জ্বালানিবিহীন ইঞ্জিনের গণিত: পর্ব ১

একটা মজার দাবি দিয়ে আজ আলাপ শুরু করা যাক। কেউ হয়তো বলে বসলেন, চাকার এক পাশে কৌশলে কিছু ওজন সাজিয়ে দিলেই মহাকর্ষ সেটিকে অনন্তকাল ঘোরাবে, সঙ্গে ফ্রি বিদ্যুৎও পাওয়া যাবে! আরেকজনের বুদ্ধি আরও চমৎকার। তিনি গাড়ির চাকায় জেনারেটর লাগিয়ে তার বিদ্যুৎ দিয়েই মোটর চালাবেন। বাহ্যিক জ্বালানি বা সঞ্চিত শক্তি খরচ ছাড়াই নাকি চলবে সব। শুনতে দারুণ লাগলেও, এই ফ্রি এনার্জি বা অবিরাম গতির যন্ত্রের দাবিগুলো কি আদৌ কাজ করে?

এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা প্রায়ই শুনি, শক্তির সংরক্ষণ সূত্র ভাঙা যায় না। কথাটি ঠিক। কিন্তু তখন কেউ পাল্টা বলতেই পারেন, আমি তো নতুন শক্তি বানাচ্ছি না! চারপাশের বাতাসে এত তাপ আছে, সেখান থেকে একটু নিয়ে যন্ত্র চালাব। এবার কী বলব?

দেখা যাচ্ছে, এখানে দুই ধরনের দাবি আছে। একটিতে একই শক্তিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাড়তি শক্তি পাওয়ার চেষ্টা। অন্যটিতে শক্তির একটি উৎস আছে, কিন্তু সেই উৎস থেকে ইচ্ছেমতো কাজ আদায় করা যাবে কি না, সেটিই প্রশ্ন। আজ তাই শুধু সূত্রের নাম বলে থেমে যাব না। হিসাব করে দেখব, প্রথম দাবিটির সমস্যা কোথায়, আর দ্বিতীয় দাবিটির বেলায় সম্ভাবনা ও গণিত কীভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ঘুরতে থাকা আর কাজ করে দেওয়া এক নয়

অঙ্কে ঢোকার আগে একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা যাক। কোনো কিছু অনন্তকাল চলতে থাকবে, আর সেটি অনন্তকাল আমাদের কাজ করে দেবে, এই দুই দাবি এক নয়!

ঘর্ষণহীন একটি আদর্শ চাকা একবার ঘুরিয়ে দিলে ঘুরতেই পারে। সমতল, সম্পূর্ণ বাধাহীন পথে একটি গাড়িও সমবেগে চলতে পারে। শুধু গতি বজায় রাখার জন্য সেখানে প্রতি মুহূর্তে নতুন শক্তি ঢালতে হবে না। কিন্তু চাকায় জেনারেটর লাগিয়ে হেডলাইট জ্বালানো শুরু করলেই পরিস্থিতি বদলে গেল। এবার আমরা চাকার সঞ্চিত গতিশক্তি থেকে শক্তি নিচ্ছি। অন্য কোনো উৎস সেই শক্তি ফিরিয়ে না দিলে চাকাটির গতি কমবে।

তাই আমাদের আলোচনার দাবি হলো, যন্ত্রটি বারবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে, কোনো সঞ্চিত শক্তি কমবে না, বাইরে থেকে ব্যবহারযোগ্য কোনো শক্তিও আসবে না, অথচ প্রতিবার আমরা কিছু কাজ পাব। এখানে কাজ বলতে শুধু কোনো বস্তুকে ঠেলে সরানো বোঝাচ্ছি না। ভার তোলা, মোটর চালানো বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করাও শক্তি দিয়ে কাজ আদায়ের উদাহরণ।

আর “আগের অবস্থায় ফেরা” কথাটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চাকার গায়ে আঁকা দাগ আবার আগের জায়গায় এসেছে বলেই পুরো যন্ত্র আগের অবস্থায় ফেরেনি। ভেতরের স্প্রিং হয়তো ঢিলে হয়েছে, ব্যাটারির চার্জ কমেছে, কোনো ওজন নিচে নেমেছে, কিংবা চাকার গতি একটু কমেছে। আমাদের সম্পূর্ণ চক্রের হিসাবে এগুলোকেও ধরতে হবে।

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, স্থির ভরের একটি কণার ওপর মোট বল প্রয়োগ করলে তার বেগ বদলায়। বলের সঙ্গে ক্ষুদ্র সরণের ডট গুণন করে যোগ করতে থাকলে পাওয়া যায় কাজ। ক্ষুদ্র সরণ হলো বেগের সঙ্গে ক্ষুদ্র সময়ের গুণফল। তাই,

∫𝐅⋅d𝐫=∫md𝐯dt⋅𝐯dt=Δ(12mv2)=ΔK.\int \mathbf F\cdot d\mathbf r =\int m\frac{d\mathbf v}{dt}\cdot\mathbf v\,dt =\Delta\left(\frac12mv^2\right) =\Delta K.

এটিই কাজ–শক্তির উপপাদ্য। এখানে K হলো গতিশক্তি। ডট গুণনের কাজ হলো বলের যে অংশ সরণের দিকে আছে, সেই অংশটিকে হিসাবে আনা। বল প্রয়োগ করলেই কাজ হবে না; সেই বলের দিকে সরণের উপাংশও থাকতে হবে।

এবার ধরুন, বলটি রক্ষণশীল। এর অর্থ, দুই অবস্থানের মধ্যে বলের মোট কাজ পথের ওপর নির্ভর করে না। তখন অবস্থানের সঙ্গে একটি বিভবশক্তি V যুক্ত করা যায়। বলটি বিভবশক্তি কমার দিকে কাজ করে। গাণিতিকভাবে,

𝐅=−∇V,∫𝐅⋅d𝐫=−ΔV=ΔK,∴ Δ(K+V)=0 \mathbf F=-\nabla V, \qquad \int \mathbf F\cdot d\mathbf r=-\Delta V= \Delta K, \qquad \therefore \ \Delta(K+V)=0

এখানে গ্রেডিয়েন্ট চিহ্নটি বোঝায়, বিভিন্ন দিকে সরলে বিভবশক্তি কী হারে বদলায়। ঋণাত্মক চিহ্নটি বলের দিক নির্দেশ করছে। বলটি বস্তুটিকে যেদিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেদিকে বিভবশক্তি কমছে। শুধু এমন রক্ষণশীল বল কাজ করলে এবং বিভবশক্তি সময়ের সঙ্গে আলাদাভাবে বদলে না গেলে, গতিশক্তি যত বাড়ে বিভবশক্তি তত কমে। ফলে K + V অপরিবর্তিত থাকে। তবে এখানেই একটু সতর্কতা দরকার। শুধু নিউটনের সূত্র লিখে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রের সবটুকু প্রমাণ করে ফেলিনি। বলগুলো রক্ষণশীল, এটিও কিন্তু আলাদা করে ধরে নিয়েছি। বাস্তব যন্ত্রে শক্তি আর কোথায় জমা থাকতে পারে, সেই হিসাবও সম্পূর্ণ হতে হবে।

গাড়ি থামলে তার গতিশক্তি উধাও হয় না। ব্রেক, চাকা এবং আশপাশের পরিবেশ গরম হয়। অণুগুলোর এলোমেলো গতি ও পারস্পরিক আন্তঃক্রিয়ায় শক্তি জমা থাকতে পারে। এর হিসাব আসে অভ্যন্তরীণ শক্তির মধ্যে। আবার তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে ব্যবস্থার সীমানা পেরিয়ে শক্তি আসা–যাওয়াকে আমরা বলি তাপের আদান–প্রদান। এটি অণুর সংঘর্ষে ঘটতে পারে, বিকিরণেও ঘটতে পারে। তাপ তাই ব্যবস্থার মধ্যে জমিয়ে রাখা আলাদা কোনো পদার্থ নয়।

সব ধরনের সঞ্চিত শক্তির মোট হিসাবকে E বলি। বাইরে থেকে আসা নিট তাপ Q এবং ব্যবস্থা বাইরে যে নিট কাজ করে তাকে W লিখি। ব্যবস্থার সীমানা দিয়ে পদার্থ ঢুকছে বা বেরোচ্ছে না ধরে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র হলো, ΔE=Q-W, অর্থাৎ যত শক্তি এসেছে, তার একটি অংশ বাইরে কাজ হিসেবে গেছে, বাকিটুকু সঞ্চিত শক্তির পরিবর্তন হয়েছে। তাপ ও কাজ হলো শক্তি স্থানান্তরের উপায়; E হলো ব্যবস্থায় থাকা শক্তির হিসাব। [১]

এখন সম্পূর্ণ চক্র শেষে সব সঞ্চিত শক্তি আগের অবস্থায় ফিরলে ΔE = 0। তাপের আদান–প্রদানও না হলে Q = 0। ফলে পুরো চক্রে নিট কাজ W = 0। চক্রের কোনো অংশে কাজ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু অন্য অংশে সেই হিসাব মেটাতে হবে। মহাকর্ষ দিয়ে চাকা ঘোরানোর প্রস্তাবে বিষয়টি সরাসরি দেখা যায়। সুষম অভিকর্ষজ ত্বরণ g-এর মধ্যে একটি ভর m-কে h উচ্চতা থেকে নামালে mgh পরিমাণ কাজ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু তাকে আগের উচ্চতায় তুলতে আদর্শ অবস্থাতেও একই পরিমাণ কাজ দিতে হবে।

চাকায় অনেকগুলো ওজন থাকলেও মোট বিভবশক্তি হবে প্রতিটি ওজনের বিভবশক্তির যোগফল। প্রতিটি ভর আগের উচ্চতায় ফিরলে সেই যোগফলও আগের মানে ফিরবে। গাণিতিকভাবে, মহাকর্ষের একটি সম্পূর্ণ বদ্ধপথের কাজ,

Wg=∮𝐅g⋅d𝐫=−∮dV=0.W_g=\oint \mathbf F_g\cdot d\mathbf r =-\oint dV=0.

এখানে ইন্টিগ্রাল চিহ্নের ছোট বৃত্তটি বোঝাচ্ছে, আমরা একটি বদ্ধপথ ধরে হিসাব করছি।

কেউ হয়তো বলবেন, দাঁড়ান! আমার চাকার ওজনগুলো তো স্থির নয়। এক পাশে কেন্দ্র থেকে দূরে চলে যায়, অন্য পাশে কাছে আসে। দূরের ওজনে টর্ক বেশি হবে। তখন?

টর্ক হলো কোনো অক্ষের চারপাশে বস্তুকে ঘোরানোর ক্ষেত্রে বলের প্রভাবের পরিমাপ। বল একই থাকলে তার প্রয়োগরেখা থেকে অক্ষের লম্ব দূরত্ব বাড়িয়ে টর্ক বাড়ানো যায়।

যুক্তিটির আকর্ষণ এখানেই। কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বাড়লে সত্যিই টর্ক বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু সেই টর্কের কাজ হিসাব করলে ওজনটির সম্পূর্ণ সরণের হিসাব করা হয় না।

একটি ভরের অবস্থান ধরি x = r cosθ এবং y = r sinθ। এখানে r হলো অক্ষ থেকে দূরত্ব, আর θ হলো অনুভূমিক অক্ষ থেকে মাপা কোণ। উচ্চতা y বদলালে মহাকর্ষের কাজ হবে −mg dy। কিন্তু r এবং θ দুটোই বদলাতে দিলে,

dWg=−mgdy=−mg(rcos⁡θdθ+sin⁡θdr)dW_g =-mg\,dy =-mg\left(r\cos\theta\,d\theta+\sin\theta\,dr\right)

প্রথম পদটি ঘূর্ণনের টর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয়টি এসেছে ওজনের কেন্দ্রের দিকে বা কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে। কিন্তু পুরো চক্র শেষে ওজনটি আগের অবস্থানে ফিরলে, মোট কাজ,

Wg=−mg∮dy=−mg∮(rcos⁡θdθ+sin⁡θdr) =∮(τzdθ+Frdr) amp;=−mg∮d(rsin⁡θ)=0\begin{aligned} W_g = -mg\oint dy=-mg\oint(r\cos\theta d\theta+\sin\theta dr)\ = \oint(\tau_z d\theta+F_r dr)\ &=-mg\oint d(r\sin\theta)=0 \end{aligned}

অর্থাৎ ব্যাসার্ধ পরিবর্তন করে ঘূর্ণনের টর্ক থেকে বেশি কাজ পাওয়া গেলেও রেডিয়াল সরণের কাজ বাদ দেওয়া যাবে না। প্রতিটি ওজন চক্র শেষে আগের উচ্চতায় ফিরলে মহাকর্ষের মোট কাজ শূন্যই থাকবে। যে পরিমাণ লাভ টর্কের হিসাবে দেখা গিয়েছিল, বাদ পড়া অংশটি ঠিক ততটাই ঋণাত্মক।

এই ফল পেতে আমরা ঘর্ষণও ধরিনি। বাস্তব মেকানিজমে ক্যাম, স্প্রিং, মোটর কিংবা চলন্ত অংশের গতিশক্তির মধ্যে কাজের আদান–প্রদান হতে পারে। কোন অংশ কত শক্তি দেবে, তা নকশার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু পুরো চক্রে মহাকর্ষের কাজ হিসাব করলে বাড়তি শক্তি পাওয়া যাবে না। ওজন সরানোর ব্যবস্থাটিকে হিসাবের বাইরে রাখলেই কেবল সেই লাভ দেখা যায়।

এবার গাড়ির চাকায় জেনারেটর লাগানোর বুদ্ধিটা দেখা যাক। ধরা যাক, চাকা থেকে জেনারেটর A জুল শক্তি নিল। জেনারেটরের কর্মদক্ষতা ηg এবং মোটরের কর্মদক্ষতা ηm। কর্মদক্ষতা মানে ইনপুট শক্তির কত অংশ কাঙ্ক্ষিত আউটপুট হিসেবে পাওয়া গেল। অন্য কোনো শক্তির উৎস না থাকলে এই অনুপাত শূন্য থেকে একের মধ্যে থাকবে।

জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে ηg A জুল। সেই বিদ্যুৎ মোটরে দিলে চাকায় ফেরত আসবে ηgηm A জুল। সমতল পথে গাড়ি ও চাকার মোট গতিশক্তি K এবং বাইরের ঘর্ষণ ও বাতাসের বাধায় কমে যাওয়া শক্তি L ধরলে,

ΔK=−A+ηgηmA−L=−(1−ηgηm)A−L≤0\Delta K =-A+\eta_g\eta_m A-L =-(1-\eta_g\eta_m)A-L \leq0

এখানে L অঋণাত্মক। এই শক্তিও ধ্বংস হয়নি; গাড়ির গতিশক্তি কমে চাকা, রাস্তা ও আশপাশের পরিবেশের অন্যান্য গতিশক্তি ও অভ্যন্তরীণ শক্তি বেড়েছে।

ধরা যাক, যন্ত্র দুটি খুবই উন্নত, দুটির কর্মদক্ষতাই ৯০ শতাংশ। চাকা থেকে ১০০ জুল নিলে জেনারেটর দেবে ৯০ জুল বিদ্যুৎ। মোটর সেই বিদ্যুৎ থেকে চাকায় ফেরত দেবে ৮১ জুল। বাইরের ঘর্ষণ শূন্য ধরলেও একবার ঘুরে আসতেই কমল ১৯ জুল।

এবার যদি অবশিষ্ট ৮১ জুলের পুরোটাই আবার একই পথে পাঠাই, ফিরবে তার ৮১ শতাংশ, অর্থাৎ ৬৫.৬১ জুল। এভাবে একই শক্তিকে বারবার ঘোরালে n ধাপ পরে,

En=(ηgηm)nE0.E_n=(\eta_g\eta_m)^nE_0.

খেয়াল করুন, এখানে প্রতি ধাপে নতুন করে একই ১০০ জুল নিচ্ছি না। আগের ধাপে যতটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটুকুই আবার পাঠাচ্ছি। বাস্তবের কর্মদক্ষতা একের কম বলে এই শক্তি ক্রমে কমতে থাকে।

তর্কের খাতিরে দুটো যন্ত্রই শতভাগ দক্ষ এবং বাইরের সব বাধা শূন্য ধরি। তখন যত শক্তি নেব, ঠিক ততটুকুই ফিরে পাব। বাড়তি কিছু পাওয়া যাবে না। গাড়ি সমবেগে চলতে পারে, কিন্তু হেডলাইট জ্বালানো, গতি বাড়ানো বা ঢাল বেয়ে ওঠার শক্তি কোথা থেকে আসবে?

রিজেনারেটিভ ব্রেকিং অবশ্যই কাজে লাগে। ব্রেক করার সময় গাড়ির গতিশক্তির একটি অংশ বিদ্যুৎ হিসেবে ফেরত পাওয়া যায়। সমতল পথে অন্য কোনো চালনা না থাকলে এতে গতি কমে। আবার ঢাল বেয়ে নামলে মহাকর্ষীয় বিভবশক্তির কিছু অংশও উদ্ধার করা যায়। দুটো ক্ষেত্রেই শক্তির একটি উৎস আছে। জেনারেটর সেটির কিছু অংশ অন্য রূপে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

কেউ এবার বলতেই পারেন, “বেশ তো, নতুন শক্তি বানাব না। চারপাশের বাতাসের অণুগুলোর গতিতে যে শক্তি আছে, সেখান থেকেই নেব!” এবার কিন্তু প্রশ্নটি আরও মজার।

এই দাবিকে প্রথম সূত্র দিয়ে সরাসরি বাদ দেওয়া যায় না। পুরো চক্রে যন্ত্র আগের অবস্থায় ফিরলে ΔE = 0। তখন Q = W হতে পারে। পরিবেশ থেকে যত তাপ নিলাম, সবটুকুই কাজে পরিণত করলাম। শক্তির মোট হিসাবে তো গরমিল নেই!

কিন্তু পরিবেশটি যদি একই তাপমাত্রায় সাম্যাবস্থায় থাকে, তাহলে শুধু সেই পরিবেশ থেকে বারবার তাপ নিয়ে নিট কাজ আদায় করা যাবে কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পরের পর্বে ঢুকব অণুর সম্ভাবনা এবং তথ্যের এনট্রপির জগতে। দেখা যাক, শক্তির হিসাব মিলে যাওয়ার পরও গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান কোথায় বাধা দেয়!

অণুর অবস্থা থেকে তথ্যের অনিশ্চয়তা

একটি যন্ত্রের তাপমাত্রা জানা আর তার প্রতিটি কণার অবস্থান ও ভরবেগ জানা এক কথা নয়। কণাগুলোর বিস্তারিত অবস্থা নির্দিষ্ট করলে তাকে বলি মাইক্রোস্টেট। একই দৃশ্যমান অবস্থার সঙ্গে অসংখ্য মাইক্রোস্টেট মানানসই হতে পারে। তাহলে যন্ত্রটি ঠিক কোন মাইক্রোস্টেটে আছে, সে বিষয়ে আমাদের অনিশ্চয়তাকে কি একটি সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায়?

এ জন্য আগে অণুর বদলে একটি কয়েন নিয়ে ভাবি। কয়েনটি নিক্ষেপ করার আগেই যদি নিশ্চিত জানি হেড হবে, তাহলে হেড হয়েছে শুনে নতুন কিছু জানলাম না। কিন্তু হেড ও টেইল সমান সম্ভাব্য হলে ফলটি না দেখা পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থাকে। আবার কোনো ফল খুবই কম সম্ভাব্য হলে, সেটি ঘটেছে জানার তথ্যও আলাদা গুরুত্ব পায়। এখানে গুরুত্ব বলতে সংবাদের সামাজিক গুরুত্ব বোঝাচ্ছি না; কোন ফলটি ঘটেছে জানতে কতটা অনিশ্চয়তা দূর হলো, সেটিই বোঝাচ্ছি।

ধরা যাক, i-তম ফলের সম্ভাবনা pᵢ; সব সম্ভাবনা অঋণাত্মক এবং তাদের যোগফল এক। pᵢ > 0 হলে সেই ফলটি ঘটেছে জানার তথ্যের পরিমাণ সংজ্ঞায়িত করি,

Ii=−log2⁡piI_i=-\log_2 p_i

লগারিদম কেন? দুটি স্বাধীন ঘটনার যৌথ সম্ভাবনা গুণ করে পাওয়া যায়, কিন্তু আলাদাভাবে পাওয়া তথ্যের পরিমাণ যোগ হওয়া উচিত। লগারিদম গুণকে যোগে বদলে দেয়। আবার নিশ্চিত ফলের সম্ভাবনা এক হলে তথ্যের পরিমাণ শূন্য হয়। সম্ভাবনা যত ছোট, তথ্যের পরিমাণ তত বড়। দুই ভিত্তির লগারিদম ব্যবহার করছি বলে এই তথ্যের একক বিট।

এবার আগে থেকে তো জানি না কোন ফলটি আসবে। তাই প্রতিটি ফলের তথ্যকে তার সম্ভাবনা দিয়ে গুণ করে গড় নিই:

H(p)=∑ipiIi=−∑ipilog2⁡pi.H(p)=\sum_i p_i I_i =-\sum_i p_i\log_2p_i.

এই গড় তথ্যই শ্যানন এনট্রপি (Shannon entropy) বা তথ্য-এনট্রপি। একই রাশিকে ফল জানার আগের গড় অনিশ্চয়তার পরিমাণও বলা যায়। কোনো ফলের সম্ভাবনা শূন্য হলে তার পদটি সীমামান অনুযায়ী শূন্য ধরা হয়।

সমান সম্ভাব্য হেড ও টেইলের ক্ষেত্রে এনট্রপি এক বিট। আর একটি ফল নিশ্চিত হলে এনট্রপি শূন্য। হেডের সম্ভাবনা ৩/৪ এবং টেইলের সম্ভাবনা ১/৪ হলে একই সূত্রে পাওয়া যায় প্রায় ০.৮১১ বিট। ফলটি এখনও অনিশ্চিত, কিন্তু সমান সম্ভাবনার কয়েনের তুলনায় কিছুটা বেশি অনুমানযোগ্য।

এবার কয়েনের ফলের জায়গায় বসাই যন্ত্রের মাইক্রোস্টেটগুলোকে। আপাতত একটি সসীম মডেল নিচ্ছি, যেখানে প্রতিটি মাইক্রোস্টেট আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। একইভাবে প্রস্তুত করা ব্যবস্থায় i-তম মাইক্রোস্টেট পাওয়ার সম্ভাবনা pᵢ, এই ভৌত বণ্টনের জন্য গিবসের পরিসংখ্যানগত এনট্রপি লেখা হয়,

S=−kB∑ipiln⁡pi=kBln⁡2 H(p),kB=Boltzman  constantS=-k_{\mathrm B}\sum_i p_i\ln p_i =k_{\mathrm B}\ln 2 \ H(p), \quad k_B=Boltzman \ \ constant

H-এর একক বিট; S-এর একক জুল প্রতি কেলভিন। সাম্যাবস্থার উপযুক্ত মাইক্রোস্টেট বর্ণনায় এই পরিসংখ্যানগত এনট্রপিই তাপগতিবিদ্যার এনট্রপির সঙ্গে মেলে। তবে সেই সংযোগের জন্য সম্ভাবনাগুলোকে ব্যবস্থার ভৌত প্রস্তুতি ও অনুমোদিত অবস্থার সঠিক বিবরণ দিতে হবে। যেকোনো অনিশ্চয়তার সূত্রে একটি ধ্রুবক গুণ করলেই সেটি তাপগতীয় এনট্রপি হয়ে যায় না।

একই শক্তির দুটি আলাদা মাইক্রোস্টেট থাকলে তাদের আলাদা করেই গুনতে হবে। শুধু শক্তির ভিন্ন ভিন্ন মানের তালিকা বানালে অবস্থাগুলোর কিছু তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে।

এবার ধরি, নির্দিষ্ট শর্তে Ωটি মাইক্রোস্টেট সম্ভব এবং প্রতিটি সমান সম্ভাব্য। তাহলে প্রতিটির সম্ভাবনা 1/Ω আগের সূত্রেই বসাই,

S=−kB∑i=1Ω1Ωln⁡1Ω=kBln⁡Ω.S=-k_{\mathrm B} \sum_{i=1}^{\Omega} \frac1{\Omega}\ln\frac1{\Omega} =k_{\mathrm B}\ln\Omega.

চেনা লাগছে? এই সমান-সম্ভাবনার মডেলে এটিই বোল্টজম্যানের এনট্রপির সূত্র। অর্থাৎ নতুন করে আরেকটি অসংযুক্ত সংজ্ঞা আনতে হলো না। তথ্য-এনট্রপির একই কাঠামো থেকে সমান সম্ভাবনার বিশেষ রূপটি পাওয়া গেল।

এখন তাপীয় সাম্যাবস্থায় সম্ভাবনাগুলো কেমন হবে ও কীভাবে নির্ধারণ করব? সেই অবস্থাগুলোকে কৌশলে বদলিয়ে কি গড়ে কাজ আদায় করা সম্ভব? পরের পর্বে জেনসেনের অসমতা (Jensen’s Inequality) ব্যবহার করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব। সেখান থেকেই দেখা যাবে, শক্তির সংরক্ষণ সূত্র না ভেঙেও কেন তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র আমাদের ফ্রি এনার্জির স্বপ্নে বাধা দেয়!

☕ Support Us