ক্যাসকেড

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

একটি খোলা প্রান্তরে অনেকক্ষণ ধরে আকাশে টেলিস্কোপ তাক করে বসে আছে হোমেরা। শুক্র গ্রহের ছবি তোলার চেষ্টা করছিল। এখানে শহরের আলোক দূষণ তেমন একটা নেই। কিন্তু গ্রহটি ধীরে ধীরে দিগন্তের নীচে নেমে যাচ্ছিল। একদিকে হাতে সময় অল্প, অন্যদিকে টেলিস্কোপের সেন্সরের ক্যালিব্রেশন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঠিকমতো ফোকাস করা যাচ্ছিল না। ফলে প্রতিটি ছবিই ঘোলাটে আসছিল।

ফোকাস ঠিক করতে করতেই শুক্র গ্রহ প্রায় দিগন্তের আড়ালে চলে গেল। টেলিস্কোপে ধরা পড়ল শুধু একটি অতি ক্ষীণ, চিকন আলোকফালি, যেখান থেকে গ্রহটিকে ঠিকভাবে চেনাই কঠিন।

সেদিন হেমেরার সঙ্গে ছিল তার বোন  ইওস। তবে এখন আর শুক্র গ্রহ নিয়ে তাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। কারণ সেদিন ছিল পূর্ণিমা, চন্দ্রমাসের পঞ্চদশ দিন। তাই তাদের সমস্ত ব্যস্ততা এখন পূর্ণচন্দ্রকে ঘিরে।

কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে হেমেরা ল্যাবরেটরিতে ফিরে যায়। কাজে বসে। কিন্তু নেটওয়ার্ক প্রায় অচল। পাশাপাশি, তার সংরক্ষিত বহু ডেটা ফাইলও হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে।

সেই রাতের ঘটনাকে প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি হেমেরা। ভেবেছিল, হয়তো ল্যাবের সার্ভারে সাময়িক কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছে।

কিন্তু পরদিন সকালেই বিপত্তিটা বোঝা গেল।

ল্যাবের লোকাল নেটওয়ার্কে বাইরের সার্ভার থেকে আসা সব তথ্য হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। প্রথমে যদিও সাধারণ সার্ভার সমস্যাই মনে হয়েছে; কিন্তু হঠাৎ করে ল্যাবরেটরির দেয়ালে ঝুলানো পুরোনো সফটওয়্যার-ডিফাইন্ড রেডিও (এসডিআর) রিসিভারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল। এটি ছিল তাদের ব্যাকআপ যোগাযোগ ব্যবস্থা।

স্পিকারে ভেসে এল, 

“…all satellite telemetry unstable… repeat… multiple orbital failures detected…”

হেমেরা থমকে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন স্পেস মনিটরিং সেন্টার ও মহাকাশ সংস্থা থেকে একের পর এক জরুরি ঘোষণা প্রচারিত হতে শুরু করল। তবে সেগুলো ইন্টারনেটে নয়; বরং জরুরি টেরেস্ট্রিয়াল সিগন্যাল এবং অ্যামেচার হ্যাম রেডিও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

হেমেরা এসডিআরে একটি জরুরি বার্তা শুনতে পেল। নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে একটি অস্বাভাবিক সংঘর্ষের শৃঙ্খল শুরু হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ আগে একটি অচল স্যাটেলাইটের সঙ্গে একটি ক্ষুদ্র ধ্বংসাবশেষের সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সংঘর্ষ থেকে সৃষ্টি হয় হাজার হাজার নতুন ধ্বংসাবশেষ। পরে সেগুলো আবার অন্য স্যাটেলাইটে আঘাত করে আরও নতুন ধ্বংসাবশেষ তৈরি করতে থাকে।

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে যাকে শুধু একটি তাত্ত্বিক আশঙ্কা বলে মনে করতেন, সেটিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে— কেসলার সিনড্রোম

কক্ষপথে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের সংখ্যা প্রতি মিনিটে বাড়তেই লাগল। পৃথিবীর বিভিন্ন স্পেস মনিটরিং সেন্টারের বিশাল স্ক্রিনে একের পর এক সতর্কবার্তা ভেসে উঠতে শুরু করল। প্রতিটি লাল বিন্দু নির্দেশ করছিল সম্ভাব্য একটি সংঘর্ষকে। অল্প সময়ের মধ্যেই লাল বিন্দুর সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের মানচিত্র প্রায় সম্পূর্ণ লাল রঙে ঢেকে গেল।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একের পর এক স্যাটেলাইট অকেজো হয়ে পড়তে শুরু করল। পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসল হেমেরা। সবাই বিভিন্ন স্পেস মনিটরিং সেন্টার থেকে আসা কক্ষপথের তথ্য বিশ্লেষণ করছিল। আলোচনা চলাকালেই একটি বিষয় বারবার তার নজরে পড়ল।

সংঘর্ষগুলো সম্পূর্ণ এলোমেলো নয়।

স্ক্রিনে তাকিয়ে সে লক্ষ্য করে, ধ্বংসাবশেষগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে না পড়ে কক্ষপথের কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বেশি জমা হচ্ছে। যেন কোনো অদৃশ্য প্রভাব তাদের একই দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রচলিত বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে প্রতিটি ধ্বংসাবশেষকে আলাদা বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ফলে তাদের সম্মিলিত গতিবিধির প্রকৃত ধরণ বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না। বিপুল সংখ্যক ধ্বংসাবশেষের আচরণ বিশ্লেষণ করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল।

হেমেরা টেবিলে ছড়িয়ে থাকা কক্ষপথের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

“হয়তো এতক্ষণ আমরা ভুল জায়গায় উত্তর খুঁজছিলাম।”

কয়েকজন  বিস্মিত হয়ে তাকাল।

“ভুল জায়গায়? কী বলতে চাইছ?”

হেমেরা একটি কাগজে কয়েকটি বক্ররেখা আঁকল।

ধর, একটি নদীতে কোটি কোটি পানির অণু প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা কি প্রতিটি অণুর পথ আলাদা করে হিসাব করি? না। আমরা পুরো নদীর প্রবাহ বিশ্লেষণ করি।

মহাকাশের ধ্বংসাবশেষও ঠিক তেমন। প্রতিটি টুকরোকে আলাদা করে দেখলে পুরো চিত্রটা বোঝা যায় না। কিন্তু সবগুলোকে যদি একটি প্রবাহমান ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা যায়, তাহলে বোঝা সম্ভব হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। এমনকি বড় সংঘর্ষ ঘটার আগেই তার পূর্বাভাস দেওয়া যাবে।

দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরিকল্পনার পর অবশেষে প্রস্তুত হলো নতুন গবেষণা প্রকল্প – ‘মহাকাশ নিরাপত্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। প্রকল্পটির নেতৃত্বে ছিল হেমেরা নিজে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা, যা পৃথিবীর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি মহাকাশ ধ্বংসাবশেষ, স্যাটেলাইট এবং রকেটের অবশিষ্টাংশকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারবে। এগুলোকে আলাদা আলাদা বস্তু হিসেবে নয়, বরং একটি বিশাল কক্ষপথীয় প্রবাহের অংশ হিসেবে দেখা হবে।

প্রকল্পটির মূল শক্তি ছিল একটি নতুন গাণিতিক অ্যালগরিদম – ডেব্রিস ফ্লো প্রেডিকশন ইঞ্জিন (ডিএফপিই)।

এই অ্যালগরিদম কোনো একটি ধ্বংসাবশেষকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে না। বরং পৃথিবীর চারপাশে থাকা সব ধ্বংসাবশেষকে একটি চলমান ব্যবস্থার অংশ হিসেবে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি সম্ভাব্য কক্ষপথ গণনা করে আগেই নির্ণয় করতে পারে কোথায় ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনকভাবে জমতে পারে, কোথায় নতুন সংঘর্ষের ঝুঁকি রয়েছে এবং কোন এলাকায় ভবিষ্যতে কেসলার সিনড্রোম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার মাত্র দশ থেকে পনেরো  দিনের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত তথ্য হেমেরার গবেষণা দলে পাঠাতে শুরু করল।  ডিএফপিই প্রতিটি তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি তালিকা তৈরি করল।

আশ্চর্যের বিষয়, কোটি কোটি ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মাত্র কয়েকশ বড় অচল স্যাটেলাইটই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোর সঙ্গে আবার সংঘর্ষ ঘটলে লক্ষ লক্ষ নতুন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে।

তখন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলো।

প্রথমে সবচেয়ে বিপজ্জনক বড় বস্তুগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। তাহলেই সংঘর্ষের শৃঙ্খল ধীরে ধীরে ভেঙে যাবে।

প্রথম কয়েক সপ্তাহে ডিএফপিই আশাব্যঞ্জক ফল দেখালেও বাস্তব পরীক্ষায় অপ্রত্যাশিত একটি সমস্যা ধরা পড়ল। বাস্তব পরিস্থিতি পূর্বাভাসের সঙ্গে একেবারেই মিলল না।

যেসব এলাকাকে নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানেই পরপর সংঘর্ষ ঘটতে থাকে। অন্যদিকে, যেসব অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই নিরাপদ রয়ে যায়।

অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল।  কেউ কেউ প্রকল্পটি বন্ধ করার প্রস্তাবও দিলেন।

হেমেরা আবার পরীক্ষার প্রতিটি ফলাফল খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করল। কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না।

সেদিন দুপুরে হেমেরা আর ইওস খেতে গিয়েছিল। রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই পাশের টেবিলে সহকর্মী এলিসানকে দেখতে পায় হোমেরা। সৌজন্য শুভেচ্ছা বিনিময় করে ইওস ও হেমেরা একটু দূরের একটি টেবিলে গিয়ে বসল।

ইওস  হেসে বলল, চাইলে এলিসানের সঙ্গেই বসতে পারতে। আলাদা বসলে কেন?

হেমেরা বললো, না। এলিসানের মতো  কৌশলী, কথোপকথনে দক্ষ এবং বিচক্ষন মানুষ আমি পছন্দ করি না। এমন কারো সঙ্গে মিশতে আমি অনিরাপদ বোধ করি। 

ইওস তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,  মজার ব্যাপার হলো, মানুষ সাধারণত চায় তাকে কেউ বুঝুক। আর তুমি চাইছ, কেউ যেন তোমাকে বুঝতেই না পারে। 

হেমেরা কিছুক্ষণ চুপচাপ ইওসের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,

আমি বুদ্ধিমান মানুষের বিরোধী নই। আমি বরং সরল মানুষ পছন্দ করি। এমন মানুষ, যারা কয়েক দিনের পরিচয়েই নিজের আনন্দ, দুঃখ, স্বপ্ন… সবকিছু অকপটে বলে ফেলতে পারে। তাদেরকে বিশ্বাস যোগ্য লাগে। সে কিছুক্ষণ থেমে জানালার বাইরে তাকাল।

কিন্তু এলিসান অন্য রকম। সে নিজের সম্পর্কে খুব কম বলে, বরং তোমাকেই পড়তে থাকে। কথার ফাঁকে ফাঁকে তোমার চিন্তা, অভ্যাস, দ্বিধা সব বুঝে নিতে চায়। কথোপকথন শেষ হওয়ার পর হঠাৎ মনে হয়, তুমি তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানলে না, অথচ সে তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে গেল।   শোনো ইওস, একই সাথে জ্ঞানী কিন্তু সরল মানুষের উপস্থিতি আমি পছন্দ করি

ইওস কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে আছে। তারপর বললো, তুমি আসলে এলিসানকে নয়, অসম্পূর্ণ তথ্যকে ভয় পাও। সে তোমার সম্পর্কে যতটুকু জানে, তার ওপর ভিত্তি করেই তোমাকে বুঝে ফেলে।

কথাটা শুনে হেমেরা হঠাৎ থেমে গেল।

অসম্পূর্ণ তথ্য…

শব্দ দুটো যেন মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল ডিএফপিইর সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কথা। অ্যালগরিদম কি সত্যিই ভুল করছিল, নাকি ভুল ছিল তাকে দেওয়া তথ্যে?

খাওয়া শেষ করেই সে দ্রুত ল্যাবে ফিরে গেল।

পুরোনো সব পর্যবেক্ষণ তথ্য আবার একে একে পরীক্ষা করতে শুরু করল।

ঘণ্টাখানেক পর অবশেষে সে বুঝতে পারল, ত্রুটি অ্যালগরিদমে নয়, ত্রুটির উৎস ছিল তথ্য।

বিভিন্ন দেশের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া কক্ষপথের তথ্য একই সময়ের ছিল না। কোথাও কয়েক সেকেন্ড, কোথাও কয়েক মিনিট, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টা আগের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। দ্রুত পরিবর্তনশীল কক্ষপথে এই সামান্য সময়ের ব্যবধানই পূর্বাভাসকে ভুল করে দিচ্ছিল।

এরপর বিজ্ঞানীরা তথ্যপ্রক্রিয়া নতুন করে সাজালেন। সব তথ্য একই সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে অ্যালগরিদমকে আরও নির্ভুল করা হলো।

দ্বিতীয় পরীক্ষায় চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেল। এইবারের মিশন সফল হয়েছে।

শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাশ উদ্ধার অভিযান।

বিশেষ ধরনের ছোট ছোট সার্ভিসার মহাকাশযান তৈরি করা হলো। এগুলোর কাজ ছিল অচল স্যাটেলাইটের কাছে গিয়ে সেটিকে নিরাপদে ধরে ফেলা।

সব ধ্বংসাবশেষের জন্য একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো না। আকার, গঠন ও গতিপথ বিবেচনা করে কোথাও রোবোটিক বাহু, কোথাও চৌম্বকীয় সংযোগ, আবার কোথাও বিশেষ ডি-অরবিট কিট ব্যবহার করা হলো।

এরপর ধীরে ধীরে স্যাটেলাইটগুলোকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দিকে নামিয়ে আনা হলো। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর অধিকাংশই সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।

যেগুলোর পৃথিবীতে পড়ার ঝুঁকি ছিল, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রিতভাবে নির্দিষ্ট নিরাপদ সমুদ্র অঞ্চলের দিকে নামিয়ে আনা হলো।

একই সময়ে ডিএফপিই প্রতিদিন নতুন সংঘর্ষের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করছিল। কোনো এলাকায় ঝুঁকি বেড়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পাঠানো হতো। যেসব সচল স্যাটেলাইট তখনও কার্যকর ছিল, তারা কয়েক মিটার থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত কক্ষপথ পরিবর্তন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়িয়ে যেত।

ধীরে ধীরে নতুন সংঘর্ষের সংখ্যা কমতে শুরু করল।

এক বছর  পরে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে একটিও বড় সংঘর্ষ ঘটল না।

দীর্ঘ দুই বছর  পর পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলো। অবশেষে কাজ থেকে কয়েক ঘণ্টার বিরতি নিয়ে হেমেরা ইওসের সঙ্গে শহরে ঘুরতে বের হলো।

ঘুরতে ঘুরতেই তারা একটি সুগন্ধির দোকানে ঢুকল। এর আগে এমন কোনো দোকানে যাওয়া হয়নি তার; এটাই প্রথমবার। প্রবেশপথে টাঙানো হেয়ার ট্যানিং করা  লোমশ ছাগলের চামড়ায় খোদাই করা দোকানের নামটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বিশেষভাবে সংরক্ষিত চামড়াটি যেন এক অনন্য শিল্পকর্ম।

দোকানের ভেতরে সারি সারি কাঁচের বোতলে সাজানো ছিল নানা ধরনের সুগন্ধি। দোকানদার একের পর এক সুগন্ধি কাগজের স্ট্রিপে লাগিয়ে তাদের ঘ্রাণ নিতে দিচ্ছিলেন। কয়েকটি সুগন্ধি শোঁকার পর কফি বিনের ঘ্রাণ নিতে হচ্ছিল, যাতে পরের সুগন্ধির সূক্ষ্ম পার্থক্য সহজে বোঝা যায়।

শেষ পর্যন্ত ইওস বহুদিনের পরিচিত সুগন্ধিটিই বেছে নিল। আর হেমেরা প্রথমবারের মতো দুটি ভিন্ন ঘ্রাণের মিশ্রণে তৈরি চার মিলিলিটারের একটি ছোট সুগন্ধি কিনল।

দিনটি ছিল খুবই সাধারণ, কিন্তু হেমেরার কাছে ছিল একেবারে নতুন এক অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিন পর মহাকাশের সংকট থেকে মন সরিয়ে পৃথিবীর ছোট ছোট সৌন্দর্যও যে উপভোগ করা যায়, সেটিই যেন সে নতুন করে উপলব্ধি করল।

কেসলার সিনড্রোম পুরোপুরি শেষ না হলেও তার সংঘর্ষের শৃঙ্খল ভেঙে গিয়েছিল।

তবুও একটি প্রশ্ন রয়ে গেল, 

কেসলার সিনড্রোম কি আবারও ফিরে আসবে? না কি মানবজাতি এবার সত্যিই তাকে চিরতরে প্রতিরোধ করার পথ খুঁজে বের করবে?

লেখাটি 0-বার পড়া হয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল থেকে

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখা


নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান? হোস্টিং ও ডোমেইন কেনার জন্য Hostinger ব্যবহার করুন ৭৫% পর্যন্ত ছাড়ে।

আলোচনা

Leave a Reply