কফির রসায়ন, রসায়নের কফি

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

কফি। স্বাদে ও গন্ধে জনপ্রিয় একটি পানীয়। আমি নিজেও এক কাপ কফি পাশে নিয়ে কফিকে নিয়েই লেখাটি সাজাচ্ছি। সারাবিশ্বেই কফির চাহিদা তুঙ্গে। চায়ের বিপরীতে দাম কয়েকগুণ বেশি। তবুও কম নয় এর জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশেও কফির চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। গত দশকে চায়ের চাহিদা যেখানে বছরে ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে, সেখানে কফির চাহিদা বাড়ছে ৫৬ শতাংশ হারে। দেশে কফির বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ২০০০ টন। চাহিদার প্রেক্ষিতে বাড়ছে আমদানি ও দেশজ কফির উৎপাদন।

কফিতে ক্যাফেইন থাকে— এই বিষয়টির সাথে সকলেই পরিচিত। তবে ক্যাফেইন অন্যতম রাসায়নিক উপাদান হলেও কফিতে হাজারের ওপর অ্যারোমেটিক উপাদান রয়েছে। একই সমতলে অবস্থিত এমন চাক্রিক যৌগ যারা হাকেল তত্ত্ব মেনে নিজের চক্রে ৪n+২ সংখ্যক পাই ইলেক্ট্রন ধারণ করে— তারাই অ্যারোমেটিক যৌগ। এর সবচেয়ে সাধারণ উদাহরণ বেনজিন (C6H6)। সহজ করে বললে, যে যৌগে বেনজিন বলয় থাকে, সাধারণত তারাই অ্যারোমেটিক হয়। এছাড়াও বেশ কিছু অ্যারোমেটিক নয় এমন রাসায়নিক যৌগের অবদান রয়েছে কফিতে।

ঘ্রাণেই কাবু

এক কাপ কফির চারপাশে ট্রিলিয়নের ওপর অণু চলাফেরা করে। গরম কফি থেকে উড়ে যাওয়া জলীয় বাষ্পও হাজারো অণু ধারণ করে। সে অণুগুলো বহন করে সুগন্ধ। কফির এই সুগন্ধের দায় বা অবদান হিসেবে কয়েকটি যৌগের নাম উল্লেখ করা যায়। ২-আইসোবিউটাইল-৩-মিথক্সিপাইরাজিন-এর জন্য পাওয়া যায় মাটির গন্ধ। ভাজা কফির গন্ধ তৈরি হয় ২-ফুরফুরাইলথিওল যৌগের উপস্থিতিতে। অ্যাসিটালডিহাইড সৃষ্টি করে ফলের কটু গন্ধ।

মিথাইলপ্রোপানলের প্রভাবে ফল বা ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়ায়। সেদ্ধ আলুর গন্ধ হয় মেথিওনাল থেকে। (ই)-বিটা-ড্যামাসেনোন থেকে উৎপন্ন হয় মধু, ফলের মতো সুগন্ধ। কফির মিষ্টি গন্ধের জন্য দায়ী ফুরানিওল এবং রসুনের ঝাঁঝালো গন্ধ সৃষ্টি করে মেথানেথিওল।

কফি ব্রুও কফি-বীজ থেকে আহরণ করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় উল্লিখিত সব যৌগ বীজে থাকে না। অধিকাংশই উৎপন্ন হয় কফির বীজ আগুনের তাপে ভাজার সময়। ভাজা কফির বীজ মেশিনে ব্লেন্ড করা হয়। ব্লেন্ড কফির সাথে পানি দিয়ে তৈরি করা হয় কফি পানীয়টি। এর নাম ব্রুও। ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডের জন্য কফির বীজ তেতো স্বাদের। তাপ থেকে প্রয়োজনীয় শক্তির মাধ্যমে তেতো ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড সুগন্ধযুক্ত উপাদানে রূপান্তরিত হয়। তবে কফির তেতো ভাব কখনোই পুরোপুরি যাবে না। তেতো স্বাদটিই কফির অনন্য এক বৈশিষ্ট্য।

ঘ্রাণে মনোহর, স্বাদে কেন তেতো?

অনেকেই মনে করেন, কফির তেতো স্বাদের কারণ ক্যাফেইন। ক্যাফেইন কফির প্রধান উপাদানের একটি হলেও মাত্র ১৫ শতাংশ তেতো স্বাদের ভাগীদার। মূল দায় ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ও ফেনিলিন্ডেন নামের দুটো যৌগের। দুটোই ভাজা কফির বীজে পাওয়া যায়।

ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড মূলত ক্যাফেইক অ্যাসিড এবং কুইনিক অ্যাসিডের এস্টার। জৈব অ্যাসিডের কার্বক্সিল (-COOH) গ্রুপের হাইড্রক্সিল গ্রুপ (-OH) অ্যলাকক্সি গ্রুপ (-OR) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে এস্টার (-COOR) তৈরি করে। অ্যালকোহল ও জৈব অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় পাওয়া যায় এস্টার। এস্টারের অনন্য এক গুণ এরা মিষ্ট গন্ধ ছড়ায়। ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড প্রকৃত অর্থে এস্টারের একটি পলিফেনল পরিবারকে নির্দেশ করে। কুইনিক অ্যাসিড, হাইড্রোক্সিসিনামিক অ্যাসিডও তেমন পরিবারের। হাইড্রোক্সিসিনামিক অ্যাসিড ক্যাফেইক অ্যাসিডের মতোই অ্যারোমেটিক। এর রয়েছে মধুর মতো গন্ধ।

ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডের নাম থেকে মনে হতে পারে এতে ক্লোরিন রয়েছে। কিন্তু এতে ক্লোরিনের উপস্থিতি নেই। নামটি প্রাচীন গ্রিক ‘ক্লোরোস (chlorós)’ থেকে এসেছে। ক্লোরোস অর্থ হালকা সবুজ। অ্যাসিড গ্রুপগুলো জারিত হওয়ার ফলে এমন বর্ণ দেখায়। যখন ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড পানি বের করে দেয় তখন তেতো স্বাদের জন্যে দায়ী অণুগুলো তৈরি হয়। এই অণুগুলোর নাম অ্যাসিডের নামের সাথে মিল রেখে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ল্যাকটোন দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয়, ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড নিজেই তেতো নয়, অথচ কফির তেতোর জন্য সেই প্রধান নিয়ামক। হালকা থেকে মাঝারি কফির ব্রুওতে উচ্চ ঘনত্বে দুটো প্রধান ল্যাকটোন উপস্থিত থাকে। ৩-ক্যাফেওয়েলকুইনিক-১,৫-ল্যাকটোন এবং ৪-ক্যাফেওয়েলকুইনিক-১,৫-ল্যাকটোন— এরাই প্রধানত কফির স্বাদ তেতো করে।

ফেনিলিন্ডেন আরেকটি প্রধান যৌগ। ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ল্যাকটোনের ভাঙন থেকেই পাওয়া যায় এই যৌগ। এসপ্রেসোর মতো গাঢ় পরিশ্রুত কফিতে বেশি ঘনত্বে পাওয়া যায় ফেনিলিন্ডেন। এই যৌগটি কফিতে চূড়ান্ত তিক্ততা এনে দেয়। ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডের চেয়েও কড়া সে তেতো। গাঢ় করে ভাজা কফির ব্রুওতে স্বাদটাও তাই হয় কড়া।

ক্যাফেইনের রসায়ন

কফির প্রতি মানুষের এই একপেশে ভালোবাসার পেছনের কারণ ক্যাফেইন। এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক উপাদান, যা মস্তিষ্কের অ্যাডিনোসিন রিসেপ্টরকে উত্তেজিত করে আপনাকে জাগিয়ে রাখে। অ্যাডিনোসিন আমাদের শরীরের বেশ কিছু শারীরবৃত্তীয় কাজে ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্কের জন্য, এটি একটি নিবারক নিউরোট্রান্সমিটার। অর্থাৎ, ঘুমের তাড়না দেয় ও উত্তেজনা দমন করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উপশম দেয়। অ্যাডিনোসিন মূলত মস্তিষ্কে অ্যাডিনোসিন রিসেপ্টরগুলোর সাথে মিলেমিশে কাজ করে। আপনি যখন কফিতে চুমুক দেন তা দেহে ছড়িয়ে মস্তিষ্কের অ্যাডিনোসিনকে দমিয়ে দেয়। অ্যাডিনোসিনের জায়গা নেয় ক্যাফেইন। কারণ স্নায়ুকোষে ধাবিত হওয়া ক্যাফেইনের গঠন অ্যাডিনোসিনের মতোই। ক্যাফেইন যেহেতু অ্যাডিনোসিনের বিপরীত কাজ করে তাই ক্লান্তি কেটে যায়।

ক্যাফেইন বলতে গেলে ছদ্মবেশী আচরণ করে। অ্যাডিনোসিন রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হবার সাথে সাথে ক্যাফেইন অ্যাডিনোসিনের সমস্ত জায়গা দখল করে আসন পেতে বসে। রিসেপ্টরগুলো অ্যাডিনোসিনকে খুঁজে পায় না। ফলে, স্নায়ুকোষের কাজ মন্থর করার পরিবর্তে ক্যাফেইন সকলের গতি বাড়িয়ে দেয়। মস্তিষ্কের একক স্নায়ু নিউরনের কার্যক্ষমতাও বেড়ে যায়। পিটুইটারি গ্রন্থি এই কার্যক্রমকে জরুরি চিহ্নিত করে এবং হরমোন নিঃসরণ করে অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিকে অ্যাড্রেনালিন তৈরির বার্তা দেয়। ঠিক এ কারণেই প্রচুর কফি পানে আপনি দীর্ঘ সময় না-ঘুমিয়ে থাকতে পারেন। টলমল চোখেও জেগে থাকার সুযোগ পান। ক্যাফেইনের উপস্থিতিতে অ্যাডেনোসিনকে হটিয়ে আপনার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা চাঙা হয়ে ওঠে।

ঠিক একই ঘটনা ঘটে চকলেট খেলে। চকলেটে থাকে থিওব্রোমিন। এই যৌগটিও অ্যাডেনোসিন রিসেপ্টর দমাতে পারে। চকলেটে আসক্তির এই কারণটি প্রধান।

দ্য পারফেক্ট ব্রুও

কফি পানের উপযোগী হয়ে ওঠে ব্রুওয়ের ভেতর দিয়ে। মেশিনের ঘূর্ণন, পানি-সহ অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণে তৈরি হয় নিখুঁত ব্রুও। মেশিনের ধরন কফির ব্রুওয়ের মানকে প্রভাবিত করে। চূড়ান্ত ব্রুওতে পানির প্রভাব খুব কম। কুইনিক ও ক্লোরোজেনিক নামক দুটো অ্যাসিডের জন্য কফি তুলনামূলক অ্যাসিডিক বা অম্লীয় পানীয়। তাই পারফেক্ট ব্রুও তৈরিতে ব্যবহৃত পানির অম্লতা বিবেচনা করা উচিত। আপনি চাইলেও সম্ভ্রান্ত দোকানে পাওয়া কফির ব্রুও বাসায় তৈরি করতে পারবেন না। এর পেছনে মূল অন্তরায় পানি। আপনার ব্যবহৃত পানি দু প্রকার।

মৃদু পানি: কম মাত্রায় ক্যালসিয়াম আয়ন থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এতে থাকে বাইকার্বনেট। ফলে এক কাপ কড়া অম্লীয় কফি তৈরি হয়।
খর পানি: এ ধরনের পানিতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার বাইকার্বনেট। যা কফিতে থাকা ফ্ল্যাভারসাম অ্যাসিডকে নিরপেক্ষ করে। ফলে পাওয়া যায় চকের মতো ক্ষারীয় স্বাদ।

অর্থাৎ, মৃদু পানিতে অম্লীয়, কড়া পানিতে ক্ষারীয় ধর্মের কফি পাওয়া যায়। নিখুঁত ব্রুও তৈরিতে এই দুটো পানির রসায়ন ধর্ম বুঝতে হবে। পানির সঠিক অনুপাতটা খুঁজে পেলেই পাওয়া যাবে একটি নিখুঁত ব্রুও। দ্য পারফেক্ট ব্রুও।

কফির সাথে দুধের দোস্তি

কফি বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাপে খয়েরি বর্ণের মাঝে সাদা মেঘের মতো বিভিন্ন চিত্রের রূপ। কফিতে দুধ মেশানোর সময় এমন মনমাতানো বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়। কফিতে দুধ যুক্ত করার সময় দুধ কাপের নিচে টেনে নেওয়ার প্রভাব স্পষ্ট। যা মূলত মধ্যাকর্ষণ বলের কারণে হয়। তবে কফি ও দুধের অণু একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় সে বলের প্রভাবে সৃষ্ট ঘূর্ণায়মান গতি কাটিয়ে দেয়। এই গতির জন্য কাপের দেওয়াল একটি পৃষ্ঠ তৈরি করে, যাকে অবলম্বন করে দুধের অণু মনোহর সব প্যাঁচানো চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
ব্যাপন প্রভাবে শেষ পর্যন্ত কফিতে মিশে যায় দুধ। উচ্চ ঘনত্বের স্থান থেকে নিম্ন ঘনত্বের স্থানে কণার ছড়িয়ে যাওয়া, যতক্ষণ না সব স্থানে কণার ঘনত্ব সমান হয়— এই প্রক্রিয়ার নাম ব্যাপন। ঠিক এভাবেই কফির সর্বত্র ছড়িয়ে যায় দুধ। আমাদের উপহার দেয় নিখুঁত স্বাদের অভিজ্ঞতা।

তথ্যসূত্র-

লেখাটি 87-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Response

  1. কফি খাওয়ার অভ্যাস করা খারাপ না তাহলে

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 906 other subscribers