কোটার্ড সিনড্রোম: নিজেকে মৃত ভাবার অদ্ভুতুড়ে অসুখ

হেড অফিসের এক বড়বাবুর কথা কবিতার ছন্দ-সুরে আমাদের জানিয়ে গেছেন কবি সুকুমার রায়। একনাগাড়ে চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে যার কিনা সহসাই মনে হয়েছিল, তার গোঁফজোড়া চুরি হয়ে গেছে। কিন্তু জানেন কি, এই ধরণীতে এমন কিছু সত্যিকার মানুষেরও দেখা মেলে, যারা কি-না বেখেয়ালি মনে যোগ দিয়েছেন এই কল্পিত বড়বাবুরই দলে? কেবল গোঁফ-দাড়ি নয়, হাত-পা, পেট-মাথার মতো এক বা একাধিক অঙ্গকেই মাঝে মাঝে খুঁজে পান না তারা। কখনো কখনো প্রাণভোমরাও হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হয় তাদের। কিন্তু কেন? আসুন, জেনে আসা যাক।

উৎপত্তি

১৭৮৮ সাল। যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য এক হাসপাতালের মানবিক চিকিৎসক ডা. চার্লস বনেটের চেম্বারে উপস্থিত হয়েছেন একজন অশীতিপর বৃদ্ধা। সঙ্গে এসেছেন বৃদ্ধার বড় মেয়ে। একে দুইয়ে এসেছেন অন্যরাও। বৃদ্ধার অসুখ, রান্নাঘরে খাবার তৈরির সময় একপাশ অবশ হয়ে যায় তার। খানিকক্ষণ পর অবশভাব কেটে গেলে তিনি নিজেকে মৃত বলে দাবি করেন। বাসায় উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলে উঠেন, শুভ্র কাপড় পরিয়ে তাকে কফিনে শুইয়ে দেওয়া হোক। রেখে আসা হোক মাটির গহ্বরে। প্রথম কিছুদিন মেয়েরা মায়ের এমন আচরণকে বয়সের ছাপ মনে করেছিলো। ভেবেছিলো, অগত্যা প্রলাপ বকছেন। কিন্তু না! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তার এমন অদ্ভুতুড়ে কথাবার্তা।

একসময় বৃদ্ধা শুরু করেন অনুরোধ, তার জন্য অতি দ্রুত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করা হোক। সুন্দর কাপড় পরিয়ে,  কফিনে মুড়িয়ে রেখে আসা হোক কবরে। আর তাই একসময় অগত্যা বাধ্য হয়ে তারা বাড়ির উঠোনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করে। সমবেত করে নিকট আত্মীয়দের। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বৃদ্ধা ঘুমিয়ে পড়লে তার পরিহিত কাপড় পরিবর্তন করা হয়। পরানো হয় নির্মল বস্ত্র। খবর পাঠানো হয় তার চিকিৎসক ডা. চার্লস বনেটের কাছে। বনেট এসে রোগীকে আবারও পরখ করেন। দিয়ে যান কিছু পথ্য। এগুলো সেবন করে বৃদ্ধা কিছুদিন স্বাভাবিক থাকলেও আবারও প্রকাশ পায় তার বিদঘুটে আচরণ।

বৃদ্ধার পরিণতি কী হয়েছিল তা অবশ্য পরে আর জানা যায় নি আর। খোঁজ মেলে নি ইতিবৃত্তের বর্ণনা। সবকিছুই হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে। ধারণা করা হয়, বৃদ্ধা এই বীভৎস রোগকে ধারণ করেই একসময় মারা যান। হারিয়ে যান মৃতদের দুনিয়ায়।

চিকিৎসক ডা. চার্লস বনেট (বামে) ও ফরাসি স্নায়ুবিশারদ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জুলস কোটার্ড (ডানে); ছবি সূত্র: Getty Images

আরেকটি ঘটনা

এই ঘটনার প্রায় ১০০ বছর পর, ১৮৮০ সালে ফরাসি স্নায়ুবিশারদ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জুলস কোটার্ডের শরণাপন্ন হন একজন রোগী। বয়স তার ৪৩-এর কোটায়। তিনি এসে জানান, তার স্নায়ু, মগজ, বুক, পেট, নাড়িভুঁড়ি কিচ্ছুটি নেই! কেবল আছে পচনধরা দেহ, মড়মড়ে সব হাড়! এমনকি তার ভেতরে প্রাণের স্পন্দনও নেই। নেই পবিত্র কোনো সত্তারও উপস্থিতি। আর তাই, ভদ্রমহিলার দাবি, তিনি যেহেতু মৃত, তার বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই উপাদেয় ভোজনেরও৷ এমনকি তার স্বাভাবিক মৃত্যুও হবে না। একমাত্র উপায় পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া। কেবল লেলিহান আগুনের তাপদাহেই মুক্তি পেতে পারেন তিনি। 

ডা. জুলস কোটার্ড বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন এবার। রোগীকে পরখ করলেন খুব ভালোভাবে, খতিয়ে দেখলেন মনযোগ সহকারে। জানলেন অতীত ইতিহাস, ফেলে আসা বিবর্ণ যত ঘটনার বর্ণনা। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণের পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এর নাম দিলেন নেতিবাচক বিশ্বাসের রোগ (delire de negation)। যার অন্য নাম Walking Corpse Syndrome। যদিও কিছুদিন পর জুলস কোটার্ডের নামেই পরিচিতি পায় এটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিরল কিছু রোগের মাঝে এটি একটি। পুরো পৃথিবীতে মাত্র ২০০ জন মানুষ এই দুর্লভ রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে।

কোটার্ড সিনড্রোমের কারণ

এখন অবধি বিরল এই রোগের প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। উন্মোচিত হয় নি সত্যিকার রোগ-রহস্য! রোগীদের উপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফলই জানান দেয় এর গুটিকতক সহজাত কারণ। কারণগুলো হলো-

• ডিমেনশিয়া বা উন্মাদনা
• এনকিফেলোপ্যাথি
• এপিলেপসি
• স্ট্রোক
• মাইগ্রেন
• স্ক্লেরোসিস
• স্কিজোফ্রেনিয়া
• পারকিনসন রোগ
• মস্তিষ্কের কোনো ক্ষত বা আঘাত।

মূলত এসকল সমস্যা যাদের মাত্রাতিরিক্ত হয়, তাদের মধ্যে দেখা দেয় এই রোগ। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এমন মানুষদের মাঝে অধিক পরিলক্ষিত হয় এর প্রাদুর্ভাব।

মস্তিষ্কের কোনো ক্ষত বা আঘাতও এই রোগের অন্যতম কারণ; ছবি সূত্র: Mediclinic

কিছু উদাহরণ

.
১৯৯৬ সালে এক বৈরী আবহাওয়ার দিনে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে স্কটল্যান্ডের একজন অধিবাসী। মাথার অগ্রভাগে প্রচন্ড আঘাত নিয়ে গমন করেন হাসপাতালে। সপ্তাহ দিনের মাঝেই সেরে উঠেন তিনি। কিন্তু, বুঝতে পারেন, তিনি মারা গেছেন। একদিন মায়ের সঙ্গে আফ্রিকার উত্তপ্ত এলাকায় ঘুরতে এলে তিনি নিজেকে নরকে আছেন বলে দাবি করেন। বিশ্বাস করেন, নরকেই কেবল এতো গরম হতে পারে!

২.
২০০৩ সালে গ্রীসে ডাক্তারদের শরণাপন্ন হন এক রোগীর স্বজন। ধরে বেঁধে রোগীকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তারা। যে কি-না করতে চেয়েছিলেন আত্মহত্যা। ডাক্তার আত্মহত্যার কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, তার মাথার ভেতর ফাঁপা, নেই হাড়-মগজের কিছুই। যেহেতু তার মগজ নেই, তাই বেঁচে থাকারও প্রয়োজন নেই।

৩.
২০০৫ সালে ইরানের একটি সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন এক রোগী। বয়স তার ৩২ এর কাছাকাছি। এসেই চিকিৎসকদের জানান, বেশ কিছুকাল পূর্বেই তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর পর রূপ পরিগ্রহ করে হয়েছেন কুকুর। তার স্ত্রীও নাকি বরণ করেছেন একই দুর্ভাগ্য। তার তিন কন্যাও মৃত, তারাও প্রত্যেকেই রূপান্তরিত হয়েছেন মেষ শাবকে।

রোগী এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে তোলেন খাবারে বিষ দেওয়ার নিন্দনীয় অভিযোগ। যদিও চক্রান্তের কারণে মারা গেলেও, তার বড় কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান তিনি।

৪.
২০০৮ সাল। নিউ ইয়র্কের মনোচিকিৎসকদের কাছে এসেছিলেন একজন রোগী, নাম তার লি। সেই ভদ্রমহিলা একদিন পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ করেন, তাকে মর্গে রেখে আসতে। কোটার্ড সিনড্রোম সম্পর্কে অবগত তারাও সঙ্গে সঙ্গে জরুরি নম্বরে কল দেয়। সাহায্য চায় প্যারামেডিকদের কাছে। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তারাও হাজির হয়। রোগীকে নিয়ে আসেন হাসপাতালে।

লি হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জানান, তিনি মারা গেছেন, পচতে শুরু করেছে তার দেহপিঞ্জর। নাকে সেই উটকো দুর্গন্ধও নাকি পাচ্ছেন তিনি। আরও অভিযোগ করেন, যে লোকেরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে, তারা তার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। যদিও মাসখানেকের চিকিৎসার পরই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেন তিনি। 

বৈদ্যুতিক শক বা Electro-convulsive therapy দেওয়া হলে কিছুটা কমে এই অসুখ; ছবি সূত্র: Medicine Health

চিকিৎসা

কোটার্ড সিনড্রোম, এক রহস্যময় জীবন্মৃত রোগ। এখন পর্যন্ত এর কোনো সঠিক চিকিৎসা নেই। নেই অন্তর্নিহিত কোনো কারণও! চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এগুলো যদি আবিষ্কৃত হয়, তবে আশা করা যায়, এজাতীয় রোগীরা পুরোপুরি সেরে উঠবেন। বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শক বা Electro-convulsive therapy দেওয়া হয়। যদিও এর ফলে রোগমুক্তির সত্যিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সচেতনতা, সহযোগিতা ও উপরে বর্ণিত কারণগুলোর প্রতি যথাযথ প্রতিরক্ষাই হতে পারে এই রোগের প্রাথমিক সুরক্ষা।

References:
1. What Is Cotard’s Syndrome (Walking Corpse Syndrome)? – WebMd.com
2. Cunha, JP. (2020). What Are the Symptoms of Walking Corpse Syndrome? 
3. Samico, A., Perestrelo, J. Cotard syndrome: Pathology review. European Psychiatry.
4. Paknikar, S., (2020). Walking Corpse Syndrome: Symptoms, Signs, Diagnosis & Treatment.
5. Grover, S., Aneja, J. Cotard’s syndrome: Two case reports and a brief review of literature. National Library of Medicine.
6. Sahoo, ABS., Josephs, KA. (2018). Neuropsychiatric Analysis of the Cotard Delusion. The Journal of Neuropsychiatry and Clinical Neurosciences.
7. Andrea, C., López, C. “Cotard’s syndrome”: a description of two cases. Delusion of negation in melancholia versus delusion of negation in paranoia. Revista Colombiana de Psiquiatría (English Edition).

লেখাটি 81-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Responses

  1. খুব সুন্দর তথ্য

    1. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. Surajit Das. Avatar
    Surajit Das.

    সম্পূর্ণ অজানা একটা রোগ সম্পর্কে জানলাম। খুব ভালো লেখা।

    1. অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 907 other subscribers