আজকের পৃথিবী আমাদের সতর্ক করছে। ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে, দূরের হিমবাহ গলছে, আর প্রকৃতিতে ঘন ঘন ঝড়, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগ ঘটছে। এসব পরিবর্তন আমাদের জানান দিচ্ছে, আর দেরি করবার জো নেই। এখনই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন পথে হাঁটতে হবে। এই নতুন পথ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সূর্যের আলো, বাতাস, পানি ও বায়োগ্যাসের মতো উৎস শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না, আমাদের ভবিষ্যতকেও নিরাপদ, সবুজ ও টেকসই রাখার আশ্বাস দেয়। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণী রক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একটি স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাস করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রধান কার্বন নির্গমনকারী খাতগুলোর মধ্যে জ্বালানি খাত অন্যতম। এই কারণেই পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে “লাল” শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে পরিবেশগত ক্ষতি ও জনদুর্ভোগ যতটা সম্ভব কমানো যায়। অপরদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভিত্তিক প্রকল্পগুলোকে “হলুদ” ও “কমলা” শ্রেণিতে রাখা হয়েছে, যাতে সেগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। ২০২১ সালের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমনের ৫৫.০৭ শতাংশ জ্বালানি খাত থেকে আসে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাত একাই প্রায় ১২.৪১ শতাংশ অবদান রাখে। সরকার এনডিসিতে ২০৩০ সালের মধ্যে স্বেচ্ছায় ৬.৭৩ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে অতিরিক্ত ২১.৮৫ শতাংশ নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধুই একটি বিকল্প নয়, এটি একটি জরুরি পথ।

ছবি: তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরা—জলবায়ু পরিবর্তনের তিনটি দৃশ্যমান সংকটকে প্রতীকীভাবে দেখানো হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি কী এবং কেন জরুরি?
“নবায়নযোগ্য জ্বালানি” বলতে এমন জ্বালানির উৎসকে বোঝায় যা প্রকৃতি থেকে নিয়মিতভাবে পুনরায় উৎপাদিত হয়, যেমন সূর্য থেকে সৌর শক্তি, বায়ু থেকে বায়ু শক্তি, জল থেকে জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস, বর্জ্য-থেকে শক্তি ইত্যাদি। এই উৎসগুলো শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, স্থানীয় উদ্যোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব নানা দিক থেকে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করে, কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে প্রচুর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসৃত হয় যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে; কিন্তু নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত শক্তিতে এই নিঃসরণ অনেক কম। দ্বিতীয়ত, এটি শক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, কারণ বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব শক্তি উৎপাদন বাড়ালে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি কমে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তি টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করে, যা কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা ও নীতি
২০০৮ সালে প্রণীত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০১৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৫ শতাংশ এবং ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাস্তবায়নের নতুন পরিকল্পনা গৃহীত হয়। পরবর্তীতে, ২০২২ সালে গৃহীত মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালের সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (IEPMP)-এ এই লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ২০৫০ সালে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মাত্র ১৭ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা একাধিকবার ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সরকার বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি এবং সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা সংশোধনের উদ্যোগও নিয়েছে। তবে ২০০৪ সালের পর থেকে দেশের জ্বালানি নীতি আর হালনাগাদ করা হয়নি, ফলে একটি সুস্পষ্ট ও আধুনিক জ্বালানি নীতি ছাড়া কোনো পরিকল্পনা বা খাতভিত্তিক নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও বাংলাদেশ
২০১৫ সালে গৃহীত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে, এবং সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখা হবে। বাংলাদেশও এ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ। পরবর্তীতে, ২০১৬ সালে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ফোরাম (CVF) মারাকেশ ঘোষণায় ২০৫০ সালের আগেই শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্য ঘোষণা করে, যার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ।
২০২১ সালে বাংলাদেশ জ্বালানি রূপান্তর কাউন্সিলের (ETC) সদস্যপদ লাভ করে। এই কাউন্সিলের মূল উদ্দেশ্য হলো পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বিদ্যুৎ খাতকে কার্বনমুক্ত করা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং জ্বালানি রূপান্তর কার্যক্রমে অর্থায়ন জোরদার করা। একই বছর বাংলাদেশ বৈশ্বিক মিথেন অঙ্গীকারে (Global Methane Pledge) যুক্ত হয়, যেখানে ২০২০ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ মিথেন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ যোগ দেয় বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা প্রতিশ্রুতি (GREEP)-এ। এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ১১,০০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপন করা এবং প্রতি বছর জ্বালানি দক্ষতা চার শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশের অবস্থা ও সম্ভাবনা
বর্তমান অবস্থা

ছবি: ২০২৩–২৪ সালের শেষে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতার সারাংশ: জীবাশ্মভিত্তিক অংশের আধিক্য এবং অতিসক্ষমতার আর্থিক প্রভাব।
জাতীয় অঙ্গীকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনো প্রায় সম্পূর্ণভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩১,৪৫২ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ২৭,৪১৭ মেগাওয়াট (৮৭%) জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এবং মাত্র ১,৩৭৯ মেগাওয়াট (৪%) নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে রয়েছে কয়লা, স্থানীয় প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস অয়েল, ডিজেল ও আমদানিকৃত তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। পাশাপাশি ভারত থেকে সরাসরি ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতে অতিসক্ষমতা (overcapacity) এখন একটি বড় সমস্যা। জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত ক্ষমতা ২৮,০৯৮ মেগাওয়াট হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল মাত্র ১৬,৪৭৭ মেগাওয়াট। ফলে ১১,৬২১ মেগাওয়াট বা প্রায় ৭১% সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে গেছে। এই অলস সক্ষমতা রক্ষণাবেক্ষণে জনগণের করের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। স্থাপিত ক্ষমতা অনুযায়ী মোট উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২৪,৪১০ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা, কিন্তু বাস্তবে উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ৯,৬০০ কোটি ইউনিট অর্থাৎ মোট সক্ষমতার মাত্র ৩৯% ব্যবহার হয়েছে। অবশিষ্ট ৬১% সময় বা প্রায় ২২১ দিন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিষ্ক্রিয় থেকেছে। তবুও সরকারকে চুক্তি অনুযায়ী বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে “ক্যাপাসিটি চার্জ” দিতে হয়েছে। ২০০৭-০৮ থেকে ২০২৩-২৪ সময়কালে এই চার্জ বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১,৪৭,৫৫৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই ২৬,৮২০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে এ ধরনের ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ত না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ৪৬.৫% এসেছে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, ১৯.৯% কয়লা থেকে, ১১.৮% ফার্নেস অয়েল থেকে, ০.৫% ডিজেল থেকে, ০.৯% জলবিদ্যুৎ থেকে, ০.৯% সৌরশক্তি থেকে এবং অল্প পরিমাণ (৬.৯ কোটি ইউনিট) বায়ুশক্তি থেকে। এছাড়া ১৭.৪% বিদ্যুৎ এসেছে ভারত থেকে আমদানি করে। সব মিলিয়ে ৮১% বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি এবং মাত্র ১.৮% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হয়েছে। দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৩৪,৮১৯ কোটি টাকার (প্রায় ২৮২.৫০ কোটি ডলার) জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে—অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় ২৩.৫৪ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। শুধুমাত্র বিদ্যুৎখাতের জন্যই আমদানি করতে হয়েছে ৩৩,৩৩৭ কোটি টাকার জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে আরও ৯,৪৮২ কোটি টাকা। এলএনজি আমদানিতেই খরচ হয়েছে প্রায় ৪২,৬৪৩ কোটি টাকা। যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা যেত, তবে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।
সম্ভাবনা

ছবি: লেখায় উল্লিখিত সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাব্যতা—বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিসর যে অনেক বড়, তা এই তুলনামূলক চিত্রে স্পষ্ট।
সিডিপি ও ইউটিএস-এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে, ২০২৩ সালে ক্লিন ও বেলা’র যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, দেশের সকল বাড়ির ছাদ, খাসজমি ও জলাশয় ব্যবহার করে শুধুমাত্র সৌরশক্তির মাধ্যমেই পুরো জাতির বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। অন্যদিকে, ২০২০ সালে প্রণীত জাতীয় সৌরশক্তি পথরেখার খসড়া অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাব (NREL) ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের স্থলভাগে অন্তত ৩০ হাজার মেগাওয়াট বায়ুশক্তি কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের অগভীর সমুদ্র এলাকায় প্রায় ৯,৬০০ মেগাওয়াট বায়ুশক্তি কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোগে কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বায়ুশক্তি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যা সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে, দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনগুলোতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিল্ডিং কোডে নির্ধারিত রয়েছে যে, প্রতিটি আবাসিক ভবনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত পাঁচ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে সরবরাহ করতে হবে। তবে বাস্তবে এই বিধানটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
জ্বালানি খাতের কার্বন নির্গমন
বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) অনুযায়ী, ২০১১-১২ সালে দেশের মোট কার্বন নির্গমন ছিল ১৬৯.০৫ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে ৯৩.০৯ মিলিয়ন টন (৫৫.০৭%) নির্গত হয়েছিল জ্বালানি খাত থেকে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের অবদান ছিল ২০.৯৮ মিলিয়ন টন (১২.৪১%)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ খাত থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নির্গমন ৬০.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, যা ২০১১-১২ সালের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্বন নির্গমনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা থেকে গড়ে ১,০২২ গ্রাম কার্বন নির্গমন হয়। তুলনামূলকভাবে, জীবাশ্ম গ্যাস থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্গমন হয় ৫৮৫ গ্রাম, ফার্নেস অয়েল থেকে ৭২৮ গ্রাম, ডিজেল থেকে ৬৮৯ গ্রাম, এবং জলবিদ্যুৎ থেকে মাত্র ৭০ গ্রাম।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নির্গমন অত্যন্ত কম বা প্রায় শূন্যের সমান। প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ থেকে গড়ে ৫৭ গ্রাম এবং বায়ু বিদ্যুৎ থেকে মাত্র ২০ গ্রাম কার্বন নির্গমন হয়, যা জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নগণ্য। সম্প্রতি কেউ কেউ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরামর্শ দেন, তবে বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় দেড় কেজি কার্বন নির্গমন ঘটে। এর পরিবর্তে বর্জ্য থেকে গ্যাস তৈরি করলে নির্গমন কমানো সম্ভব। অতএব, বাংলাদেশ যদি এখনই জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে কয়লা এবং জীবাশ্ম গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ না করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর না দেয়, তাহলে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি ক্ষতিকর ও অসদুপ্রচেষ্টা দেশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জগুলো
নবায়নযোগ্য শক্তিতে উত্তরণের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাধা রয়েছে, যেগুলো সমাধান করা জরুরি।
প্রথমত, নিয়ন্ত্রণ ও নীতি-জটিলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন গৃহীত আন্তর্জাতিক বা দেশীয় নীতিতে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নধর্মী অনিশ্চয়তা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারের নতুন নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও, বাস্তবায়নে নানা জটিলতা রয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থায়নের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প শুরু করতে প্রারম্ভিক পুঁজির প্রয়োজন হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারী বা ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, ভৌগোলিক ও প্রযুক্তিগত বাধাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। অনেক অঞ্চলে জমির ব্যবহার বা জায়গার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এবং বিশেষ করে বায়ু শক্তির ক্ষেত্রে অনুমোদিত সম্পদগুলো এখনো যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
চতুর্থত, গ্রিড ও সংযোগ সমস্যা নবায়নযোগ্য শক্তির কার্যকর ব্যবহারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদিত নবায়নযোগ্য শক্তি জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা বা সঞ্চয়যোগ্য শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা এখনো সহজ নয়।
ইতিবাচক উদ্যোগ ও দৃষ্টান্ত
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে সৌর শক্তিতে চালিত বিশোধক (desalination) প্লান্ট গড়ে উঠছে, যেখানে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব এবং জনকল্যাণমুখী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া নতুন নবায়নযোগ্য শক্তি নীতি ২০২৫ চালু হচ্ছে, যার লক্ষ্য আগামী দিনে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে বড়মাপের উন্নয়ন ঘটানো।
আমাদের করণীয়: ব্যক্তি, সমাজ ও তরুণদের ভূমিকা

ছবি: রুফটপ সোলার, তরুণ উদ্ভাবক এবং স্থানীয় উদ্যোগ—নবায়নযোগ্য শক্তিতে উত্তরণের সামাজিক ভিত্তিকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি। বাড়ি বা ভবনে যেখানে সম্ভব সেখানে সৌর প্যানেল বা রুফটপ সোলার ইনস্টলেশন বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে সৌর শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। বৈদ্যুতিক বাতি, যন্ত্রপাতি ইত্যাদিতে উদ্ভিদযুক্ত ও শক্তি সাশ্রয়ী মডেল বেছে নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয় ও কমিউনিটি গ্রুপগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে—নবায়নযোগ্য শক্তির সুবিধা ও অসুবিধা স্থানীয় ভাষায় তুলে ধরা দরকার। পাশাপাশি নীতি-প্রণয়ন ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোর জন্য নাগরিক অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদান করা যেতে পারে।
২০৪১ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনে বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা একা সরকারের পক্ষে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থা, দ্বিপাক্ষিক অংশীদার, বেসরকারি সংস্থা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং তরুণ জনগোষ্ঠীসহ সমাজের সকলের উদ্যোগ ও সহযোগিতা অত্যন্ত দরকারি।
২০২৩ সালে প্রকাশিত জনশুমারি প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৭.৮ শতাংশই ১৫-৩০ বছর বয়সী তরুণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনে এই তরুণ সমাজই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ হাঁসমুরগি ও গরুছাগল পালন করে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। আবার, শূন্য দশকে কম্পিউটারকেন্দ্রিক কাজের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।
পরিবারসহ সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, জন-উদ্দীপনা তৈরি, নীতি নির্ধারকদের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অন্যান্য খাতের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে, বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে, তরুণ সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাঁদের নানান ধরনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতে পারে সবুজ বাংলাদেশ।
সবশেষে, গবেষণা ও টেকনোলজির প্রতি মনোযোগী হওয়া জরুরি। বায়োটেকনোলজি ও জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশ-প্রযুক্তির সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে, যা একটি টেকসই ও সবুজ বাংলাদেশের পথে তরুণদের অবদানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধুই একটি বিকল্প নয়, এটি একটি জরুরি পথ — কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই আমাদের জলবায়ু, পরিবেশ এবং সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে। বাংলাদেশে সংখ্যাগতভাবে এখনও বেশ পিছিয়ে থাকলেও সম্ভাবনা রয়েছে নানা তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগে। যদি আমরা এখনই উদ্যোগী হই, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও টেকসই, সমৃদ্ধ ও জীবনের গুণমানযুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।
তথ্যসূত্র:
- CLEAN. (2024, June 30). Bangladesh can meet entire electricity demand by solar energy.
- Government of the People’s Republic of Bangladesh. (n.d.). The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh (Article 18A).
- Department of Environment. (2023). Poribesh Songrokkhon Bidhimala, 2023 (Environment Conservation Rules, 2023). Government of Bangladesh.
- Ministry of Environment, Forest and Climate Change. (2021). Bangladesh Nationally Determined Contributions (NDC) 2021.
- Power Division, Ministry of Power, Energy and Mineral Resources. (2008). Renewable Energy Policy of Bangladesh.
- General Economics Division, Bangladesh Planning Commission. (2020). Eighth Five Year Plan (July 2020–June 2025).
- Government of Bangladesh et al. (2021). Mujib Climate Prosperity Plan: Decade 2030.
- Power Cell. (2023). Integrated Energy and Power Master Plan (IEPMP) 2023.
- Hydrocarbon Unit. (2024). Energy Scenario of Bangladesh 2023–24.
- Bangladesh Power Development Board. (2024). Annual Report 2023–24.
- Sustainable and Renewable Energy Development Authority. (n.d.). National Database of Renewable Energy.
- National Database of Renewable Energy. (n.d.). RE Generation Mix.
- UNFCCC. (2015). Paris Agreement.
- Climate Vulnerable Forum. (2016). The CVF Vision (Marrakech Vision).
- Global Methane Pledge. (n.d.). Global Methane Pledge.
- COP28 Presidency. (2023). Global Renewables and Energy Efficiency Pledge.
- Energy Transition Council. (n.d.). About the Energy Transition Council.










মতামত জানান