বইকথনঃ দ্য গড পার্টিকেল

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

২০২৩ এর বইমেলায় আসে হালিমা-শরফুদ্দিন পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত লেখক আব্দুল গাফফারের ‘দ্য গড পার্টিকেল’। বইটি মূলত হিগস বোসন ও তৎসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরুরি খুঁটিনাটির উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের জরুরি একটি কণাকে কেন্দ্র করে এরকম আস্ত একটা বই লিখে ফেলা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু কী ছিল এই বইতে?

বই পরিচিতি

‘দ্য গড পার্টিকেল’ বইটি মূলত ৪টি পর্বে বিন্যস্ত। ১ম পর্বের আলোচ্য বিষয়গুলো হলো সবল বল, দুর্বল বল, কাপলিং কন্সট্যান্ট, প্রতিসাম্য, প্যারিটির সংরক্ষণশীলতা এবং টাউ-থিটা পাজলের মতো চমকপ্রদ ব্যাপারগুলো। ২য় পর্বে রয়েছে ভর নিয়ে নানান বিচিত্র তথ্য। ৩য় পর্বে মূলত কিছু অত্যাধুনিক যন্ত্রের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যেগুলো কণাকে শক্তিশালী বা ত্বরিত করতে ব্যবহৃত হয়। আর একদম শেষ পর্বে গিয়ে মূল আলোচ্য বিষয় তথা ‘হিগস বোসন’ এর বিভিন্ন বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

বইয়ের প্রচ্ছদ

মজার বিষয় হলো, চার পর্বে বিন্যস্ত এই বইটির অধিকাংশ আলোচনাই সংলাপ নির্ভর। ‘রবিন’ আর ‘টনি ভাইয়া’ নামের দুটো চরিত্রের মাধ্যমেই বইটির কথাগুলো সাজানো হয়েছে। সেখানে রবিন একজন বিজ্ঞান পিপাসু সাধারণ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ‘টনি ভাইয়া’ হলেন পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিচত্র বিষয়ে জ্ঞান রাখা একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। এই দুজন কখনো স্কুল মাঠ, কখনো আমবাগানের মাচা, আবার কখনো বা বদ্ধ ঘরে বসে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গল্পে মেতে উঠেছে।

শিক্ষণীয় বিষয়

‘দ্য গড পার্টিকেল’ বইটিকে পপ সায়েন্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বলে মনে হয়েছে। কারণ এখানে কিছু বিষ্ময়কর ও চমকপ্রদ শিক্ষণীয় ব্যাপার রয়েছে, যেগুলো হয়ত সচরাচর আলোচনা হয় না বা জানা থাকে না। যেমনঃ 

  • বিগ ব্যাং এর পর প্রকৃতির মৌলিক বলগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় এক সাথে ছিল
  • মৌলিক কণাগুলো আসলে এক ধরণের কম্পন
  • পরমাণুর ৯৯% ভর কোয়ার্ক-গ্লুয়োনের কারণে সৃষ্ট
  • ‘হিগস বোসন’ উচ্চ শক্তি অর্জন করে মহাবিশ্বকে ধ্বংস করে দিতে পারে
  • যে কণা হিগস ফিল্ডের সাথে যত বেশি মিথষ্ক্রিয়ায় জড়াবে, সে তত বেশি ভারী হবে
  • ‘হিগস বোসন’ আবিষ্কারের সাথে বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আসলে কোনো সম্পর্ক নেই

এরকম ডজন খানেক ব্যাপার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বইটির কালো বর্ণখচিত তথ্যবহুল পৃষ্ঠাগুলোতে। 

ভালো লাগা

‘দ্য গড পার্টিকেল’ বইটি পড়ে কেন ভালো লেগেছে, সেটা কি আবার নতুন করে বলার দরকার আছে? প্রথমত, আমাদের পদার্থবিজ্ঞান বইগুলো যেমন কাটখোট্টা ভাষায় লেখা থাকে বা বিভিন্ন বিষয় যেরকম অস্পষ্ট থাকে, সেরকম কিছু এই বইটিকে স্পর্শ করেনি বললেই চলে। দ্বিতীয়ত, দুজন বিজ্ঞানপ্রেমী ব্যক্তির কথোপকথনের মাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন বিষয়ের গভীর ধারণা প্রদান করা হয়েছে, তা সত্যিই অসাধারণ! এছাড়াও পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষকে কেন্দ্র করে জন্মানো বদ্ধ ধারণা বা ভুল চিন্তার অবসান ঘটাতেও এই বই অবদান রখতে পারে বলে আমি মনে করি। এই বইটি একদিকে যেমন আনন্দের সাথে বিজ্ঞান শেখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি অন্যদিকে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি নিয়ে দূরদর্শী চিন্তারও ইঙ্গিত দিয়েছে। সর্বোপরি, বইটি অনন্য ও অসাধারণ! 

লেখক আবদুল গাফফার রনি

কিছু এদিক-সেদিক

একটি বইয়ে সাধারণত কিছু অসামঞ্জস্যতা, সীমাবদ্ধতা বা মুদ্রন ত্রুটি থেকেই যায়। ‘দ্য গড পার্টিকেল’ও তার ব্যতিক্রম নয়। এ বইয়ে দেখতে পাওয়া কিছু ত্রুটি বা অসামঞ্জস্যতার কথা উল্লেখ করছি, যা হয়ত পরবর্তী সংস্করণে পাঠকদের কল্যাণে পরিবর্তিত হতে পারে। 

  • পৃ:১৭ এর একটি জায়গায় দুবার ‘প্রোটন-প্রোটন’ বন্ধনের কথা বলা হয়েছে। এর যেকোন একটিতে ‘প্রোটন-নিউট্রন’ বন্ধন হবে।
  • পৃ:২৬ এর শেষ লাইনে লেখা হয়েছে যে অ্যান্টিনিউট্রিনোর চার্জ -১/২। কিন্তু এটা আসলে চার্জ নয়, বরং স্পিন। (অ্যান্টিনিউট্রিনোর চার্জ০)
  • পৃ:৭৪ এ শেষ থেকে ৪ নম্বর লাইনে বলা হয়েছে, “…মিউয়নের চেয়ে ভারী কণা পেয়ে গেলেন। তুলনামুলক হালকা কণাটার নাম দেওয়া হলো মিউয়ন…” মিউয়নের চেয়ে ভারী কণা মিউয়ন কীভাবে হয়? আর তাছাড়া তো ১৯৩৬ সালের দিকে মিউয়ন আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, তাহলে ১৯৪৭ সালে এসে আবার আবিষ্কার হলো কীভাবে? 
  • পৃ:৮২ এ ২য় প্যারার দিকে রয়েছে যে দুর্বল নিউক্লীয় বল মানছে ‘প্যারিটির সংরক্ষণশীলতা’। এখানে ‘মানছে না’ হবে। অবশ্য পূর্বের বাক্যগুলোতে ‘মানছে না’ এর ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়েছে। 
  • পৃ:৯১ এ শেষ থেকে ৪-৫ নং লাইনে ‘মহাশূন্য বলশূন্য…’ লেখা, ঐটা হবে ‘মহাকর্ষ বলশূন্য’।
  • পৃ:৪০ এ বলা হয়েছে, বোসন কণা বলবাহী কণা। পৃ:১৯১ এ বলা হয়েছে হিগস কণা বোসন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। পৃ:৫৮ এ বলা হয়েছে, হিগস বোসন কোনো বলবাহী কণা নয়। তো, হিগস ‘বোসন’ হয়েও কেন বলবাহী নয়, সেই রহস্য পরিষ্কার নয়।
  • বইয়ের প্রথম দিকের বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে বিভিন্ন জিনিসকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে ‘নিচের চিত্রের মতো’। কিন্তু সে কথার আশেপাশে সংশ্লিষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি।

শেষ কথা

হিগস বোসনকে কেন ঈশ্বর কণা বলা হয়? এটার কী প্রভাব রয়েছে? নিউক্লিয়ার বন্ধনে বিদ্যুৎ-চুম্বক বলের কোনো ভূমিকা নেই কেন? কণাগুলো কীভাবে ঢেউয়ের মতো আচরণ করে? এরকম ডজন ডজন প্রশ্নের উত্তর মিলবে ‘দ্য গড পার্টিকেল’ বইতে। সাধারণ কৌতুহলী পাঠক অথবা শিক্ষার্থী হিসেবে যদি কেউ এই বইটা পড়ে, তবে সে নিশ্চয়ই নতুন কিছু জানতে পারবে এবং উপকৃ্ত হবে। বইটি পড়লে শুধুমাত্র কৌতুহলই মিটবে না, বরং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নতুন সব ভাবনাও জন্ম নিবে। তাই বইটি সংগ্রহ করুন, পড়ুন এবং নিজের জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করুন। হ্যাপি রিডিং!

এক নজরে-

বইয়ের নাম- দ্য গড পার্টিকেল 

লেখক- আবদুল গাফফার রনি

প্রকাশক- অন্বেষা প্রকাশন

পৃষ্ঠা- ১৯১

গায়ের দাম- ৪০০ টাকা

লেখাটি 142-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers