অদৃশ্য এক বুলেট, আর একজন বাবার সত্য খোঁজার গল্প

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

বিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রয়োগ দেখা যায় ফরেনসিক বিজ্ঞানে। অপরাধ তদন্তে। অপরাধী চোখকে ফাঁকি দিতে চাইলেও নীরব প্রমাণকে কথা বলিয়ে সত্য তুলে আনে বিজ্ঞান। পিটার থমাসের অসাধারণ ধারাভাষ্যে জনপ্রিয় সত্যঘটনাভিত্তিক অনুসন্ধানমূলক টিভি ধারাবাহিক ‘ফরেনসিক ফাইলস’-এর পর্বে পর্বে রয়েছে চাঞ্চল্যকর অপরাধ, রহস্যময় দুর্ঘটনা ও জটিল রহস্য সমাধানের গল্প। প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং নিরলস তদন্তের মাধ্যমে কীভাবে শত রহস্যের জট খুলেছে, তারই জীবন্ত দলিল এই সিরিজ। এই লেখাটি ফরেনসিক ফাইলস সিরিজের ২য় পর্ব।

বন্ধুকপ্রেমী এক তরুণ ট্রে কুলি। কোথাও শুটিংয়ের প্রতিযোগিতা হলেই বাবা বাচ কুলি ও ট্রে ছুটে যান। কে জানত এই বন্দুকের ‘অদৃশ্য’ একটি গুলি ট্রের জীবন কেড়ে নেবে!

১৯৯১ সালে ডালাস পিস্তল ও রিভলভার ক্লাবে শুটিং প্রতিযোগিতা চলছিল। বাচ তাঁর ছেলেকে সকাল সকাল ঘুম থেকে ডেকে তুলেন। শৈশব থেকে বাবার ন্যাওটা ট্রে। সাত বছর বয়সেই বাবার সাহায্যে শুটিং শেখে। ফলে ট্রেও চায়নি প্রতিযোগিতাটা কোনোভাবে মিস হোক।

২৯ সেপ্টেম্বরের সকাল। ১৪ বছর বয়সী ট্রে প্রতিযোগিতা দেখার পাশাপাশি একটা দায়িত্বও পেয়ে যায়, স্কোরকার্ড দেখাশুনো। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এই কাজের ফাঁকে ও রোদের কারণে এয়ার গান ভবনের ভেতর বসে ছিল। বন্দুকের গুলির প্রবল শব্দ এড়িয়ে দুজন নারীর হাড় হিম করা চিৎকারে বিচারক বাবা-সহ সকলে এসে দেখেন মাটিতে পড়ে আছে ট্রের দেহ। মাথায় থাকা বেসবল ক্যাপের ফুটো থেকে কপাল বেয়ে ঝরছে রক্ত।

ঘটনাস্থলের কিছু দূরে বিচারকের দায়িত্বে থাকা বাচ কুলি দক্ষ শুটার। কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়, তা তিনি ভালো করেই জানেন। কিন্তু নিজের ছেলের রক্তাক্ত দেহ দেখে কী করবেন, সেটা তো কোনো কর্মশালা তাঁকে শেখায়নি।

ছবি: ট্রে কুলি।

হাসপাতালে ছয় ঘণ্টা পর ট্রে মারা যায়।

ট্রে ক্লাবের নির্ধারিত নিরাপদ এলাকায় বসে থাকা স্বত্বেও কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল! ডিটেকটিভ টম পিস এবং ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর ডেভিড টেলর পান তদন্তের ভার। গুলির গতিপথ কী পরিকল্পিত ছিল? না কি সত্যিই দুর্ঘটনা!

প্রতিযোগিতা এলাকার সীমানা বা রেঞ্জ ছিল বিশাল। এটা কোনো ঘর বা আবদ্ধ জায়গায় ছিল না। খোলা জায়গায় কয়েকশ ফুট জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

ট্রের মাথা থেকে বের করা বুলেট কিছু প্রশ্নের জবাব দিলেও নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞ ল্যারি ফ্লেচারের মতে, আধা ইঞ্চির ছোট্ট বুলেট হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, হুবহু প্রায় একই পাওয়া যায়। যেখানে একটি .৪৫ ক্যালিবারের বুলেট সিমেন্টের দেওয়ালের আঘাতে থেঁতলে যায়। কারণ কী?

ছবি: হাতে বানানো বুলেটের বিকৃতি নেই বললেই চলে। যা ট্রে-কে আঘাত করে।

কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেল বুলেটটি সত্যিই ‘অসাধারণ’। এটি ছিল হাতে তৈরি গুলি। সীসার সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু কেমিক্যাল মেশানোর ফলে এই গুলি ভীষণ শক্ত হয়। এছাড়া বাণিজ্যিক বুলেটের থেকে হাতে তৈরি বুলেটের খরচও কম পড়ে।

সেদিনের প্রতিযোগিতায় বেশিরভাগ প্রতিযোগিই এই হ্যান্ড-লোডেড বুলেট চালাচ্ছিলেন। এছাড়া বুলেটের গতি দ্রুত ও দূরত্ব বাড়াতে সকলে অতিরিক্ত গানপাউডার ব্যবহার করেন। ল্যারি ট্রের ঘাতক বুলেট প্রতিযোগিতার বন্দুকগুলোর সঙ্গে মেলান। একটি বন্দুকে লাল মোমের চিহ্ন পাওয়া যায়। এই বন্দুক চালাচ্ছিলেন ড্যান স্মিথ। তিনি এয়ার গান ভবনের ঠিক পেছনে আউটডোর রেঞ্জে গুলি চালাচ্ছিলেন। জিজ্ঞাসায় ড্যান স্মিথ দাবি করেন, তাঁর সব গুলি টার্গেটে লেগেছে, একটাও এলোমেলো কোথায় যায়নি।

বাইরে থেকে আসা একটি গুলি, অথচ সে স্থানে শুট করা ব্যক্তির কোনো গুলিই বাইরে যায়নি। কয়টা ট্রিগার চাপা হয়েছে, তার সকল হিসেব আছে। তাছাড়া রেঞ্জটি যেকোনো মিস হওয়া গুলি আটকে দেওয়ার মতো ডিজাইন করা। এয়ার গান ভবন ও ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে ছিল উঁচু এক বাধা বা বার্ম, ধুলোবালি দিয়ে তৈরি ১২ ফিটের ছোট টিলা। লক্ষ বা টার্গেটের ঠিক পেছনেই ছিল এই বার্ম, এবং বার্মের পর এয়ার গান ভবন।

ছবি: টার্গেট, বার্ম (মাঝে, মাটির ওপর প্রতিবন্ধক-সহ) এবং টিন শেড এয়ার গান ভবন।

টার্গেটের ঠিক ওপরে কাঠের পাটাতন বা বাফল রয়েছে। গুলি টার্গেট এড়িয়ে উপর দিয়ে আসলে এই পাটাতনে আঘাত করে। তাহলে অদৃশ্য এই গুলিটি কোথা থেকে এলো? 

পুলিশ এই ঘটনাটাকে দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত করে মামলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ট্রের বাবা বাচ কুলি সত্যটা জানতে চান। তিনি অ্যাটর্নি মাইক স্মিথকে নিয়োগ দেন। গঠিত হয় তদন্তকারী দল। 

দুর্ঘটনার দিন ঠিক কী ঘটেছিল তা সকলের কাছ থেকে শুনে ঘটনা পুনরায় নির্মাণ করেন স্টিভ আরউইন। তিনি লেজার প্রযুক্তি ও কম্পিউটারের সাহায্যে এয়ার গান ভবন ও রেঞ্জের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেন, এবং গুলিটির কোন পথে গিয়েছে— তার একটি নকশা করেন।

পুলিশ আগেই কিছু বিষয় শনাক্ত করেছিল। এয়ারগান বিল্ডিংটির বাইরের দেয়ালটি চারদিক থেকে আসা গুলির ছিদ্রে ঝাঁঝরা হয়ে ছিল। আরউইন জানতে চান, ঠিক কোন ছিদ্রটি ট্রের ঘাতক। তারা ভবনের ভেতরেও গুলির চিহ্ন খুঁজে পান। দেওয়ালের ভেতর থাকা জিপসাম বোর্ডে গুলির ছিদ্র ছিল। আলোক ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে সেই অংশের বোর্ডটি খুলে রাখা হয়। এবং একটি দেওয়াল, যা ইনডোর শুটিং রেঞ্জ ও মালামাল রাখার ঘরকে দুটো ভাগ করেছে। এছাড়াও সিলিং টাইলেও আঘাতের নতুন একটি দাগ পাওয়া যায়।

ছবি: ট্রের ভাগ্য এমনই অনিবার্য ছিল যে, এক ইঞ্চিরও কম দূরত্বে সরলে গুলিটি ঘাতক হতো না। 

আরউইনের লেজার জরিপ অনুযায়ী, বন্দুকের গতিপথ ট্রে, বোর্ড, সিলিং টাইল, এবং অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি পেছনের দেওয়াল — সব মিলে যায়। যা প্রায় একটি সরলরেখা। যা ড্যান স্মিথের রেঞ্জের দিকেই নির্দেশ করে। কিন্তু রেঞ্জ তো মেলে না। লেজারের মডেল অনুযায়ী ড্যান ফায়ারিং লাইন থেকে গুলি করেননি। সূক্ষ্ম মাপ বলছে, তিনি মাত্র ১০ গজ দূর থেকে ফায়ার করেছেন।

সেফটি এক্সপার্ট কেন বাস্টার রেঞ্জ পরিদর্শন করে অবাক হন। তাঁর জীবনে দেখা সবচেয়ে বাজে রেঞ্জ এটি। বার্মের আদর্শ উচ্চতা ২০ ফুট হলেও এই রেঞ্জে তা মাত্র ১২ ফুট। বাফেল অপর্যাপ্ত, কোথাও কোথাও ফাঁকা, ভবনের গায়ে থাকা গুলির চিহ্ন জানান দিচ্ছে— এসব অব্যবস্থাপনায় বুলেট যে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে যায়, সেটা কর্তৃপক্ষ জানত, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রতিযোগিতায় শুটারদের ২৫, ২০ এবং ১৫ গজ দূরত্ব থেকে গুলি ছুড়তে হয়। ১৫ গজ লাইনে দাঁড়ালে তারা বাফল ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে চলে আসেন এবং এয়ার গান ভবন সরাসরি চোখে পড়ে।

ছবি: বাফলের নিচে এয়ার গান ভবন দেখা যাচ্ছে (যেখানে ট্রে গুলিবিদ্ধ হয়)।

লেজারে দেখা গেল, বুলেট শেষ বাফলের নিচ দিয়ে মাটির ঢিবি বা বার্ম টপকে সরাসরি ভবনে ঢুকে যায়। এর গতিপথ ছিল অদ্ভুত। অর্থাৎ, বন্দুকধারীর গুলি লক্ষ্যবস্তু থেকে ৫ ফুটেরও বেশি উপরে এবং বাম দিকে চলে যায়। দক্ষ একজন শুটারের কীভাবে হলো এই ভয়ানক বিচ্যুতি, তাও মাত্র ১৫ গজ দূর থেকে! 

বন্দুকেই লুকিয়ে ছিল সকল উত্তর। ড্যানের বন্দুকটি ছিল মডিফাইড, পরিবর্তিত। প্রতিযোগিতায় খুব দ্রুত ও সহজে ট্রিগার চাপলে জেতা সহজ হয়। তাই অনেক প্রতিযোগী বন্দুকের কিছু অংশ ঘষে বা অন্য উপায়ে পরিবর্তন করেন। পুলিশ সার্জেন্ট ডেভিড টেইলর বলেন, অস্ত্রটি এমনভাবে মডিফাই হয়ে যায় যে, এক ট্রিগারের চাপে একটি নয়, দুটো গুলি বের হয়ে যায় মাঝেমধ্যে। এই ঘটনাকে ডাবলিং বলা হয়। যা কখনো কখনো অস্ত্রের রিকয়েলের সময় ঘটে। রিকয়েল হলো গুলি ছোড়ার সময় বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট বিপরীতমুখী ধাক্কা, যা অস্ত্রটিকে পেছনের দিকে ঠেলে এবং উপরের দিকে উঠিয়ে দেয়। একটি পয়েন্ট ৪৫ ক্যালিবার অস্ত্রের রিকয়েল সাধারণত উপরের দিকে এবং বাম দিকে যায়। 

ছবি: অ্যানিমেশনে গুলির গতিপথ (হলুদ দাগ)।

ফরেনসিক অ্যানিমেটর কার্ক পার্কস ভিডিও ফুটেজ ও লেজার তথ্য ব্যবহার করে পুরো ঘটনার কম্পিউটার অ্যানিমেশন তৈরি করেন।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ড্যান স্মিথ ১৫ গজ লাইন থেকে গুলি করেন। ড্যান নিজেও বুঝেননি রিকয়েলের দ্বিতীয় গুলি টার্গেট মিস করে উঁচু ও বাম দিকে চলে গেছে। শেষ বাফেলের নিচ দিয়ে, বার্মের মাত্র ৩ ইঞ্চি ওপর দিয়ে উড়ে এসে ভবনের অ্যালুমিনিয়াম সাইডিং ভেদ করে, স্টোরেজ রুম পেরিয়ে (১ ইঞ্চিরও কম দূরত্বে থাকা স্টিল ও পাইপ এড়িয়ে), সিলিং টাইলে আঘাত করে। প্রতি সেকেন্ডে ১২০০ ফিট গতির বুলেটটি টাইলে আঘাত পেয়ে অদ্ভুতভাবে ৭ ইঞ্চি আঁচড় কেটে বেঁকে যায়। এই আঘাতে ১০ ডিগ্রি ঘুরে নিচের দিকে নামে এবং ট্রের মাথায় আঘাত করে।

ট্রের মা-বাবার করা অবহেলা মামলায় আদালত ফরেনসিক অ্যানিমেশন ও মডেল সন্তুষ্ট হন। প্রযুক্তির এমন অবদান ছাড়া এই ঘটনার আড়ালের বিষয়গুলো অজানাই রয়ে যেত। মামলায় কুলি পরিবার জয়লাভ করে।

একমাত্র ছেলে, সেরা বন্ধু, মাছ ধরার সঙ্গী, শিকারের সহযাত্রী হারিয়ে বাচ কুলির আক্ষেপ ছিল, সেই রেঞ্জ, বন্দুক, গুলি বা ফায়ারিং — যেকোনো একটা বদলালেই আমার ছেলে বেঁচে থাকত।

তথ্যসূত্র: ফরেনসিক ফাইলস, ব্রিটানিকা।

১ম পর্বের লিংক: ফরেনসিক বিজ্ঞান: কাঠের গুঁড়োয় মিশে থাকা ঠান্ডা খুনের রহস্য

লেখাটি 0-বার পড়া হয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল থেকে

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখা


নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান? হোস্টিং ও ডোমেইন কেনার জন্য Hostinger ব্যবহার করুন ৭৫% পর্যন্ত ছাড়ে।

আলোচনা

Leave a Reply