জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে সমুদ্রগুলোকে প্রভাবিত করছে?

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

“UN Climate Change” প্রতিষ্ঠানটি বলছে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্র দীর্ঘকাল ধরে ভুগছে। মহাসাগরগুলো পৃথিবীতে আটকে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন থেকে মুক্ত হওয়া অতিরিক্ত তাপ এবং শক্তি শোষণ করে। সমুদ্র এই ক্রমবর্ধমান ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন দ্বারা উৎপন্ন তাপের প্রায় ৯০% শোষণ করে।

অত্যাধিক তাপশক্তি সমুদ্রকে ক্রমেই উষ্ণ করে তুলছে। তাপমাত্রার পরিবর্তনে বরফ-গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এর পাশাপশি সামুদ্রিক তাপ-প্রবাহ (Marine heat waves) তীব্রতর হচ্ছে এবং সমুদ্রের এসিডিফিকেশন ঘটছে। এর ফলে ক্যাসকেডিং ইফেক্ট দেখা দিচ্ছে অর্থাৎ কিছু নির্দিষ্ট কারণে পুরো সামুদ্রিক সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনগুলি শেষ পর্যন্ত সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারীদের জীবন ও জীবিকার উপর একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে। দেখুন, ৩০ কোটিরও বেশি মানুষের প্রোটিন চাহিদা পূরণে মাছ একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সমুদ্রের উপরে যেই প্রভাবগুলো পড়ছে, সেগুলো এই মৎসজগৎকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

চলুন, এমন কিছু উপাত্ত, গবেষণা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জেনে নেওয়া যাক, যেখান থেকে আপনি কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারবেন যে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে সমুদ্রগুলোকে প্রভাবিত করছে।

বিশ্বের মেরু অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বরফের গলনের কারণে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ত্বরান্বিত হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ তথ্য দেখায় যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ২০২১ সালে একটি নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে, যা ২০১৩ থেকে ২০২১ সময়কালে প্রতি বছর গড়ে ৪.৫ মিলিমিটার বেড়েছে।

তীব্রতর গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে মারাত্মক ঝড়-বৃষ্টি এবং উপকূলীয় বিপদ যেমন বন্যা, ক্ষয় এবং ভূমিধসের মতো চরম ঘটনাগুলি বেড়েই চলেছে, যা এখন অনেক জায়গায় বছরে অন্তত একবার হলেও ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখতে পাবেন, প্রতি শতাব্দীতে একবার এই ধরনের মারাত্মক বিধ্বংসী ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ইন্টারগভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) বলেছে যে বেশ কয়েকটি অঞ্চল, যেমনঃ পশ্চিম ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে এবং দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে।  

জলবায়ুর ক্রম পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ফ্রিকোয়েন্সি দ্বিগুণ, দীর্ঘস্থায়ী, তীব্রতর এবং বিস্তৃত হয়েছে। আইপিসিসি বলছে যে ১৯৭০ এর দশক থেকে সমুদ্রের তাপ বৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক হলো মানুষের ভুল ও খামখেয়ালি। যখন সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য গড় তাপমাত্রার থেকে ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়, তখন সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ঘটে। এর ফলে সমুদ্রে অক্সিজেনের ঘনত্ব কমে যাচ্ছে। কারণ ঠান্ডা পানি যেরকম অক্সিজেন ধারণ করতে পারে, গরম পানি সেরকম পারে না।

২০০৬ এবং ২০১৫ এর মধ্যে বেশিরভাগ তাপপ্রবাহ সংঘটিত হয়েছিল, যার ফলে ব্যাপক প্রবাল ব্লিচিং এবং প্রবাল প্রাচীরের ক্ষয় ঘটে। ২০২১ সালে, বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৬০% অন্তত একটি সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম বলছে যে পৃথিবীর প্রতিটি প্রবাল প্রাচীরে যদি পানি উষ্ণ হতে থাকে তবে শতাব্দীর শেষের দিকে পুরোটাই ব্লিচ হয়ে যেতে পারে।

এই ব্লিচিং আবার কী? যখন পানি খুব উষ্ণ হয়ে যায়, তখন ঐ অংশের প্রবালগুলি তাদের টিস্যুতে বসবাসকারী শৈবালকে (জুক্সানথেলা) বের করে দেয়, যার ফলে প্রবাল সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়। একে বলা হয় কোরাল (প্রবাল) ব্লিচিং। যখন একটি প্রবাল ব্লিচ হয়, তখন প্রবালগুলো একদম পুরোপুরি মারা না গেলেও তাদের উপর অত্যাধিক চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাবটা পরে ঐ পানিতে থাকা মাছগুলোর উপরে।

একদিকে প্রবালগুলো মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে এবং অন্যদিকে সমুদ্রজগতের বেশ কিছু প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. জায়মারা সেরানো বলেন, “প্রবাল প্রাচীরগুলি মৎস্য চাষের জন্য অপরিহার্য। মাছ সহ সমস্ত সামুদ্রিক প্রাণীর প্রায় ২৫% তাদের জীবনচক্রের কোনো না কোনো সময়ে প্রবাল প্রাচীরের উপর নির্ভর করে”।

ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা সামুদ্রিক এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের অপরিবর্তনীয় ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে চলেছে। সমুদ্রের হুঙ্কারে ম্যানগ্রভ বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার আগেই বলেছি যে প্রবাল প্রাচীরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেখানে বসবাসরত প্রাণীদের কেউ কেউ তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিলেও বাকিরা মেরুতে বা নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে।

বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইডের ক্রমবর্ধমান শোষণের কারণে সমুদ্রের এসিডিফিকেশন ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, ক্রাস্টেসিয়ান, মোলাস্কাস সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক জীবের উপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব জীবদের কেউ কেউ খাপ খাওয়াতেও পারছে না, আবার স্থানান্তরও হতে পারছে না। ফলে তাদেরকে বিলুপ্তির দিকে যেতে হচ্ছে।

ইউনেস্কো সর্বশেষ সতর্ক করে যে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি সামুদ্রিক প্রজাতি ২১০০ সালের মধ্যে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। আজ গড় তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে বিশ্বের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের আনুমানিক ৬০% ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এই মাত্রা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তাহলে ৭০%-৯০% প্রবাল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রায় ১০০% সামুদ্রিক প্রবালের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এছাড়াও এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, কিলার হোয়েল, ব্লুফিন টুনা এবং পঞ্চাশ ধরনের হাঙর ও হাঙরের আত্মীয় প্রাণীরা বিলুপ্তির পথে হাঁটছে। যদিও এদের বিলুপ্তির পেছনে অবাধ শিকার একটি বড় কারণ, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনও এক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী। কারণ এর ফলে খাদ্যশৃঙ্খলে ক্ষতিকর পরিবর্তন এসেছে এবং সমুদ্রের পরিবেশ দিনকে দিন প্রতিকূল হচ্ছে।

আপনি কি জানেন সামুদ্রিক শৈবালই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করে? আপনি হয়ত জানেন যে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর উপর গবেষণা করে ক্যান্সারের প্রতিষেধক (যেমনঃ Discodermolide, bryostatins, sarcodictyin ইত্যাদি) উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু সমুদ্র যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাতে কি অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যেতে পারে না? ক্যান্সারের প্রতিষেধক পাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে না?

এতক্ষণ ধরে যেসব বিষয় শুনলেন, তাতে কী মনে হচ্ছে? নিশ্চয়ই ভাবছেন যে আমরা একটি বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হতে চলেছি। একদিকে আমরা সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের বারোটা বাজিয়ে ঐসব প্রাণীদের ক্ষতি করছি, অন্যদিকে নিজেদের জন্যও বিপদ ডেকে আনছি। এই মুহূর্তে আমরা কি সচেতনতামূলক কিছু করতে পারি না?

মূল রেফারেন্সঃ How is climate change impacting the world’s ocean

লেখাটি 51-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 906 other subscribers