হাইড্রোথার্মাল ভেন্টঃ প্রাণসৃষ্টির আঁতুড় ঘর   

এই লেখাটা প্রাণ সৃষ্টির উপাখ্যানের তৃতীয় কিস্তি। গত দুই পর্বে প্রাণ সৃষ্টি নিয়ে বেশ ক’টা হাইপোথিসিস নিয়ে আলাপ করেছি। এই লেখায় আলাপ করব এ নিয়ে জগ্বিখ্যাত “হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট” অনুকল্প নিয়ে। অনেকেই মনে করেন, প্রথম সরল প্রাণের জার্নি শুরু হয়েছিল সমুদ্রতলের ক্ষারীয় ভেন্টে। ক্ষারীয় ভেন্ট কি? কি করেই সরল বুদবুদ সদৃশ প্রাণ শক্তির যোগান পেল সেখানে? আজকের লেখায় বলব সেসব কথা।

[restrict]

ইতিমধ্যেই আমরা “মেটাবলিজম ফার্স্ট” হাইপোথসিস নিয়ে জেনেছি। এই অনুকল্প বলে,  পৃথিবীতে প্রাণসৃষ্টি নিয়ে রহস্যের সুরাহা করতে হলে কোষের শক্তির উৎস নিয়ে আগে মাথা ঘামাতে হবে। একদম প্রথম প্রাণকোষটির শক্তির উৎস কি ছিল? ১৯৮০ সালের শেষ দিকে জার্মান রসায়নবিদ  গুন্টার ভেস্টারশয়াউসার আগ্নেয়গিরির হাইড্রোথার্মাল প্রবাহে উচ্চ চাপ এবং তাপের মধ্যে থাকা আয়রন পাইরাইট ক্রিস্টালে বেশ কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথা কল্পনা করেন। যেগুলো হতে পারে প্রথম প্রাণকোষটির শক্তির উৎস। এই ধারণা “আয়রন সালফার ওয়ার্ল্ড” নামে পরিচিত। এই ধারণাই পরবর্তীতে পুরোপুরিভাবে প্রতিস্থাপিত হয়ে যায় মাইক রাসেলের দেওয়া আইডিয়া দিয়ে। মাইক রাসেল তখন প্যাসাডেনায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি কাজ করেন। তিনি ধারণা দেন, সমুদ্রতলের ক্ষারীয় ভেন্টে থাকা প্রোটনের বৈদ্যুতিক চার্জ দিয়ে শক্তির যোগান পেত প্রথম প্রাণকোষটি। তবে রাসেলের ধারণা খুব একটা সাড়া ফেলতে পারে নি তখন। কেননা তখনকার বাঘা বাঘা আণবিক জীববিজ্ঞানীরা সবাই-ই একে স্ববিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে বেশ আশার আলো দেখে এই অনুকল্প।

একটি হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট

রাসেলের এই ক্ষারীয় ভেন্ট কেমন? একধরনের বিশেষ হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট হচ্ছে এই ক্ষারীয় ভেন্ট। নব্বই সালের দিকে রাসেল যখন প্রথম এই আইডিয়া দেন, তখন ক্ষারীয় ভেন্ট বলতে প্রাচীন কিছু শিলায় খুঁজে পাওয়া অবশিষ্টাংশই ছিল। পানি যখন অলিভাইন খনিজের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তখনি তৈরি হয় রাসেলের সেই বিশেষ ভেন্ট। সমুদ্রতলে এই খনিজ প্রচুর পরিমাণে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় সারপেন্টাইন নামে এক নতুন খনিজের সৃষ্টি হয় এবং পাশাপাশি হাইড্রোজেন, ক্ষারীয় তরল ও প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। প্রক্রিয়াটা শিলাস্তরকে আরও প্রসারিত করে, চিড়ে ফেলে। এতে করে আরও বেশি বেশি পানি ঝরতে থাকে এবং এভাবে বিক্রিয়াটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই উত্তপ্ত হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ তরল শেষমেশ ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট হিসেবে সমুদ্র তল ভেদ করে জেগে ওঠে। ক্ষারীয় ভেন্ট নিয়ে বিজ্ঞানিদের কৌতূহল বাড়ে ২০০০ সালের দিকে। সিয়াটেলের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেবোরা কেলি এবং তার সহকর্মীরা মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরায় শনাক্ত করেন রাসেলের সেই ক্ষারীয় ভেন্ট। মজার ব্যাপার হল রাসেল ঠিক এই জায়গাতেই এমনতর ভেন্ট খুঁজে পাওয়া যেতে পারে বলে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। তাঁরা এই ভেন্টের নাম দেন “হারিয়ে যাওয়া শহর”। এমন নামের কারণ এর দর্শনীয় স্পাইরগুলো (পিরামিড আকৃতির চূড়া)। প্রাচীন ভেন্টের মতোই এর স্পাইরগুলোতে ছিল বেশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র। কোনো কোনো দিক দিয়ে আকারে আধুনিক কোষ থেকে খুব একটা আলাদা নয়। ২০০৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওঠে আসে, এই ভেন্টে হাইড্রোজেন, মিথেনসহ অন্যান্য কিছু জৈব যৌগের উপস্থিতির কথা। 

ড. মাইক রাসেল

ডেবোরা এবং তাঁর দলের আবিষ্কৃত এই ক্ষারীয় ভেন্ট অনেক দিক থেকেই চার বিলিয়ন বছর আগের ক্ষারীয় ভেন্টগুলোর মতোই। কিন্তু তখনকার মহাসাগর এখনকার মতো ছিল না। প্রাগৈতিহাসিক মহাসাগরগুলো ছিল অম্লীয় প্রকৃতির যেখানে বর্তমান মহাসাগর কিছুটা ক্ষারীয়। সে সঙ্গে ছিল না কোনো অক্সিজেন। আর অক্সিজেন ছাড়া আয়রন বেশ দ্রুত দ্রবীভূত হয়ে যায়। তবে কালপরিক্রমায় অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শয়ে শয়ে কোটি টন লোহা মরিচা হিসেবে থিতিয়েছে। তার মানে প্রাচীন অম্লীয় সাগরে ক্ষারীয় ভেন্ট সৃষ্টির মাঝে যে কাল বিরতি বর্তমানকালের তুলনায় তা অনেকবেশি আদিম প্রাণরসায়নের সঙ্গে মানানসই হয়। তাছাড়া এসব ভেন্টে আছে  আয়রন-সালফার খনিজের বুদবুদ যা প্রভাবন ক্ষমতা বিশিষ্ট। এটা অনুমান না, রাসেল নিজে এধরনের প্রাচীন ভেন্টের খোঁজ পেয়েছেলেন। এমনকি নিজেও গবেষণাগারে তৈরি করেছিলেন। ক্ষারীয় ভেন্টগুলোর আরেকটি ব্যাপার বিজ্ঞানীদের নজর কাড়ে। এসব ভেন্টে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মাইক্রোকম্পার্টমেন্ট থাকত। এগুলো কোষের কোষপ্রাচীর তৈরির কাঠামো হিসেবে ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা রাখে যার ভেতর কোষ গঠিত হওয়া সম্ভব। আর্কিয়া এবং ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রোটিন যেমন মিথানোজেন এবং অ্যাসিটোজেন, হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে শর্করায় রূপান্তরিত করে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, এসব প্রোটিনেও আয়রন-সালফার থাকে। 

শুধু তাই-ই নয়, ক্ষারীয় ভেন্টে থাকা তরলে থাকে নাইট্রোজেনের তৈরি যৌগ যেমন অ্যামোনিয়া। সুতরাং এখানে প্রোটিনের বিল্ডিং ব্লক অ্যামাইনো এসিড তৈরি হওয়াটা অমূলক কিছু নয়। এমনকি ফসফেটের উপস্থিতিতে তৈরি হতে পারে ডিএনএ/আরএনএ’র বিল্ডিং ব্লক নিউক্লিওটাইডও। জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েটার ব্রাউন, কম্পিউটার সিম্যুলেশন করে দেখান যে, ভেন্টের ছিদ্রগুলোর বাইরের এবং ভেতরের তাপমাত্রার পার্থক্যের দরুন এখানে নিউক্লিওটাইড জমা হতে পারে। আর এভাবে তৈরি হতে পারে ডিএনএ/আরএনএ সুতা। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে তাপমাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে হারহামেশাই ডিএনএ/আরএনএ তৈরি করেন। এমনকি বিজ্ঞানীরা এও আবিষ্কার করেন যে, এসব ছিদ্রে থাকতে পারে ফ্যাটি এসিডও। অর্থাৎ প্রাণ সৃষ্টির সবরকম মাল মশলাই প্রাকৃতিক ভাবে উৎপন্ন হতে পারে প্রাচীন এসব ক্ষারীয় ভেন্টে। সুতরাং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এসব সুপ্রাচীন ক্ষারীয় ভেন্টের গহ্বরে পৃথিবীর প্রথম প্রাণের স্পন্দন বেজে ওঠতে পারে, এই ধারণাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার সুযোগ নেই। 

ছবিটায় দেখা যাচ্ছে অম্লীয় সাগরের পানি আর ক্ষারীয় ভেন্টের মাঝে একটা প্রাচীন সরল কোষ। সাগরের অম্লীয় পানি হাইড্রোজেন আয়ন সমৃদ্ধ। সুতরাং কোষটার দু পাশে হাইড্রোজেন আয়ন ঘনত্বের একটা পার্থক্য থাকে। একেই বলে প্রোটন আনতি। কোষটিতে কাল পরিক্রমায় একটা প্রোটিন বিবর্তিত হয় যেটি টারবাইনের মতন কাজ করে প্রোটন আনতি থেকে শক্তি তৈরি করে। ছবিসূত্র- নিউ সায়েন্টিইস্ট

এর আগে আলোচনা করা আরএনএ বিশ্ব অনুকল্পের একটা সমস্যা ছিল যে, সব রকম জৈবরাসায়নিক গুলো উপস্থিত থাকলেও সেগুলো থেকে প্রোটিন, নিউক্লিক এসিডের মতন জটিল অণু তৈরি পর্যন্ত যে গ্যাপটা থেকে যায় তার সাথে এই অনুকল্প অতটা খাপ খায় না। কিন্তু ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট অনুকল্প তা অনেকটাই ব্যাখ্যা করতে পারে। সেজন্যে সুপ্রাচীন এসব ক্ষারীয় ভেন্টকে প্রাণ সৃষ্টির আঁতুড় ঘর বলা যেতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসব আঁতুড় ঘরে এই বুদবুদ সদৃশ আদিম কোষগুলোর শক্তির যোগান হতো কি করে? আরও সরল ভাবে যদি প্রশ্নটা করি, এই কোষগুলোতে ATP কি করে তৈরি হতো? ATP ছাড়া আমাদের সকলের পূর্বসূরি এই আদি কোষগুলো টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। এমনকি সেই আদিম ক্ষারীয় ভেন্টের গহ্বর থেকে বেরোতে পারত না। আর তা যদি না হতো তাহলে ক্ষারীয় ভেন্টগুলোকেই বা কি করে প্রাণ সৃষ্টির আঁতুড় ঘর দাবী করা যায়?    

এই প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে আবার একটু আগের প্রসঙ্গে ফিরতে হবে। আগেই বলেছি, আদিম সাগরগুলো ছিল অম্লীয়। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই সেগুলো প্রোটন তথা হাইড্রোজেন আয়নে সমৃদ্ধ ছিল। রাসেল কল্পনা করেন, “ সেই আদিম অম্লীয় সাগরের ক্ষারীয় ভেন্টের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জন্ম নেওয়া ক্ষারীয় তরলের বুদবুদগুলো একসময় খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ হয়। পরবর্তীতে সেগুলো এক কোষে রূপান্তরিত হয় যেটির অজৈব পর্দায় ছিল প্রোটন আনতি। প্রোটন আনতির কথা মনে আছে? না মনে থাকলে আগের লেখাটা পড়ে আসতে পারেন। সেই কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়ার তড়িৎরাসায়নিক আনতি।  এই আনতিই ছিল সেই প্রাচীন কোষটির শক্তি যোগানের উপায়। অনেকেই তখন রাসেলের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি। তবে পরবর্তীতে আদিকোষীদের বায়োএনার্জিটিক্স তাঁদের কেমিঅসমোসিসের সার্বজনীনতা উপলব্ধি করতে বাধ্য করে। এই ধারণা এখন প্রায় সর্বজনগৃহীত যে, প্রাচীন আদিম সরল কোষটির শক্তি যোগানের উপায় ছিল এই কেমিঅসমোসিস। অন্য সাধারণ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া কেন নয়? বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। পৃথিবীতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে জৈব উপাদানে আবদ্ধকরণ করবার মাত্র পাঁচটা উপায় আছে। তার মধ্যে শুধু একটা উপায়ই আছে, যে বিক্রিয়ায় কোনোরকম শক্তির উপযোগিতা ছাড়াই এই কাজটা সম্পন্ন হয়। উল্টে আরও শক্তি উৎপাদিত হয়। উপায়টা হচ্ছে, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে সরাসরি হাইড্রোজেনের বিক্রিয়ায় সরল জৈব উপাদান তৈরি করা। এই বিক্রিয়াটি তাপউৎপাদী। অর্থাৎ বাইরে থেকে কোনো শক্তি তো লাগেই না উল্টে শক্তি উৎপন্ন হয়। বিষয়টা অনেকটা এমন যেন, কেউ আপনাকে খাবার খেতে দিয়ে পয়সা তো নিলই না বরং খাবার খাওয়ার জন্যে উল্টে পয়সা দেবার অফার দিলো।

পরবর্তীতে কোষ পর্দায় একটা revolving বা পুনরাবর্ত চ্যানেল প্রোটিন সৃষ্টি হল। এর কাজ প্রোটন কোষের ভেতর ঢুকার সময় সোডিয়াম আয়ন বাইরে বের করে দেয়। পুনরায় সোডিয়াম আয়ন টারবাইন প্রোটিনের সাহায্যে কোষের ভেতর প্রবেশ করে। এতে করে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। ছবিসূত্র- নিউ সায়েন্টিইস্ট

তাহলে একবার সেই আদিম কোষের কথা ভাবুন। আপনার মনে হতেই পারে, এই বিক্রিয়াও তো ক্ষারীয় ভেন্টে সরল কোষগুলোর শক্তির যোগানদাতা হতেই পারে। কিন্তু না, এখানে একটা সমস্যা আছে। সমস্যাটি হচ্ছে, একদম প্রথমে এই বিক্রিয়া শুরু হতে হলে কিছু শক্তি লাগে। এরপর আর লাগে না। কিন্তু সেই আদিম সরল বুদবুদগুলোয় এই শক্তিটা পাবে কোথায়? ধরা যাক, এক অণু ATP’র মূল্য ১০ টাকা। এখন একটা বিক্রিয়া শুরু হতে যদি ১০ টাকা লাগে এবং বিক্রিয়া শেষে যদি ১৫ টাকা উৎপাদন হয়, তাহলে তাত্ত্বিক ভাবে, ঐ কোষটা সর্বসাকুল্যে ৫ টাকা পেলো। এখন এই বিক্রিয়াই যদি কোষের একমাত্র শক্তির উৎস হয়, তাহলে ধরা যাক, প্রথমে উৎপাদিত ১৫ টাকা থেকে ১০ টাকা খরচ করে কোষটা এক অণু ATP তৈরি করল। এখন কোষের কাছে আছে ৫ টাকা। পরবর্তী কোষটা যদি নতুন দুই অণু ATP তৈরি করতে চায় তাহলে সেটা কোনোদিন সম্ভব না। কেননা তার কাছে থাকা এক অণু ATP ভাঙিয়ে সে শুধু সমমূল্যের আরেকটা ATP তৈরি করতে পারবে। বাদবাকী ৫ টাকা দিয়ে আরেক অণু ATP তৈরি সম্ভব না। কারণ এক অণু ATP’র দাম ১০ টাকা। সুতরাং শুধুমাত্র এই রাসায়নিক বিক্রিয়া দিয়ে সে সময়ে একটা কোষ টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।  

অবশেষে কোষের ভেতর বিবর্তিত হয় একটা সার্বক্ষণিক প্রোটন পাম্প সিস্টেম। এরপর থেকে কোষ নিজে নিজেই এর পর্দায় প্রোটন আনতি তৈরি করতে থাকল এবং প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করতে থাকল। এভাবে একসময় বেরিয়ে আসল আঁতুড় ঘর হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থেকে। ছবিসূত্র- নিউ সায়েন্টিইস্ট

কিন্তু অন্যদিকে প্রাকৃতিক প্রোটন আনতি ব্যবহার করে আদিম কোষের ATP’র আদিম রূপ পাইরোফসফেট তৈরি করা সম্ভব ছিল। কোনো কোনো জীবে যেমন বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়ায় ATP’র বদলে শক্তিমুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই পাইরোফসফেট। এরা এটি তৈরি করে পাইরোফসফাটেজ এনজাইমের সহায়তায়। বিজ্ঞানীরা কিছু আদিম কোষে এই এনজাইমের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। সুতরাং এবারে পরিপ্রেক্ষিতটা সাজানো যাক। ক্ষারীয় ভেন্টে সেই আদিম কোষগুলো পর্দার প্রোটন আনতি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করতে লাগলো। ক্ষারীয় ভেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে এখন দরকার শক্তি সঞ্চয়ের। কোষ কেমিঅসমোসিস প্রক্রিয়ায় বারবার প্রোটনকে পর্দার বাইরে পাম্প করে, এভাবে প্রোটন আনতি তৈরি হয়। এই প্রোটন আনতি আসলে আর কিছুই, এটাকে বলা যায় সঞ্চিত শক্তি। প্রোটন পাম্প করতে শক্তি খরচা হয় না, তাই কেমিঅসমোসিস কোষকে অল্প অল্প করে হলেও শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ দেয় যেটা অন্য সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে খরচ হয়ে যেতো। এই আনতির শক্তি ব্যবহার করেই তৈরি হল প্রথম প্রাচীন ATP, নাম তার পাইরোফসফেট। আর এভাবে কোষ তৈরি করতে থাকলো দরকার মতন ATP। আর এই শক্তিমুদ্রার শক্তি ব্যবহার করেই সেই প্রাচীন আদিম কোষ বেরিয়ে এলো আঁতুড় ঘর থেকে। 

তাহলে রাসেলের কল্পনার সেই আঁতুড় ঘরকে যদি আরেকবার বলতে চাইঃ আমাদের সর্বশেষ প্রাচীন পূর্বসূরি আসলে কোনো স্বাধীন কোষ ছিল না। এগুলো ছিল পাথুরে শিলার ক্ষারীয় ভেন্টের গহ্বরে থাকার কতগুলো বুদবুদ। এদের পর্দা ছিল আয়রন-সালফার খনিজ সমৃদ্ধ। এই আয়রন-সালফার সমৃদ্ধ পর্দার ছিল দারুণ প্রভাবন ক্ষমতা, যেটি এসব বুদবুদের ভেতর প্রাচীন প্রাণরাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে প্রভাবিত করত। আর পর্দায় থাকা প্রাকৃতিক প্রোটন আনতির শক্তিতে এই প্রাচীন সরল বুদবুদগুলো নানা জৈব অণুতে ভরে যেতে লাগলো। এগুলো হয়ে উঠলো প্রাণরাসায়নিক থলি। আর এই থলিগুলোই অবশেষে বিভাজিত হলো প্রথম দুই স্বাধীন আদিকোষে- আর্কিয়া এবং ব্যাকটেরিয়ায়!

তথ্যসূত্র-

[/restrict]

সুজয় কুমার দাশ
বিজ্ঞান ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আছি। পড়াশোনা করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে। প্রকাশিত বই- দ্য মাঙ্গা গাইড টু বায়োকেমিস্ট্রি, দ্য মাঙ্গা গাইড টু মলিকিউলার বায়োলজি, অন্বেষা প্রকাশন; জীব জগতের অজানা গল্প, পুঁথি প্রকাশন।