Category: অনুবাদ

  • স্টিফেন হকিং এর ভবিষ্যদ্বাণী: কৃষ্ণগহ্বর কি অনন্ত বন্দিশালা?

    স্টিফেন হকিং এর ভবিষ্যদ্বাণী: কৃষ্ণগহ্বর কি অনন্ত বন্দিশালা?

    কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল হলো মহাবিশ্বের এমন একটি এলাকা, যেখানে প্রবল মাধ্যাকর্ষণ বল বিরাজমান। এ বল এতটাই শক্তিশালী যে ওই এলাকা থেকে আলোকরশ্মিও বের হতে পারে না। বিজ্ঞানীদের মতে, বিপুল ভরের কোনো নক্ষত্রের মৃত্যুর পর তা কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে ক্রমেই বৃদ্ধি পায় কৃষ্ণ গহ্বরের (Black Hole) চেহারা। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে নিজের গবেষণায় প্রাপ্ত এই তত্ত্বের কথা জানিয়েছিলেন কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। প্রয়াত প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী হকিংয়ের একটি পূর্বাভাসকে অবশেষে সঠিক প্রমাণ করল ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর অবশেষে প্রমাণিত হল হকিংয়ের তত্ত্ব। 

    ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইগো’ অবজারভেটরিতে ধরা পড়া এক মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীরা। সেই তত্ত্বকেই পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করলেন ম্যাসাচুসেট্স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-র একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। কয়েকশো কোটি বছর পূর্বে ব্রহ্মাণ্ডের দূরপ্রান্তে দুটি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষের বার্তা ছিল সেই তরঙ্গে। কোনও পুকুরের মাঝখানে ঢিল ফেললে যেমন জলে তরঙ্গের জন্ম হয় আর তা ধীরে ধীরে আরও বড় আকার নিয়ে যেমন পাড়ে পৌঁছয়, ঠিক তেমনই ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও কোনও ঘটনা বা দুই মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যে সংঘর্ষের ফলেও তৈরি হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। যা কয়েকশো কোটি বছরের পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছলে জানা যায় সেই সুদূর অতীতে ঠিক কী ঘটনা ঘটেছিল।

     ইভেন্ট হরিজন টেলিস্কোপ এর মাধ্যেমে ধারণকৃত কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি  

    কৃষ্ণগহ্বরের গঠন

    আমরা আগেই জেনেছি স্বাভাবিকভাবে কোনো একটি নক্ষত্র চুপসে গেলে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। তবে নক্ষত্রগুলোর ভর হয় অনেক। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্যের বিস্তৃতি প্রায় $1.3\times10^9$ km এবং এর ভর প্রায় $2\times10^{30}$ kg এর কাছাকাছি। নক্ষত্রগুলোর অস্বাভাবিক ভরের জন্য এদের মধ্যাকর্ষণও অনেক। কেননা আমরা জানি মধ্যাকর্ষনের সাথে ভরের একটি অনন্য সম্পর্ক রয়েছে। কারণঃ
    $$F = \frac{G m_1 m_2}{r^2}$$
    এটি নিউটনের মধ্যাকর্ষন সূত্র। এখানে $G$ এর মান ধ্রুবক। $G = 6.673 \times 10^{-11}$ যা খুব ছোট। যাই হোক, যখন আপনি $m_1 m_2$ তে সূর্য এবং পৃথিবীর ভর রাখবেন এবং $r$ তাদের মধ্যবর্তী দুরত্ব হবে তখন এদের মধ্যে আকর্ষণ মান হবেঃ $3.76 \times10^{22}$ N। যখন নক্ষত্রের বাইরের তাপমাত্রার চাপে ভেতরের মধ্যাকর্ষন বাড়তে থাকে, তখন সেই বলের কারণে নক্ষত্র চুপসে যেতে শুরু করে। সব ভর একটি বিন্দুতে পতিত হতে শুরু করে। এটি ধীরে ধীরে ছোট এবং অধিক ঘনত্বে আসতে শুরু করে এবং এক সময় সমস্ত ভর একটি ছোট্ট বিন্দুতে ভিড় করে যার নাম সিঙ্গুলারিটি। সব চুপসে পড়া নক্ষত্রই কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়না। কৃষ্ণগহ্বর হবে কিনা তা নির্ভর করে তার ভরের উপর। যাই হোক, কৃষ্ণগহ্বর হতে হলে নক্ষত্রকে বা বস্তুকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে আসতে হবে। নিচে সমীকরণটি দেওয়া হলো যার সাহায্যে আমরা নির্ণয় করতে পারি কৃষ্ণগহ্বর হতে হলে কোনো বস্তু বা নক্ষত্রের কত ব্যাসার্ধে আসা দরকারঃ
    $$R=\frac{2GM}{c^2}$$
    যেখানে $M$ বস্তু বা নক্ষত্রটির ভর। $G$ মহাকর্ষিয় ধ্রুবক। $c$ আলোর বেগ। এই ব্যাসার্ধ পরিমাপের সূত্রটির মান Schwarzschild radius, পদার্থবিজ্ঞানী Karl Schwarzschild এই সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন ১৯১৬ সালে। তার নাম অনুসারে এর নাম রাখা হয়।

    স্টিফেন হকিং এর বিখ্যাত রেইথ লেকচার

    হকিং মহাবিশ্ব, কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব এবং এদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে ‘রেইথ লেকচার’ এ বলেছিলেন যে। যদিও কৃষ্ণগহ্বরের ধারণাটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী থেকেও আশ্চর্যজনক, কিন্তু এটি দৃঢ়ভাবে বৈজ্ঞানিক। নক্ষত্র নিজেদের মহাকর্ষের বলে নিজেরাই সংকুচিত হয় এবং এর ফলে সৃষ্ট বস্তুটির প্রকৃতি কেমন হবে, এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিক সমাজ উপলব্ধি করতে অনেক সময়  নিয়েছে। ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে আলবার্ট আইনস্টাইন দাবি করেন – যেহেতু পদার্থ একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে সংকুচিত করা যায় না, তাই নক্ষত্র নিজ মহাকর্ষ বলে সংকুচিত হতে পারে না। বহু বিজ্ঞানী তাঁর এই কথায় একমত হয়েছিলেন। তবে একজন আমেরিকান বিজ্ঞানী সেই দলে ছিলেন না এবং তাকেই বলা যায় ব্ল্যাকহোলের গল্পের পথিকৃৎ । একটি সাধারণ নক্ষত্র তার সহস্র বছরের জীবনকালে তাপীয় বহির্মুখী চাপের সহায়তায় নিজের মহাকর্ষের বিপরীতে নিজেকে বজায় রাখে। এই চাপ উৎপন্ন হয় হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তর করার পারমাণবিক প্রক্রিয়ায়।

    ধীরে ধীরে নক্ষত্রের এই জ্বালানী শেষ হয়ে যায়। তারপর সে সংকুচিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে নক্ষত্রটি একটি শ্বেত বামন হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে।

    তবে ১৯৩০ সালে সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর দেখিয়েছিলেন, একটি শ্বেত বামনের সর্বোচ্চ ভর হতে পারে আমাদের সূর্যের ভরের ১.৪ গুন।

    এছাড়াও একজন সোভিয়েত বিজ্ঞানী লেভ লান্দাউ নিউট্রন দ্বারা নির্মিত একটি নক্ষত্রের জন্য একই ধরণের সর্বোচ্চ ভরের সীমারেখা গণনা করেছিলেন।

    তাহলে পারমাণবিক জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে সেসব অসংখ্য নক্ষত্রের কি পরিণতি হবে, যাদের ভর শ্বেত বামন বা নিউট্রন নক্ষত্রের চাইতে অধিক?

    এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই গবেষণা করেছিলেন অ্যাটম বোমার জনক হিসেবে খ্যাত রবার্ট ওপেনহাইমার। জর্জ ভল্কফ এবং হার্টল্যান্ড স্নাইডারের সঙ্গে যৌথভাবে ১৯৩৯ সালে কিছু গবেষণাপত্রে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে এমন একটি নক্ষত্র বহির্মুখী তাপীয় চাপ দিয়ে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে না। এই চাপ বাদ দিলে, একটি সুষম গোলীয় নক্ষত্র অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দুতে সংকুচিত হয়। এই বিন্দুকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

    স্থান এবং কাল নিয়ে আমাদের সকল তত্ত্ব এই অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, স্থান ও কাল মসৃণ এবং প্রায় সমতল। তাই এসকল তত্ত্ব সিঙ্গুলারিটিতে এসে অকেজো হয়ে পড়ে, যেখানে স্থান এবং কালের বক্রতা অসীম। আদতে, এখানেই সময়ের সমাপ্তি। এই বিষয়টি আইনস্টাইন মেনে নিতে পারেন নি।

    এর মাঝে তখন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, রবার্ট ওপেনহাইমারসহ বেশীর ভাগ বিজ্ঞানী মনোযোগ দিলেন পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার প্রতি এবং মহাকর্ষীয় বলে নক্ষত্রের সংকোচন চলে গেল পর্দার আড়ালে। এই প্রসঙ্গে পুনরায় আগ্রহ জেগে উঠল দূরবর্তী ‘কোয়াসার’ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।

    ১৯৬৩ সালে প্রথম ‘কোয়াসার’, 3C273 আবিষ্কৃত হয়। অচিরেই আরও ‘কোয়াসার’ আবিষ্কৃত হয়। অনেক দূরের হলেও, এগুলো অনেক উজ্জ্বল।

    এই ধরনের শক্তির উৎপাদন শুধুমাত্র পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয় কারণ এতে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা স্থিতিভরের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। এক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হল মহাকর্ষীয় শক্তি যা মহাকর্ষীয় সংকোচন থেকে সৃষ্ট। মহাকর্ষীয় সংকোচন পুনরাবিষ্কার হয়। সিঙ্গুলারিটিতে আইনস্টাইনের সমীকরণ অসংজ্ঞায়িত। অর্থাৎ অসীম ঘনত্বের এই বিন্দুতে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব।

    তাহলে খুব অদ্ভুত কিছু ঘটবে একটি নক্ষত্রের ধ্বসের পর। যদি সিঙ্গুলারিটিগুলো বাইরের থেকে আবৃত না হয় অর্থাৎ যদি কোন ঘটনা দিগন্তের সৃষ্টি না হয়, তবে ভবিষ্যদ্বাণী করাটা সম্ভব হবে। ১৯৫৭ সালে জন হুইলার ‘ব্ল্যাক হোল’ নামটির আবির্ভাব ঘটালে, পুরনো নাম ‘ফ্রোজেন স্টার’ বাতিল হয়ে যায়। এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে ব্ল্যাক হোলের সৃষ্টির উপায় বিবেচনা না করলেও, এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোই আগ্রহের উদ্রেক ঘটাতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের সীমারেখা আছে, যাকে বলা হয় event horizon (ঘটনাদিগন্ত) । আলোক রশ্মিকে আটকানো এবং ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট মহাকর্ষ বল সেখানে বিদ্যমান। কিন্তু সূর্যের থেকে মিলিয়ন গুণ বেশী ভরের কিছু ব্ল্যাক হোলে পরলে, ঘটনা দিগন্তে সহজেই পৌঁছানো যাবে।

    সুতরাং যদি আমরা একটি কৃষ্ণগহ্বরে অনুসন্ধান চালাতে চাই, আমাদেরকে অধিক ভরের একটি বস্তু বেছে নিতে হবে। আমাদের মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল আছে, যার ভর সূর্যের চেয়ে ৪ মিলিয়ন গুণ বেশী।সূর্যের ভরের সমান ভরের কৃষ্ণগহ্বর খুব ধীরগতিতে কণা বিকিরণ করে যা শনাক্ত করা অসম্ভব। তবে একটি পাহাড়ের ভরের সমান ভরের কৃষ্ণগহ্বর ও থাকতে পারে।

    এরকম ক্ষুদ্র একটি ব্ল্যাক হোল ১০ মিলিয়ন মেগাওয়াট হারে এক্স-রে ও গামা-রে বিকিরণ করে- এই পরিমাণ পৃথিবীর বৈদ্যুতিক চাহিদার সমান।

    তবে এই শক্তি ধারণ করে কাজে লাগানো সহজ হবে না। কৃষ্ণগহ্বরটিকে একটি বৈদ্যুতিক কেন্দ্রে রাখা যাবে না কারণ সে তো মেঝে ভেঙে বেরিয়ে একেবারে পৃথিবীর কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছাবে।

    একটি কৃষ্ণগহ্বরকে রাখার উপায় হবে যদি পৃথিবীর চারিদিকে কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানী জন হুইলারের ভাষ্যমতে, একটা ব্ল্যাক হোলের ভেতরে লুকোনো অনেক তথ্য রয়েছে। সুতরাং, এই গুপ্ত তথ্যের পরিমাণ যদি ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর নির্ভর করে, তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তার তাপমাত্রা থাকার কথা এবং গরম ধাতুর মত তার জ্বলজ্বল করার কথা। কিন্তু এটা তো সম্ভব হওয়ার কথা না, কারণ সবাই জানে কৃষ্ণগহ্বর থেকে কিছুই বের হতে পারেনা। অন্তত এটাই জানা ছিল। এই তথ্যের ভিত্তি ১৯৭৪ পর্যন্ত ছিল, যখন স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম মেকানিকস অনুযায়ী কৃষ্ণগহ্বরের সন্নিকটে পদার্থের ব্যবহার কেমন হবে তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি দেখেছিলেন ব্ল্যাক হোল থেকে সুষম হারে কণার বিকিরণ ঘটে।

    বড় ম্যাগেলানিক মেঘের সামনে একটি কৃষ্ণগহ্বরের সিমুলেটেড ভিউ।

    স্টিফেন হকিং তার বক্তৃতার  সমাপ্তি টেনেছিলেন এই বলে যে,

    এটা কোন অনন্তকালের বন্দিশালা নয়। কৃষ্ণগহ্বর থেকে পদার্থ বেরিয়ে আসতে পারে, সম্ভবত অন্য এক মহাবিশ্বে। হকিংয়ের প্রস্তাবনা সত্য হলে আরেকটি নতুন সম্ভাবনাও সত্য হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে ঢুকে পড়া কণাগুলো যেহেতু পুরোপুরি ধ্বংস হচ্ছে না, সেহেতু আমরা কি ধারণা করতে পারি যে সেটি গহ্বরের ভেতর থেকে অপর প্রান্ত দিয়ে ‘বেরিয়ে’ আসবে? হকিং বলছেন, এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে পড়া কণাগুলো ঘটনা দিগন্তে নিজেদের তথ্য রেখে যেতে পারছে, তার মানে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরেও তারা নিজেদেরকে অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রবেশ করছে। এটা সত্যি যে গহ্বরের ভেতরে কী ঘটছে তা আমরা এখনও জানি না। হকিংয়ের মতে, গহ্বরে প্রবেশ করা কণাগুলো অন্য প্রান্তে বেরিয়ে আসলে আমাদের মহাবিশ্বে ফেরত আসবে না, বরং তারা পৌঁছে যাবে আমাদেরই সমান্তরাল অন্য একটি মহাবিশ্বে। অনেক পদার্থবিদের মতে, কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে আরেকটি ক্ষুদে মহাবিশ্ব তৈরি হয়। কণাগুলো সেখানেও থাকতে পারে।

    সম্ভাবনার যেটাই সত্য হোক না কেন, এটুকু নিশ্চিত যে এই প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে কৃষ্ণগহ্বর ও মহাবিশ্বের নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে গেল। কে জানে, হয়তো এই গবেষণা থেকেই বেরিয়ে আসবে সমান্তরাল মহাবিশ্বের সন্ধান!


    তথ্য সূত্র
    Review: Stephen Hawking’s Reith lectures on black holes – Financial Times

     

  • কোষের শক্তি কোত্থেকে আসে?

    কোষের শক্তি কোত্থেকে আসে?

    মাইটোকন্ড্রিয়া যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এদের উদ্ভব মাত্র একবার হয়েছে কেন? সুকেন্দ্রীক কোষরাই বা কেন একবার মাত্র বিবর্তিত হয়েছে? নিক লেন ও বিল মার্টিন ২০১০ সালে বৈজ্ঞানিক জার্নাল ন্যাচারে প্রকাশিত নিবন্ধ “The energetics of genome complexity”-তে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সহজ হিসাব-নিকাশ ও চমৎকার যুক্তির মাধ্যমে তারা দেখিয়েছেন প্রাককেন্দ্রিক কোষরা সরলই রয়ে গেছে কারণ তাদের পক্ষে সুকেন্দ্রীক কোষের জ্বালানী-খেকো জীবনযাপন করার সামর্থ্য নেই। অন্যভাবে বলা যায়: “তারা ইহা করতে পারবে না জনাব, তাদের সেই শক্তিই নেই।” লেন ও মার্টিন যুক্তি দেন যে কোন কোষকে জটিলতর হতে হলে তার জিনোম বড় হতে হবে। আজকালকার দিনে গড়পড়তা সুকেন্দ্রিক জিননামের আকার সাধারণ প্রাককেন্দ্রিক জিনোমের চেয়ে ১০০-১০,০০০ গুণ বড়। কিন্তু বড় জিনোম ব্যয়বহুল, তা বিনামূল্যে আসে না। ডি.এন.এ. অনুলিপি করা কিংবা জেনেটিক তথ্য থেকে থেকে প্রোটিন বানানোর সময় কোষের অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। একটি কোষের শক্তি-বাজেটে ডি.এন.এ. অনুলিপি করার তুলনায় প্রোটিন বানানো খুব খরুচে কাজ, যা কোষের এক-তৃতীয়াংশ শক্তি খেয়ে ফেলতে পারে। যদি কোন ব্যক্টেরিয়া বা আর্কিয়ার জিনোম ১০-গুণ বড় করতে হয়, তা অতিরিক্ত প্রোটিন নির্মানের জন্য মোটামুটিভাবে আরো ১০-গুণ বেশি শক্তি দাবী করবে কোষের শক্তি তহবিলে।

    ধারাবাহিকের সূচী:
    কিস্তি ১. প্রাণের প্রথম একশ কোটি বছর কেন একঘেয়ে ছিলো?
    কিস্তি ২. সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব কেন অসম্ভব-সম্ভাবনা ছিলো?
    কিস্তি ৩. প্রাককেন্দ্রিক জিনেরা সুকেন্দ্রিক জিনোমে কিভাবে কর্মবিভাজন করলো?
    কিস্তি ৪. মাইটোকন্ড্রিয়াহীন সুকেন্দ্রিকদের হুমকি সামলানো গেলো কিভাবে?
    কিস্তি ৫. কোষের শক্তি কোথেকে আসে?
    কিস্তি ৬. কেন সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব গবেষণায় অনিশ্চয়তা নিশ্চিত?

    কোষের আকারে বড় হওয়া এ সমস্যার একটা সমাধান হতে পারে। প্রাককেন্দ্রীক কোষে শক্তি-উৎপাদন-বিক্রিয়াগুলো তাদের কোষঝিল্লীর মধ্যে সংঘঠিত হয়। তাই বড় কোষ মানে বড় কোষঝিল্লী, তার মানে অতিরিক্ত শক্তির সরবরাহ। কিন্তু একটি বড় কোষকে বেশি প্রোটিন তৈরি করতে হয়, তাই তাদের বেশি শক্তি পুড়াতে হবে হবে যা হবে কোষঝিল্লীর বিক্রিয়া থেকে পাওয়া শক্তির তুলনায় বেশি। যদি কোন প্রাককেন্দ্রীক কোষকে সুকেন্দ্রিক কোষের সমান বড় করে একই রকম জিনোম সরবরাহ করা হয়, তাহলে তা প্রতিটি জিনের পেছনে ব্যয় করার জন্য আগের তুলনায় ২,৩০,০০০ ভাগ শক্তি অবশিষ্ট থাকবে! শক্তির হিসাবে অদক্ষ একটি প্রাককেন্দ্রীক কোষ যদি কোনভাবে একাকী বেঁচে থাকতে সক্ষমও হয়, তাহলেও সেটি অন্যান্য প্রাককেন্দ্রীকদের সাথে প্রতিযোগীতায় হেরে যাবে।

    সুকেন্দ্রিক ও প্রাককেন্দ্রিক কোষের আকার ও শক্তি ব্যবহারের তুলনা
    সুকেন্দ্রিক ও প্রাককেন্দ্রিক কোষের শক্তি ব্যবহারের তুলনা। উপরে জিনোম পর্যায়ে ও নিচে জিন পর্যায়ে কোষের আকারের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় শক্তির তুলনা দেয়া হচ্ছে। সূত্র

    প্রাককোষীরা তাই একটি নির্দিষ্ট শক্তিসীমার গিরিখাদের আটকে গেছে — যা তাদের ক্ষমাহীনভাবে সরল ও ক্ষুদ্র করে রাখে। এখান থেকে বেয়ে ওঠার অন্য কোন পথ নেই। বরং বিবর্তন তাদের বিপরীত দিকে চালনা করে, ক্ষমাহীনভাবে জিনোমের আকার ছেটে সব জিনকে ঠাসাঠাসি করে রেখে বৃত্তাকার জিনোমের মধ্যে, যেখানে কিছু কিছু জিন অন্যদের। সাথে সমপতিতও হয়ে যায়। এই গিরিখাদ থেকে শুধু একবারই একটি প্রাককোষী বের হতে পেরেছিল অসম্ভব একমেবাদ্বিতীয়ম কসরতের মাধ্যমে — মাইটোকন্ড্রিয়া অর্জনের মাধ্যমে। মাইটোকন্ড্রিয়ার কোষঝিল্লী দুইটি পর্দায় গঠিত। ভেতরের পর্দাটি ঠেসে কুঁচি দেয়া কাপড়ের মতো অজস্রবার ভাঁজ খেয়েছে। ফলে মাইটোকন্ড্রিয়ায় শক্তি-তৈরির রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য বৃহৎ পৃষ্ঠতল পাওয়া যায়। কিন্তু এই বিক্রিয়াগুলো আচরণে চঞ্চল, চপল। মাইটোকন্ড্রিয়ার ঝিল্লীতে পরপর অনেকগুলো প্রোটিন জড়িত থাকে এ বিক্রিয়ার সাথে, যারা ইলেকট্রন বের করে আনে খাদ্য-অণু থেকে আর একে-অপরের কাছে হাত-বদলিয়ে শেষ পর্যন্ত অক্সিজেন অণুতে ফেলে দেয়। ফলাফলে তৈরি হয় উচ্চ বৈদ্যুতিক বিভব ও কিছু ঠুনকো অণু। কোন ধাপে একটু ভুল হলে কোষটি সহজেই মারা যেতে পারে।

    মাইটোকন্ড্রিয়ার বারবার ভাঁজ খাওয়া ঝিল্লি। ছবি উইকিপিডিয়া।

    তবে মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব ডি.এন.এ.-এর ছোট একটি সংগ্রহ আছে, যা ইলেকট্রন-হস্তান্তর-শেকল বিক্রিয়ায় অংশ নেয়া ডজনখানেক প্রোটিন তৈরির সংকেত বহন করে। ডি.এন.এ.টি এসব প্রোটিনের পরিমাণ দ্রুত বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে মাইটোকন্ড্রিয়ার কোষঝিল্লীর বিভব শক্তির লাগাম টেনে রাখে। মাইটোকন্ড্রিয়া শক্তি সরবরাহের সাথে সাথে শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখার ক্ষমতা রাখে। আর এই কাজগুলি করে কোষের হেড-কোয়ার্টার নিউক্লিয়াসকে কোন রকম বিরক্ত না করেই। শক্তির যোগান দেয়া মাইটোকন্ড্রিয়ার বিশেষত্ব, সত্যিকার অর্থেই মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের পাওয়ারহাউস। লেন বলেন, ‘কোষের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (নিউক্লিয়াস – অনুবাদক) অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক ও দ্রুত কিছু করার জন্য অনেক দূরে। আপনার তাই এসব ছোট দল (মাইটোকন্ড্রিয়া – অনুবাদক) থাকতে হবে যাদের ক্ষমতা সীমিত হলেও চারপাশের পরিস্থিতি দেখে বিচক্ষণতার সাথে সাড়া দিতে পারে। তারা যদি সেখানে না থাকে, সবকিছুই মারা যাবে।’ প্রাককেন্দ্রীক কোষের কোন শক্তিকেন্দ্র নেই; কিন্তু তারা নিজেরাই পাওয়ার হাউজ। তারা কোষঝিল্লীকে ভেতরের দিকে ভাঁজ করতে পারবে শক্তি-বিক্রিয়ার জন্য বাড়তি জায়গা করে দিতে। অনেক প্রাককেন্দ্রীক কোষই এমনটা করে। কিন্তু তাদের উচ্চ-শক্তির অণু তৈরির জন্য কোন দ্বিতীয় ডি.এন.এ. নেই যা বাড়তি ঘাঁটির মতো কাজ করবে; ফলশ্রুতিতে কেন্দ্রীয় ডি.এন.এ. বিবর্তনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে ব্যয় করার জন্য বাড়তি সময় ও শক্তির অবকাশ পাবে।

    মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যে যেভাবে শক্তি তৈরি হয়
    মাইটোকন্ড্রিয়া যেভাবে শক্তি তৈরি করে। প্রথমে একটি প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট তৈরি হয় যা একটি শক্তি বিভব তৈরি করে। শক্তি বিভব নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে তৈরি হয় ATP যা কোষীয় শক্তির একক। ছবি

    এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো অন্য কোষের সাথে যুক্ত হয়ে যাওয়া। যখন এক আর্কিয়া অন্য ব্যক্টেরিয়ার সাথে যুক্ত হতে সক্ষম হয়, তখন তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এর নতুন সহকর্মীর কাছ থেকে শক্তি নিয়ে শক্তি-গিরিখাত থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে আসে। এটি তখন জিনোমের আকার বৃদ্ধি করার সামর্থ্য লাভ করে, নতুন ধরনের জিন ও প্রোটিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করে, বড় হতে থাকে আকারে আর নতুন নতুন উদ্ভাবনী পথে বিবর্তিত হওয়া শুরু করে। এটি নিজস্ব ডি.এন.এ. আলাদা ভাবে ধরে রাখার জন্য নিউক্লিয়াস গঠন করে আর অন্যান্য অণুজীব গ্রাস করে ক্লোরোপ্লাস্টের মতো ক্ষুদ্র অঙ্গানু তৈরি করে, যেখানে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ বিক্রিয়া সংগঠিত হয়। মার্টিন বলেন, “আপনার (কোষীয়) স্তর মাইটোকন্ড্রিয়ার ধাপ পর্যন্ত উঠানো দরকার যাতে এসব বিবর্তনীয় অভিযানের শক্তি-সংস্থান করা যায়। এসব অভিযাত্রা বিনামূল্যে করা যায় না।”

    লেন ও মার্টিনের যুক্তি হঠাৎ-উদ্ভব অনুকল্পের জন্য বিশাল আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। জটিল হওয়ার জন্য কোষের দরকার। শক্তিশালা যা হবে স্থিতিশীল ও ছড়ানো থাকবে কোষ জুড়ে। একমাত্র মাইটোকন্ড্রিয়ার পক্ষেই তা সম্ভব। অন্যান্য প্রাককেন্দ্রীকদের অকপট বিবর্তনীয় কুশলতা থাকা সত্ত্বেও এই অন্তঃস্থ পাওয়ার-স্টেশনের অভাবে সবসময় সরল এককোষীই রয়ে যায়।

    যে ধরণের সংযােজন মাইটোকন্ড্রিয়া তৈরি করে তা আজগুবি অসম্ভব বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। প্রাককেন্দ্রিকরা গত তিনশ’ কোটি বছরে মাত্র একবার এরকম সংযোজন সম্ভব করতে পেরেছে, যদিও তারা একে অপরের সংস্পর্শে সবসময়ই ছিলো। লেন বলেন, “বিবর্তনীয় ইতিহাসে সম্ভবত এরকম ঘটনা হাজার বা লক্ষ বার ঘটেছে, তবু তারা একসাথে থাকা ও একে অন্যের সাথে মানিয়ে সহবিবর্তিত হবার পথ খুঁজে পায় নি। এরকম মানিয়ে নেয়া আসলেই দুঃসাধ্য।”

    ভিনগ্রহে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাহীনতা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। লেন মনে করেন অন্যান্য গ্রহে যদি সঠিক রাসায়নিক পরিবেশ উপস্থিত থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সেখানে জীবনের উদ্ভব ঘটবে। তবে দৈবভাবে সংযোজন না হলে সে জীবন চিরতরে অণুজীব রয়ে যাবে। সম্ভবত এটাই ফার্মি হেত্বাভাসের উত্তর – ফার্মির হিসাবে আকাশ গঙ্গা বা মিল্কি ওয়েতে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি হলেও আমরা তাদেরকে বা তাদের কোন চিহ্ন খুঁজে পাই না। লেন ২০১০ সালে লিখেন, “(এ হেত্বাভাস সম্পর্কে) অনিবার্য উপসংহার হলো মহাবিশ্বে ব্যক্টেরিয়া দিয়ে সম্ভবত ভর্তি, কিন্তু আরো জটিল জীবন বিরল হবে। আর যদি বুদ্ধিমান ভিনগ্রহবাসীর আদতেই থেকে থাকে, তাদেরও সম্ভবত মাইটোকন্ড্রিয়া ধরনের কিছু থাকবে।

    কেন সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব গবেষণায় অনিশ্চয়তা নিশ্চিত? 

    সুকেন্দ্রিক-উৎপত্তি বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি হয় নি। বিভিন্ন নতুন ভাবনা-চিন্তার প্রভাব কখনো বেড়েছে বা কমেছে। আর নানান তথ্য-প্রমাণ এখন হঠাৎ-উদ্ভব অনুকল্পের পক্ষে গেলেও বিপরীত ভিন্নমতের সংখ্যাও যথেষ্ট। কোন কোন বিজ্ঞানী এমনও মত সমর্থন করেন যে প্রাককোষীরা আসলে সুকেন্দ্রিকদেরই অন্য সংস্করণ যারা তাদের পূর্বপুরুষের চেয়ে বেশি সরলতার দিকে বিবর্তিত হয়েছে। অন্যরা কার্ল উজের জীবন-বৃক্ষের দৃঢ়-নিশ্চয় সমর্থক রয়ে গেছেন। ২০০৭ সালে, অ্যান্থনি পুল ও ডেভিড পেনি হঠাৎ-উদ্ভব শিবিরকে দায়ী করেন যে তারা “বাঁধনহারা কল্পনার উপর প্রক্রিয়াটির ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। তারা বলছেন আকিয়া ও ব্যক্টেরিয়া একে অপরকে গিলে ফেলে নি, এই গিলে ফেলা হচ্ছে সুকেন্দ্রিকদের বৈশিষ্ট্য। একটি আদিম সুকেন্দ্রিক কোষ কিভাবে অন্য ব্যক্টেরিয়াকে গিলে খাচ্ছে তা বোঝা সহজ, কিন্তু তুলনামূলক সরল আর্কিয়া এ কাজটা কিভাবে করছে তা কল্পনা করা কঠিন।

    এক রকমের সাদা পোকা সাইট্রাস মেলিবাগের কারণে এ সমালোচনা কিছুটা ধার হারায়। এই পোকাটির কোষ একটি ব্যক্টেরিয়া ধারণ করে যার নাম ট্রেমব্লায়া (Tremblaya), আর ট্রেমব্লায়া মোরানেলা নামক অন্যএকটি ব্যক্টেরিয়া ধারণ করে। এটি একটি প্রাককেন্দ্রিক কোষ যার অন্য কোন কিছু গিলে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও এর মধ্যে অন্য একটি প্রাককেন্দ্রিক কোষ কোন না কোন ভাবে বসবাস করছে। তবুও প্রথম আর্কিয়া-ব্যক্টেরিয়া কিভাবে সংযুক্ত হলো তার বিস্তারিত কৌশল এখনো রহস্যময়। কিভাবে একে অন্যের মধ্যে ঢুকে গেলো? তাদের অংশীদারিত্বের ভিত্তি কি ছিলো — মার্টিন ও মুলার যেমন হাইড্রোজেন অনুকল্পের ধারণা দিয়েছেন তেমন কিছু? নাকি অন্যকিছু? অণুজীব দুইটি একত্রিত থাকার টানাপোড়ন কিভাবে সামলালো? মার্টিন বলেন,”আমার মনে হয় আমাদের রোডম্যাপ ঠিক আছে, কিন্তু সেখানে সব সাদা-লাইন ও মাইলস্টোন জায়গা মতো নেই। সামগ্রিক রূপটি আছে কিন্তু বিস্তারিত বর্ণনা নেই।” হয়তো আমরা কখনোই নিশ্চিতভাবে জানতে পারবো না। সুকেন্দ্রিক কোষের উদ্ভব এতো আগে হয়েছে, তার সামান্য যে আভাসটুকু রয়েছে তাই বিস্ময়ের। তাই মতবিরোধ অনিবার্য; অনিশ্চয়তা নিশ্চিত।

    মার্টিন বলে, “আপনি কখনোই বিবর্তনের প্রথম দিকে আসলে কি ঘটেছিলো সে বিষয়ে কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, কারণ প্রত্যেকে নিজস্ব মত আঁকড়ে রাখতে চায়। তবে আমি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে চাই না। আমি এসব সমস্যার সমাধান করেছি নিজের সন্তোষের জন্য, আর এ সমাধান যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। আমি আনন্দিত।

    [এড ইয়ং এর Unique Merger প্রবন্ধের অনুবাদ।]

    Ed Yong is an award-winning science writer. His work has appeared in Wired, Nature, the BBC, New Scientist, the Guardian, the Times, Aeon, Discover, Scientific American, The Scientist, the BMJ, Slate, and more.

  • প্রাককেন্দ্রিক জিনেরা সুকেন্দ্রিক জিনোমে কিভাবে কর্মবিভাজন করলো? 

    প্রাককেন্দ্রিক জিনেরা সুকেন্দ্রিক জিনোমে কিভাবে কর্মবিভাজন করলো? 

    [একমেবাদ্বিতীয়ম্ সংযোজন – ৩য়+৪র্থ কিস্তি]

    বিভিন্ন জীবের জিন সিকোয়েন্স করে (ডি.এন.এ. নিউক্লিওসাইড ক্ষার অণু দিয়ে পর পর কি লেখা আছে তার পাঠোদ্ধার করে) তাদের পারস্পারিক তুলনা করার ভাবনা ১৯৭৭ সালে অণুজীববিজ্ঞানী কার্ল উজের মাথায় আসে। এখন আধুনিক জীববিজ্ঞানে এটা নিত্যদিনের কাজ, তবে সেই সময় বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রজাতির মাঝে বিবর্তনীয় সম্পর্ক আন্দাজ করার জন্য বাহ্যিক-দৈহিক বৈশিষ্ট্যের উপরেই ভরসা করতেন। ওই সময়ে বিভিন্ন জিনের তুলনা করা ছিলো নতুন ধরনের দুঃসাহসিক কাজ। এ তুলনা সুকেন্দ্রিক-কোষীদের মতো জটিল প্রাণ কিভাবে এলো তা বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

    ধারাবাহিকের সূচী: 
    ধারাবাহিকের সূচী:
    কিস্তি ১. প্রাণের প্রথম একশ কোটি বছর কেন একঘেয়ে ছিলো?
    কিস্তি ২. সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব কেন অসম্ভব-সম্ভাবনা ছিলো?
    কিস্তি ৩. প্রাককেন্দ্রিক জিনেরা সুকেন্দ্রিক জিনোমে কিভাবে কর্মবিভাজন করলো? 
    কিস্তি ৪. মাইটোকন্ড্রিয়াহীন সুকেন্দ্রিকদের হুমকি সামলানো গেলো কিভাবে? 
    কিস্তি ৫. কোষের শক্তি কোথেকে আসে? 
    কিস্তি ৬. কেন সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব গবেষণায় অনিশ্চয়তা নিশ্চিত?  

    কার্ল উজ তাঁর গবেষণার মনোযোগ নিবন্ধ করলেন 16s রাইবোজোমাল আর.এন.এ. জিন লক্ষ্য করে। এটি এমন একটি জিন যা বিভিন্ন প্রোটিন নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা রাখে আর একে সকল জীবের মধ্যেই পাওয়া যায়। উজ যুক্তি দিলেন বিভিন্ন জীব নতুন নতুন প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের রাইবোজোমাল আর.এন.এ. জিন সিকোয়েন্সের সংস্করণও ক্রমশঃ বিসদৃশ হয়ে যেতে থাকবে। সুতরাং বিভিন্ন প্রাককেন্দ্রীক ও সুকেন্দ্রীক কোষী জীবের 16s রাইবোজোমাল আর.এন.এ. সিকোয়েন্স তুলনা করলে জীবনবৃক্ষের ডালপালার অন্তর্নিহিত সজ্জা-বিন্যাসও প্রকাশিত হবে। জীবন-বৃক্ষের বহুল আকাঙ্ক্ষিত সজ্জা উন্মোচিত হয়েছিলো — কিন্তু সে সজ্জার নকশা কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করে নি।

    কার্ল উজ ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টের পাশাপাশি প্রণের নতুন একটি ডোমেইন খুঁজে পান।

    উজের জীবন-বৃক্ষে ব্যক্টেরিয়া আর সুকেন্দ্রীকরা ডালপালার আলাদা গুচ্ছে বিভক্ত দেখায়। কিন্তু অন্য কিছু প্রাককেন্দ্রিক-কোষীর তৃতীয় একটি অভাবনীয় গুচ্ছ দেখা যায় উজের জীবন-বৃক্ষে, যাদের খুব উষ্ণ তাপমাত্রার প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বিজ্ঞানীরা সংগ্রহ করেছিলেন। সকলেই ভাবতেন, এরা হয়তো কোন অভূতপূর্ব-ধরনের ব্যক্টেরিয়া। কিন্তু কার্ল উজের জীবন-বৃক্ষ এদেরকে প্রাণের তৃতীয় অঞ্চল বলে ঘোষণা করলো। ঘটনাটা তুলনা করা যায় একটা ম্যাপের সাথে: সকলেই পৃথিবীর ম্যাপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, হঠাৎ কার্ল উজ এসে সবিনয়ে ম্যাপ উল্টিয়ে দেখালেন এর ভাঁজে আরো এক তৃতীয়াংশ অঞ্চল লুকিয়ে ছিলো! কার্ল উজের ঐতিহাসিক তিন-অঞ্চল জীবন-বৃক্ষে সুকেন্দ্রিক ও আর্কিয়ারা পাশাপাশি অবস্থান করে তারা সহোদর দল। উভয় দল একই সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে, যে সাধারণ পূর্বপুরুষ পৃথিবীর ইতিহাসের একেবারে প্রথমে ব্যক্টেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে যখন আধুনিক বংশগতিবিদ্যা পূর্ণ গতিতে ছোটা শুরু করলো, বিজ্ঞানীরা সুকেন্দ্রিক-কোষী জীবদের বিভিন্ন জিন সিকোয়েন্সিং করা শুরু করলেন, তখন জীবন-বৃক্ষের এই পরিপাটি চিত্র আরো পাক-খেয়ে যেতে লাগলো।

    কিছু কিছু সুকেন্দ্রিক জিন দেখা গেলো অনুরূপ প্রাককেন্দ্রিক জিনের সাথে নিকট আত্মীয়তায় সম্পর্কিত; কিন্তু অন্য জিন দেখা গেল ব্যক্টেরিয়ার অনুরূপ জিনের সাথে বেশি মিলে যায়। কেন্দ্রীক কোষীদের দলটা হয়ে পড়লো একটা বিভ্রান্তিকর জগাখিচুড়ী, আর প্রতিটি নতুন জিন সিকোয়েন্সের সাথে সাথে অন্য দুই দলের সাথে তাদের বিবর্তনীয় সম্পর্কটা দোল খাওয়া আরম্ভ করলো। ২০০৪ সালে জেমস লেক এই গবেষণা-যজ্ঞের নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনলেন। কেবল একটি জিন না দেখে সহকর্মী মারিয়া রিভেরার সাথে দুইটি সুকেন্দ্রীক, তিনটি ব্যক্টেরিয়া ও তিনটি আর্কিয়ার পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স তুলনা করলেন। তাদের বিশ্লেষণ দুই ধরনের ভিন্ন কোষের সংযোজন ঘটার ধারণাকেই সমর্থন করলো: তারা সিদ্ধান্ত দিলেন যে পৃথিবীর সকল জীবের সাধারণ পূর্বপুরুষ প্রথমে ব্যক্টেরিয়া ও আর্কিয়াতে ভাগ হয়ে যায়, যারা স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হওয়া শুরু করে, আর পরবর্তীতে এ দুই দলের দুই সদস্য হঠাৎ করে পরস্পর সংযোজিত হয়। এর ফলে তৈরি হয় প্রথম সুকেন্দ্রিক-কোষী। এ ঘটনার ফলে আমরা জীবন-বৃক্ষের জায়গায় পেলাম জীবন-বলয়। এর আগে জীবনের মাত্র দুইটি অঞ্চল ছিলো। আর পরে জীবনের অঞ্চল বেড়ে দাঁড়ালো তিনটি।

    কেবলমাত্র সাতটি প্রজাতি নিয়ে কাজ করার জন্য রিভেরা ও লেককে পরবর্তীতে অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়। তবে কেউই সম্ভবত বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী জেমস ম্যাকাইরেনির বিরুদ্ধে এরকম সমালোচনা করার সাহস পাবেন না। ২০০৭ সালে তিনি ১৬৮ প্রাককেন্দ্রিক ও ১৭ সুকেন্দ্রিক কোষী জীবের ৫,৭০০টি জিন নিয়ে একটা বিশাল জীবন-বৃক্ষ তৈরি করেন। তিনিও একই উপসংহারে পৌঁছেছিলেন; সুকেন্দ্রিক-কোষীরা মিশ্র জীব; তারা গঠিত হয়েছে কোন ব্যক্টেরিয়া ও আর্কিয়ার সমবায়ী মিথজীবিতার প্রাচীন সম্পর্কের মাধ্যমে। এ দুই অংশীদারের জিনগুলি যে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এমন নয়। তাদের আচরণ অনেকটা নিউ ইয়র্ক শহরে আগত এশিয়ান ও ল্যাটিনো জাতির অভিবাসীদের মতো যারা একই শহরে থাকলেও আলাদা পাড়ায় প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বিষয়টা হলো, বেশিরভাগ সময়েই তারা স্বজাতিভূক্ত জিনের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে: আর্কিয়া হতে আসা জিন অন্যান্য আর্কিয়া-জিনের সাথে, আর ব্যক্টেরিয়া থেকে আসা জিন ব্যক্টেরিয়া-জিনের সাথে।

    A phylogenetic supertree of the prokaryotes based on 168 species and 5,741 genes. Numbers at the nodes represent bootstrap proportions. Full circles indicate nodes with 100% bootstrap support.
    জেমস ম্যাকাইনারনির সেই ফাইলোজেনেটিক ট্রি যেখানে ১৬৮টি প্রজাতির ৫,৭৪১টি জিন ব্যবহার করা হয়েছিলো মূল গবেষণাপ্রবন্ধ এখানে

    ম্যাকইনারনি বলেন,

    “খেলার মাঠে আপনার দুই দল আছে, দলগুলো একে অন্যের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে খেলছে, কারণটা হলো আসলে তারা একে অন্যের সাথে ভিন্ন ভিন্ন সময় কাটিয়েছে।”

    এ দুই উৎসের জিন ভিন্ন ধরনের কাজ করে। আর্কিয়া হতে আসা জিন সাধারণত ডিএনএ অনুলিপি করা সহ ডিএনএ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। ব্যক্টেরিয়া হতে আসা জিনেরা খাদ্য ভেঙে পুষ্টি সংগ্রহ সহ অণুজীবের অন্যান্য নিত্যদিনের দিকগুলোর সাথে বেশি জড়িত। যদিও ব্যক্টেরিয়া হতে আসা জিনের সংখ্যা আর্কিয়া-উৎস এমন জিনের চাইতে প্রায় চারগুণ হলেও আর্কিয়া-উৎসের জিনগুলোকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। কারণ এরা ব্যক্টেরিয়া হতে আসা জিনের চাইতে প্রায় দ্বিগুণ সক্রিয়। তারা এমনসব প্রোটিন তৈরি করে যা সংশ্লিষ্ট কোষে তুলনামূলক কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। যদি এই জিনদের ভুল করে কেটে বাদ দেয়া হয় জিনোম থেকে তাহলে পোষক কোষ সাধারণত ধ্বংস হয়ে যায়। গত চার বছর ধরে ম্যাকইনারনি বার বার একই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছেন, ইস্ট, মানুষ সহ অন্য ডজনখানেক সুকেন্দ্রিক কোষী জীবের ক্ষেত্রে।

    “হঠাৎ-উদ্ভব” অনুকল্প আমলে নিলে কোন কিছুই খাপছাড়া মনে হয় না। যখন সেই প্রাচীন অংশীদাররা মিশে গেল, তখন অভিবাসী ব্যক্টেরিয়ার জিনগুলোকে স্থানীয় আর্কিয়-জিনের যৌথ যোগাযোগের মাঝে একীভূত হতেই হবে, যে জিনগুলি। ইতিমধ্যে অগণিত প্রজন্ম ধরে একসাথে বিবর্তিত হচ্ছিলো। দুই দল জিন একীভুত হয়েছিলো, আর যদিও অনেকগুলো আর্কিয়া-জিন স্থানচ্যুত হয়ে যায়, তবে কিছু অভিজাত জিন বেদখল করা যায় নি। বরং দুইশ কোটি বছর ধরে বিবর্তিত হওয়ার পরেও এই যৌথ যোগাযোগের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়ে গেছে; সংখ্যায় কম হলেও এরা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

    মাইটোকন্ড্রিয়াহীন সুকেন্দ্রিকদের হুমকি সামলানো গেলো কিভাবে? 

    হঠাৎ-উদ্ভব অনুকল্পের একটি মৌলিক দাবী হলো সকল সুকেন্দ্রীক কোষে অবশ্যই মাইটোকন্ড্রিয়া থাকবে। কোন ব্যত্যয় ঘটলে এই অনুকল্পের জন্য সেটি হবে মারাত্মক। আর ১৯৮০-র দশকে এরকম ব্যতিক্রম অঢেল সংখ্যক দেখা গেল।

    Giardiasis - Wikipedia
    মাইটোকন্ড্রিয়া-বিহীন জিয়ারডিয়া।

    আপনি যদি পৃথিবীর ভুল জায়গায় গিয়ে ভুল গ্লাসে পানি খান তাহলে আপনার অন্ত্রে জিয়ারডিয়া (Giardia) পরজীবি বাসা বানিয়ে ফেলতে পারে। ফলে এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার পেটে বিষম খিচুনী ধরতে পারে আর হতে পারে তীব্র উদরাময় (ডাইরিয়া)। রোগ সৃষ্টির বাইরেও জিয়ারডিয়ার খুব কিম্ভুতকিমাকার শারীরসংস্থান রয়েছে। জিয়ারডিয়ার আকৃতি অশ্রুবিন্দুর মতো, এর চারটি লেজের মতো ফিলামেন্ট আছে, আর এর নিউক্লিয়াসের সংখ্যা দুইটি। এটা পরিস্থার যে জিয়ারডিয়া একটি সুকেন্দ্রিক কোষ।

    কিন্তু এর কোন মাইটোকন্ড্রিয়া নেই।

    আরও অন্তত হাজারখানেক সুকেন্দ্রিক কোষ রয়েছে যাদের কোন মাইটোকন্ড্রিয়া নেই। একসময় তাদেরকে ডাকা হতো আর্কিজোয়ানস নামে। তাদের নিরুদ্দেশ পাওয়ার-হাউজ হয়ে পড়ে সুকেন্দ্রিক-কোষ-উৎপত্তি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এদের দেখে মনে হতে লাগলো এরা প্রাককেন্দ্রিক থেকে আদিম সুকেন্দ্রিক হতে যাওয়া একটি সময়ের জীবন্ত পর্যায়। এরা সেই সময়ের নিদর্শন যখন আদিম সুকেন্দ্রিক কোষ মাইটোকন্ড্রিয়া অর্জন করে নি। এই অবশিষ্টাংশদের উপস্থিতি সাক্ষ্য দেয় যে মাইটোকন্ড্রিয়া সুকেন্দ্রিক কোষ উদ্ভবের পরের অর্জন। ফলাফল – ‘হঠাৎ-উদ্ভব’ অনুকল্পের “গল্প” গলাধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়ার হুমকি।

    এ ধাক্কা সামলানো গেল ১৯৯০-র দশকে, যখন বিজ্ঞানীরা ক্রমেই বুঝতে পারলেন যে জিয়ারডিয়ার মতো বিদঘুটে সুকেন্দ্রীকদের এমন সব জিন আছে যাদের সচরাচর মাইটোকন্ড্রিয়াতেই খুঁজে পাওয়া যায়। তার মানে এসব আর্কিজোয়ানের একসময় অবশ্যই মাইটোকন্ড্রিয়া ছিলো যারা পরবর্তীতে হারিয়ে গেছে কিংবা অন্যান্য কোষীয় প্রকোষ্ঠে পরিণত হয়েছে। এরা সুকেন্দ্রীক কোষের আদিপর্যায় নয় যারা এখনো মাইটোকন্ড্রিয়া অর্জন করে নি, বরং আপাত-অবক্ষয়ের ফলে মাইটোকন্ড্রিয়া হারিয়ে ফেলা অত্যাধুনিক-সুকেন্দ্রীক কোষ — অনেকটা ফিতাকৃতি ও অন্যান্য পরজীবির মতো যারা প্রায়ই বিভিন্ন জটিল অঙ্গানু হারিয়ে ফেলে, পরজীবি-জীবনে অভ্যস্থ হওয়ার পর ঐসব অঙ্গানুর আর কোন প্রয়োজন নেই বলে। এই ধাক্কা-সামলানো নিয়ে ম্যাকইনারনি বলেন, “মাইটোকন্ড্রিয়া-বিহীন কোন আদিম-সুকেন্দ্রীক কোষ খুঁজে পাওয়া এখনো বাকি আছে; আর আমরা ইতিমধ্যে অনেক খোঁজাখুঁজি করে ফেলেছি।” আর্কিজোয়ানের রহস্য উন্মোচনের পর নতুন প্রাণশক্তিতে ‘হঠাৎ-উদ্ভব’ অনুকল্প পুনরায় তার অবস্থানে ফিরে এলো। মার্টিন বলেন,

    “আমরা বলেছিলাম সকল সুকেন্দ্রীক কোষেরই মাইটোকন্ড্রিয়া থাকবে। তখন সবাই এজন্যে হাসাহাসি করেছিলো, কিন্তু এখন এটা পাঠ্যপুস্তকের অংশ। সুতরাং আমি বিজয় ঘোষণা করছি। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক ছাড়া আর কেউই তা দিচ্ছে না আমাকে।”

    [এড ইয়ং এর Unique Merger প্রবন্ধের অনুবাদ। ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে]

  • সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব কেন অসম্ভব-সম্ভাবনা ছিলো?

    সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব কেন অসম্ভব-সম্ভাবনা ছিলো?

    [একমেবাদ্বিতীয়ম্ সংযোজন – ২য় কিস্তি]

    সুকেন্দ্রীক-কোষের কিছু অংশ এক সময় অন্তঃমিথোজীবী স্বাধীন অণুজীব হিসেবে ছিলো যারা পরবর্তীতে অন্য কোষের মধ্যে স্থায়ী ঠিকানা গড়ে নেয় – রাশিয়ান বিজ্ঞানী কনস্ট্যানটিন মেরেস্কোস্কি ১৯০৫ সালে সর্বপ্রথম এ ধারণা দেন। তিনি ভেবেছিলেন নিউক্লিয়াস এভাবে গড়ে উঠেছে, আর সৌরালোক থেকে উদ্ভিদকোষকে শক্তি জোগানো ক্লোরোপ্লাস্টের উদ্ভবও একইভাবে। অন্তঃমিথোজীবির তালিকায় প্রথমে মাইটোকন্ড্রিয়া বাদ গেলেও ১৯২৩ সালে আমেরিকান শরীরবিদ ইভান ওয়ালিন একে যুক্ত করেন।

    ধারাবাহিকের সূচী:
    ধারাবাহিকের সূচী:
    কিস্তি ১. প্রাণের প্রথম একশ কোটি বছর কেন একঘেয়ে ছিলো?
    কিস্তি ২. সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব কেন অসম্ভব-সম্ভাবনা ছিলো?
    কিস্তি ৩. প্রাককেন্দ্রিক জিনেরা সুকেন্দ্রিক জিনোমে কিভাবে কর্মবিভাজন করলো? 
    কিস্তি ৪. মাইটোকন্ড্রিয়াহীন সুকেন্দ্রিকদের হুমকি সামলানো গেলো কিভাবে? 
    কিস্তি ৫. কোষের শক্তি কোথেকে আসে? 
    কিস্তি ৬. কেন সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব গবেষণায় অনিশ্চয়তা নিশ্চিত? 
    

    দশকের পর দশক ধরে এসব ভাবনা উপেক্ষিত ছিলো, যতক্ষণ না আমেরিকান জীববিজ্ঞানী লিন মার্গুলিস ১৯৬৭ সালে তাদের পুনর্জাগরিত করেন। একটি বৈপ্লবিক নিবন্ধে তিনি বলেন মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্ট একসময় মুক্ত-ব্যক্টেরিয়া ছিলো যাদেরকে অন্য একটি প্রাচীন অণুজীব পরপর গিলে ফেলেছে। মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের মধ্যে ধারণকৃত জিনোম দেখতে ব্যক্টেরিয়া জিনোমের মতো মনে হওয়ার এটাই কারণ। মাগুলিস বললেন যে অন্তঃমিথোজীবিতা কোন পাগলামী বা উদ্ভট ধারণা নয় – বরং সুকেন্দ্রীকদের আগমণ-সংগীতে বাজানো স্থায়ী সুর, যা বার বার ফিরে আসবে।

    Lynn Margulis
    লিন মার্গুইলিস। ১৯৭০-এর দশকে তিনি এন্ডোসিম্বায়োসিস তত্ত্বকে বিজ্ঞানীমহলে প্রতিষ্ঠিত করেন।

    সেই বৈজ্ঞানিক নিবন্ধটি জীবকোষবিদ্যা, জৈবরসায়ন, ভূতত্ত্ব, জিনতত্ত্ব ও জীবাশ্মবিদ্যার ক্ষেত্রে বিশেষ নৈপূণ্যের সাথে উপস্থাপিত একটি প্রস্তাবনা ছিলো। সেই নিবন্ধের উপসংহার ছিলো তৎকালীন জীববিজ্ঞানের ভাবনা-গন্ডীর বাইরে। সে সময় বেশিরভাগ মানুষ ভাবতো যে মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের অন্য অংশ থেকে বিবর্তিত। জার্মানির হেনরিখ হেইন ইউনিভার্সিটির বিল মার্টিন বলেন,

    “অন্তঃমিথোজীবিতা ছিলো নিষিদ্ধ। আপনাকে কোন লুকোনো কুঠুরিতে গিয়ে নিজের কানে এ কথা ফিসফিস করতে হবে; ভাবনাটা আরেকবার ফিরে আসার আগেই।”

    বিল মার্টিন, হেনরিখ হেইন ইউনিভার্সিটি

    মার্গুইলিসের মতামত তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হলেও তিনি সমান-তেজে সেগুলো প্রতিরোধ করেছেন। বেশ দ্রুতই তিনি উপযুক্ত প্রমাণের সমর্থন পেলেন। বংশগতির গবেষণায় দেখা গেল মাইটোকন্ড্রিয়ার ডি.এন.এ. মুক্ত-ব্যক্টেরিয়ার ডি.এন.এ.-র মতো একই রকমের। সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ কোষে অনুপ্রবিষ্ট হওয়া সমবায়ী যে প্রাচীন ব্যক্টেরিয়ারই উত্তরপুরুষ তা নিয়ে বর্তমানে খুব কম বিজ্ঞানীই সন্দেহ পোষণ করেন। তবে সেই আদিম-সংযোজনের সময়কাল, অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃতি, আর সুকেন্দ্রিক-কোষের উদ্ভবে সংযোজনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে এখনো উত্তপ্ত বিতর্ক চলে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সুকেন্দ্রিক কোষের উদ্ভব নিয়ে নতুন নতুন তত্ত্ব পুরানোগুলো পরীক্ষিত হওয়ার চেয়ে দ্রুতগতিতে তৈরি হচ্ছে। বেশিরভাগ বয়ানকেই দুইটি শিবিরে ভাগ করা যায়।

    Serial Endosymbiotic Theory - an overview | ScienceDirect Topics
    লিন মার্গুইলিসের তত্ত্ব অনুযায়ী এন্ডোসিম্বায়োসিস যেভাবে হয়েছে। History of Symbiogenesis by N Gontier। Encyclopedia of Evolutionary Biology জার্নালে প্রকাশিত।

    প্রথম শিবিরকে বলা যায় “ক্রম-উদ্ভব” দল – যারা দাবী করেন যে প্রাককেন্দ্রীকরা ক্রমেই তাদের আকার বৃদ্ধি করেছে, নিউক্লিয়াস ও অন্যান্য কোষ গলাধঃকরণের মতো বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এভাবেই প্রাক-সুকেন্দ্রিকরা মাইটোকন্ড্রিয়া অর্জন করেছে, কারণ তারা নিয়মিতই ব্যক্টেরিয়া গ্রাস করতো। এই কাহিনী ধীরগতির, চাঞ্চল্যহীন এবং ধরনের দিক দিয়ে ধ্রুপদী ডারউইনিয়। মাইটোকন্ড্রিয়া অর্জন হলো এই দীর্ঘ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কেবল একটি মাত্র ধাপ। মার্গুইলিস জীবনের শেষ পর্যন্ত এই কাহিনীতেই ধারণাটিই সমর্থন করতেন। অন্যপক্ষকে বলা যায় “হঠাৎ-উদ্ভব” শিবির। এটি পূর্বোক্ত মতামতকে নাকচ করে দিয়ে বলে যে নাটকীয়ভাবে দু’টি প্রাককেন্দ্রিক কোষের হঠাৎ-সংযোজনের মাধ্যমে সুকেন্দ্রিকরা উৎপন্ন হয়েছে। বহুকাল আগে একটি ব্যক্টেরিয়া ছিলো। আর ছিলো প্রাককেন্দ্রিকদের আরেক কুলীন বংশ: আর্কিয়া (আর্কিয়া নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরে)। এই দুই অণুজীব বাইরে থেকে দেখতে এক রকম হলেও প্রাণ-রসায়নের দিক দিয়ে একেবারেই ভিন্ন, যেমন উইন্ডোজ ও ম্যাক তাদের অপারেটিং সিস্টেমের দিক দিয়ে ভিন্ন। এরা সংযোজিত হওয়ার মাধ্যমে গড়ে তুললো সুকেন্দ্রিকদের প্রারম্ভ। বিল মার্টিন ও মিকলোস মুলার এই ভাবনার প্রথমিক রূপ এগিয়ে নিয়ে যান ১৯৯৮ সালে। তারা একে ডাকা শুরু করলেন হাইড্রোজনে অনুকল্প নামে। এ নামের কারণ হলো একটি প্রাচীন আর্কিয়া: যা তাদের অনেক উত্তরসূরীদের মতোই হাইড্রোজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড যুক্ত করে মিথেন বানানোর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি সংগ্রহ করে । সে আর্কিয়া উপজাত হিসেবে হাইড্রোজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করা একটি ব্যক্টেরিয়ার সাথে অংশীদারী শুরু করলো, যে উপজাত পূর্বোক্ত আকিয়া শক্তি তৈরির জন্য ব্যবহার করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে তারা অবিচ্ছেদ্য হয়ে পড়লো আর। ঐ ব্যক্টেরিয়া পরিণত হলো মাইটোকন্ড্রিয়ায়।

    এই অনুকল্পের অনেকগুলো ভিন্ন পাঠ আছে, যারা মিলনের কারণ ও ঐ মিলনে যে আর্কিয়া এবং ব্যক্টেরিয়া অংশ নিয়েছিলো তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে আলাদা যুক্তি প্রয়োগ করে। কিন্তু সকলেই ক্রম-উদ্ভব শিবির থেকে আলাদা একটি বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে একাট্টা বলে — সকলেই বলে যে পোষক কোষটি ছিলো অকৃত্রিম প্রাককেন্দ্রিক। তা ছিলো আগাগোড়া আর্কিয়া। এটা আকারে বড়ো ছিলো না। এর কোন নিউক্লিয়াসও ছিলো না। এটা সুকেন্দ্রিক হওয়ার রাস্তায় অগ্রসর হচ্ছিলো না। তবে হঠাৎ করে একটি ব্যক্টেরিয়াকে নিজের সাথে যুক্ত করে আর্কিয়া বিবর্তনের নতুন পথে চলা শুরু করে। মার্টিন বলেন, “উদ্ভাবনগুলো পরে এসেছিলো।” (মানে সুকেন্দ্রিক কোষের বর্ধিত আকার কিংবা বড় জিনোমের মতো দারুণ সব বৈশিষ্ট্যগুলো পরে এসেছিলো — অনুবাদক)। এই পার্থক্য খুব গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে পারে না। হঠাৎ-উদ্ভব মত অনুযায়ী প্রথম দিকের সুকেন্দ্রিকদের ক্রমান্বয়ে অর্জিত অনেকগুলো অভিযোজনের মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়া একটি উদাহরণ নয়। লেন বলেন, “মাইটোকন্ড্রিয়া অর্জন করাই ছিলো সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব। দুইটি একই ঘটনা।” যদি তাই হয়, তাহলে সুকেন্দ্রিকদের অভ্যুত্থান বিবর্তনীয় রূপান্তরের ক্ষেত্রে চোখ, কিংবা সালোকসংশ্লেষণ কিংবা প্রাণীদের সাগর থেকে ভূমিতে ওঠার ধারাবাহিক পরিবর্তনের তুলনায় মূলগতভাবে একেবারেই ভিন্ন। বলতে গেলে একেবারেই অবিশ্বাস্য-অসম্ভব সাথে করে ঘটা আকস্মিক-অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা পৃথিবীতে জীবনের উদ্ভবের ১০০ কোটি বছর কেটে যাওয়ার পর ঘটেছে মাত্র একবার, যার পরবর্তী ২০০ কোটি বছরে আর কোন পুনরাবৃত্তি ঘটে নি। লেন বলেন, “এটি দারুণ মজার ও উত্তেজক সম্ভাবনা। এটি হয়তো প্রকৃত ঘটনা নাও হতে পারে, কিন্তু খুবই সুন্দর।”

    [এড ইয়ং এর Unique Merger প্রবন্ধের অনুবাদ। ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে]

  • প্রাণের প্রথম একশ কোটি বছর কেন একঘেয়ে ছিলো?

    প্রাণের প্রথম একশ কোটি বছর কেন একঘেয়ে ছিলো?

    [একমেবাদ্বিতীয়ম্ সংযোজন – ১ম কিস্তি]

    প্রথম দেখায় একটি গাছ থেকে ঐ গাছের পাতা খাওয়া শুঁয়োপোকা, গাছের বাকল থেকে অঙ্কুরিত ব্যাঙের ছাতা, গুঁড়ির পাশে বর্ধনশীল ঘাস, কিংবা তরু ছায়ায় বসে গল্প করা যুগল – কোন কিছুই দেখতে এক রকম লাগবে না। তবে বাহ্যরূপ ছলনাপূর্ণ হতে পারে। আণুবীক্ষণিক পর্যায়ে বিবর্ধিত করে দেখা হলে এদের কাঠামোগত সাদৃশ্য অবাক করে দেবে। কারণ এরা সকলে একই ধরনের গঠন-শৈলী মেনে চলা কোষ দিয়ে তৈরি।

    ধারাবাহিকের সূচী: ধারাবাহিকের সূচী:
    কিস্তি ১. প্রাণের প্রথম একশ কোটি বছর কেন একঘেয়ে ছিলো?
    কিস্তি ২. সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব কেন অসম্ভব-সম্ভাবনা ছিলো?
    কিস্তি ৩. প্রাককেন্দ্রিক জিনেরা সুকেন্দ্রিক জিনোমে কিভাবে কর্মবিভাজন করলো? 
    কিস্তি ৪. মাইটোকন্ড্রিয়াহীন সুকেন্দ্রিকদের হুমকি সামলানো গেলো কিভাবে? 
    কিস্তি ৫. কোষের শক্তি কোথেকে আসে? 
    কিস্তি ৬. কেন সুকেন্দ্রিকদের উদ্ভব গবেষণায় অনিশ্চয়তা নিশ্চিত? 

    এ কোষগুলোতে রয়েছে একটি নিউক্লিয়াস যা সুক্ষ্ম ঝিল্লী দিয়ে ডি.এন.এ-কে ধরে রাখে। আর এ নিউক্লিয়াসই হলো কোষের শাসন-কেন্দ্র, হেডকোয়ার্টার। নিউক্লিয়াসের চারপাশে অনেকগুলো ছোট ছোট কুঠুরী আছে যারা আসলে ক্ষুদ্র অঙ্গাণু, এরা বিশেষায়িত কাজ করে বেড়ায়: যেমন গুরুত্বপূর্ণ অণু জমা রাখা কিংবা প্রোটিন তৈরি। এসব কুঠুরীর মাঝে আছে শিম-আকৃতির মাইটোকন্ড্রিয়া: কোষকে শক্তি সরবরাহ করা পাওয়ার-প্ল্যান্ট।

    এই বৈশিষ্ট্যগুলো ঘুরে-ফিরে দেখা যায় সকল প্রাণী, উদ্ভিদ, ছত্রাক ও শৈবালের প্রায় সব কোষে – যাদেরকে এক নামে ডাকা হয় ইউক্যারিয়টস বা সুকেন্দ্রিক কোষ।

    অন্যদিকে ব্যক্টেরিয়ারা কোষ নির্মাণের অন্য একটি সরলতর নির্মাণ-কৌশল দেখায় – এ কৌশল সুকেন্দ্রীক কোষের চেয়ে অন্তত একশ কোটি বছরের পুরনো। এদেরকে বলে প্রোক্যারিয়টস বা প্রাককেন্দ্রীক কোষ। এসব কোষ আকারে সাধারণ সুকেন্দ্রিক কোষের চেয়ে অনেক ছোট এবং মাইটোকন্ড্রিয়া বা নিউক্লিয়াসের মতো কোন অভ্যন্তরীণ কুঠুরী বিহীন। নির্মাণশৈলী তুলনামূলক সরলতর হলেও ব্যক্টেরিয়ারা বেশ মনোগ্রাহী জৈব-যন্ত্র। তারা সকল সাম্ভাব্য বাসভূমিতে উপনিবেশ স্থাপন করে, তা সে হোক না অভ্রচুম্বী মেঘ কিংবা গভীর সমুদ্র। তাদের রয়েছে একঝাঁক জৈব-কৌশল যার মাধ্যমে ওরা রোগব্যাধি তৈরি করতে পারে, হজম করে ফেলতে পারে অপরিশোধিত তেল, বহন করতে পারে বিদ্যুত-প্রবাহ, সূর্য থেকে সংগ্রহ করতে পারে শক্তি, আর যোগাযোগ করতে পারে নিজেদের মধ্যে।

    আণবিক জাতিজনি, তুলনামূলক জিনোমবিদ্যা, আর পরিবেশে অণুজীবদের বৈচিত্র্যের মিথস্ক্রিয়া প্রকৃতকোষীদের মিথোজীবি উদ্ভবের পক্ষে প্রমাণ দেয়। পৃথিবীতে প্রথম প্রকৃতকোষিরা আর্কিয়ান আর ব্যক্টেরিয়ার মিথোজীবি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছিলো। সূত্র: Symbiosis in eukaryotic evolution, Journal of Theoratical Biology

    তবু, সুকেন্দ্রিক কোষের মতো বিশেষায়িত কাঠামো নেই বলে ব্যক্টেরিয়া চিরদিনের জন্য ক্ষুদ্র-আকৃতি ও সরলতার মধ্যে আটকে যায়। তাদের অজস্র মনোগ্রাহী দক্ষতা আছে, কিন্তু সুকেন্দ্রীক-কোষী জীবরাই পৃথিবীর বন ও তৃণভূমি ছেয়ে আছে – যারা এ গ্রহের মাঝে খাদ্য ও সঙ্গীর সন্ধানে চরে বেড়ায়, যারা মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার জন্য রকেট নির্মাণ করে।

    পৃথিবীতে প্রাণের ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আদিম প্রাককোষী থেকে জাঁকজমকপূর্ণ সুকেন্দ্রিককোষের উদ্ভব। আর এই ঘটনাটা তিনশ কোটি বছরের বেশি সময়ের মধ্যে মাত্র একবার ঘটেছে।

    বিষয়টা কিন্তু খুবই অবাক করা। পৃথিবীতে জীবন অজস্র জটিল কাঠামোতে পরিপূর্ণ যাদের হরদম বিবর্তন ঘটছে। কতগুলো একাকী কোষ কয়েক ডজন আলাদা ঘটনার মাধ্যমে একাট্টা হয়ে গঠন করেছে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মতো বহুকোষী জীব। একই কথা প্রযোজ্য চোখের ক্ষেত্রে; চোখ স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হয়েছে বারবার। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি বিবর্তনের পথে একই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে একই সমাধানে পৌঁছাতে পারে। আবার ভিন্ন পদ্ধতিতেও সমাধানে পৌঁছাতে পারে; যেমন উড়ার জন্য কীট-পতঙ্গ (ভ্রমর), সরীসৃপ (উড়ন্ত ডাইনোসর), পাখি (শালিক), স্তন্যপায়ী (বাদুড়) ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। কিন্তু প্রাককেন্দ্রিক থেকে সুকেন্দ্রিক কোষের উদ্ভব একবারই ঘটেছে।

    ব্যক্টেরিয়ারা বারবার অধিকগতর জটিল নির্মাণের পথে ঠেলাঠেলি করেছে। তাদের কেউ কেউ সাধারণ অণুজীবের তুলনায় আকারে বেশ বড়ো; বাকিরা একসাথে উপনিবেশ তৈরি করে করে কাজকারবার করে, অনেকটা বহুকোষ দিয়ে তৈরি একক জীবের মতো। কিন্তু কেউই সুকেন্দ্রিককোষের দরকারী বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে নি: বড় আকার, নিউক্লিয়াস, আভ্যন্তরীণ কুঠুরী, মাইটোকেন্ড্রিয়া ও অন্যান্য বিশেষত্ব। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নিক লেন যেমন বলেন: ব্যাক্টেরিয়ারা সুকেন্দ্রিক কোষের মতো জটিলতার অর্জনের লক্ষ্যে সকল পথে প্রচেষ্টা চালিয়ে দ্রুত থেমে গেছে। কিন্তু কেন?

    এমন নয় যে সুযোগের অভাব। পৃথিবী অজস্র প্রাককেন্দ্রিক জীব দিয়ে ঠাসা যারা খুব দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে। তবে তাদের এই গতি সুকেন্দ্রিক-কোষী হওয়ার জন্য খুব একটা দ্রুত নয়। জীবাশ্মের তথ্য আমাদের বলে যে সবচেয়ে পুরাতন ব্যক্টেরিয়া এখন থেকে তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো বছরের মাঝামাঝি সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলো। কিন্তু দুইশ-দশ কোটি বছরের আগে কোন সুকেন্দ্রিক কোষের খোঁজ পাওয়া যায় না। তাই বিস্ময় তৈরি হয় যে কেন একশো কোটি বছরের কল্পনাতীত দীর্ঘ সময় ধরে প্রাককেন্দ্রীক জীবেরা এত সরল কোষ হিসেবে বেঁচে ছিলো?

    অনেকগুলো সাম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে কিভাবে প্রাককেন্দ্রীক থেকে সুকেন্দ্রীক কোষের উদ্ভব পারে। এদের মাঝে একটি ব্যাখ্যা সম্প্রতি পায়ের তলায় শক্ত মাটি পেয়েছে। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী একটি প্রাককেন্দ্রীক জীব কোনভাবে অন্যটির মধ্যে ঢুকে যায়। হয়তো অন্য কোষটি খাদ্য শিকারের সময় গিলে ফেলেছিলো প্রথমটিকে হজম করার উদ্দেশ্য, কিন্তু সেখানে প্রথম কোষটির সাথে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারির আত্মীয়তা শুরু করে আভ্যন্তরীণ কোষটি। এই আভ্যন্তরীণ কোষ – একটি ব্যক্টেরিয়া – তার মুক্ত জীবন পরিত্যাগ করে এবং অবশেষে মাইটোকন্ড্রিয়ায় পরিণত হয়। এ ঘরোয়া পাওয়ার-হাউজ পোষক কোষের বাড়তি শক্তির একটি যোগান হয়ে দাঁড়ায়। নতুন শক্তিতে বলীয়ান পোষক কোষটি আরো জটিলতার পথে বিবর্তিত হওয়ার সামর্থ্য লাভ করে, যেখানে অন্য প্রাককেন্দ্রীক কোষ পৌঁছাতে পারবে না কখনোই।

    এখনো অনেকে আছেন যারা এ তত্ত্বকে সন্দেহের চোখে দেখেন, তবে এ কাহিনী যদি সত্য হয়, তাহলে সকল সুকেন্দ্রীককোষী – সব ফুল ও ছত্রাক, মাকড়শা ও চড়ই, মানুষ – সকলেই দুইটি অণুজীবের হঠাৎ-শ্বাসরুদ্ধকর-ধরনের সংযোজন থেকে বিবর্তিত হয়েছে। সে সংযোজন আমাদের বড়-বড়-বড়-বড়-বড়…বড়-বড়-দাদাদাদীর দুই কোষের মিলন; দুইটি কোষ এই জোড়া লাগার মাধ্যমে এক হয়ে জীবনের বহুরূপী বৈচিত্র্যের ভিত্তি গঠন করে। পৃথিবীকে এখন আমরা যেভাবে দেখছি তা অপরিবর্তিতভাবে বদলে যায় সেই চরম মিলনের মাধ্যমে – যে মিলন এতোটাই অসম্ভব যে না ঘটলেও তা স্বাভাবিকই ঠেকতো, পৃথিবীকে চিরদিন শাসন করতো একঘেয়ে চেহারার অজস্র অণুজীব; জীবনের বৈচিত্র্যকে কখনোই স্বাগত না জানিয়ে; গাছপালা, ব্যাঙের ছাতা, শুয়োপোকা ও মানুষের আবির্ভাব না দেখেই।

    [এড ইয়ং এর Unique Merger প্রবন্ধের অনুবাদ। ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে]

  • টিকা বৃত্তান্ত

    টিকা বৃত্তান্ত

    In science credit goes to the man who convinces the world, not the man to whom the idea first occurs.

    —Francis Galton

    এই উদ্ধৃতিটির মাহাত্ন এবং যথার্থতা অনুধাবনের জন্য আপনাকে ফিরে যেতে হবে ১৭০০ শতকের মধ্যভাগে ইংল্যান্ডের বার্কলে শহরে। এই ছোট্ট শহরে বার্কলে ক্যাসেল এবং তাতে রাজা দ্বিতীয় এডোয়ার্ডের খুনের কিংবদন্তি ছাড়া তখন পর্যন্ত আর বলার মত কিছু নেই। তবে ১৭৪৯ সালে এই শহরে জন্ম নেন আরেক এডোয়ার্ড , এডোয়ার্ড জেনার যার মাধ্যমে শহরটি নতুন একটা কিংবদন্তি ধারণ করার সুযোগ পায়। টিকার জনক হিসেবে লোকে তাঁকে চিনে থাকলেও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বহুমুখী বিচরণ। 

    চলুন এবার জেনে নেই গল্পের এন্টাগনিস্টকে। এর নাম স্মলপক্স, ভেরিওলা ভাইরাসের দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রামক রোগ যাকে আমরা গুটি বসন্ত বলে চিনি। নামে স্মল থাকলে তার কাজের বাহার দেখে মোটেই ছোট করে দেখার জো নেই। ধারণা করা হয় ক্রাইস্টের জন্মেরও হাজার দশেক বছর আগে আফ্রিকায় এর প্রথম প্রাদুর্ভাব হয়। ফারাও রামজেসের মমি, প্রাচীন  চৈনিক শিল্প, ভারতের সংস্কৃত লেখনীতেও স্মলপক্সের কথা পাওয়া যায়। ইতিহাসে অনেকগুলো মহামারী ঘটিয়ে, যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহৃত হয়ে; এজটেক,  ইনকার মত সভ্যতার পতন ঘটিয়ে, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, হাজার বছর ধরে বিভীষিকা ছড়িয়ে দেয়া গুটি বসন্ত আজ বিলুপ্ত! 

    এডোয়ার্ড জেনার

    এডোয়ার্ড জেনার ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও বিজ্ঞান নিয়ে কৌতূহলী ছিলেন। তিনি ১৩ বছর বয়সেই একজন ডাক্তার জর্জ হারউইকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তখনকার প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি সমূহে জ্ঞান লাভ করেন। কথিত আছে সেই সময়ে একদিন তার ডাক্তার গুরুর সাথে একটি খামারে যাওয়ার পর শুনতে পান এক গোয়ালিনী বলছে “যেহেতু আমার কাউপক্স হয়ে গেছে, আমি নিশ্চিত যে আমার আর স্মলপক্স হবেনা”। স্মলপক্সেরই আরেকটি মৃদু সংস্করণ কাউ পক্স, যা গরু এবং আশেপাশে থাকা মানুষদের হয়। তবে এটা তেমন মারাত্নক না। 

    তো যাই হোক, এরপরে জেনার আরও বড় বড় বিজ্ঞানীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। চিকিৎসা, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদ বিদ্যা, ভূতত্ব, বেহালা, কবিতা অনেক রকম চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ক্যাপ্টেন জেমস কুক তাঁর প্রথম সমুদ্রযাত্রায় যেসব প্রজাতি সংগ্রহ করেছিলেন সেসবের অনেক গুলো এডোয়ার্ড জেনার শ্রেণীভুক্ত করতে সাহায্য করেন। যদিও সেই ১৩ বছর বয়স থেকেই “কাউ পক্স হলে আর স্মলপক্স হয়না” এই প্রচলিত কথাটি তার আগ্রহের মধ্যে ছিল। তবে আরও ৩২ বছর পরে, ১৭৯৬ সালে তিনি প্রথম পদক্ষেপটি নেন যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮০ সালের ৮ মে ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বলি পৃথিবীকে স্মলপক্স মুক্ত ঘোষণা করে।      

    প্রচলিত ধারণাটি সঠিক কিনা তা দেখার জন্য পরে তিনি একটি এক্সপেরিমেন্ট করেন সেই বছর। সারাহ নেল্ম নামের এক গোয়ালিনীকে খুঁজে পান, যার হাতে কাউপক্সের কাঁচা ক্ষত রয়েছে। কাউপক্সের ক্ষত হতে সামান্য পুঁজ নিয়ে জেমস ফিপ নামের এক ৮ বছর বয়সই বালকের শরীরে লাগিয়ে দেন। কিছুদিন পর তার জ্বর হয়, আর বগলে ব্যাথা হতে থাকে। পুঁজ গ্রহণের ৯ দিন পরে তার ঠাণ্ডা লাগে, এবং রুচি কমে যায়। তবের ১০ম দিন থেকে সে সুস্থ হতে থাকে। তার এক মাস পর, জেনার আবার জেমসের দেহে পুঁজ প্রয়োগ করেন, এবার আর কাউ নয়, সেই সময়ের বিভীষিকা স্মলপক্সের! তার দেহে আর স্মলপক্স দেখা দেয়নি। জেনার তার পর্যবেক্ষন একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে পাঠালে সেটা প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর আরও অনেকের উপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে একই রকম ফলাফল পাওয়ার পর নিজেই একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন তার এক্সপেরিমেন্ট আর ফলাফল নিয়ে। এটার শিরোনাম ছিলঃ 

    An Inquiry into the Causes and Effects of the Variolae Vaccinae, a disease discovered in some of the western counties of England, particularly Gloucestershire and Known by the Name of Cow Pox

    গরুর ল্যাটিন নাম Vacca, কাউপক্সের ল্যাটিন নাম Vaccinia সেকারণেই তিনি তার পদ্ধতির নাম দেন Vaccination।  

    এটা ঠিক, তার যুগে Human Subject Protection Committeeর কোন অস্তিত্ব ছিলোনা। তবে যতজনকে তিনি এই টোটকা দিয়েছিলেন, বেশিরভাগই স্মলপক্স প্রতিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। জেনারের এই প্র্যাকটিস এরপর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।   

    তবে জেনার যেটা জানতেন না, বা সেই সময়ে জানতে পারেননি তা হল কাউপক্স এবং স্মলপক্স রোগ দুটি কাছাকাছি ধরণের ভাইরাসের কারণে হয়। যেহেতু উভয় ভাইরাসের অনুজীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে, একটার সংস্পর্সে যে অনাক্রম্যতা দেহে তৈরি হয় সেটা অন্যটার বিরুদ্ধেও কার্যকর। তবে যেহেতু তিনি যেই ঘটনা  পর্যবেক্ষন করছেন তার কার্যকরন জানতেন না, তাই অন্য রোগের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারেননি। 

    সময়ের সাথে সাথে অণুজীব বিষয়ে আমাদের বোঝাপড়া বাড়তে থাকে। বিভিন্ন ধরণের ইমিউনাইজেশন সংক্রামক ব্যাধিতে মানুষের মৃত্যুহার কমিয়ে আনে নাটকীয়ভাবে। বিংশ শতকের শুরুতে রবার্ট কচ আমাদের দেখান, ঘোড়ার দেহে কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে সৃষ্ট এন্টিসিরাম মানুষের দেহে প্রয়োগ করে করে সেই জীবাণুর সংক্রমণ এড়ানো যায়। এভাবে অন্যের অনাক্রম্যতাকে ধার করে নিয়ে আসাকে Passive Immunization বলে।

    প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন প্রক্রিয়ার একটি ছোট এবং একটিত বড় সময়সা থাকায় এটাকে ব্যপকভাবে ব্যবহার করা হয়না। ছোট সমস্যা হচ্ছে, যদিও প্রয়োগের পরপরই এন্টিসিরাম বেশ জোড়ালোভাবে কাজ করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পুর্ন সংক্রমণকে দমিয়ে দেয় তবে কিছুদিন পরি এই অনাক্রম্যতা গায়েব হয়ে যায়। কোন দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনিটি থাকেনা এবং কোন সুরক্ষা স্মৃতি(Immunological Memory)  তৈরি হয়না এই ধরনের ইমিউনাইজেশনে। 

    বড় সমস্যাটি হচ্ছে এই এন্টিসিরাম ঘোড়া থেকে সংগৃহীত হওয়ায় ঘোড়ার প্রোটিনে ভর্তি। বহিরাহগত হবার কারণে এই প্রোটিনগুলোকে গ্রাহকের দেহ নিষ্ক্রিয় করতে সচেষ্ট হয়। প্রথমবার প্রয়োগের সময় এই এন্টিসিরাম যে উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয় তা সফল হয় কেননা দেহে ঘোড়ার প্রোটিনের বিরুদ্ধে ইমিউন রেসপন্স তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগে। ততদিনে সিরামের এন্টিবডি তার লক্ষ্যের বিরুদ্ধে যা করার করে ফেলে। তবে, যদি পরবর্তিতে আবার এই এন্টিসিরাম প্রয়োগের দরকার হয়, তখন আর এটা কাজ করেনা। কারণ প্রথম বার এর সংস্পর্শে আসার পর গ্রাহকের অনাক্রম্য ব্যাবস্থা ঘোড়ার প্রোটিনগুলোকে চিনে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে রেখেছে। এরাই এখন এন্টিসিরামকে ক্ষতিকর ধরে নিয়ে প্রতিহত করে ফেলবে। 

    এতে সুধু রক্ষাকারী এন্টিবডি নিষ্ক্রিয়ই হয়না, বরং প্রচুর পরিমাণ এন্টিবডি-এন্টিজেন কমপ্লেক্সও তৈরি রক্তে। এর ফলে ইমিউন কমপ্লেক্স ডিজিস তৈরি হয়। এর কারণ কি? যেখানে ম্যাক্রোফেজের এই ধরণের কমপ্লেক্স অপসারণ করার কথা, তারাই এত সংখ্যক কমপ্লেক্স দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই অতিরিক্ত কমপ্লেক্স গুলো পরে কিডনি, ফুসফুস, অস্থিসন্ধ্যি যেখানেই জমা হয় সেখানেই নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে । 

    সুতরাং এখন পর্যন্ত অনাক্রম্যতা ধার করা, মাথাপিছু একবারের ব্যপার। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো এটা ব্যবহার হয়- যদি আপনার খুব ব্যপক মাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন হয়ে থাকে, তাহলে প্রথমে এন্টিসিরাম দিয়ে তীব্রতা কমিয়ে তারপর এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়। যদি আপনি সাপের দংশনের শিকার হন, এবং দেহ থেকে বিষ দূর করা প্রয়োজন যত দ্রুত সম্ভব। তবে কথা এটাই, একবার যদি কোন বিশেষ এন্টিসিরাম গ্রহণ করে থাকেন, পরবর্তীতে সেই এন্টিসিরাম গ্রহণ করার মত পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো।  

    তবে প্যাসিভ ইমিউনিটি শুধু বিজ্ঞানাগার কিংবা চিকিৎসা সঙ্ক্রান্ত বিষয়-ই নয় কেবল, প্রকৃতিতেও ঘটে থাকে। ফিটাল সার্কুলেশনের মাধ্যমে মায়ের দেহ থেকে এন্টিমাইক্রোবিয়াল এন্টিবডি সকল স্তন্যপায়ীতেই প্লাসেন্টায় যায়। মায়ের দুধেও বিভিন্ন সুরক্ষামূলক এন্টিবডি থাকে। নবজাতকের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবার আগ পর্যন্ত এই এন্টিবডিগুলোই সুরক্ষা দিয়ে যায়। 

    তবে বাস্তবে প্যাসিভ ইমিউনিটি সক্রিয় ইমিউনাইজেশনের বিকল্প নয়। আমাদের দেহে সংক্রমণ হলে যেভাবে অন্তর্নিহিত এবং অভিযোজিত অনাক্রম্য ব্যবস্থা ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেটা সক্রিয় ইমিউনাইযেশোনের ফল। এর ফলে দেহ থেকে আক্রমণকারী জীবাণু শুধু দুরি হয়না, দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা স্মৃতিও তৈরি হয় যা ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগে।   

    যে ঘটনার মাধ্যমে জেনারের প্রক্রিয়া অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব, সেই বোধনের মূলে রয়েছে একটি ভুল। ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ধারণা করা হয় যে লুই পাস্তুরের ল্যাবে এটা ঘটেছিল। কেউ একজন মুরগিতে কলেরা ইনফেকশন নিয়ে কাজ করার সময় ভুলবশত টিউব ভর্তি কলেরা ব্যাকটেরিয়া তার কাজের টেবিলে রেখে চলে যান। সেই সময় আবার চলছিল দাবদাহ। পরে যখন সেই ব্যাকটেরিয়া মুরগির দেহে ঢুকানো হয়, তখন আর সেগুলো কলেরায় আক্রান্ত হয়নি। 

    সেই গবেষক বুঝতে পারলেন যে গরমের কারণে ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা গিয়েছে তাই তিনি একই মুরগিতে আরও শক্তিশালী তাজা কলেরা ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করলেন। এবারও তারা দিব্যি সুস্থ, যেটা ছিল আশ্চর্যজনক কেননা সেই একই চালানের ব্যাক্টেরিয়া অন্যান্য মুরগিতে কঠিনভাবে আক্রান্ত করলো। এরকম উল্টা পাল্টা ফলাফল দেখে সেই গবেষক কিন্তু সব ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে পারতেন। সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি। বেঁচে যাওয়া মুরগীর রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল মৃত কলেরা ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করা মুরগির দেহে সেই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রচুর এন্টিবডি এবং মেমরি কোষ তৈরি হয়েছে। যেই মেমরি  কোষ পরবর্তি সংক্রমণে কলেরা প্রতিরোধে কাজ করেছে। পাস্তুর পরে দেখিয়েছিলেন একই পদ্ধতি এনথ্রাক্স এবং জলাতঙ্কেও কাজ করে। 

    সবার অপেক্ষার পালা ফুরোলো। অচিরেই বুঝা গেল মৃত অণুজীব রোগ সৃষ্টি করতে না পারলেও ঠিকই সুরক্ষা প্রতিক্রিয়া(Immune Response)তৈরি করে। জীবিত কিংবা মৃত দুই দশাতেই অণুজীবের পৃষ্ঠে একই প্রোটিন, লিপিডের কাঠামো থাকে যেটা দেখে অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত করে সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করে।  

    তবে মারাত্নক সব জীবাণু, হোক সে মৃত, তাদের সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করিয়ে ইমিউনিটি প্রদান করার বিষয়টা মানুষকে বুঝানো এত সহজ ছিলোনা। ইমিউনাইজেশনের অনেক বড় বড় প্রচারণা প্রচণ্ড বাঁধার সম্মুখীন হয়। এই যুগে কিন্তু আমরা অনেক রকম জীবাণুকে মৃত অথবা খুবই দূর্বল অবস্থায় ব্যবহার করে বিভিন্ন টিকা তৈরি করি। জীবাণুর সক্রিয়তা নানা ভাবে হ্রাস করা যায়। তাদেরকে এমন পরিবেশে বড় করা হয় যার ফলে মিউটেশন ঘটে ইমিউনোজেনিসিটি বজায় রেখেই রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা কমে যায়। কিছু কিছু জীবাণুর ক্ষেত্রে আবার এমন টিকা তৈরি করা হয় যাতে সম্পুর্ন জীবাণুর পরিবর্তে শুধু সুরক্ষা প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য দরকারি আণবিক কাঠামো(Molecular Structure) থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ব্যাক্টেরিয়ার টক্সিনও টিকা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।   

    এটা মেনে নিতে হবে কখনো কখনো হিসেবে ভুল হয়ে যায়। এমনকি এখনো, এত মাত্রায় যাচাই বাছাইয়ের পরও  কারো কারো দেহে টিকা নেয়ার সাথে সাথে হিতে বিপরীত হতে পারে । কিন্তু তবু আমরা নিয়ম করেই নানা ধরনের টিকা নিয়ে থাকি একটাই কারণেঃ টিকা কোন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা হাজার গুন কমিয়ে দেয়। টিকার সুবিধা এটাই যে আপনি টিকা নিয়ে নিজে তো নিরাপদ থাকবেনই, জনসংখ্যার বিশাল অংশে টিকা দেয়া হলে যারা টিকা নেয়নি তারাও উপকৃত হবে।  

    সব টিকারই উদ্দেশ্য রোগে আক্রান্ত না করে সংক্রমণের প্রাকৃতিক পরিণতির অনুসরণ ঘটানো। এর ফলে দেহে যেসব B এবং T কোষ উদ্দিষ্ট জীবানুকে চিনতে পারে, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং এদের কিছু কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি কোষে(Memory Cell) রূপান্তরিত হয়। এই স্মৃতি কোষ পরবর্তি সংক্রমণে এত দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে যে আপনি টেরও পাবেন না যে আপনি আক্রান্ত। 

    সক্রিয় ইমিউনাইজেশনের মাধ্যমে স্মলপক্সকে নির্মূল করা গেছে। পোলিওকে অনেকাংশে কমানো গেলে এখনো পৃথিবীর কিছু কিছু অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে হাম নির্মূল হলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এখনো হাজারো শিশুর মৃত্যুর কারণ হাম। 

    বৈজ্ঞানিক প্রতিবন্ধকতা বাদ দিলেও কোন একটি আবিষ্কার ল্যাব থেকে বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসার ঝক্কি কম না। আর তা চিকিৎসা সংক্রান্ত হলে তো কথাই নেই। তার উপর টিকা হচ্ছে রোগ সৃষ্টিকারী জীবানুর-ই কার্যত নিষ্ক্রিয় অথবা দূর্বল সংস্করণ। নানা রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পার হয়ে বাজারে নামতে হয়। তার উপর রয়েছে মানুষের সচেতনতার অভাব আর কুসংস্কারাচ্ছন্নটা। যার জন্য ২০০ বছর আগে ইমিউনলজির জনক এডোয়ার্ড জেনারকে যেমন হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছে, তেমনি আধুনিক যুগেও বিজ্ঞানী আর টিকা সংশ্লিষ্ট মানুষজনদের হতে হয়। 

    এত ঝামেলার পরও কিন্তু অনেক রোগের টিকা নিয়ে কাজ চলছে। আর কিছু কিছু জীবাণুর কার্যকর টিকার জন্য এখনো বিজ্ঞানীদের খাবি খেতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ম্যালেরিয়া, টিউবারকুলোসিস এবং এইচআইভি।  

    ম্যালেরিয়ার জীবনচক্র বেশ জটিল। তার উপর ম্যালেরিয়ার জীবাণুতে খুব দ্রুত মিউটেশন হয়। প্রধানত এই দুটি কারণে ম্যালেরিয়ার টিকা তৈরিতে জটিলতা রয়েছে। টিউবারকুলোসিসের টিকা আর ১০০ বছর আগেই তৈরি হয়েছে। কোন অজানা কারণে ইউরোপ আর আমেরিয়ায় সেই টিকা কাজ করলেও, তৃতীয় বিশ্বে কার্যকারীতা খুব কম। আবার শিশুদের দেহে কাজ করলে বয়স্কদের দিয়ে কোন সুফল পাওয়া যায়না। 

    তবে নতুন কিছু পদ্ধতিতে এসব রোগের টিকা তৈরির কাজ চলছে। ম্যালেরিয়া, টিউবারকুলোসিস এবং যত রকম ভাইরাস ঘটিত রোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ধাপ হচ্ছে CD8 টি কোষের প্রতিক্রিয়া। তবে এই কোষ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়, জখন জীবাণুর এন্টিজেনিক প্রোটিন পোষকের দেহের ভেতরেই সংশ্লেষিত হয়। যখন নিষ্ক্রিয়া বা মৃত জীবাণু বা তার প্রোটিন ব্যবহার করে টিকা তৈরি করা হয়, তখন যৎসামান্য CD8 কোষই সক্রিয় হয়। 

    তবে ডেন্ড্রাইটিক কোষের সহায়তায় এই সমস্যা উৎরানো সম্ভব। একটি উপায় হচ্ছে, পেপটাইড পালসিং(Peptide Pulsing) । এই প্রক্রিয়ায় ডেন্ড্রাইটক কোষকে উচ্চ ঘনত্বের জীবাণুর পেপটাইড, যা ভালো প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তার সাথে ইনকিউবেট করা হয়। তখন ডেন্ড্রাইটিক কোষ তার পৃষ্ঠে সেই পেপটাইডকে ধারণ করে নেয়। এই ডেন্ড্রাইটিক কোষ যখন দেহে প্রবেশ করানো হলে CD8 কোষ যখন এই ডেন্ড্রাইটিক কোষের সংস্পর্শে আসে, তখন সে এটাকে বহিরাগত ধরে নিলেই কেল্লা ফতে। 

    অন্য উপায়টি আর দারুণ, জীবাণুর এন্টিজেনিক পেপটাইডের ডিএনএ কেই চামড়া বা পেশিতে ইনজেক্ট করা হয়। ডেন্ড্রাইটিক কোষ এই ডিএনএ কে গ্রহণ করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা পৌঁছে যায় ডেনড্রাইটিক কোষের নিউক্লিয়াসে। তখন সে তার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জীবাণুর প্রোটিন তৈরি করে পৃষ্ঠে মেলে রাখে CD8 কোষের জন্য, সংস্পর্শে এলেই ডেজাভু। এই প্রক্রিয়াকে বলে ডিএনএ ভ্যাক্সিনেশন।      

    অন্যান্য চিরাচরিত টিকাসমূহের একটা সমস্যা কি, এটাকে সবসময় হিমাংকের নিচে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করতে হয়। যার কারণে এটার পরিবহন এবং সংরক্ষণ ব্যয়বহুল। অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশেরই সব প্রান্তে সেরকম অবকাঠামো না থাকায় বহু মানুষ টিকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন, ডিএনএ ভ্যাক্সিনে এই সমস্যাটি নেই। ঠিকঠাক ভাবে বানানো হয়ে গেলে এটাকে পকেটে করেও পরিবহন করা যাবে। 

    টিকা নিয়ে গবেষণা যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী বা বেসরকারি অনুদান নিয়ে করে। এর সাথে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে সমাধান করে, চাহিদার সমান পরিমাণে তৈরি করে জনমানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষমতা তাদের থাকেনা। এটা তাদের কাজও না। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই মাথা ব্যাথা হজম করতে সক্ষম। তবে তারা যাদের জন্য টিকার বাণিজ্যিক উৎপাদন করবে, তাদের যদি সে টিকা কেনার ক্ষমতা না থাকে তখন আবার তাদের এই বিনিয়োগে আগ্রহ না থাকাই স্বাভাবিক। উন্নত দেশের টিকার প্রয়োজন হলে তা যতটা গুরুত্ব পায়, দরিদ্র কোন দেশের জন্য হলে তা অনেক সময়েই পায়না।

    তথ্যসূত্রঃ

    ১। In Defense of self, William R. Clark

    ২। Edward Jenner and the history of smallpox and vaccination, Stefan Riedel, MD, PhD

    ৩। https://www.historyofvaccines.org/content/articles/future-immunization

  • রোজেটা স্টোন (গেম অব জিনোমস)

    রোজেটা স্টোন (গেম অব জিনোমস)

    গেম অব জিনোমস

    মূল: কার্ল জিমার
    অনুবাদ: আরাফাত রহমান

    [আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

    খন্ড-১, অধ্যায়-৪

    ম্যাসাচুসেটেসের কেমব্রিজ শহর। ব্রড ইনস্টিটিউটের একটি প্রশস্ত জানালা দিয়ে রোদ চুঁইয়ে পড়ছিলো, আর বিপরীত দেয়ালে হোয়াইটবোর্ডে এলোমেলো লেখা সে রোদেলা আলোয় আলোকিত হয়েছিলো। কনরাড কার্কেজোস্কি, একজন তরুণ বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞ, প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে সে হোয়াইটবোর্ডে বোঝাচ্ছিলেন আমার জিনোম উপাত্তের বিস্তারিত, যা এখন তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে।

    পুরো বিশ্লেষণটি শেষ করতে কার্কেজোস্কির (অথবা ব্রড ইন্সটিটিউটের সার্ভারগুলোর) দুই সপ্তাহ লেগেছে।

    টিভির খবরে কিংবা অপরাধভিত্তিক-অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং আমাদের এতোটাই পরিচিত হয়ে গেছে, যে এমন ভাবা  অস্বাভাবিক নয় যে জিনোমের মর্মউদ্ধার করা খানিকটা তাক থেকে বই বের করে এর পাতাগুলো পড়ার মতো। কিন্তু কার্কেজোস্কি আমাকে বোঝালেন যে বিজ্ঞানীরা এখনো অনুসন্ধান করে চলছেন জিনোমের অনুক্রম কিভাবে নির্ভুলতার সাথে আগাগোড়া জোড়া লাগানো যায়। জিনোমের সাথে যদি বইয়ের তুলনা দিতেই হয়, তাহলে এটা প্রাচীন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিকের হরফে লেখা, বিজ্ঞানীরা এখনো অনুবাদের রোজেটা-স্টোন অভিসন্ধান করে চলছেন।

    “জীববিজ্ঞান জটিল,” কার্কেজোস্কি কাঁধ-ঝাঁকিয়ে স্বগোতক্তি করলেন। “আমরা আগে থেকেই জানতাম যে জীবন জটিল। তবে মনে হয় না নিজের হাতে গবেষণা শুরু আগে আমি প্রকৃতভাবে উপলদ্ধি করা শুরু করেছি যে এই জটিলতা কতটা অসম্ভব ধরনের।”

    ইল্যুমিনা আমার জিনোম সিক্যুয়েন্স করার সময় এই প্রযুক্তিটি মূলত আমার ডিএনএর ১.২ বিলিয়ন খণ্ডের অনুক্রম পাঠোদ্ধার করছিলো। এই পর্যায়ে, একেকটি টুকরো (যা Read হিসাবে পরিচিত) অনেকটা জিগস-স’ ধাঁধার মতো, যা একসাথে মেলানোর জন্য অপেক্ষামান। এই ধাঁধাটি মেলানো আবার বেশ চ্যালেঞ্জের, কারণ কিছু কিছু খন্ডে রাসায়নিক  বিক্রিয়ার ভুল হয়েই যায়।

    জিগ-স’ ধাঁধাটি সমাধান করার জন্য আমরা প্রতিটি খন্ডকে ধাঁধাটি যে বাক্স থেকে এসেছে সেখানে থাকা মূল ছবিটার সাথে মেলাতে পারি। কার্কেজোস্কির মতো বিজ্ঞানীরা ঠিক তেমনই মানব জিনোমের খন্ডাংশগুলো মেলানোর জন্য এরকম একটি প্রমাণ জিনোম ব্যবহার করেন, যাকে হিউম্যান রেফারেন্স জিনোম বলা হয়। এটি আসলে একজন ব্যক্তির জেনেটিক উপাদানের অত্যন্ত নির্ভুল অনুক্রম। যেহেতু সকল মানুষেরই ডিএনএ মোটামুটি একইরকম, তাই কার্কেজোস্কি মানব রেফারেন্স জিনোমটি ব্যবহার করে আমার অনুক্রম করা ডিএনএ খন্ডাংশগুলোর পারস্পারিক অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে মিলাতে পারেন।

    ধাঁধা মেলানোর জন্য রিড অনুক্রমের দুই পাশের অনুক্রম অন্যান্য রিডের সাথে মিলিয়ে জোড়া লাগানো হয়। ছবি চৌধুরী আরিফ জাহাঙ্গীর তূর্য

    তবে এই রিডগুলো অত্যন্ত ছোট। এর বিপরীতে মানব জিনোম বেশ দীর্ঘ। তাই কার্কেজোস্কি ডিএনএ অনুক্রম রিড আর জিনোমের মিল খোঁজার জন্য সরাসরি আগা থেকে গোঁড়া তুলনা করতে চান নি। কারণ সেক্ষেত্রে মিল খুঁজে আমার জিনোম সম্পূর্ণ করতে কয়েক শতাব্দী সময় নিতে হবে। এর পরিবর্তে, কিছু চতুর গাণিতিক উপায় ব্যবহার করে অধিকাংশ রিডের আপেক্ষিক অবস্থান বের করা যায় মাত্র ৩০ ঘন্টায়।

    ইল্যুমিনা রিড তৈরির রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভুলগুলো শুধরে ফেললেন কার্কেজোস্কি। আসলে ইল্যুমিনার সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি এত বেশি রিড তৈরি করে যে সেগুলো আমার জিনোমের একই জায়গায় অনেকবার সাঁটানো যাবে। আপনি যদি এই মুহুর্তে আমার জিনোমের মানচিত্রটি দেখতে চান তবে রেফারেন্স জিনোমের উপরে সজ্জিত রিডগুলি এটি একটি অনিয়মিত ইটের প্রাচীরের অনুরূপ হবে। এই প্রযুক্তি এমনভাবে কাজ করে যাতে প্রতিটি বেস প্রায় ৩০ বা এর বেশি রিডের মধ্যে থাকে।

    জিনোমের প্রতিটি অবস্থানে অতিরিক্ত রিডের প্রাচুর্য্য ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। যদি একটি রিডের এক স্থানে একটি A থাকে, এবং অন্য ৩০টি রিডের একই অবস্থানে T থাকে, তাহলে কার্কেজোস্কি নিরাপদে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে আমার জিনোমে ওই অবস্থানে একটি T আছে, A মূলত প্রথম রিডটির রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভুল।

    এই প্রক্রিয়াটি জিনোম সিকোয়েন্সের অসংখ্য ত্রুটি ঠিক করতে পারলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে না। জিনোমে কিছু কিছু অবস্থান পাওয়া যাবে যেখানে কিছু read একটি A নির্দেশ করে, কিছু C, কিছু T এবং কিছু G-বেস নির্দেশ করে। সঠিক বেসটি কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে তারা কোনও ধারণা দেয় না।

    যখন কোন মিউটেশন ডিএনএ-র একটি বড় অংশকে ভেঙে টুকরো করে ফেলে বা দুর্ঘটনাক্রমে এটির অতিরিক্ত অনুলিপি তৈরি করে, তখন এই ধরনের পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। এ ধরণের রিড বায়োইনফরমেটিক্স ম্যাপিং প্রোগ্রামগুলিকে বিভ্রান্ত করে দেয়। এসব ম্যাপিং প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য হলো মানব রেফারেন্স জিনোমকে সকল রিডের সাথে মেলানোর চেষ্টা করা। এ ধরনের ক্ষেত্রে ম্যাপিং প্রোগ্রামগুলি ভুল জায়গায় রিড সমূহকে বসিয়ে দিতে পারে।

    তবে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রোগ্রাম লিখেছেন যা ভুল করে অনুলিপি হওয়া বা মুছে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট এসব বিভ্রান্তি ধরে ফেলতে পারে। অবশ্য এই ত্রুটিগুলি সংশোধন করা কোন ছোট কাজ নয়। কার্কেজোস্কি আমার জিনোমে এসব অনুলিপি বা মুছে ফেলা জনিত সমস্যা সনাক্ত করে ঠিক করতে মোট ১৫ ঘন্টা লাগিয়েছিলেন।

    দুই সপ্তাহ ধরে এইসব সমস্যা সমাধান করে কার্কেজোস্কি অবশেষে ব্রড ইন্সটিটিউটের কম্পিউটার সার্ভারগুলিতে আমার জিনোম-অনুক্রমটি লেখা শুরু করেন। এটা শেষ হলে আমি তখন কাঁচা-উপাত্ত থেকে তৈরি আমার জিনোমের এই নতুন এবং উন্নত সংস্করণটিতে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের প্রবেশাধিকার দিতে পারলাম, যাতে তারা এটির উপর বিস্তারিত গবেষণা করতে পারেন।

    কার্কেজোস্কি এসব বিশ্লেষণ শেষ করার পরে আমি ব্রড ইন্সটিটিউটে আসি তার কাজের মূলত ফলাফল দেখার জন্য। আমার জিনোমটি দেখানোর জন্য একটি বিশেষ ধরণের সফটওয়্যার খুললেন। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখার জন্য যেমন আমরা গুগল ক্রোমের মতো বিভিন্ন ব্রাউজার ব্যবহার করি, তেমনি ডিএনএর উপাত্ত দেখার জন্য এধরণের জিনোম ব্রাউজার ব্যবহার করা হয়। ব্রাউজারটি আমার জিনোমকে একটা লম্বা লাইন হিসেবে দেখায় যেখানে ডিএনএ অনুক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন জানা বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা থাকে। ব্রাউজারটি ডিএনএর মধ্যে থাকা বিভিন্ন জিনের পারস্পারিক অবস্থান দেখাতে পারে। কার্কেজোস্কি ডিএনএ-র যেকোন অংশ বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ব্রাউজারে এটাকে বড়-ছোট করতে পারেন।

    আমার জিনোমের কাঁচা উপাত্ত নিয়ে গড়া পুনর্গঠনটি কতটা ভাল ছিল তা বোঝাতে কার্কেজোস্কি HTT নামের একটি জিন বড় করে দেখানো শুরু করেন।

    HTT কোন সাধারণ  জিন নয়। HTT-তে কিছু নির্দিষ্ট মিউটেশনের ফলে হান্টিংটনের রোগ হয়। হান্টিংটন একটি বিধ্বংসী বংশগতীয়-রোগ যা মধ্যবয়সে দেখা দেয়। এ রোগে আক্রান্ত রোগী স্মৃতি ভুলে যেতে শুরু করে এবং এক সময় মারা যায়। সমস্যা হলো, সাধারণ জিনোম সিকোয়েন্সিং এর মাধ্যমে এ মিউটেশনগুলো সনাক্ত করা বেশ কঠিন।

    HTT-র জিনে এমন একটি অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবেই আছে যেখানে C, A, ও G বার বার পুনরাবৃত্তি হয়। হান্টিংটন ঝুঁকিবিহীন রোগীদের ক্ষেত্রে এই CAG পুনরাবৃত্তি বিভিন্ন মাত্রায় হতে পারে — কতবার তা নির্দিষ্ট নয়। কিন্তু যখন HTT জিনে ৩৭ বা ততোধিক CAG পুনরাবৃত্তি হয়, তখন হান্টিংটন রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সিকোয়েন্সিং করার রিডের আকার ছোট হলে ডিএনএর পুনরাবৃত্তি করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ পুনরাবৃত্তি হওয়া অনুক্রমে এমন কোন পার্থক্যসূচক অনুক্রম নেই যা দিয়ে রেফারেন্স জিনোমে ম্যাপ করা যাবে।

    ইল্যুমিনা আমার জিনোম সিক্যুয়েন্স করার সময় HTT জিনটি সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়নি। তারা ভুল অনুমান করার পরিবর্তে বরং জিনোমের এই অংশটুকু খালি রেখে গেছে। ইল্যুমিনা যখন বিভিন্ন বংশগতি-ব্যাধির জন্য আমার ঝুঁকি অনুমান করছিলো, তখন আমি হান্টিংটন রোগের জন্য ঝুঁকিতে কি না সেটা নির্ধারণের চেষ্টাও করেনি।

    তবে কার্কেজোস্কিকে ধন্যবাদ দিতেই হবে — আমি জিনোম ব্রাউজারে আমার HTT জিনের একটি সম্পূর্ণ অনুক্রমের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি চাইলে অনুক্রম পুরোটা পড়তে পারি আর HTT জিনে কতবার CAG পুনরাবৃত্তি হয়েছে তা গুণতে পারি।

    “আপনি জানেন … এটি দেখানোর আগে আমার সম্ভবত বংশগতির কাউন্সেলিং দিয়ে শুরু করা উচিত ছিল,” কারক্জেওস্কি বললেন।

    নিজের জিনোমকে নিজের হাতে নিলে অজানা দূর্যোগ জেনে যাওয়ার একটা মানসিক ঝুঁকি থাকে। তবুও, আমি দ্রুত কিছু জৈবিক গণনা করে ফেললাম।

    আমাদের প্রতিটি ক্রোমোজম দুই জোড়া করে আছে। সেখানে হান্টিংটনের রোগ হওয়ার জন্য HTT-র একটি মাত্র ত্রুটিযুক্ত অনুলিপি লাগে। অর্থাৎ রোগ হওয়াটা প্রকট বৈশিষ্ট্যের। তবে আমি জানতাম আমার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন না। সুতরাং পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে HTT-র এই মিউটেশন আমার কাছে কাছে বংশগতির মাধ্যমে আসাটা প্রায় অসম্ভব। তবে, আমি এটাও জানতাম যে ১০ শতাংশ রোর ক্ষেত্রে মাঝে নতুন মিউটেশন (অর্থাৎ CAG পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে) তৈরি হতে পারে। তবে এ জাতীয় ঘটনা বেশ বিরল।

    তাই বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে আমার একটি সাধারণ HTT জিন থাকবে। কিন্তু হান্টিংটনের রোগ হওয়ার জন্য যদি ওই মিউটেশনটা থেকেই থাকে আমার জিনোমে, সেটা বরং আমি আগে থেকে জানাটাই ভালো বলে মন ঠিক করে ফেলেছি। অন্তত হঠাৎ করে মধ্যবয়সে হান্টিংটনের রোগ হওয়ার চেয়ে আগে থেকে জানা ভালো!

    আমি বললাম, “দেখা যাক,”

    এবং আমরা দেখলাম।

    মানব রেফারেন্স জিনোমে ১৯-বার CAG পুনরাবৃত্তি ছিলো। আর আমারটাতে গুনে দেখলাম ১৭-বার।

    যদি কার্কেজোস্কির করা আমার জিনোমের পুনর্গঠন সঠিক হয় তবে হান্টিংটনের রোগের আবির্ভাব নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হবে না।

    তবে হান্টিংটনের মতো বংশগতির রোগ নির্ণয় করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং করাটা মেডিকেল টেস্ট হিসাবে এখনও যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। কারো যদি হান্টিংটনের রোগ আছে এমন আত্মীয় থাকে, এবং দেখতে চান যে তারা এই মিউটেশনটি বহন করছেন কি না, তাদের সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা করা উচিত যা জিনোমের বাকি অংশগুলি উপেক্ষা করে HTT-র অনুক্রম বের করবে।

    কিন্তু সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স ১০০-শতাংশ নির্ভুল নয়, তার মানে এটা না যে জিনোম অনুক্রম মূল্যবান নয়। কার্কেজোস্কি এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ দিতেই হবে সংক্ষিপ্ত read অনুক্রমের কাঁচা উপাত্ত থেকে যত্ন সহকারে সম্পূর্ণ জিনোম সমাবেশ করার জন্য। শেষ পর্যন্ত আমার জিনোমের পুনর্গঠন হয়েছে। এখন আমি নিজের জিনোমে বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে পারি।

    [আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়][post-views]

  • কৃষ্ণ গহ্বরের ভোজ নিউট্রন তারা দিয়ে

    কৃষ্ণ গহ্বরের ভোজ নিউট্রন তারা দিয়ে

    জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দুটি কৃষ্ণ গহ্বরকে একে অপরের সাথে মিশে যেতে দেখেছেন। দুটি নিউট্রন তারার মধ্যে সংঘর্ষ হতে দেখেছেন। কিন্তু সর্বগ্রাসী রাক্ষুসে কৃষ্ণ গহ্বর যে একটা আস্ত নিউট্রন তারা দিয়ে ভোজ সাড়তে পারে তা সম্প্রতিই বিজ্ঞানীরা ধরতে পেরেছেন। গত ২৯ জুন তারিখে দি নিউইইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় কেনেথ চাং লিখেছেন কৃষ্ণ গহ্বরের নিউট্রন তারা গিলে ফেলার ঘটনা নিয়ে। লেখাটার ভাবানুবাদ লেখার চেষ্টা করেছি। আশা করি উপভোগ করবেন।

    গত ২০২০ জানুয়ারিতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম নিশ্চিত ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন একটা রাক্ষুসে কৃষ্ণ গহ্বর একটা মৃত তারা কে গিলে ফেলছে। তার দশ দিন বাদে মহাকাশের ভিন্ন জায়গায় তারা একই রকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। তারা এই বিজয়ের গল্প একটা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশ করেন যা এখনো মহাকর্ষীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটা জমজমাট বিষয়। লাইগো কোলাবোরেশনের মুখপাত্র উইসকনসিন-মিলওয়াকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্যাট্রিক ব্র্যাডি বলেন, “আমরা এই প্রথম মহাবিশ্বের কোন এক জায়গায় একটা কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার মধ্যে ঘটা সংঘর্ষের ঘটনা ধরতে পেরেছি”। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এইরকম ঘটনা ঘটার ব্যপারে জানতেন। কিন্তু পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত তা অনিশ্চিত ছিল। এই আবিষ্কার মহাবিশ্বে থাকা বাইনারি তারাদের জগত সম্পর্কে আরো জানতে সহায়তা করেছে। এবং সেই সাথে আরেকটা প্রশ্ন তৈরি করেছে যে কেন আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথ এ এরকম ঘটনা এখনও দেখা গেল না?

    অধ্যাপক প্যাট্রিক ব্র্যাডি

    জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ আইনস্টাইন এর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এরকম কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার সংঘর্ষ সম্পর্কে প্রথম ভবিষ্যৎবানী করেছিল। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাইগো (LIGO — Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) এইরকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার জন্যে খোঁজ করছিল। লাইগোর একটা লেজার বীম হ্যানফোরড এবং আরেকটা লিভিংস্টোন থেকে বছরের পর বছর ধরে মহাকাশে এই রোমহর্ষক ঘটনা পর্যবেক্ষণ এর অপেক্ষা করছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে লাইগোর এই দুইটা স্থানে বহুপ্রতীক্ষিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ে। এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল মূলত দুইটা নাক্ষত্রিক আকৃতির কৃষ্ণ গহ্বরের পরস্পরের সাথে সংঘর্ষের কারণে। এই দুটো কৃষ্ণ গহ্বরের জন্ম হয়েছিল দুটো বিশাল আকৃতির নক্ষত্রে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে। কৃষ্ণ গহ্বর গুলো পরস্পরের চার পাশে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একে অপরের সাথে মিশে যায়। দুটো মিলে একটা হয়ে যায়। যেসব তারা সূর্যের চাইতে বড় কিন্তু কৃষ্ণ গহ্বরে পরিণত হবার মতো যথেষ্ট না সেগুলোর মৃত্যু হয় নিউট্রন তারায় রূপান্তরের মাধ্যমে। প্রথম মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হবার দুই বছর পর এরকম দুটো নিউট্রন তারার সংঘর্ষ হতে সৃষ্ট মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরা পড়ে লাইগো ডিটেক্টর যন্ত্রে। মহাবিশ্বের অধিকাংশ স্বর্ণ এবং রুপো তৈরি হয় এরকম নিউট্রন তারাদের সংঘর্ষ থেকে। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে প্রায় অর্ধশতক ধরেও খোঁজাখোঁজি করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণ গহ্বরের চারপাশে ঘূর্ণনরত কোন নিউট্রন তারা খোঁজে পান নি। ড. ব্র্যাডি বলেন, কেন এমনটা হচ্ছে? এই রহস্যের পেছনে কারণ কি?

    কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন নক্ষত্রের পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়া। সুত্রঃ দি নিউইয়র্ক টাইমস।

    ২০১৯ সালে দুটো মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হবার ঘটনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মনে এই আশার সঞ্চার করেছিল যে সম্ভবত জ্যোতির্বিদ্যার এই রহস্যের সমাধান হতে যাচ্ছে। এর একটি শনাক্ত হয় সেই বছর এপ্রিলে এবং অন্যটি আগস্টে। কিন্তু তখন এদের মধ্যে একটি(এপ্রিল এ শনাক্ত হওয়া তরঙ্গটি) তরঙ্গকে গবেষণা প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় নি। হতে পারে সেই তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষার সেই কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার সংঘর্ষের ঘটনার ফলেই। কিংবা হতে পারে এটা কোন অর্থহীন কিছু। ড. ব্র্যাডি বলেন, আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ বা তথ্য নেই যে আসলেই এটি কোন কৃষ্ণ গহ্বর-নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট নাকি।

    আগস্টে শনাক্ত হওয়া তরঙ্গটিও রহস্য থেকে যায়। এটি যাদের সংঘর্ষ থেকে তৈরি হয়েছে এর মধ্যে বড় বস্তুটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি কৃষ্ণ গহ্বর। কিন্তু ছোট বস্তুটি আকারে নিউট্রন নক্ষত্রের চেয়ে বড় কিন্তু কৃষ্ণ গহ্বর থেকে ছোট। এর ভর সূর্যের চাইতে ২.৬ গুণ বেশি ছিল। বিজ্ঞানীরা অনিশ্চিত যে এটি আসলে কোন কৃষ্ণ গহ্বর ছিল নাকি নিউট্রন তারা। তবে নতুন শনাক্ত হওয়া তরঙ্গ থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে মিল্কিওয়ে থেকে অনেক দূরে একটা নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বর এর পরস্পরের সাথে মিশে গেছে। গতবছর জানুয়ারির ৫ তারিখে প্রথম এই ধারার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। লিভিংস্টোন এ রাখা লাইগো ডিটেক্টর যন্ত্রে প্রথম এই সিগন্যাল ধরা পড়ে। মহাকর্ষ তরঙ্গের কম্পাংকের পরিবর্তন লক্ষ্য করে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে যেসকল বস্তুর মধ্যে সংঘর্ষ থেকে তরঙ্গের সৃষ্টি তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারেন। কৃষ্ণ গহ্বরটি ছিল সূর্য থেকে নয় গুণ ভারী আর নিউট্রন তারাটি দুই গুণ ভারী। এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে পৃথিবী থেকে প্রায় নয়শ আলোকবর্ষ (এক আলোকবর্ষ মানে হল আলো তার নিজের গতিতে এক বছরে যে পরিমাণ দুরত্ব অতিক্রম করে) দূরে।

    পরবর্তীতে ১৫ জানুয়ারি তারিখে হেনফোরডে রাখা ডিটেক্টর যন্ত্রে দ্বিতীয়বার আরেকটি মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হয় যা কিনা একই রকম ঘটনা অর্থাৎ একটি কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়া থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। এবারের নিউট্রন তারাটি সূর্যের চাইতে দেড় গুণ ভারী ছিল এবং কৃষ্ণ গহ্বরটি ছিল ছয় গুণ ভারী। তবে এক্ষেত্রে তারা কোন রকম আলোক বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেন নি বিজ্ঞানীরা। সাধারণত একটা কৃষ্ণ গহ্বর একটা নিউট্রন তারা কে গিলে ফেলতে যথেষ্ট বড় হয় এবং কোন রকম স্পষ্ট বিকিরণ তৈরি হবার আগেই কৃষ্ণ গহ্বর তার গলাধকরণ সম্পন্ন করে। তবে ড. ব্র্যাডির প্রশ্নের জবাব এখনো পাওয়া যায় নি। কেন আমাদের ছায়া পথে আমরা এখনো এইরকম ঘটনার স্বাক্ষি হতে পারছি না? হয়ত আমাদের খোঁজার পদ্ধতি সঠিক নয় অথবা এরা আমরা কিছু বোঝে উঠার আগেই পরস্পরের সাথে মিশে যায়।

    তথ্যসুত্রঃ

    A Black Hole Feasted on a Neutron Star. 10 Days Later, It Happened Again. — দি নিউইয়র্ক টাইমস।       

  • BAM উন্মোচন (গেম অব জিনোমস)

    BAM উন্মোচন (গেম অব জিনোমস)

    গেম অব জিনোমস

    মূল: কার্ল জিমার
    অনুবাদ: আরাফাত রহমান

    [আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

    খন্ড-১, অধ্যায়-৩

    আমি জানলাম, জিনোম সিকোয়েন্সিং করার পর প্রাথমিক উপাত্ত যাচাই বাছাই করে যে ফাইল তৈরি করা হয় তা হলো BAM। এই ফাইলগুলো আকারে দৈত্যাকার — ৭০ গিগাবাইটের মতো, যার মাঝে অন্তত চারশতাধিক পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচিত্র আঁটবে। যতবড়ই হোক না কেন আকারে, অন্য কোন ফাইল দিয়ে বিজ্ঞানীরা জিনোমকে তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জটিলতায় বিশ্লেষণ করা যায় না।

    অদ্ভূত হলেও সত্য, আপনার নিজের জিনোমের BAM ফাইল হাতে পাওয়াটা প্রায় অসাধ্য একটা ব্যপার।

    ইল্যুমিনা আমার জিনোম অনুক্রম করার পর আমাকে একটি মেডিকেল রিপোর্ট পাঠায়। এছাড়া একটা ওয়েবসাইটের লিঙ্ক দেয় যেখান থেকে আমি জিনোমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য জানতে পারবো। কিন্তু ইল্যুমিনা BAM ফাইল দেয় নি। আমি জিজ্ঞেস করার পড়েও। কাগজপত্র ঘেঁটে বুঝতে পারি কেন। ইল্যুমিনা কেবলমাত্র “চিকিৎসা-গবেষণার ব্যবহারের প্রয়োজনে” BAM ফাইল হস্তান্তর করবে।

    কেন ইল্যুমিনার মতো কোম্পানী সাধারণ মানুষের হাতে BAM ফাইল তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক তা বোঝা কঠিন নয়। ২০০৭ সালে 23andMe নামের একটি কোম্পানী সাধারণ ভোক্তার কাছে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই সরাসরি বিভিন্ন বংশগতির পরীক্ষা বিক্রয় করা শুরু করে। সকল ভোক্তার জন্য কোম্পানীটি কয়েক হাজার বংশগতির বৈচিত্র্য নিরীক্ষা করে বের করার চেষ্টা করে বিভিন্ন রোগের জন্য প্রত্যেকের কতটুকু ঝুঁকি আছে। এরপর ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Food and Drug Admistration (FDA) কোম্পানীটিকে এসব পরীক্ষা বিক্রি করা বন্ধ করতে বলে — কারণ কোম্পানীটি এসব পরীক্ষার যথার্থতা প্রমাণ করে নি।

    এসব পরীক্ষার জন্য 23andMe কোম্পানী মাত্র কয়েক শত-হাজার বংশগতির চিহ্ন বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে একটি BAM ফাইলে তিনশো-কোটি বেসে লিখিত জিনোম উপাত্ত ধারণ করা হয়। তাছাড়া, এ সকল প্রাথমিক কাঁচা-উপাত্ত অজস্র ত্রুটিতে ভরপুর যা কেবল একজন বিশেষজ্ঞ-গবেষকই আগাছা-মুক্ত করতে পারবেন। সাধারণ ভোক্তার হাতে ভুলে ভরা বিশাল আকারের কাঁচা-উপাত্ত দিয়ে দেয়া হতে পারে একটা বড়সড় বিপর্যয়ের কারণ। হয়তো তারা BAM ফাইল নিজেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভুল করে নিজের রোগ চিকিৎসা শুরু করতে পারে, যে ব্যাধী হয়তো তার নেই।

    সমস্যা হলো এসব সাবধানতা কৌতূহলী ব্যক্তিদের একটি জটিল অবস্থায় ফেলে দেয়। এসব ক্ষেত্রে একজন জিনোম-বিশেষজ্ঞও ভুক্তভোগী হতে পারেন।

    যেমন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পিএইচডি গবেষক ব্র্যাড গুল্কোর কথা শোনা যাক। ব্র্যাড তার গবেষণায় জিনোম বিশ্লেষণের নতুন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে তিনি নিজের জিনোম অনুক্রম বের করার জন্য টাকা জমাচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য নিজ জিনোমের BAM ফাইল হাতে নিয়ে বিশ্লেষণ করা। ব্র্যাড বলেন, “আমি প্রতি দিনই এসব ফাইল নিয়ে কাজ করি। মূলত আমার জিনোম ঠিক কোন জায়গায় পড়ছে তাই দেখতে চাই।”

    ব্র্যাড বেশ ধৈর্য্য নিয়ে অপেক্ষা করে আছেন কবে তার বিশেষ “তহবিল” বড় হবে আর ডিএনএ অনুক্রমকরণের খরচ কমবে। সময় যখন উপযুক্ত মনে হলো, তখন একটা জিনোম অনুক্রমকরণ কেন্দ্রের সাথে তিনি যোগাযোগ করলেন নিজের জিনোম অনুক্রম বের করার জন্য। তখন তিনি জানতে পারলেন, কোন গবেষণা প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর গবেষণার মূল্যায়ন করার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন বোর্ড থেকে অনুমোদন পেতে হবে। বহু চেষ্টার পড়েও ব্র্যাড সঠিক জায়গার যোগাযোগ বের করতে পারেন নি। তিনি নিজের জিনোম সম্পর্কে জানা ছাড়াই একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে রইলেন।

    যদি ব্র্যাডের মতো গবেষক নিজের জিনোমের উপাত্ত নিজের হাতে নিতে না পারেন, তাহলে আমার মতো সাধারণ নাগরিক কিভাবে সেটা করবেন? সেজন্য আমি আবার বংশগতিবিদ রবার্ট গ্রিনের সাথে যোগাযোগ করি, যিনি ব্রিগহাম ও মহিলা হাসপাতালে আমার জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রকল্পের দেখভাল করেছিলেন। তিনি বললেন, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে হলেও এটা করা সম্ভব।

    রোগীদের চিকিৎসা করার সাথে সাথে ড. গ্রীন গবেষণা করছেন কিভাবে জিনোম অনুক্রমকরণ ঔষুধ-পথ্যকে প্রভাবিত করবে। তার একটি প্রকল্প হলো PeopleSeq। এই গবেষণাপ্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সুস্থ-নিরোগ মানুষ কিভাবে নিজেদের জিনোম অনুক্রমের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়।

    এই গবেষণায় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী তাদের ডাক্তারের মাধ্যমে নিজস্ব জিনোমের নির্বাচিত তথ্য জানতে পারেন। কেউ কেউ ইল্যুমিন্যার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জিনোমের রিপোর্ট দেখেন। তবে ড. গ্রীন সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার গবেষণাটি আরেকটু বিস্তৃত করবেন। তিনি ঠিক করেছেন অংশগ্রহণকারীদের হাতে একটি হার্ডড্রাইভ দেবেন যেখানে জিনোমের BAM ফাইল থাকবে। ড. গ্রীন আমাকে ইমেইলে জানালেন, এজন্য তাদের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে, যা এর আগে কখনো ব্যবহৃত হয় নি। আমিও হতে পারি এই প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রথম ব্যক্তি!

    আমি PeopleSeq প্রকল্পে যুক্ত হলাম। ড. গ্রীনের গবেষকদল ইল্যুমিনাকে আমার BAM ফাইলগুলো সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করলেন। আমাকে আরো কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে হলো যে এসব উপাত্ত উপযুক্ত মান-পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায় নি সেটা আমি জানি ও বুঝি।

    ড. গ্রীনের সাথে এসব কথা হয়েছিলো আগস্টে। তখন ছিলো গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মকাল থেকে শরৎ হলো, শরৎ থেকে শীতকাল। শেষপর্যন্ত জানুয়ারির মাঝামাঝি UPS কুরিয়ার সার্ভিস আমার বাসায় একটা ছোট বাক্স বিলি করে দিয়ে গেলো। বাক্সের ভেতরে ছিলো সবুজ রঙের মোড়ক, যার মাঝে কালো কাপড়ে তৈরি কিডনী-আকৃতির ব্যাগ। ব্যাগটির জিপার খুললাম। সেখানে আমি একটা ধাতব-সবুজ আভার হার্ড ড্রাইভ পাই। ড. গ্রীনের প্রক্রিয়াটি বেশ প্যাঁচানো হলেও আমি অবশেষে নিজের জিনোমের কাঁচা-উপাত্ত হাতে পেলাম।

    আমার BAM ফাইল বিশ্লেষনের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীদের সাহায্য নেয়ার জন্য আমি এখন তৈরি।

    এই অভিযানে আমি প্রথমে যার সাথে দেখা করবো তিনি হলেন কনরাড কারসেজওস্কি। ম্যাসাচুসেটেস শহরের বিখ্যাত ব্রড ইন্সটিটিউটের একজন বিজ্ঞানী হলেন কনরাড। BAM ফাইল এতোটাই বড়ো আকারে, যে সেটা ইমেইলে পাঠানো সম্ভব নয়। সবচেয়ে সোজা হলো এই পুরনো শিক্ষাঙ্গনে নিজে হাজির হয়ে হাতে হাতে নিজের জিনোম পৌঁছে দেয়া।

    তাই আমি হার্ডড্রাইভটিকে পিঠের ব্যাগে নিয়ে বোস্টনগামী ট্রেনে উঠে পড়ি। নিজের জিনোমের ব্যক্তিগত কুরিয়ার হয়ে যাই আমি নিজেই।

    প্রচ্ছদ ছবি: Molly Ferguson, মূল সিরিজ থেকে নেয়া।

    [আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]