ইমিউনোলজিস্ট ড্রু ওয়াইজম্যান এর। ওয়াইজম্যানের জন্ম ১৯৫৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেক্সিংটন শহরে। ১৯৯৭ সালে পেরেলম্যান স্কুল অব মেডিসিন-এ তিনি গড়ে তুলেন তাঁর গবেষণা দল। তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং দ্য পেন ইনস্টিটিউট ফর আরএনএ ইনোভেশন এর পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। ওয়াইজম্যান ডেনড্রাইটিক কোষ নিয়ে বেশ কৌতূহলী ছিলেন। এই বিশেষ ধরনের কোষগুলো ভ্যাকসিন প্রয়োগে সৃষ্ট প্রতিরক্ষা সাড়া সক্রিয়করণে ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে  এই দুই সহকর্মী একজোট হয়ে গবেষণা শুরু করলেন, বিভিন্ন ধরনের আরএনএ  কি করে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলে সেটা বুঝতে। 

ক্যারিকো এবং ওয়াইজম্যান খেয়াল করলেন, ডেনড্রাইটিক কোষগুলো গবেষণাগারে প্রস্তুত এমআরএনএ কে এন্টিজেন হিসেবে শনাক্ত করে। সেই সাথে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঐ এমআরএনএ এর বিরুদ্ধে সক্রিয় করতে নানান রকম প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করতে থাকে। ফলে মানব কোষে প্রয়োগ করা এমআরএনএ ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সরাসরি স্তন্যপায়ী কোষ থেকে নেয়া এমআরএনএ এর ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। আরএনএ তে এডিনিন, সাইটোসিন, ইউরাসিল এবং গুয়ানিন নামের চার রকমের বেস থাকে। সরাসরি স্তন্যপায়ী কোষ থেকে নেয়া এমআরএনএ এর বেস গুলিতে বেশ দ্রুত রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আর সেকারণেই স্তন্যপায়ী কোষ থেকে নেয়া এমআরএনএ সেরকম কোনো সাড়া তৈরি করে না। কিন্তু গবেষণাগারে তৈরি এমআরএনএ এর ক্ষেত্রে সেরকমটা হয় না। পরবর্তীতে ২০০৮ এবং ২০১০ সালে, ক্যারিকো এবং ওয়াইজম্যান দেখান যে, বেস পরিবর্তন করে এমআরএনএ অপরিবর্তিত এমআরএনএ এর তুলনায় অনেক বেশী পরিমাণে প্রোটিন তৈরি করে। আর এভাবেই, এমআরএনএ এর বেস পরিবর্তন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টির পরিমাণ কমিয়ে আনে এবং প্রোটিন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। সেই সাথে দেহের ভেতর এমআরএনএ কে ভেঙ্গে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এই দুই বিজ্ঞানী উদ্ভাবন করেন এক বিশেষ প্রকার লিপিড ন্যানোপার্টিকেল ক্যাপসুল। এই ক্যাপসুলে আবদ্ধ করে এমআরএনএ কে দেহে প্রয়োগ করা হয়। 

ফলত এমআরএনএ কে থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করায় আর কোনো বাঁধা রইল না। আর এরই ধারাবাহিকতায়, সম্ভব হয়েছে এমআরএনএ ভ্যাকসিন আবিষ্কার। এ ধরনের ভ্যাকসিন উৎপাদন করার জন্যে অনেক বেশী সময় নিয়ে কোষ কালচার করার দরকার পড়ে না। কেননা এ ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করার জন্যে সম্পূর্ণ ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়ার দরকার পড়ে না। শুধু দরকার হয় ঐ প্যাথজেনের জিনোমের অনুক্রম।  ফলে অল্প সময়ে অনেক বেশি পরিমাণে টিকা উৎপাদনও সম্ভব হয়ে উঠে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে, ক্যারিকো এবং ওয়াইজম্যান, জিকা, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং এইচআইভির বিরুদ্ধে প্রাণী দেহে বার কয়েক এমআরএনএ টিকার ট্রায়াল চালিয়েছেন। এইচআইভি ছাড়া বাদবাকি সবকটা ভাইরাসের বিরুদ্ধেই এ ধরনের টিকা বেশ ভাল কার্যকারিতা দেখিয়েছে। করোনাকালীন সময়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে এই এমআরএনএ টিকা। ক্যারিকো এবং ওয়াইজম্যান এর এই আবিষ্কারের ভবিষ্যৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখবে। ক্যান্সার, সিকল সেল অ্যানেমিয়া, স্বতঃঅনাক্রম্য রোগ, খাবারে অ্যালার্জিসহ আরও নানান রকম রোগের চিকিৎসায় এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ওয়াইজম্যান আশা করছেন আগামী দেড় বছরের মধ্যেই সিকল সেল অ্যানেমিয়া রোগীদের জন্যে এমআরএনএ থেরাপি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তিনি নিজেও কয়েকটা এমআরএনএ ট্রায়াল প্রজেক্টে হাত দিয়েছিলেন। এর মধ্যে আছে অ্যামাইলোডোসিস রোগের প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল এবং এইচআইভি, ম্যালেরিয়া ও নোরো ভাইরাসের বিরুদ্ধে এমআরএনএ টিকার ট্রায়াল। করোনাভাইরাসের জন্যে একটা “প্যান করোনা ভাইরাস টিকা” উদ্ভাবনের পরিকল্পনাও আছে ওয়াইজম্যান ও তাঁর গবেষণা দলের, যা ভবিষ্যতে করোনা মহামারি ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে।    

তথ্যসূত্রঃ  

Press release: The Nobel Prize in Physiology or Medicine 2023 – NobelPrize.org

Scientists behind mRNA COVID Vaccines Win 2023 Nobel Prize in Physiology or Medicine – Scientific American

লেখাটি 104-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।