Category: অনুবাদ

  • ২০,০০০ বছর পূর্বেও করোনা ভাইরাসের মহামারি?

    ২০,০০০ বছর পূর্বেও করোনা ভাইরাসের মহামারি?

     কিংবদন্তি বিজ্ঞান লেখক, গবেষক, কলামিস্ট কার্ল জিমার New York Times ম্যাগাজিন এ সম্প্রতি পূর্ব এশিয়ান জনগোষ্ঠির শরীরে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধি প্রকট ৪২ টি জিনের উপস্হিতি ছিলো এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন  প্রকাশ করেছেন। কী ছিলো সেই লেখার বিষয়বস্তু চলুন চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।   

    গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে করোনা ভাইরাস ধ্বংসাত্মক একটি মহামারি  প্রায় ২০,০০০ বছর পূর্বে পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলো  যা আজ জীবিত মানুষের ডিএনএর উপর একটি বিবর্তনীয় ছাপ রেখে যেতে যথেষ্ট ছিলো।  

    গবেষকরা বলেছেন নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে একটি প্রাচীন করোনভাইরাস এই অঞ্চলটিকে বহু বছর ধরে জর্জরিত করেছে। অনুসন্ধানে বলা হয় কোভিড -১ মহামারিটি যদি টিকাদানের মাধ্যমে শীঘ্রই নিয়ন্ত্রণে না আনা হয় তবে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

    অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ডেভিড এনার্ড, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি বলেছেন,

    আমাদের উদ্বেগজনক হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ” যেটি গত বৃহস্পতিবার Current Biology  জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিলো। “এখনই যা চলছে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্ত ধরে চলতে পারে।”

    চিত্র: প্রজন্মের নির্বাচিত মিউটেশন এর গ্রাফ ( গবেষণা পত্র থেকে নেওয়া)

    জনসংখ্যার ঘনত্বের সাথে মিউটেশনের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে মূল গবেষণাপত্রে।

    এখন অবধি গবেষকরা এই রোগজীবাণুর পরিবারের ইতিহাসের খুব বেশি পিঁছনে ফিরে তাকাতে পারেননি। গত ২০ বছরে, তিনটি করোনাভাইরাস মানুষকে সংক্রামিত করেছে। গুরুতর শ্বাস প্রশ্বাসের রোগের কারণ হিসাবে করোনার ভূমিকা রয়েছে। কোভিড -১৯ , সার্সএবং মার্স এর। এই করোনা ভাইরাসগুলোর  প্রত্যেকটির উপর গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে তারা বাদুড় বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর কাছ থেকে আমাদের প্রজাতির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো।

    অন্য চারটি করোনাভাইরাসও মানুষকে সংক্রামিত করতে পারে তবে এগুলো সাধারণত কেবলমাত্র হালকা সর্দি সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীরা বলেন এই করোনা ভাইরাসগুলো সরাসরি মানুষের প্যাথোজেন হয়ে ওঠেননি, তাই তারা কখন স্হানান্তরিত হয়েছিলো তা অনুমান করার জন্য অপ্রত্যক্ষ ক্লুগুলোর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে । প্রায় নিয়মিত হারে করোনাভাইরাসগুলো নতুন রূপান্তর লাভ করে।  তাই তাদের জিনগত প্রকারণের সাথে তুলনা করে কখন তা সাধারণ পূর্বপুরুষের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল তা নির্ধারণ করা সম্ভব। 

    গবেষণাপত্র

    HCoV-HKU1 এইচসিওভি-এইচকিউ 1 নামে পরিচিত এই হালকা করোনা ভাইরাসগুলোর মধ্যে অতি সাম্প্রতিক ১৯৫০ এর দশকে প্রজাতির বাঁধা পেরিয়েছিল। প্রাচীনতম, বলা হয় HCoV-NL63, ৮২০ বছর পর্যন্ত পুরানো হতে পারে।

    তবে এই বিন্দুটির আগে, যতক্ষণ না করোনাভাইরাস ট্রায়াল আশানুরূপ হয়েছিলো – ডঃ এনার্ড এবং তার সহকর্মীরা অনুসন্ধানে একটি নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। করোনাভাইরাসের জিনগুলো দেখার পরিবর্তে গবেষকরা তাদের মানব পোষকের  ডিএনএতে প্রভাবগুলো দেখেছিলো।

    প্রজন্ম ধরে, ভাইরাসগুলো মানব জিনোমে প্রচুর পরিমাণে পরিবর্তন এনে দেয়। একটি রূপান্তর যা ভাইরাল সংক্রমণের বিরুদ্ধে রক্ষা করে তার অর্থ জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে এবং এটি বংশধরদের মধ্যে চলে যাবে। একটি জীবন রক্ষাকারী পরিব্যক্তি, উদাহরণস্বরূপ, লোকেরা ভাইরাসের প্রোটিন কে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। 

    তবে ভাইরাসগুলোও বিকশিত হতে পারে। কোনও পোষকের প্রতিরক্ষা কাটিয়ে উঠতে তাদের প্রোটিন এর আকার পরিবর্তন করতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো পোষককে আরও বেশি আক্রমণাত্মক (কাউন্টারঅফেনসিভ) হতে উৎসাহিত করতে পারে, যার ফলে আরও পরিবর্তন ঘটবে। 

    যখন কোনও এলোমেলো নতুন রূপান্তর কোনও ভাইরাসের প্রতিরোধের জন্য ঘটে তখন তা দ্রুততার সাথে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে আরও সাধারণ হয়ে উঠতে পারে। এবং সেই জিনের অন্যান্য সংস্করণগুলো পরিবর্তে বিরল হয়ে যায়। সুতরাং যদি কোনও জিনের একটি সংস্করণ লোকের বৃহত গোষ্ঠীতে অন্য সকলকে প্রাধান্য দেয় তবে বিজ্ঞানীরা জানেন যে এটি সম্ভবত অতীতে দ্রুত বিবর্তনের চিহ্ন ।

    সাম্প্রতিক বছরগুলোতে , ডাঃ এনার্ড এবং তার সহকর্মীরা ভাইরাসগুলোর একটি অ্যারের ইতিহাস পুনর্গঠন করার জন্য জিনগত পরিবর্তনের এই নিদর্শনগুলোর  জন্য মানব জিনোম অনুসন্ধান করেছেন। মহামারিটি আঘাত হানলে তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন যে প্রাচীন করোনভাইরাসগুলো  তাদের নিজস্ব একটি আলাদা চিহ্ন রেখে গেছে কী না?  

    বিশ্বের ২৬ টি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার মানুষের ডিএনএ তুলনা করেছেন, জিনের সংমিশ্রণটি দেখে যা করনোভাইরাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্য ধরণের রোগজীবাণু নয়। পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীতে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছিলেন যে এর মধ্যে ৪২ টি জিনের একটি প্রকট সংস্করণ রয়েছে। এটি একটি দৃঢ়  সংকেত ছিলো যে পূর্ব এশিয়ার লোকেরা একটি প্রাচীন করোনা ভাইরাস প্রজাতিকে অভিযোজিত করে নিয়েছিলো। 

    অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডেলাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টোরাল গবেষক যিনি নতুন গবেষণার সহ-লেখক ইয়াসিন সৌলমি বলেছিলেন।

    তবে পূর্ব এশিয়ায় যা ঘটেছিল তা মনে হয়েছিল কেবল সে অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলো। “যখন আমরা তাদেরকে বিশ্বজুড়ে জনগোষ্ঠীর সাথে তুলনা করি, তখন আমরা সংকেতটি খুঁজে পেলাম না।

    এরপরে বিজ্ঞানীরা অনুমান করার চেষ্টা করেছিলেন যে কতকাল আগে পূর্ব এশিয়রা   কোনও করোনভাইরাসকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো। তারা এই সত্যটির সুযোগ নিয়েছিলো যে একবার কোনও জিনের প্রকট সংস্করণ প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে যেতে শুরু করলে, এটি ক্ষতিকারক এলোমেলো রূপান্তর লাভ করতে পারে। যত বেশি সময় যায়, তত বেশি রূপান্তর জমতে থাকে।

     এনার্ড এবং তার সহকর্মীরা দেখতে পান যে ৪২ টি জিনের প্রায় একই সংখ্যক রূপান্তর ছিলো। এর অর্থ হলো তারা প্রায় একই সময়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছিলো। গবেষক  এনার্ড বলেছিলেন

    “এটি এমন একটি সংকেত যা আমাদের হঠাৎ পাওয়া বস্তু হিসেবে প্রত্যাশা করা উচিত নয়।

    তারা অনুমান করেছিলেন যে এই সমস্ত জিনগুলো তাদের অ্যান্টিভাইরাল মিউটেশনগুলো ২০,০০০থেকে ২৫,০০০বছর আগে একসময় বিকশিত হয়েছিল, সম্ভবত কয়েক শতাব্দীর পরে এটি সম্ভবত। এটি একটি আশ্চর্যজনক অনুসন্ধান, যেহেতু পূর্ব এশীয়রা তখন ঘন বসতি  সম্প্রদায়ের মধ্যে বাস করতো না বরং এর  পরিবর্তে শিকারী-সংগ্রহকারীদের ছোট ছোট দল তৈরি করেছিলো।

    University College London এর

    বিবর্তনীয় জিনতত্ত্ববিদ আইদা  যিনি এই নতুন গবেষণায় জড়িত ছিলেন না, তিনি বলেছিলেন যে এই কাজটি অমোঘ বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এখানে বেশ কিছু সুনিশ্চিত ব্যাপারে বিমোহিত হয়েছি।”

    তিনি বলেছিলেন,

    তবুও, তিনি ভাবেননি যে প্রাচীন মহামারীটি কত দিন আগে সংঘটিত হয়েছিল তার দৃঢ় অনুমান করা এখনও সম্ভব হয়েছিলো। “সময় একটি জটিল জিনিস”। “এটি কয়েক হাজার বছর আগে বা পরে ঘটেছে কী না?  আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটি এমন একটি বিষয় যা সম্পর্কে আমরা আত্মবিশ্বাসী হতে পারি না।

    ডক্টর  সৌলমি বলেছিলেন,

    নতুন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ওষুধের সন্ধানকারী বিজ্ঞানীরা প্রাচীন মহামারির প্রতিক্রিয়ায় বিবর্তিত ৪২ জিনের যাচাই-বাছাই করতে চাইতে পারেন”।

    তিনি বলেছিলেন,”এটি ভাইরাস প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া সামঞ্জস্য করার জন্য আণবিক নবগুলো আসলে আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে”। 

    ডক্টর অ্যান্ডার্স একমত হয়ে বলেছিলেন,

    যে নতুন গবেষণায় চিহ্নিত জিনগুলো ড্রাগের লক্ষ্য হিসাবে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। “আপনি জানেন যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, ইহাই বিবর্তন এর সৌন্দর্য।”

     তথ্য সূত্র :

    ১.A Coronavirus Epidemic Hit 20,000 Years Ago, New Study Finds

    https://nature.us17.list-manage.com/track/click?u=2c6057c528fdc6f73fa196d9d&id=1930d66b7d&e=d4300d7f89

    ২.An ancient coronavirus-like epidemic drove adaptation in East Asians from 25,000 to 5,000 years ago

    https://doi.org/10.1101/2020.11.16.385401

  • সংকেত ভাঙার পর  (গেম অব জিনোমস)

    সংকেত ভাঙার পর (গেম অব জিনোমস)

    গেম অব জিনোমস

    মূল: কার্ল জিমার
    অনুবাদ: আরাফাত রহমান

    [আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

    খন্ড-১, অধ্যায়-২

    নিজের জিনোম সিকোয়েন্স করবো। এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছুদিন পর আমি বোস্টনের এক হাসপাতালে আবিষ্কার করি। একজন বংশগতি-বিশেষজ্ঞ আমার মুখে আকুপাকু করে কিছু খুঁজছিলেন।

    ড. রবার্ট গ্রিন বললেন, “আমি আসলে তোমার চেহারায় কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে কি না সেটা খুঁজছি, যা থেকে তোমার বংশগতির রোগ থাকলে তার ইঙ্গিত দেবে। যেমন ধরো চোখের আকৃতি, তোমার কান নিম্নমুখি কি না, কানের গঠনের জটিলতা ইত্যাদি।”

    ড. গ্রিন তারপর আমাকে তার ব্রিগহাম ও মহিলা হাসপাতালের অফিসে এদিক-ওদিক হাঁটতে বললেন। ওয়েস্টমিনিস্টারে প্রতিবছর একটি বিখ্যাত কুকুর-প্রদর্শনী হয়। সেখানে নানা জাতের শৌখিন কুকুর নিয়ে বিভিন্ন কৌশল প্রদর্শন করেন মালিকেরা। আমার নিজেকে তখন সেই প্রদর্শনীর একটি পিচ্চি টেরিয়ার কুকুর মনে হচ্ছিলো। অবশ্য গ্রিন পরে বোঝালেন যে বংশগতির কিছু লুকানো বংশব্যাধি মানুষের হাঁটার ধরনেও বিশেষ ছাপ ফেলে।

    আমার হাঁটার ভঙ্গি দেখার সময়ে ড. গ্রিন বললেন, “ভবিষ্যতে হয়তো চিকিৎসকরা এগুলোকে অপ্রয়োজনীয় সতর্কতা বলবেন। সমস্যা হলো কিভাবে আমরা জিনোম সিকোয়েন্সিং করবো তার সুনির্দিষ্ট কোন মানদণ্ড নেই। এজন্য আমি এভাবে তোমার জিনোম সিকোয়েন্সিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

    কোন বংশগতিবিজ্ঞানীকে আমি আগে কখনো তাৎক্ষণিক-প্রবর্তিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে দেখি নি। তবে নিত্যনতুন পদ্ধতি আবিষ্কার জিনোম-গবেষণার ক্ষেত্রে বেশ স্বাভাবিক। আমাদের মানব-প্রজাতির ইতিহাসে আমরা আগে কখনো নিজেদের ডিএনএ-লিখন দেখতে পাই নি। বিজ্ঞানীরা এখনো বোঝার চেষ্টা করছেন জিনোম কিভাবে আমাদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। আর ড. গ্রিন হলেন সেসব চিকিৎসকের একজন যারা স্বাস্থ্য-চিকিৎসায় জিনোম ব্যবহারের নিয়ম-নীতি ঠিক করার চেষ্টা করছেন।

    এর এক মাস আগে ড. গ্রীন আমাকে ইল্যুমিনা কোম্পানির একটি শিক্ষামূলক প্রোগ্রামের মাধ্যমে জিনোম সিকোয়েন্স করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ইল্যুমিনা হলো ডিএনএ-সিকোয়েন্সিং করার ক্ষেত্রে শীর্ঘে থাকা কোম্পানি। এর জন্য আমার একদফার শারিরীক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তারপর ড. গ্রিন আমার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। এ নমুনা বোস্টন থেকে স্যান দিয়েগো শহরে পাঠানো হয়। রক্তের নমুনা থেকে ইল্যুমিনা আমার জিনোম সিকোয়েন্স করে। এছাড়া ইল্যুমিনার পক্ষ থেকে একটি সেমিনারেও অংশ নেই আমি। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতে ৩,১০০ মার্কিন ডলার খরচ হয়।

    ইল্যুমিনার রসায়ন। ছবি এঁকেছে চৌধুরী আরিফ জাহাঙ্গীর তূর্য

    ইল্যুমিনার দলটি আমার রক্তকোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে। তবে ইল্যুমিনার প্রযুক্তি বই পড়ার মতো করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে পারে না। প্রথমত, ডিএনএ এতোই বড় যে এভাবে পড়তে গেলে অনেক সময় লাগবে। তাছাড়া কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহের সময় ডিএনএ ভেঙে যেতে পারে।

    এর বদলে ইল্যুমিনা এমন কিছু করলো যা কিছুটা অদ্ভূত। ডিএনএকে অজস্র ছোট ছোট টুকরা ভাঙা হয়। তারপর এসব টুকরার অজস্র অনুলিপি তৈরি করা হয়। এসব ছোট-দৈর্ঘ্যের অনুলিপি পড়া হয়। তারপর সব টুকরাকে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণ জিনোম কেমন ছিলো তার সমাধার করা হয়।

    এক্ষেত্রে ইল্যুমিনা মূলত ডিএনএ-র নিজের অনুলিপি তৈরির বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে। প্রথমে দ্বিসূত্রক ডিএনএকে দুইটি সূত্রে আলাদা করা হয়। তারপর প্রতিটি সূত্রের বিপরীতে নুতন একটি পরিপূরক সূত্র তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ার সৌন্দর্য হলো এর সারল্যে। ডিএনএ-র একটি বেস কেবলমাত্র অন্য একটি বেসের সাথে জোড়-বাঁধতে পারে: A-র সাথে T এবং C-র সাতে G। আমার ডিএনএর পাঠোদ্ধার করতে ইল্যুমিনা মূলত এই রসায়নটিই অনুকরণ করে।

    প্রথমে ইল্যুমিনার বিশেষজ্ঞ দলটি আমার ডিএনএ-কে ছোট ছোট টুকরায় ভেঙে ফেলে। প্রতিটি টুকরার দৈর্ঘ্য কমবেশি ৩৪০ বেস। তারপর প্রতিটি টুকরারর অজস্র অনুলিপি করা হয়। উদ্দেশ্য যাতে প্রতিটি টুকরাকে অনেকবার সিকোয়েন্সিং করা যায়। টুকরোগুলোকে এরপর তারা একটা ছোট চিপে যুক্ত করে রাসায়নিক মিশ্রণে প্লাবিত করে।

    রাসায়নিক মিশ্রণে অজস্র বেস মুক্তভাবে থাকে। একে একে এসব বেস ডিএনএ-টুকরাগুলোর সাথে যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে প্রতিটি ডিএনএ টুকরার বিপরীত সূত্রক তৈরি হয়। যখনই একটি মুক্ত বেস কোন ডিএনএ-টুকরায় যুক্ত হয়, ইল্যুমিনার সূক্ষ্ম যন্ত্র ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করে রাখে। সিকোয়েন্স মেশিনের সাথে যুক্ত কম্পিউটার প্রতিটি সংযুক্তি-ঘটনা থেকে মূল ডিএনএ-সূত্রকের সিকোয়েন্স পাঠোদ্ধার করে ফেলে।

    ইল্যুমিনার গবেষকদল তারপর আমার ডিএনএ সিকোয়েন্সের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বারো হাজার ব্যাধির জন্য আমার ঝুঁকি কতটুকু তা বোঝার চেষ্টা করেন। এসব ব্যধির মধ্যে আছে ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো জানাশুনা রোগ থেকে শুরু করে শারুবিসম-নামক অজ্ঞাতপ্রায় রোগ (শারুবিসম রোগে মুখের চোয়াল সিস্ট দিয়ে ভরে যায়)।

    আমার ডিএনএ সিকোয়েন্সে তাদের এই অনুসন্ধান শুরু হলে আমি বেশ চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম। আমার পঞ্চাশতম জন্মদিন ঘনিয়ে আসছে। যদিও আমার স্বাস্থ্য বেশ ভালো, তবুও পরবর্তী কয়েক দশকে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে তা আমাকে ভাবায়। আমার দাদার বয়স চল্লিশের ঘরে থাকতেই হৃদরোগে মারা যান। দাদী এর দশ বছর পর ক্যন্সারে মারা যান। অন্যদিকে আমার নানা বেঁচে ছিলেন ৮৮ বছর পর্যন্ত, আর নানী গত গ্রীষ্মে নব্বইতম জন্মদিন উদযাপন করলেন। এজন্য মাঝে মাঝে আমি ভাবি যে বংশগতির লটারিতে আমি আসলে কেমন করলাম?

    বোস্টনে ড. গ্রিনের সাথে সাক্ষাতের কয়েক সপ্তাহ পরে আমি হাসপাতাল থেকে একটা ফোন পাই। তারা ইল্যুমিনার কাছ থেকে ফলাফল সংগ্রহ করেছে। ফোন করেছিলেন শেইলা সুটি, হাসপাতালের একজন কাউন্সেলর। তিনি জানালেন আমার রিপোর্টে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই। রিপোর্টটা নাকি বেশ নিরীহ।

    ইলুমিনার মতে আমি হয়তো কিছু কিছু ঔষুধে ভালোভাবে সাড়া দেব না। কিন্তু তারা এমন কোন প্রমাণ পায় নি যে আমি কোন বংশব্যাধিতে আক্রান্ত। তবে আমি দুইটি বংশব্যধির জন্য বাহক। তারমানে আমার একটি মিউটেশন আছে যা আমার বাচ্চাকাচ্চাদের রোগাক্রান্ত করে দিতে পারে — যদি আমার স্ত্রী থেকেও তারা একই মিউটেশন পায়। যেহেতু এসব রোগ আমাদের সন্তান ছোট থাকতেই ধরার পড়ার কথা, সেহেতু আমার পরিবারের জন্য সেগুলো দুশ্চিন্তার কিছু নয়।

    ব্যাস। এটুকুই।

    সুটির সাথে কথা হওয়ার পর আমার উদ্বেগ আর থাকে না।  তেমন কোন দু:সংবাদ নেই। কিন্তু কিছু সময় যাওয়ার পর পুরো অভিজ্ঞতাটি আমার জিনোমকে বিরক্তিকর একটা বিষয় বানিয়ে ফেললো। আমার মনে হলো কোথাও নিশ্চয়ই ভুল হচ্ছে। প্রতিটি মানুষের জিনোম অসীম-আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত — যদি গভীরভাবে তা বিশ্লেষণ করা হয়।

    নিজের জিনোম সিকেয়েন্স করার অনেক আগে থেকেই এ ব্যপারে আমার আগ্রহ ছিলো। কয়েক বছর আগে সান্তা ক্রুজে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জিন-গবেষক দম্পত্তির সাথে আমি মধ্যাহ্নভোজে কথা বলছিলাম এ বিষয়ে। তারা হলেন বেথ শ্যাপিরো ও এড গ্রিন। মনে পড়লো শ্যাপিরো বলেছিলেন, “জানো তোমার একদিন কি করা উচিত? তোমার নিজের জিনোম সিকোয়েন্স করা উচিত। তারপর কি জানো কি করা উচিত? তোমার জিনোম সিকোয়েন্সের BAM ফাইল সংগ্রহ করা উচিত। যদি সেটা করতে পারো, তাহলে আমাদের মতো গবেষকদের তুমি ফাইলটা দিতে পারো। তাহলে তুমি বুঝবে আসলে তোমার জিনোমে কি হচ্ছে।”

    BAM ফাইল কি তা আমি জানতাম না। আমার এই না জানা স্বীকার করার কোন সহসও ছিলো না তখন। কিন্তু এখন, সেই কথোপকথনের কয়েক বছর পরে, BAM ফাইল কি তা বের করার সময় হয়েছে।

    প্রচ্ছদ ছবি: Molly Ferguson, মূল সিরিজ থেকে নেয়া।

    [আগের অধ্যায় | সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

  • হার্ডড্রাইভের মধ্যে মানুষটি (গেম অব জিনোমস)

    হার্ডড্রাইভের মধ্যে মানুষটি (গেম অব জিনোমস)

    [বিজ্ঞান লেখক কার্ল জিমার নিজের জিনোম সিকোয়েন্সিং করেছিলেন। শুধু তাই না, বিভিন্ন বিজ্ঞানীর সাথে মিলে নিজের জিনোমের ব্যবচ্ছেদও করেছিলেন। বায়োইনফরমেটিক্স, জেনোমিক্স, সিকোয়েন্স এনালাইসিসের প্রতিটি ধাপে খুঁটিয়ে বুঝেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তার একটা বিশাল ধারাবাহিক আছে, Game of Genomes। প্রায় দুই বছর আগে লস এঞ্জেলসে একটা বিজ্ঞান বক্তৃতায় কার্ল জিমারের সাথে আমার দেখা হয়। এই সিরিজটা বাংলাতে অনুবাদের জন্য অনুমতি পাই তার কাছ থেকে (এবং মূল প্রকাশক ওয়েব-ম্যাগাজিনের কাছ থেকে)। এটা আমার জন্য একটা বিশাল ব্যপার কারণ এই লেখককে আমি বহুদিন ধরে অনুসরণ করে আসছি। তিনিও কোন দ্বিধা ছাড়াই অনুবাদের অনুমতি দেন। অনুবাদটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে বিজ্ঞান ব্লগে। সূচীপত্র ]

    [সূচীপত্র | পরের অধ্যায়]

    খন্ড-১, অধ্যায়-১

    হার্ডড্রাইভের মধ্যে মানুষটি

    সম্প্রতি এক বিজ্ঞানী সহগবেষকদের সামনে আমাকে দেখিয়ে ঘোষণা দিলেন, “এই ব্যক্তি কার্ল জিমার নন।”

    তিনি মার্ক জেরস্টেইন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঘা প্রফেসর। আমি গিয়েছিলাম তার কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসে আরো দু’জন ল্যাব-সদস্য সাথে বসে ছিলেন তিনি। টেবিলের উপরে রাখা একটা হার্ড ড্রাইভ। সেটা দেখিয়ে তিনি বললেন, “আসল কার্ল জিমার এখানে”

    “এখানে” বলতে তিনি মূলত আমার জিনোম অনুক্রম বোঝালেন। আমার জিনোম অনুক্রমের উপাত্ত তখন ঐ ড্রাইভ থেকে একটা ম্যাকবুক কম্পিউটারে স্থানান্তরিত হচ্ছিলো।

    “আমি কিন্তু মজা করছি না,” জারস্টেইন আবার বললেন। “মিনিট পাঁচেকের মধ্যে জিমার এই কম্পিউটারে চলে আসবেন।”

    আমি জারস্টেইনের কাছে গিয়েছিলাম আমার জিনোম বিস্তারিত অনুসন্ধান করার জন্য। আমার বিশেষজ্ঞ সাহায্য দরকার। আমার বংশগতিতে আসলে কি লেখা আছে?

    হ্যাঁ, আজকাল আপনি বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে মুখের থুতুর নমুনা পাঠিয়ে প্রচলিত কিছু পরীক্ষা করতে পারবেন। আপনার বংশ-কুলুজি-ঠিকুজি বিস্তারিতভাবে জানতে পারবেন। তবে এসব বাণিজ্যিক পরীক্ষা আসলে একজন ব্যক্তির ডিএনএ-র খুব ছোট একটা অংশ নিয়ে করা হয়। এটা হয়তো জিনোমের এক শতাংশেরও সমান নয়। আমি একটু ভিন্ন কিছু করতে চাচ্ছিলাম। যেটা গতানুগতিকের চেয়ে রোমাঞ্চকর। আমি আমার জিনোম অনুক্রম পুরোটাই সিকোয়েন্স করে ফেলেছি। আমার জিনোম অনুক্রমের সকল কাঁচা-উপাত্ত যোগাড়ও করে ফেলেছি। এটা হলো সেই উপাত্ত যা দিয়ে জীববিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন কিভাবে অজস্র জিন একজন মানুষকে আলাদাভাবে গড়ে তোলে।

    জারস্টেইনের ম্যাকবুকে উঁকি দিলে দেখা যাবে বিশাল ফাইল স্থানান্তরিত হচ্ছে। সে ফাইলের প্রতিটি লাইন A, T, G ও C অক্ষরের এলোমেলোভাবে বিন্যস্ত। এরকম অজস্র লাইন ধারাবাহিকভাবে সাজানো। প্রতিটি লাইনের সাথে আবার ভিন্ন ভিন্ন কলামে আরো কিছু উপাত্ত সঙ্গ দিচ্ছে। কোন কলামে অর্থহীন কিছু সংকেত, বাকিগুলোতে বিভিন্ন সংখ্যা। অবোধ্য, কিন্তু রহস্যময়। সব মিলিয়ে এরকম এক’শ-বিশ কোটি সারি।

    গেম অব জিনোম। ছবি এঁকেছে চৌধুরী আরিফ জাহাঙ্গীর তূর্য

    জার্সটেইনের কম্পিউটারে আমার জিনোম স্থানান্তরিত হতে দেখে খানিকটা বিহ্বল হয়ে পড়ি। সেই ১৯৯০-এর দশকে আমি ডিএনএ নিয়ে লেখালেখি শুরু করি। সেটা এমন এক সময় যখন মানব জিনোম সিকোয়েন্স ধরা হতো মঙ্গলে মানুষ প্রেরণ করার মতোই অরাধ্য। শতশত বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টা আর তিনশ কোটি ডলার খরচ করার পর ২০০১ সালে প্রথম মানব জিনোমে কি লেখা আছে তা পাঠোদ্ধার করা হয়। তখন থেকে ডিএনএ অনুক্রমকরণের খরচ ক্রমাগতই কমা শুরু করে। সাথে সাথে অনুক্রমকরণ প্রযুক্তি আরো নিখুঁত হতে থাকে। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত প্রায় দেড়লাখ মানুষের জিনোম অনুক্রম পাঠোদ্ধার করে ফেলেছেন।

    তবে গবেষণার জন্য জিনোম অনুক্রম করা সাম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে গেলেও খুব অল্প লোকজনই নিজেদের জিনোম অনুক্রমের উপাত্ত নিজের হাতে পান। আর সেসব হাতে গোনা ভাগ্যবান ব্যক্তি সচরাচর জিনোমের ভিত্তিতে সতর্কভাবে লেখা প্রতিবেদন পান। আমার মতো নিজের জিনোমের কাঁচা-উপাত্ত সংগ্রহ করার ঘটনা শোনাই যায় না। সাংবাদিকদের মধ্যে নিজ জিনোমের উপাত্ত আমিই সম্ভবত প্রথম হাতে নিয়েছি।

    গত কয়েক মাস ধরে আমি জারস্টেইনসহ দুই ডজন বিজ্ঞানীদের খুঁজে বের করেছি যারা আমার জিনোমে কি আছে তা খুঁজে পেতে সাহায্য করবেন। নিজেদের সময় ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নিয়ে তারা এ অভিযানে উদার-সম্মতি জানিয়েছেন। যেমন সাহায্য করেন স্কুবা ডাইভিঙের গাইডেরা, সাগরতলে গভীর গিরিখাতের মধ্যে নের্তৃত্ব দেয়ার সময়ে।

    এ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমি নিজের সম্পর্কে বেশ অনেক কিছুই জেনেছি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — মানব জিনোম সম্পর্কেও আমার খানিকটা জ্ঞানগম্যিও হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন এ গবেষণাক্ষেত্রে যে সব অগ্রসর গবেষণা করছেন, সেটাও খানিকটা বোধগম্য হচ্ছে।

    আমি কি শিখেছি জিনোম ব্যবহার করে? লক্ষ লক্ষ বছর আগেরকার আমাদের প্রাক-মানব উৎপত্তির ঘটনা, আমার জিনোমের ঠিক কোন কোন ডিএনএ নিয়নন্ডারথাল মানব থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, সেগুলো আমার শরীর-স্বাস্থ্যে কি প্রভাব ফেলতে পারে ইত্যাদি। আরো জেনেছি আমার কোন কোন জিনের একাধিক অনুলিপি রয়েছে, আর কোন ডিএনএ খন্ডাংশ আমার নেই যা অন্যান্য মানুষের মাঝে সচরাচর থাকে। আমার কিছু কিছু প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গাঠনিক মডেল দেখেছি। পর্যবেক্ষণ করেছি কিভাবে মিউটেশন এসব প্রোটিনের কাজের ধরণ বদলে দিয়ে আমাকে কিছু রোগের প্রতি দূর্বল করে তুলেছে। হয়তো সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি আমি উপলদ্ধি করেছি, তা হলো বিশেষজ্ঞদের জন্য এখনো জিনোমের অর্থ উদ্ধার করা কতটা কঠিন।

    নিজের জিনোম থেকে আমি কি জেনেছি, তা আগামী অধ্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বলবো। পৃথিবীর কয়েকজন শীর্ষ জিনোম গবেষকদের সাথেও আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। আশা রাখি, পাঠক আপনিও আমার সাথে হার্ড ড্রাইভের রহস্যময় উপাত্তে কি আছে তার পাঠোদ্ধার করবেন।

    প্রচ্ছদ ছবি: জিনোম সাগরে স্কুবা ডাইভারদের মতো ডুব। ছবি STAT থেকে নেয়া।

  • সংবেদনশীল চুলের কোষের প্রতিবিম্ব বিন্যাসকরণ কীভাবে অন্তকর্ণে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে?

    সংবেদনশীল চুলের কোষের প্রতিবিম্ব বিন্যাসকরণ কীভাবে অন্তকর্ণে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে?

    জ্যাকসন ল্যাবরেটরির একদল গবেষক সংবেদনশীল চুলের ত্বকের কোষ কীভাবে অন্তকর্ণে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তা নিয়ে গবেষণা করেন । মার্ক ওয়ানার একটা চমকপ্রদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এ বিষয় নিয়ে।

    শব্দ সংবেদনশীল  চুলের কোষগুলো বিশেষায়িত মাধ্যমিক সংবেদনশীল যা শ্রবণশক্তি, ভারসাম্য, রৈখিক ত্বরণ এবং কৌণিক ত্বরণ (মাথা ঘোরানো) আমাদের ইন্দ্রিয়ের ভারসম্য রক্ষা করে। শব্দ এক কথায় বলতে গেলে একটা সিরিজ। আমরা জন্মের পর থেকে শোনা শব্দ পরে বলতে শিখি। গান কবিতা বেশিরভাগ মানুষই শুনতে ভালোবাসেন। রবী ঠাকুরের একটি গান প্রায়ই গুনগুন করি। গানটি হলো তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী?  আমি অবাক হয়ে শুনি!  শোনা ছাড়া বলতে পারা অসম্ভব আমরা যাদেরকে বাক প্রতিবন্ধি কিংবা বোবা বলে সম্বোধন করি তারা বলতে পারেনা কারণ তারা শুনতে পায়না। শব্দের ভূমিকা কতো প্রয়োজনীয় তা আমরা দৈনন্দিন জীবনে টের পাই প্রতিনিয়ত। একবিংশ শতাব্দীতে মুঠো ফোন ব্যবহার করেনা এমন মানুষ নেহাত কম। তো যখন আমরা মুঠো ফোনে কথা বলি তখন প্রায়শই শব্দ ভালো মতো শোনা না গেলে অপর জন কে বলি জোরে বলতে। এই যে কানে শোনার ব্যাপারটা আমাদের শ্রবণ স্নায়ুকে আলোড়িত করে তাকে আমরা কী বলি?  বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা তাকে শ্রাব্যত্যার পাল্লা  বলি। সুস্হ মানুষের শ্রাবোত্তর সীমা ২০ থেকে ২০,০০০ হার্জ (Hz)  ধরা হয় ।

    শ্রবণ জটিল ধাপের একটি সিরিজ যা বাতাসের শব্দ তরঙ্গকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। আমাদের শ্রাবণ স্নায়ু তখন মস্তিষ্কে এই সংকেত প্রেরণ  করে। যথাযথ চুলের কোষের প্রবণতা সমন্বিত শ্রবণ শক্তি এবং গতি শনাক্তকরণ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিটি কোষ কেবল একটি দিকে গতি শনাক্ত করে। গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে মাছের অন্ত কর্ণের মধ্যে এবং পার্শ্বীয় রেখা গুলোর গতি শনাক্তকরণ চুলের কোষের ১৮০  ডিগ্রি “উল্টানো” হওয়া বিভিন্ন উপধারার উপর নির্ভরশীল। এটি একটি উপসেটের মতো প্যাঁচানো থাকে। অন্যটি একটা আয়না-চিত্র বিন্যাসে বিপরীত দিকে মুখ করে থাকে । তবে কীভাবে তা অর্জিত হয়?

    শ্রবণ ক্ষয়, কানের গবেষণা

     সহযোগী অধ্যাপক বাসাইল তারচিনী( পিএইচডি) প্রকৃতি যোগাযোগের একটি জটিল নতুন গবেষণাপত্রে একটি অন্ত কর্ণের ভেতরের  সঠিক চুলের কোষের বিন্যাস বলে প্রকাশ করেছেন।

    হোম ব্যালেন্স ডিজঅর্ডার  কীভাবে ব্যালেন্স সিস্টেম কাজ করে?

    ব্যালেন্স সিস্টেম কীভাবে কাজ করে?

    শরীরের ভারসাম্য ব্যবস্থা অন্ত কর্ণ , চোখ, পেশী, জয়েন্টগুলো এবং মস্তিষ্কের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্তকরণ, প্রতিক্রিয়া এবং সামঞ্জস্যের একটি ধ্রুবক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে।

    কানের ভিতরে গভীর, ঠিক মস্তিষ্কের নিচে অবস্থিত,অন্ত কর্ণের অবস্হান । অন্ত কর্ণের একটি অংশ শ্রবণ সক্ষম  অন্য অংশ, যা ভ্যাসিটিবুলার সিস্টেম নামে পরিচিত, মস্তিষ্কের  সেরিবেলাম গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মাথার অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য পাঠানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছিলো। আমাদের বেশিরভাগ শ্রবণশক্তি গ্রহণযোগ্যতার জন্য গ্রহণ করি। তবে আমরা কীভাবে শুনি তার যান্ত্রিকতা গুলো বেশ অসাধারণ। বাতাসের তরঙ্গগুলো আমাদের কানের ভেতরে তরল তরঙ্গে পরিণত হয় যা চুলের ত্বকের এর কারণে  অনুভূত হয় যা আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ু গুলোর সাথে বৈদ্যুতিক প্রবণতাকে জাগিয়ে  দেয়, যা তাদের পরে ব্যাখ্যা করে। কোনও ঘেউ ঘেউ কুকুর, একটি পরিচিত গান, গাড়ি ব্রেকের চিৎকার থেকে  এসেছে? পার্থক্য শনাক্ত  করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জ্যাকসন ল্যাবরেটরি (জ্যাকস) সহযোগী অধ্যাপক বেসিল তারচিনি( পিএইচডি) কানের চুলের কোষগুলো কীভাবে সুনির্দিষ্টভাবে সাজিয়েছেন । শব্দ তরঙ্গের সংশ্লেষপূর্ণ পার্থক্য শনাক্ত করার জন্য স্থানিক দিক নির্দেশনা নিয়ে গবেষণা  করেন। তার পূর্ববর্তী গবেষণাটি আণবিক স্তরে দেখিয়েছেন।  যে চুলের কোষে স্টেরিওসিলিয়া হিসাবে পরিচিত গতিগুলো শনাক্ত করার জন্য বিশেষায়িত কাঠামো কীভাবে শ্রবণের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক দিক নির্দেশ ধাপে ধাপে তৈরি হয়। এখন, প্রকৃতি যোগাযোগগুলো প্রকাশিত “ইএমএক্স ২জিপিআর ১৫৬- গাই মেকানিকোসেনরি এপিথেলিয়াম চুলের কোষের প্রবর্তন বিপরীত করে। তিনি এবং তাঁর গবেষণা দলটি একটি নতুন প্রক্রিয়া প্রকাশ করেছেন যা নির্ধারণ করে যে চুলের কোষগুলোর একটি উপ-জনপুঞ্জ কীভাবে অংগ স্তরের দিকে তাদের দিক গুলো বিপরীত করতে পারে। কানের চুলের কোষ গুলো কীভাবে সুনির্দিষ্টভাবে সাজিয়েছেন এবং শব্দ তরঙ্গের সংশ্লেষপূর্ণ পার্থক্য শনাক্ত করার জন্য স্থানিক দিক নির্দেশিত গবেষণা করেছেন । তার পূর্ববর্তী গবেষণাটি আণবিক স্তরে দেখিয়েছে যে চুলের কোষের বিশেষায়িত কাঠামো যা গতি সনাক্ত করে যা স্টেরিওসিলিয়া হিসাবে পরিচিত, শ্রবণের জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক অভিযোজনে ধাপে ধাপে রূপায়ণে পরিণত হয়। তারচিনী বলেন, জিপিআর ১৫৬ একটি ‘অনাথ’ রিসেপ্টর — আমরা কীভাবে এটি দিয়ে আবদ্ধ তা জানি না।” “জিপিসিআরগুলো উচ্চ আগ্রহের কারণ তারা ওষুধে ব্যবহৃত হয় । প্রকৃতপক্ষে,বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে একটি ওষুধ সংস্থা ভেবেছিল যে জিপিআর ১৫৬  নিউরোট্রান্সমিটার গ্রাবার জন্য রিসেপ্টর হতে পারে, কারণ এটি পরিচিত গ্যাবা রিসেপ্টর এর অনুরূপ, তবে তাদের গবেষণাটি গ্যাবার কোনও প্রতিক্রিয়া দেখায় নি। জিপিআর ১৫৬ আসল কাজটি অজানা থেকে যায়। আমাদের কাগজ কোষের মেরুতে এই রিসেপ্টারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, অভিনব ভূমিকা চিহ্নিত করে। “

    গবেষণায় দেখা যায় যে চুলের কোষের বিপরীতমুখী এবং বহু-দিকনির্দেশক সংবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি উপাদান রয়েছে: প্রতিলিপি ফ্যাক্টর ইএমএক্স ২,জিপিআর ১৫৬ এবং গাই। ইঁদুর এবং মাছের তিনটির কোনও একটিরই অভাব রয়েছে এমন চুলকোষ রয়েছে যা অভিন্নমুখী, কেবল একটি দিকে গতি সনাক্তকরণ সরবরাহ করে। যখন এমএক্স 2 চুলের কোষ গুলোতে প্রকাশিত হয়, তখন এটি একটি জটিল ক্যাসকেড শুরু করে যেখানে জিপিআর ১৫৬ চুলের কোষগুলোতে  স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ ( “মেরুকৃত”) হয়ে যায়। জিপিআর ১৫৬  তারপরে ১৮০  ডিগ্রিতে কোষ কে  ঘোরানোর জন্য গাইকে সক্রিয় করে।

    তারচিনি বলেন, “লক্ষণীয় বিষয় হলো  প্রক্রিয়াটি  ইঁদুরের কান এবং পার্শ্বীয়ভাবে মাছের উভয় লাইনেই একই বলে মনে হয়।”

    আশ্চর্যের বিষয়, শ্রুতি চুলের কোষগুলো সাধারণত একটি প্রতিবিম্ব সংগঠন দেখায় না তা সত্ত্বেও স্পষ্টতই একটি উল্টাপাল্টা থেকে যায়,” তাই আমরা দেখতে পেলাম এটি হার্ড-ওয়্যারড, অত্যন্ত সুরক্ষিত সেলুলার পথ হিসাবে দেখা যাচ্ছে। বিপরীত সেল অরিয়েন্টেশন যা একাধিক অঙ্গ এবং প্রাণীর জন্য প্রযোজ্য। যার শ্রবণ ঘাটতি ছাড়াও ভারসাম্য ত্রুটি রয়েছে, আয়না-চিত্র চুলের কোষ সংগঠনটি কীভাবে বিশেষভাবে ভেস্টিবুলার  অন্ত কর্ণের  ক্রিয়ায় অবদান রাখে, মাথা নড়াচড়া এবং মাধ্যাকর্ষণ শনাক্তকরণের ক্ষমতা রাখে।

    তথ্য সূত্রঃ

    ১. Sensory Hair Cells: An Introduction to Structure and Physiology – Oxford Academic
    ২. BUILDING THE MIRROR-IMAGE ARRANGEMENT OF SENSORY HAIR CELLS – The Jackson Laboratory
    ৩. How Do We Hear? – NIDCD
    ৪. How does the balance system work? – Eye and Ear Hospital
    ৫. https://bigganblog.org/2016/09/সনোজেনেটিক্স-শ্রবনোত্ত/
    ৬. https://bigganblog.org/2015/04/কান-ফাটানো-শব্দ-এবং-তার-চে/

  • অন্ত্রে মাইক্রোবায়োম নেই এমন প্রাণীর সন্ধানে

    অন্ত্রে মাইক্রোবায়োম নেই এমন প্রাণীর সন্ধানে

    শরীর বা শরীরের কোন নির্দিষ্ট অংশে স্বভাবতই বিপুল সংখ্যক অণুজীব বসবাস করে যারা খাদ্য হজমে, শক্তি উৎপাদনে, ভিটামিন তৈরিতে এমনকি ক্ষতিকর জীবাণু থেকে আমাদের রক্ষা করতে সাহায্য করে। এসব অণুজীবদের এক কথায় আমরা মাইক্রোবায়োম বা শরীরের অণুজীব বলে থাকি যারা প্রাকৃতিক ভাবেই মানুষ বা অন্য প্রাণীর দেহে থাকে। কিন্তু সিমন্স ফাউন্ডেশনের “Quanta Magazine’’ অনলাইন প্রকাশনার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমনও প্রাণী আছে যাদের অন্ত্রে মাইক্রোবায়োম নেই বা থাকলেও তা খুবই নগন্য। প্রতিবেদনটির মূলভাব এখানে তুলে ধরা হলোঃ

    সুস্থ থাকার জন্য মানুষ এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী তাদের অন্ত্রের জটিল ব্যাকটেরিয়া সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যে তাদের এই সম্পর্ক নিয়মের বাইরেও ঘটতে পারে।

    ২০১১ সালের গ্রীষ্মে, অনুজীববিজ্ঞানী স্নাতকোত্তর ছাত্র জন স্যান্ডার্স বহু বছর পরে  দ্বিতীয় বারের মত গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘনবর্ষণ বনাঞ্চল খুঁজে পেয়েছিলেন। একটি বিশাল ফ্লোরসেন্স মাইক্রোস্কোপ এবং জেনারেটর দিয়ে অ্যামাজন নদী পর্যন্ত ৬০ পাউণ্ড ল্যাব সরঞ্জামে সজ্জিত করেছিলেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে  পৌঁছে তিনি যত দ্রুত সম্ভব বিভিন্ন পিঁপড়ে ধরতে শুরু করলেন, তাদের অন্ত্রে পরিব্যপ্ত  সব জীবাণু গুলো দেখার জন্য। তিনি সেই পিঁপড়া প্রজাতির কয়েকটিতে “আশ্চর্যজনক, প্যাকেটযুক্ত মেঘ’’ দেখেছিলেন। তার মতে, ‘’এটি ছিল অনুজীবের ছায়াপথের মতো! মাইক্রোস্কোপের নিচে তাদের দিকে তাকালে তারা আপনার চোখে বিস্ফোরিত হবে।” 

    চিত্র ১- বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ার অন্ত্রে ভিন্ন ধরনের ও ঘনত্বের অণুজীবের উপস্থিতি।Source:  মূল গবেষণাপত্র 

    আমরা অন্যভাবে হজম করতে পারি না এমন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য, মূল পুষ্টি সরবরাহের জন্য, সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে কাজ করতে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণের জন্য আমরা এবং অন্যান্য অনেক প্রাণী আমাদের মধ্যে বসবাসকারি  ব্যাকটেরিয়া কোষগুলোর উপর নির্ভর করি। মাইক্রোবায়োম আমাদের স্বাস্থ্য এবং বেঁচে থাকার জন্য এতোটাই প্রয়োজনীয় যে কিছু গবেষক প্রাণীদেরকে তাদের অনুজীবীয় অংশের সমষ্টি হিসাবে ভাবাও দরকারি বলে মনে করেন। কিন্তু স্যান্ডার্স যখন পিঁপড়াগুলোর বাকি অংশ – তার সংগ্রহ করা বিভিন্ন কলোনি এবং প্রজাতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের দিকে ফিরে গেলেন, তখন তিনি অবাক হয়ে বলেন  ” অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া হিসেবে কোন কোষকে সহজেই শনাক্ত করতে আপনি কঠোর চাপে থাকবেন।’’ খাদ্য, ধ্বংসাবশেষ, পোকামাকড়ের অন্ত্রে আস্তরণের কোষগুলো – সবই উপস্থিত ছিল যেখানে মিথোজীবী অণুজীব বেশি ছিলোনা। 

    অণুজীব সম্প্রদায়ের পরিমাপ ও বিশ্লেষণের সরঞ্জামগুলোর উন্নতি হওয়ার সাথে সাথে এটি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে মাইক্রোবায়োম প্রাণীজগতের সর্বত্র সর্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ যা প্রায়শই চিত্রিত করা দরকার। জীবাণুদের সাথে অনেক প্রাণীর আরও নমনীয় বা কম স্থিতিশীল সংযোগ রয়েছে বলে মনে হয়। কেউ কেউ তাদের উপর নির্ভর করে বলে মনে হয় না।  উপহাসের বিষয় হচ্ছে, কীভাবে এবং কেন মাইক্রোবায়োমের বিকাশ ঘটে তার রহস্য সম্পর্কে, এর প্রকৃত গুরুত্ব এবং এর মূল অংশে থাকা সুবিধা ও অসুবিধাগুলোর সূক্ষ্ম ভারসাম্যহীন কাজ সম্পর্কে নতুন অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে এই প্রাণীগুলো এখন বিজ্ঞানীদেরকে সহায়তা করে।

    অণুজীব হারিয়ে গেছে

    বিশ শতকের গোড়ার দিকে, জীববিজ্ঞানীরা জটিল জীব এবং তাদের অণুজীবের মধ্যে আকর্ষণীয় সম্পর্ক উন্মোচন করতে শুরু করেছিলেন- টিউবওয়ার্ম যার মুখ, মলদ্বার বা অন্ত্র ছিল না; উইপোকা যা শক্ত, কাঠের গাছ খায়; গরু যাদের ঘাসযুক্ত খাদ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রোটিনের ঘাটতি রয়েছে। এই  পর্যবেক্ষণ গুলো কৌতূহল তৈরি করেছে এবং পরবর্তী পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে উৎসাহিত করেছে। সেই বছরগুলোতে, কোনও প্রাণীর মধ্যে মাইক্রোবিয়াল সহায়কের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে আশ্চর্যজনক বা আকর্ষণীয় মনে হয় নি এবং এটি প্রায়শই সাহিত্যে পাস করার সম্মতির চেয়ে কিছুটা বেশি পেয়েছিল। এমনকি তার চেয়েও বেশি কিছু বিবেচনা করা হয়েছিল – যেহেতু ১৯৭৮ সালের বিজ্ঞানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে উইপোকার মত নয় এমন ক্ষুদ্র কাঠ-খাওয়া ক্রাস্টেসিয়ানগুলোর অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়াগুলোর স্থিতিশীল জনপুঞ্জ ছিলো না।


    চিত্র ২- গরু, পাণ্ডা এবং পিঁপড়ার মধ্যে অনুজীবীয় সম্পর্ক 
    Source: academic.oup.com/femsle/article-abstract/366/10/fnz117/5499024

    এবং তাই এ ধারণা একটি নতুন নিয়মের দিকে যাচ্ছিলো যে প্রতিটি প্রাণীর এমন ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিল যা ছাড়া এটি বিনষ্ট হয়। কয়েকজন এই অতি সাধারণ ধারণাটির প্রতিবাদ করেছিল। ১৯৫৩ সালের প্রথম দিকে মিথোজীবীতা গবেষণার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পল বুকনার এই ধারণাটি নিয়ে হতাশার সাথে লিখেছিলেন যে বাধ্যতামূলক, স্থির ও কার্যকরী মিথোজীবী সর্বজনীন ছিলো।  তিনি বলেছিলেন, “বারবার লেখকরা জোর দিয়েছিলেন যে এন্ডোসিম্বায়োসিস হলো সমস্ত জীবের একটি প্রাথমিক নীতি”। তবে পাল্টা উদাহরণগুলো পোষক অণুজীবের মিথোজীবিতার গুরুত্ব নিয়ে, বিশেষত যেগুলো মানব স্বাস্থ্য এবং আমাদের নিজস্ব মাইক্রোবায়োমের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে তার উপর অধিক গবেষণায় জোর দিয়েছিলো।

    অ্যান্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুতন্ত্র এবং বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞান পোস্ট ডক্টরাল গবেষক টোবিন হ্যামার বলেছেন,”মানব মাইক্রোবায়োম কীভাবে জীবাণুগুলো কাজ করে তা আমাদের চিন্তাভাবনাকে পুরোপুরি চালিত করেছে। এবং আমরা মাঝেমাঝে আমাদের বাইরেও চিন্তা করে থাকি।” তবে শুয়োপোকা এবং প্রজাপতি থেকে শুরু করে সফ্লাই এবং চিংড়ি, কিছু পাখি এবং বাদুড় (এবং এমনকি কিছু পান্ডা) এসব বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে যা চলছে তার জন্য মানব উদাহরণ আদর্শ নয়। এই প্রাণীগুলোতে অণুজীবগুলো বিক্ষিপ্ত, আরও ক্ষণস্থায়ী বা ধারণা  করা যায় না এমন।  তারা প্রয়োজন ছাড়া তাদের পোষকের জন্য খুব বেশি অবদান রাখে না। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী এবং অনুজীবীয় বাস্তু বিশেষজ্ঞ সারা হির্ড বলেছেন,” বিষয়টি আরও জটিল।’’

    স্যান্ডার্স তার গ্রীষ্মমন্ডলীয় পিঁপড়ের সাথে ব্যাকটেরিয়ার একটি ক্ষণস্থায়ী এবং প্রায় অস্তিত্বহীন সম্পর্ক দেখেন। তিনি তার নমুনা গুলো পুনরায় তার গবেষণাগারে নিয়ে এসেছিলেন যেখানে তিনি পোকামাকড়ের ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স করেছিলেন এবং কতটি জীবাণু উপস্থিত ছিল তা নির্ধারণ করেছিলেন। স্যান্ডার্স যে কয়টি প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন তার মধ্যে ঘন, বিশেষায়িত মাইক্রোবায়োম যুক্ত পিঁপড়ের প্রায় ১০০০০ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া ছিল। স্যান্ডার্স বলেছেন, পিঁপড়াগুলোকে যদি মানুষের আকারে পরিমাপ করা হত তবে কেউ কেউ তাদের মধ্যে এক পাউন্ড জীবাণু নিয়ে যেত, অন্যরা কেবল কফি বিনের মতো সামান্য কিছু রাখতো। “এটি সত্যিই একটি গভীর পার্থক্য।”

    ২০১৭ সালে Integrative and Comparative Biology রিপোর্টে দেখা গেছে যে এই পার্থক্য খাদ্যের সাথে জড়িত বলে মনে হয়েছিলো। কঠোরভাবে নিরামিষভোজী গাছে বাসকারী পিঁপড়ার প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোবায়োম থাকার সম্ভাবনা ছিলো। সম্ভবত তাদের প্রোটিনের ঘাটতি যুক্ত খাদ্য গ্রহণের জন্য; মাটির নিচে বাসকারী সর্বভুক এবং মাংসাশী  পিঁপড়ে বেশি  সুষম খাবার গ্রহণ করে এবং তাদের অন্ত্রে নগণ্য পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া ছিল। তবুও, এই ব্যাপারটি বেমানান ছিল। কিছু গুল্মজাতীয় পিঁপড়ার মাইক্রোবায়োমেরও অভাব ছিলো এবং যে পিঁপড়েগুলোর  মাইক্রোবায়োম ছিলো সেগুলোর  নির্দিষ্ট প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া গুলোর সাথে বিস্তৃত, অনুমানযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয় না (যদিও কিছু  অনুজীব পৃথক জেনেরার পিঁঁপড়ার মধ্যে সাধারণ ছিল)। এই ফলাফল আমাদের মতো স্তন্যপায়ী মাইক্রোবায়োম থেকে একটি স্পষ্ট ভিন্নতা চিহ্নিত করেছে, যা তাদের পোষক গুলোর জন্য খুব নির্দিষ্ট।

    হিমশৈলীর চূড়ায়

    স্যান্ডার্স পেরুতে যখন পিঁপড়া পরীক্ষা করছিলেন সেই একই সময়ে, হ্যামার শুঁয়োপোকার মাইক্রোবায়োম সন্ধানে কোস্টা রিকায় ছিলেন (সান্ডার্স মন্তব্য করেছিলেন, “পোকামাকড় জগতের এই গরুগুলোর চেয়ে আর কোনটা উৎকৃষ্ট পাওয়া যেতে পারে যার ব্যাকটেরিয়ার সাথে অত্যাবশ্যকীয় সম্পর্ক আছে?” তবে হ্যামার যেমন চেষ্টা করেছিলেন, তার সংগ্রহ করা পেটের এবং মলদ্বারের নমুনায় খুব বেশি ব্যাকটেরিয়া ডিএনএ খুঁজে পাননি।  তিনি বলেছিলেন, “সত্যিই অদ্ভুত কিছু ঘটেছিল।”

    কয়েক মাস ল্যাবে কাজের পরে তিনি হতাশাজনক ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রাণীগুলোতে কেবল কোন স্থিতিশীল মাইক্রোবায়োম থাকে না! “এটি আমার জন্য চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনার একটি কারণ ছিল যা মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না।” তিনি এবং তার সহকর্মীরা শেষ পর্যন্ত দেখতে পেলেন যে, স্যান্ডার্সের অনেক পিঁপড়ার মতো, শুঁয়োপোকায় অনেক কম পরিমাণে জীবাণু ছিল যা আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মত না। হ্যামার বলেছিলেন, “তদুপরি সেই জীবাণু গুলো  কেবলমাত্র প্রাণীর গাছপালার ডায়েটের মধ্যে পাওয়া একটি উপসেট ছিল, যা এই ধারণাকে সমর্থন করে যে তারা ক্ষণস্থায়ী ভাবে থাকছে। মূলত তাদের মধ্যে কিছু হজম হচ্ছে, তারা অন্ত্রে স্থিতিশীল জনপুঞ্জ স্থাপন করছে না।”


    চিত্র ৩ – শুঁয়োপোকা Eumorpha satellitia. 
    Source: biotechniques.com/microbiology/animals-without-gut-microbiomes/

    এই ক্ষণস্থায়ী ব্যাকটেরিয়াগুলো শুঁয়োপোকার উপকার করেছে কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য, গবেষকরা এন্টিবায়োটিক দিয়ে তাদের দূর করেছিলেন। অন্যান্য পোকামাকড় এবং প্রাণীতে এই ধরনের চিকিৎসা পোষককে সরাসরি বিকাশ বা হত্যা করে। তবে এটি হ্যামারের শুঁয়োপোকায় কোনো প্রভাব ফেলেনি।

    ভারতের বেঙ্গালুরুতে ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিকাল সায়েন্সেসের ভারতের বাস্তুবিদ এবং বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানী দীপা আগাশে ও তার দল তাদের ক্যাম্পাসের সবুজাভ অংশের বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে সংগ্রহ করা পোকামাকড়ের মধ্যে একইরকম কিছু দেখতে পেল। ড্রাগনফ্লাই এবং প্রজাপতিগুলোতে তারা যে অণুজীবগুলো পেয়েছিল সেই গুলো কোনও বিশেষ পোকার প্রজাতি বা বিকাশের পর্যায়ে না গিয়ে পোকামাকড়ের  খাবারের সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। ড্রাগনফ্লাই এর ব্যাকটেরিয়া সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই সুযোগ পেয়ে একত্র হয়েছে বলে মনে হয়েছে। আগাশে বলেছিলেন, “পোকামাকড় গুলো নির্দিষ্ট প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া বা কোনও বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বেছে নিচ্ছে বলে মনে হয় না, বেশিরভাগ কেবল সেখানে নামে মাত্র   ছিল।”

    প্রজাপতির মাইক্রোবিয়াল জনপুঞ্জ ব্যাহত করে এমন বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা গুলো পোষকের বৃদ্ধি বা বিকাশের উপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। এমনকি তাদের অন্ত্রের সাথে ব্যাকটেরিয়াকে পুনঃপ্রবর্তন করতে পারেন নি । আগাশে বলেছিলেন, ” সত্যিই তারা তাদের জীবাণুগুলোর তত্ত্বাবধায়ন করে বলে মনে হয় না।” হ্যামার এবং স্যান্ডার্সের মতে যদিও প্রজাপতিগুলো খাবারের জন্য বিষাক্ত উদ্ভিদের উপর নির্ভর করে, পরিপূর্ণ, কার্যকরী মাইক্রোবায়োম কে তাদের খাবার বিষমুক্ত করতে উপযুক্ত মনে হয়। আগাশে বলেছিলেন, “প্রথম দিকে আমরা আমাদের মাথা চুল্কাচ্ছিলাম। এটি একটি আশ্চর্যজনক ফলাফল ছিলো এবং প্রকৃতপক্ষে এই বিষয় নিয়ে আমাদের মাথা খাটাতে কিছুটা সময় লেগেছিলো।”

    তবে এতে এত অবাক হওয়ার কিছু নেই যেহেতু বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যখন মাইক্রোবায়োম উপস্থিত থাকে তখন তারা প্রায় নির্দিষ্ট টিস্যুতে পাওয়া যায়। এতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া জড়িত যা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য গুলো কে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ববটেল স্কুইডের একটি মিথোজীবিতা রয়েছে যা এক প্রজাতির আলোকিত ব্যাকটেরিয়ায় সীমাবদ্ধ যেটা একক আলোক উৎপাদনকারী অঙ্গে বিভক্ত থাকে। যখন স্কুইডের অন্ত্র এবং ত্বক অণুজীব মুক্ত থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক মৌচাকের তাদের ব্যাকটেরিয়ার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে তবে লার্ভার থাকে না।

    সুতরাং এমন না ভাবার কোন কারণ নেই যে এমন প্রাণী থাকতে পারে যার এরকম সম্পর্ক নেই। আগাশে বলেছিলেন, “আমি মনে করি এই ধরনের সংযোগের পুরো বিস্তৃতি আপনি খুঁজে পেতে পারেন বর্তমানে এমন ক্রমবর্ধমান অনুধাবন রয়েছে। “

    হ্যামার সহমত হলেন, “আমরা কেবল হিমশৈলির শীর্ষে এক ঝলক পেয়েছি”। 

    তিনি বলেছিলেন, “এটি গরু এবং শুঁয়োপোকার মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, এখানে বিভিন্ন ধরণের জীবনধারা রয়েছে যা সত্যিই জটিল হয়ে উঠছে।” সম্ভবত ক্ষণস্থায়ী, স্বল্প-প্রাচুর্যের জীবাণুগুলো আরও উপদ্রব জনক কিছু করছে বা সম্ভবত তারা আরও স্থিতিশীল বিবর্তনমূলক সম্পর্ক গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপের প্রতিনিধিত্ব করে। হতে পারে তারা বেশিরভাগ সময় নিরপেক্ষ থাকে এবং কিছু নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কেবল কার্যকরী হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু গবেষক মনে করেন যে এই অনুজীব গুলো কেবল অন্ত্রে অবস্থান করে, জীবাণু গুলোকে অবরুদ্ধ করে কোন পোষককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। তদুপরি, ব্যাকটেরিয়া যেগুলো একটি বিষাক্ত উদ্ভিদ বা অন্যান্য বিপদের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে যা হয়তো সাময়িকভাবে অর্জিত, তারা কখনও কখনও নিয়মিত  মিথোজীবীতায় জড়িত না হয়েও সহায়ক হতে পারে।

    অ্যারলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবিয়াল বাস্তুবিদ এবং কীটপতঙ্গ বিদ  অ্যালিসন রাভেনস্ক্রাফ্ট বলেছেন, “এমনকি যদি কোনও ক্ষণস্থায়ী মাইক্রোবায়োম আপনার সাথে যুক্ত না হয়, আপনি যদি পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া ব্যাকটেরিয়া গিলে ফেলেন তাহলে সম্ভবত আপনি তাদের থেকে সুবিধা পেতে পারেন। এটি শুধুমাত্র পরিমাপ করা আরও কঠিন হবে।”

    তিনি এটাও বলেন, ” এমনকি মানুষের মধ্যেও মাইক্রোবায়োম (ক্ষণস্থায়ী জীবাণুগুলো সহ) ডায়েট বা আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।’’ স্থিতিশীল মাইক্রোবায়োমের উপর নির্ভর করে না এমন জীবনধারা নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীদের সেই পরিবর্তনের প্রভাব দূর করতে সহায়তা করতে পারে। এটি মাইক্রোবায়োম থাকার গুরুত্ব আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করে বিবর্তনে নতুন অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে পথ দেখায়। 

    বৈচিত্র্য থেকে যা শিখলাম

    আগাশে বলেছিলেন, “আপনি যদি এটি নিয়ে চিন্তা করেন তবে স্থায়ী মাইক্রোবায়োম না রাখার অনেক কারণ রয়েছে। আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এমন প্রাণী রয়েছে যা বিভিন্ন দিকে চলেছে। তবে মূল বিষয়টি হলো আমরা জানি না কেন – কোন কারণে মাইক্রোবায়োম গঠনে এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে সক্ষম করে এবং বিপরীতে, কী কারণে এই সম্পর্ক গুলো প্রতিরোধ করতে পারে।

    শুঁয়োপোকা, ড্রাগনফ্লাই, কিছু পিঁপড়া এবং অন্যান্য প্রাণী লিভ-ইন অণুজীবের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সহাবস্থান মূলক সম্পর্কের সম্ভাব্য অসুবিধাগুলো তদন্ত করার একটি উপায় বের করে। যে অসুবিধা পরিমাপ এবং পরীক্ষা করা কঠিন হতে থাকে। গবেষকরা সন্দেহ করেছেন যে এই প্রাণীগুলো সম্ভবত নির্দিষ্টভাবে মিথোজীবিতার সম্ভাব্য কিছু প্রতিকূলতা এড়িয়ে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ ব্যাকটেরিয়া তাদের পুষ্টির জন্য তাদের পোষকের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে বা প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। 

    কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে, এই ঝুঁকিগুলো সম্ভাব্য সুবিধা সমূহ ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদি তাদের নিজের বাঁচার জন্য দরকার এমন এনজাইম বা আচরণগুলো ইতিমধ্যে প্রকাশ হয়ে থাকে তবে তারা কোনও মাইক্রোবায়োম অর্জনের জন্য বাছাইকৃত চাপের মুখে পড়ে না। হ্যামার বলেন শুঁয়োপোকার ক্ষেত্রে এটি হতে পারে, যা প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিদ উপাদান খেয়ে তাদের নিরামিষভোজী জীবনযাপন সঞ্চার করে। তাত্ত্বিকভাবে একটি শুঁয়োপোকার মাইক্রোবায়োম বাড়তি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উৎপাদন করতে বা আরও বেশি পুষ্টি তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু কীটপতঙ্গ গুণগত মানের খাবার তৈরি করতে পারে। 

    অণুজীবের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে এমন আরেকটি কারণ শারীরবৃত্তীয় বলে মনে হচ্ছে (যদিও কারণ এবং প্রভাব এর মধ্যে অস্পষ্ট রেখাটি দেখে আগাশে এটিকে সঠিক ব্যাখ্যা মনে করেন না)। কতিপয় ব্যাকটেরিয়া বহনকারী বেশিরভাগ জীবের একটি ছোট, সাধারণ অন্ত্রের কাঠামো থাকে, মূলত এমন একটি নল যার মধ্য দিয়ে খাদ্য দ্রুত চলে যায় এবং প্রক্রিয়াজাত হয়। এটি অণুজীবকে দৃঢ়ভাবে থাকার এবং বাড়ার জন্য সময় বা স্থান দেয় না।

    বাস্তুগত বিষয়গুলোও বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন,”এটি আসলে বেশ অবিশ্বাস্যরূপে আশ্চর্যজনক যে কীভাবে মিথোজীবিতা হওয়া উচিত বা ঘটতে পারে।’’ বংশ পরম্পরায়, কোনও জীবকে প্রায়শই এমন অংশীদারিত্ব নিয়ে অন্য একটি প্রজাতির মোকাবিলা করতে হয় যা পরিবর্তনীয়ও অবস্থার মধ্যেও নিয়মিত এবং পারস্পরিক উপকারী। আগাশে অনুমান করেন যে তার প্রজাপতি এবং ড্রাগনফ্লাই গুলো ক্রমশ জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করে যা স্থান এবং ঋতুতে পরিবর্তন হয়।তাই তাদের স্থিতিশীল মাইক্রোবায়োম প্রতিষ্ঠার জন্য একই ব্যাকটেরিয়ার সাথে দেখা হয়  না।

    গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে মাইক্রোবায়োমের বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সম্ভবত কোনও একক নিয়ম বা নীতি নেই। স্যান্ডার্স বলেছিলেন,”বিবর্তনটি অবিশ্বাস্য, স্বকীয় এবং বিভিন্ন জীবের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে অগ্রসর হয়।”

    হির্ড আগাশের সাথে একমত হলেন। তিনি বলেছিলেন, “মাইক্রোবায়োম সম্পর্কে আমাদের বেশিরভাগ অনুমান স্তন্যপায়ী গবেষণার উপর নির্ভর করে, যেখানে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অদ্ভুত। আমাদের প্রতিদিনের ভিত্তিতে মাছ বা পাখি বা শুঁয়োপোকা জাতীয় কোন কিছুতেই স্থিতিশীলতা নেই।”

    এমনকি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেও মাইক্রোবায়াম কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে তার মধ্যে বৈচিত্র রয়েছে। যদিও বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রজাতি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার সাথে যুক্ত বলে মনে হয়, স্যান্ডার্স এবং তার সহকর্মীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে বাদুড় এমন হয় না। প্রকৃতপক্ষে তাদের মাইক্রোবায়োম আরও ক্ষণস্থায়ী এবং এলোমেলো।  স্তন্যপায়ী প্রাণীর চেয়ে পাখির মাইক্রোবায়োমের সাথে অনেক বেশি মিল ছিলো । গবেষকরা মনে করেন যে এই পার্থক্য বাদুড় এবং পাখি উভয়েরই উড়ে চলতে যথাসম্ভব হালকা হওয়ার প্রয়োজনের সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে। সম্ভবত তারা কোনও অতিরিক্ত ভার বহন করতে পারতো না।

    নির্বিশেষে, অনুসন্ধানগুলো ব্যাখ্যা করে যে প্রজাতির তুলনা করে শেখার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। ব্যাকটেরিয়ার সাথে তাদের সম্পর্ক কী হতে পারে তা নিয়ে অগ্রিম অনুমান করে অনেক কিছুই হারানোর সম্ভাবনা থাকতে পারে। এর মানে হচ্ছে কমপক্ষে মাছি, ইঁদুর এবং অন্যান্য মডেল জীবের গবেষণা মানুষে রুপান্তর করার সময় আরও সতর্কতার সাথে এগিয়ে যাওয়া। (ইতিমধ্যে, বুনো ইঁদুর বনাম ল্যাবে ব্রিড ইঁদুরের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে  উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে এবং প্রায়শই কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক ওষুধ কীভাবে  মানুষের মধ্যে কাজ করতে পারে তার আরও একটি সঠিক মডেল হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।)

    স্যান্ডার্স বলেছিলেন, “প্রতিটি বিদ্যমান জীবের পেছনে সাড়ে তিন বিলিয়ন বছরের বিবর্তনমূলক ইতিহাস রয়েছে, ১০ লক্ষ বা ৫০ লক্ষ বা আরও অধিক লক্ষ বছর আগের যা আমরা মডেল হিসেবে নিই এমন অনুজীবের সাথে মিলে না।’’ ফলমূলের মাছির অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের গুরুত্ব বা মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কিত মডেল নিয়ে অনুমান করার সময় অনুজীবের সাথে প্রাণিদের বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদীয়মান সচেতনতা সত্যিই আমাদের সতর্ক করে। কারণ ফলের মাছিগুলো মৌলিক সূচনালগ্ন থেকে মানুষের তুলনায় খুব ভিন্নচালিত হতে পারে। ইঁদুরের ক্ষেত্রেও তা একই ।

    তিনি আরও বলেছেন,“আমাদের চোখ এবং কান খোলা রাখা দরকার। প্রাকৃতিক ভিন্নতা এবং বৈচিত্র্য থেকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে।”

    যখন বিজ্ঞানীরা আমাদের নিজস্ব থেকে ব্যাপকভাবে পৃথক কিছুকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছেন তখন মাইক্রোবায়োম এর ক্ষেত্রে হ্যামার বলেছিলেন,”আমি মনে করি তাদের এখনো অদ্ভুতরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।” এতটাই যে স্যান্ডার্স এবং অন্যরা তাদের কিছু কাজ প্রকাশ করা চ্যালেঞ্জ জনক বলে মনে করেছে।

    যত দ্রুত এই মনোভাব পরিবর্তন হবে, ততই আমরা আরও শিখতে সক্ষম হব। হির্ড বলেছেন,”আমরা সবেমাত্র খুব অল্প জায়গায় শত শত প্রজাতি থাকার জটিলতা, একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করা, তাদের পরিবেশের সাথে কথা বলার এবং পোষকের সাথে আলাপচারিতা করার বিষয়টির  চারপাশে মাথা খাটানো শুরু করেছি, প্রতেক্যটা দৃশ্যকল্প সম্ভবত এখনও প্রমাণ করা বাকি।”

    তথ্যসুত্রঃ quantamagazine.org/why-is-the-microbiome-important-in-some-animals-but-not-others-20200414/

  • প্রথম বানর-মানুষ সংকর ভ্রুণ তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা

    প্রথম বানর-মানুষ সংকর ভ্রুণ তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা

    গ্রিক মিথোলজিতে কাইমেরা নামক এক দৈত্যের কথা উল্লেখ আছে যার শরীর ছিলো তিনটি প্রাণীর সমন্বয়ে গঠিত। মাথাটা ছিল সিংহের, শরীরের মধ্যাংশে ছিল ছাগলের মাথা ঠিক সিংহের মুখের বিপরীতে এর মুখ ঘোরানো  এবং লেজ হিসেবে ছিল একটি সাপ। ভয়ংকর এই দৈত্য ছিল টাইফন এবং একিডনা নামক দুই দৈত্যের সন্তান। আর সেরবেরাস এবং হাইড্রা ছিল এর ভাই বোন। গ্রিক পুরাণের সেই কাইমেরা নামটি এখন ব্যবহৃত হয় একাধিক প্রাণীর শরীর এর কোনো অংশ নিয়ে গঠিত কোনো প্রাণীকে বোঝাতে। সেটি হতে পারে একই দেহে দুই সেট ক্রোমোজোম যার এক সেট ক্রোমোজোম হবে অন্য কারো কিংবা সেই ব্যক্তি এখনো পৃথিবীতেই নেই। কাইমেরাজম আমাদের মানুষের মাঝেও দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় কোন মানুষের দেহে দুইটি আলাদা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে কিংবা একজনের শরীরে দুই সেট আালাদা ক্রোমোজোম। যার এক সেট হতে পারে তার কোনো ভাই-বোনের যার কিনা জন্মই হয় নি!

    বিজ্ঞানীরা এই প্রথম এমন এক কাইমেরা ভ্রুণ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন যা বানর আর মানুষের জনন কোষের সমন্বয়ে তৈরি। ১৫ই এপ্রিল সেল জার্নালে এমনই এক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। গবেষণাদলটি বানরের ভ্রূণ এ মানুষের স্টেম কোষ যুক্ত করেন এবং সেগুলোর বিকাশ লক্ষ্য করেন। তারা খেয়াল করেন মানুষ এবং বানরের কোষ গুলো বিভাজিত হচ্ছে এবং নিষেকের ১৯ দিন পর্যন্ত তিনটি ভ্রূণ টিকে থাকে। প্রতিটি ভ্রূণেই মানুষের কোষ ছিল এবং সেগুলোর বিকাশ ছিল ভিন্ন ভিন্ন রকমের। ক্যালিফোর্নিয়া লা জুলার সল্ক ইন্সটিটিউট এর জীববিজ্ঞানী জুয়ান কার্লোস ইজপিসুয়া বেলমন্টে এমনটা জানান।

    কেন এই ধরণের গবেষণাঃ

    জুয়ান কার্লোস ইজপিসুয়া বেলমন্টে

    গবেষকরা মনে করছেন এই রকম মানুষ এবং অন্য কোন প্রাণীর কাইমেরা কোন ঔষধ এর ট্রায়াল মডেল হিসেবে বেশ উপযুক্ত হবে। এ ছাড়া এইসব মডেল এ মানুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গ তৈরি করা যাবে যা অঙ্গ প্রতিস্থাপন এ ব্যবহৃত হতে পারে। গবেষক দলটি জানায় তারাই প্রথম ২০১৯ সালে মানুষ এবং বানরের ভ্রূণ তৈরি করতে সফল হয়েছিলেন যা কিনা নিষেকের পর প্রায় ২০ দিন টিকে ছিল। এছাড়া ২০১৭ সালে তারা মানুষ ও অন্যান্য প্রানির সংকর ভ্রূণ যেমনঃ মানুষ ও শুঁকর এর ভ্রূণ, মানুষ ও ইঁদুরের সংকর ভ্রূণ এবং মানুষ ও গরুর সংকর ভ্রূণ তৈরি করতে সমর্থ হরেছিলেন।

    বানর-মানুষ কাইমেরা ভ্রূণ এর ব্লাস্টোসাইট পর্যায়। ছবিসুত্রঃ নেচার ডট কম

    কিন্তু নতুন এই গবেষণা কাজটি জীববিজ্ঞানীদের বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখে বিভক্ত করেছে। প্রশ্নগুলো বাস্তবিক ভাবেই নীতিগত দিক থেকে। কারণ এখানে মানুষের সাথে ব্যবহৃত অন্য প্রাণীটি (বানর) শ্রেণীবিন্যাসগত দিক দিয়ে মানুষের খুব কাছের একটি প্রাইমেট সদস্য। ইঁদুর কিংবা বীবর এর মতো মডেল হিসেবে এদের ব্যবহার অতটা স্বাধীন নয়। এখানে নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। এইরকম ননহিউম্যান প্রাইমেট সদস্যদের নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা শক্ত রকমের নীতিগত প্রশ্নে বাঁধা। বার্সেলোনার পম্পেউ ফ্যাব্রা বিশ্ববিদ্যালয় এর জীববিজ্ঞানী আলফোনসো মার্টিনেজ আরিয়াস বলেন,

    “ শুঁকর, গরু কিংবা ইঁদুর এর মতো প্রানী নিয়ে এরকম গবেষণা গুলো নীতিগত প্রশ্ন গুলো তৈরি করে না যেমনটা প্রাইমেট সদস্যদের নিয়ে করলে হয়”।

    গবেষণার ব্যর্থতা সফলতাঃ

    ভ্রুনের বিকাশের সময় দুইটা আলাদা প্রজাতির জীবের কোষ সমূহ কীভাবে একে অপরের সাথে খাপ খাওয়ায় সেটা বোঝা ছিল গবেষকদের কাছে গুরত্বপূর্ণ একটা বিষয়। ইঁদুর এবং মানুষের সংকর ভ্রূণগুলো ছিল খুবই দুর্বল এবং ব্যবহার করার জন্যে অনুপযুক্ত। এই রকম সংকর ভ্রূণ গুলোকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা পোহাতে হয়। কারণ ইঁদুর আর মানুষ বিবর্তনীয় দিক থেকে অনেক দূরে। সুতরাং বলা যায় এদের কোষ গুলো পরস্পরের সাথে ভিন্ন উপায়ে খাপ খাওয়ায়। কিন্তু বানর এবং মানুষ উভয়ই প্রাইমেট বর্গের। এবং এরা বিবর্তনীয় দিক থেকে  পরস্পরের বেশ নিকট সদস্য। তাই এদের কোষ গুলো কীভাবে পরস্পরের সাথে মানিয়ে নেয় এটা অপেক্ষাকৃত বোঝা সহজ। সেই সাথে ভবিষ্যতে ইঁদুর-মানুষ এর ভ্রূণ মডেল গুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে দরকারি উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে।

    জাপানের একজন গবেষক ইঁদুরের ভ্রুনে মানুষের কোষ যুক্ত করেছিলেন। ছবিসুত্রঃ নেচার ডট কম

    গবেষকরা সাইনোমোলগাস ( ম্যাকাকা ফ্যাসিকোলারিস ) বানর থেকে নিষিক্ত ডিম্বানু সংগ্রহ করেন এবং একটি কালচার মিডিয়ামে আবাদ করেন। নিষেকের ৬ দিন পরে তারা এরকম ১৩২ টি ভ্রুনে মানুষের প্লুরিপুট্যানট কোষ যুক্ত করেন। ভ্রূণগুলো মানুষ এবং বানরের কোষ সহ বিকশিত হতে থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে ভ্রূণ এর সংখ্যা কমতে থাকে। নিষেকেরে ১১ দিন পর ৯১ টি ভ্রূণ টিকে ছিল। ১৭ দিনের মাথায় সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় ১২ তে এবং ১৯ দিন পর কেবল ৩ টি ভ্রূণ টিকে ছিল। হিউম্যান প্লুরিপুট্যানট কোষ বানরের ভ্রুনে টিকে থাকতে পারে

    সাইনোমোলগাস ( ম্যাকাকা ফ্যাসিকোলারিস ) বানর। ছবিসুত্রঃ নেচার ডট কম

    এবং বিকশিত হতে পারে এই গবেষণাটি তা প্রমাণ করে। তবে কোন কোষ গুলো কোন টিস্যু গঠন করেছে সেটা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয় গবেষকরা। কিন্তু ভ্রূণ মডেল গুলো ব্যবহার করার জন্যে এই বিষয়টা বোঝা জরুরি।

    ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত প্রাইমেট ভ্রূণের সাথে মানব কোষের সংমিশ্রণ ফলাফল সৃষ্ট সংকর জীবগুলির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিছু কিছু লোক এর মতে এভাবে নৈতিক দিক দিয়ে অস্পষ্ট স্বত্ত্বা তৈরি হবে।

    গবেষণার সীমাবদ্ধতাঃ

    ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর স্টেম সেল রিসার্চ (ISSCR) গবেষণাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে ভাবছে। তবে তারা বর্তমানে এই ধরণের কাইমেরা নিয়ে গবেষণায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জাপান বিভিন্ন সময়ে এই ধরণের কাইমেরা নিয়ে সীমাবদ্ধ গবেষণা করেছে। তবে জাপান ২০১৯ সালে মানুষ এবং অন্য প্রাণীর কাইমেরা তৈরির গবেষণার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছে এবং গবেষণা চালিয়ে যাবার জন্যে অর্থায়ন করেছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এ ঘরানার গবেষণার ক্ষেত্রে অর্থায়ন করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও ২০১৬ সালে তারা তা প্রত্যাহার করে। তবে ভ্রুণ গুলো গ্যাস্ট্রোলেশন ধাপ যখন স্নায়ুতন্ত্র গঠিত হওয়া শুরু হয় সে পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে যাবার একটা সীমারেখা টেনে দেয়। এর চার বছর পরেও তারা এ ধরনের গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে। তারা বলছে তারা  ISSCR এর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে।

    তথ্যসুত্রঃ নেচার ডট কম।                                                                                                                                                                                                                                                          

  • বিষ থেকে প্রাণরক্ষার ওষুধ

    বিষ থেকে প্রাণরক্ষার ওষুধ

    রোগব্যাধী ও মৃত্যু থেকে দূরে থাকার জন্য বর্তমানে  আমাদের আছে বৈচিত্র্যময় ও বিশাল পরিমাণ ঔষধের সরবরাহ। মজার ব্যাপার হলো জীবন রক্ষাকারী উল্লেখযোগ্য অনেক ঔষধ তৈরী করা হয়েছে প্রাণঘাতী বিভিন্ন বিষ থেকে।

    চিত্রঃ বোটুলিনাম বিষের ত্রিমাত্রিক গঠন। Source : en.wikipedia.org

    উপরের চিত্রটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদানের ত্রিমাত্রিক গঠন। এই বিষাক্ত যৌগটির মাত্র এক চা চামচ পরিমাণ, একটি দেশের সকল মানুষকে মারার জন্য যথেষ্ট। এক কেজি পরিমাণ এই বিষ সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষকে মারতে সক্ষম। এই বিষ এতটাই বিপদজনক যে সামরিক নিরাপত্তায় এটিকে উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি, এ বিষের প্রতি কেজির মূল্য ১০০ ট্রিলিয়ন ইউরো। যা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরী হওয়া সবচেয়ে দামী ও ব্যয়বহুল উপাদান।

    এই মারাত্মক বিষাক্ত উপাদানটি হলো বোটুলিনাম বিষ (Botulinum Toxin) , যা বোটক্স (Botox) নামেই অধিক পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সসেজ জাতীয় খাদ্যে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়য় বোটক্স আবিষ্কৃত হয়। ল্যাটিন ভাষায় সসেজ মানে হলো বোটুলাস (Botulus)। এখান থেকেই এই বিষের নামকরণ করা হয়েছে।

    কোন বিষের বিষাক্ততা মাপার জন্য আছে LD50 স্কেল। কোন বিষ প্রয়োগের পর বিষ দ্বারা আক্রান্ত মানুষের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ মারতে ঐ বিষের কি পরিমাণ প্রয়োজন তা এই স্কেল দিয়ে পরিমাপ করা হয়। এই স্কেলে বোটক্স এর মান হল ০.০০০০০১ মিলিগ্রাম/কেজি। অর্থাৎ একজন ৭০ কেজি ভরের মানুষকে মারতে আপনার মাত্র ০.০০০০৭ মিলিগ্রাম বোটক্স প্রয়োজন হবে।

    অন্যভাবে বললে আপনার জন্য প্রাণঘাতী এক ডোস বোটক্স-এর ওজন এক কিউবিক মিলিমিটার বায়ু থেকেও  কম।বোটুলিনাম বিষ শ্বসনক্রিয়া সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে আক্রান্তব্যক্তিকেমেরে ফেলে। বোটক্স হলো নিউরোটক্সিন (Neurotoxin) অর্থাৎ এটি স্নায়ু কোষে প্রবেশ করে এবং কোষ ও কোষের অভ্যন্তরের প্রোটিন ধ্বংস করতে শুরু করে।

    সাধারণত স্নায়ুকোষের অ্যাক্সন দ্বারা স্নায়ু অনুভূতি তড়িৎ সংকেত (Electric Impules) হিসেবে স্নায়ুসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছায়। সেখানে এটি এসিটাইলকোলিন নামক রাসায়নিক সংকেতে (Neurotransmitter) পরিবর্তিত হয়ে স্নায়ুসন্ধি অতিক্রম করে এবং পেশীকোষে যায়। পেশীকোষের যেয়ে এই রাসায়নিক সংকেত পুনরায় তড়িৎ সংকেতে পরিবর্তিত হয় যার ফলে পেশী কোষ সংকোচিত হয়।

    অ্যাক্সন নামক যে প্রান্ত দ্বারা একটি স্নায়ুকোষ, পেশীকোষের সাথে সন্ধি সৃষ্টি করে সেখান থেকে এসিটাইলকোলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে পরে। ফলে স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। রোগী পেশী সঞ্চালনে অক্ষম হয়ে পরে এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত্র হয়। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের মাধ্যমেই পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে সময় লাগতে পারে মাসের পর মাস।

    চিত্রঃ স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে বিদ্যমান স্নায়ুসন্ধি
    Source : aklectures.com

    বোটক্স এত বিষাক্ত হওয়ার পরেও এত জনপ্রিয় কিভাবে হলো? এই বিষের জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে মূল কারণ হলো বয়স বৃদ্ধির সাথে মানুষের চেহারায় ও ত্বকে যে ভাঁজ সৃষ্টি হয় তা এই বিষ দূর করতে সক্ষম। যেসকল স্নায়ুকোষ ত্বকে ভাঁজ সৃষ্টির জন্য দায়ী সেসকল স্নায়ুকোষ ধ্বংসের মাধ্যমেই বোটক্স ত্বকের ভাঁজ হওয়া বা কুঞ্চন রোধ করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বোটক্সের পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র, যা প্রায় এক গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ এবং এটি স্যালাইনের সাথে মিশ্রিত করে প্রদান করা হয়। বোটক্স ব্যবহারের ফলে ত্বক ঠিকই মসৃণ হয়, তবে স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত মুখে এক অদ্ভুতুরে অভিব্যক্তির সৃষ্টি করে।

    চিত্রঃত্বক মসৃণ করতে ব্যবহার হয় বোটক্স। Source : medicaldaily.com

    বোটুলিনাম বিষ শুধুমাত্র একটি সাধারণ সৌন্দর্য্যবর্ধক উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তা কিন্তু নয়। নানাবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানেও বোটক্স অত্যন্ত উপযোগী। এদের মধ্যে আছে তির্যকদৃষ্টি (Eye Squints), মাইগ্রেন, অত্যধিক ঘামরোগ, দুর্বল মূত্রথলী ইত্যাদি । বর্তমানে ২০ এর অধিক রোগ নিরাময়ের জন্য বোটক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

    বিষ দিয়ে চিকিৎসার এটি তো একটি মাত্র উদাহরণ। এরকম আরও অনেক আছে। ক্যাপটোপ্রিল (Captopril) হলো উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়ে ব্যবহৃত অতি মূল্যবান এক ঔষধ। এটি প্রস্তুত করা হয়েছিল সাপের বিষ থেকে। এক্সেনাটাইড (Exenatide), যার বাণিজ্যিক নাম বেয়েট্টা (Byetta) একটি কার্যকরী ও অত্যন্ত লাভজনক ঔষধ। এই ঔষধ টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোতে বাস করা গিরিগিটি, গিলা মনস্টার (Gila Monster) এর বিষাক্ত লালারস গবেষণা করে এই ঔষধটি আবিষ্কার করা হয়।

    চিত্রঃ গিলা মনস্টার (Gila Monster)। Source : aboutanimals.com

    বিষ যে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে তার ইতিহাস কিন্তু মোটেও মধুর নয়। রাণী ভিক্টোরিয়ার যুগ, ব্রিটেনে তখন জীবন বীমার পরিমাণ হুড়হুড় করে বেড়ে চলেছে। এই জীবন বীমার সহজলভ্য টাকার লোভে খুনের পরিমাণও তুমুল পরিমাণে বাড়তে থাকে। এদের অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছিল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে।

    তখনকার অনেক বেশি আলোচিত মামলার একটি ছিল মেরি এন কটন নামক মহিলার নামে। তিনি ১৮৭৩ সালে একাধিকবার খুনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি ৪ বার বিয়ে করেন এবং তার ৩ স্বামীই সমৃদ্ধ বীমার মালিক ছিলেন। তারা সকলে স্ত্রীর হাতে খুন হন। বেঁচে যাওয়া স্বামী বীমা উত্তোলনে অস্বীকৃতি জানালে তিনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেন।

    তার মোট ১০ সন্তান মারা যায় পরিপাক জটিলতার কারণে। মানবিকভাবে প্রতিটা মৃত্যু দুঃখজনক হলেও কটনের জন্য তা ছিল আরও বীমার টাকার হাতছানি। তার শাশুড়ি, ননদ, স্বামী সবাই এক এক করা মারা যায়। ১৮৭২ সালের মাঝে, এই মহিলা বিস্ময়করভাবে ১৬ জন নিকট আত্মীয়কে হারান। বাকি ছিল শুধুমাত্র একজন। তার ৭ বছর বয়সি ছেলে ,চার্লস। তিনি তার ছেলেকে স্থানীয় কারখানায় পাঠাতে চাইলেও কারখানার লোক রাখতে রাজি হন নি। এর কদিন পরেই অল্পবয়সী চার্লসও মৃত্যুর কুলে ঢলে পড়ে। কারখানার ম্যানেজার এর মনে এই ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করলে তিনি স্থানীয় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। নান ঘটনা শেষে পুলিশ সিদ্ধান্তে আসেন যে কটন, শিশু চার্লসকে বিষ প্রয়োগ করেছেন। তারা জানতে পারেন এ কাজটি করা হয়েছে আর্সেনিক প্রয়োগের মাধ্যমে।

    আর্সেনিক অক্সাইড সমূহ হল খনিজ । বিষ হিসেবে এসব খনিজ প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অক্সাইড স্বাদহীন, গরম পানিতে দ্রবণীয় এবং একটি মানুষ মারার এক আউন্স পরিমাণের ১০০ ভাগের ১ ভাগই যথেষ্ট। তবুও ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই আর্সেনিক খনিজ ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতে থাকে। ফলে সে সময় আর্সেনিক অক্সাইড ছিল সস্তা ও সহজলভ্য। শিশুরা খুশিমনে দোকান থেকে চা, চিনি, শুঁকনো খাবারের পাশাপাশি এটিও কিনতে পারত।

    চিত্রঃ আর্সেনিক অক্সাইডসমূহ স্বাদহীন,দ্রবণীয় এবং প্রাণঘাতী। Source : ozy.com

    অন্যদিকে, আদালতে মেরি এন কটনের বিচার নির্ভর করছিল পুলিশ তার সৎ ছেলে চার্লসের দেহে আর্সেনিকের আলামত খুঁজে পায় কিনা তার উপর। সে সময় ফরেন্সিক বিজ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও আর্সেনিকের উপস্থিতি নির্ণয়ের একটি ভালো পরিক্ষা তাদের জানা ছিল। মৃত শিশু চার্লসের পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে নেয়া নমুনা এসিড ও কপারের সাথে উত্তপ্ত করা হয়। কপার গাড় ধূসর রঙ ধারণ করলেই আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণ হবে।

    পুলিশ তদন্ত করে প্রমাণ করে যে, প্রাণঘাতী আর্সেনিকের ডোস প্রদানের মাধ্যমে শিশু চার্লসকে হত্যা করা হয়। কটনকে চার্লসের খুনের দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত  করা হয় এবং দুরহাম জেলে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। এরকম বহু বেপরোয়া খুন ও বিষ প্রয়োগের ঘটনাই আমাদের প্রথম ‘আর্সেনিক আইন’ ও এরপর‘ঔষধ আইন ১৮৬৮’ এর দিকে নিয়ে যায়। এই আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্ট এবং ঔষধ-বিক্রেতাই নানাবিধ বিষাক্ত উপাদান ও বিপদনক ঔষধ বিক্রি করতে পারবে।

    তাই বলা যায় যে, বিষক্রিয়া, দুর্ঘটনা, খুন এসবের মাধ্য দিয়েই বর্তমান ‘বৈধ’ আধুনিক ঔষধ শিল্পের অঙ্কুরোদগম ঘটে। জানলে অবাক হবেন এই আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডই ক্যান্সার প্রতিরোধে বৈধভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

    তথ্যসূত্রঃ bbc.com/news/magazine-24551945

    বিঃদ্রঃ লেখাটি জিরো টু ইনফিনিটি ম্যাগাজিনের মে-জুন ২০১৮ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে

  • একঘেয়ে বচন

    একঘেয়ে বচন

    রসিকেরা বলে থাকেন, আমাদের আদি-পিতা মাতাকে বেহেশত থেকে বের করে দেয়ার কারন আসলে একঘেয়েমী। অফুরন্ত সুখের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় যে অতল একঘেয়েমীর সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্ররোচনাতেই তারা নিষিদ্ধ ফলের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। ইসস!! ওনারা এটা না করলে আমরাও হয়তো… যাই হোক, আমরা যারা যারা এই মুহুর্তে একঘেয়েমীতে ভুগছি তারা তারা একটু নড়ে চড়ে বসি- কেননা এই লেখাটি আমাদের জীবন বদলে দিতে যাচ্ছে…না।

    একঘেয়েমী এক ধরনের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা যাকে আমরা কেউই চাইনা। অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কষ্ট পেতেও ভালোবাসে, কিন্তু একঘেয়েমীর প্রশ্নে পলায়নপর। আমরা আমজনতা নিজেদের সুখ, দুঃখ নিয়ে যতটা পেরেশান হই, এদের পেতে বা রেহাই পেতে যতটা সচেষ্ট একঘেয়েমী নিয়ে কি ততটা ভাবি? প্রশ্ন করতে পারেন, এটা নিয়ে ভাবার কি আছে? ভ্যান গগ তো বলেই গেছেন- একঘেয়েমীতে ভোগার চাইতে মরে যাওয়া ভালো, তাইনা? কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। তারা খুঁজে চলেছেন একঘেয়েমী আসলে কি? এটা ভালো না খারাপ? কোন ধরনের মানুষ অতি সহজে এতে আক্রান্ত হয়? আক্রান্ত হলে প্রতিকার কি? ইত্যাদি নানা কিছু। তাদের ভাবনা চিন্তা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে সেটা সম্পর্কেই চেষ্টা করবো একটু ধারনা নেয়ার।

    ভেবে দেখবেন তো, একঘেয়ে লাগার জন্য কারন থাকে, নাকি একঘেয়ে যাতে না লাগে সেজন্য কোন একটা কারন দরকার। আমরা সাধারনত কোথায় একঘেয়েমীতে ভুগি? কারো ক্লাসে একঘেয়ে লাগে, কারো লাগে মিটিং এ, ট্রাফিক জ্যামে পড়লে তো কমবেশি সবারই লাগে। আপনার আসেপাশের সবারই নানান কিছু একঘেয়ে লাগে। সবারই বলতে কিন্ত মানুষ ছাড়াও পরিবেশের অন্যান্য সদস্যদের কথাও বলেছি। হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল, কুকুর বেড়ালেও অন্যান্য বিভিন্ন অনুভূতির সাথে একঘেয়েমীর একটা প্রজাতীর সংস্করন আছে। প্রাণিজগতে এই ব্যাপারটার বিস্তার দেখে কিউরিয়াস মাইন্ডে প্রশ্ন জাগতেই পারে “টিকে থাকার লড়াইয়ে একঘেয়েমীর কোন অবদান আছে কি ?”

    শুনতে যেমনই লাগুক, বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একঘেয়েমী এক ধরনের প্রেরণার উৎস। হ্যা বলতে পারেন ঠিক সে ধরনের প্রেরণা নয় যার টানে আমরা কিছু একটা করে থাকি, বরং উল্টো এটা আমাদের ইচ্ছাকে ঠেলাঠেলি করে কাজ করার লেভেলে নিয়ে যায়। প্রাণি মনস্তত্ববিদ ফ্রাঙ্কোয়ে ওমেলস্ফেল্ডার বলেন “আমরা অনেক প্রমাণ পেয়েছি যদি একটি বন্য জন্তু অনেকটা সময় কিছু না করে কাটিয়ে দেয়, সে এর পরে ঠিকই করার জন্য কিছু একটা খুজে নেবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই টিকে থাকার একটা যোগসূত্র রয়েছে। হয়তো সে নিজের এলাকা প্রদক্ষিন করতে যাবে এবং দেখতে পাবে শিকারীর আক্রমনের সময় পালানোর জন্য অপরিহার্য রাস্তাটি কোন কারনে বন্ধ হয়ে রয়েছে, যা ঠিক করে ফেলার মাধ্যমে তার টিকে থাকার সম্ভাব্যতা সে বাড়িয়ে ফেললো।” এই দিকটাকে যদি উপকারী হিসেবে ধরেন তাহলে এটা ততক্ষনই কাজে আসবে যতক্ষন অন্বেষনের আগ্রহ থাকবে। ওমেলফেল্ডার আরো বলেন “সব প্রাণিরই প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার চাহিদা এবং প্রয়োজন আছে। তাই বন্দি অবস্থায় তারা একঘেয়ে অনুভব করে এবং উটভট আচরন করে থাকে। তারা হয়তো ঠিক ভাবতে পারেনা ‘উফফ এত বোরিং কেন?’ তবে তাদের অশান্ত পায়চারী, নিজের লোম উপড়ানো দেখে এটা বুঝা যায়”

    যদিও মানুষের একঘেয়েমী আরো জটিল তবে কিছু সামঞ্জস্যও রয়েছে। অন্যান্য প্রাণির সাথে মিল খুজতে গেলে দেখা যাবে আমরা মানুষেরা শারীরীক কিংবা মানসিক ভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়লে একঘেয়েমী নাড়া দিয়ে ওঠে। একটি গবেষনার উদাহরন দেয়া যায়, একদল লোককে পছন্দ করার সুযোগ ছাড়াই ঠিক করে দেয়া হয়েছিলো কোন একটি নিরস কাজে অংশগ্রহন করতে হবে আরেক দল পছন্দ করে সেই একই কাজে অংশগ্রহন করে। প্রথম দলের ক্ষেত্রে সময়কে দীর্ঘ এবং কাজটিকে বেশি একঘেয়ে মনে হয়েছিলো।

    আমরা সবাই জানি একঘেয়েমী কাকে বলে। সময় থমকে দাড়ায়, প্রয়োজনীয় কাজে মনযোগ দেয়া যায়না, যেসব কাজে আনন্দ পেতাম সবই একে একে ব্যার্থ হয়। তবে পরীক্ষাগারে গবেষনা করার জন্য সঠিকভাবে একঘেয়েমীকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এটা শুধু কাজে অরুচি আর বন্দিত্বের অনুভুতিই নয়, এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশা, উদাসীনতা, বিষন্নতার মত অনুভুতি। একঘেয়েমী কি শুধুই নিস্তেজ আর খাপছাড়া ভাব নাকি ক্রমাগত অস্থিরতাকেও একঘেয়েমীর কাতারে ফেলা যায় তা নিয়ে কোন সমাধানে এখনো পৌছানো যায়নি। জার্মানির কন্সতানয বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস গোয়েটস ধারনা করেন একঘেয়েমী আসলে এগুলোর সবই। মানুষের একঘেয়েমী নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে টমাস এবং তার দল ৫ ধরনের একঘেয়েমীর শ্রেণিবিভাগ করেছেন। দেখা গেছে একজন মানুষ কোন না কোন সময় যেকোন একঘেয়েমীর শিকার হতে পারেন, এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এক ধাঁচ থেকে অন্য ধাঁচে অনুপ্রবেশ করতে পারে কিন্তু প্রত্যেকেই যেকোন একটি ধাঁচে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধরনের একঘেয়েমী তার ব্যাক্তিত্বের অংশ হয়ে দাড়ায়।

    এই পাঁচটি ধাঁচের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল প্রতিক্রিয়াশীলতা। বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা ও নেতিবাচক অনুভুতির সাথে অস্থিরতা যুক্ত হয়ে একটি রাগান্বিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। গোয়েটসের মতে উদাসীনতা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এতে কেউ খুব মনমুগ্ধকর কোন কাজে জড়িত না থাকলেও, খুব একটা বিরক্তও থাকেনা। বরং একটি নির্ভার এবং শান্তির অনুভুতিতে ডুবে থাকে। তাঁর মতে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এই ধরনের একঘেয়েমী হতে পরে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। “মনের ভেতর একঘেয়েমী সহ অন্যান্য সব অনুভুতির আবাসের পেছনে উপযুক্ত কারন রয়েছে” এমনটাই মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের মনস্তত্ববিদ স্যান্ডি মান। তিনি বলেন আমরা সবাই একঘেয়েমী ভয় পাই তবে, ইতিবাচক একঘেয়েমী কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু উপকারীই নয়, এটা আমাদের সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। গত বছর এক এক্সপেরিমেন্টে দুই দল স্বেচ্ছাসেবককে বলেছিলেন প্লাস্টিকের ফেলনা কাপ দিয়ে মজার কিছু করে দেখাতে। এক দল সরাসরি কাজে নেমে গিয়েছিলো, অন্য দল ১৫ মিনিট ধরে টেলিফোন ইন্ডেক্সের নাম্বার কপি করেছিলো। আর ফলাফলে, পরের দলের বের করা আইডিয়া গুলো বেশি মজার ছিলো। অবশ্য তাদের সাথে আরেকটি দল ছিলো যারা শুধু টেলিফোন ইন্ডেক্স ১৫ মিনিট ধরে পড়ে কাজে নেমেছিলো। তাদের আইডিয়াগুলোও খারাপ ছিলোনা। স্যান্ডির এই এক্সপেরিমেন্টের উপসংহারে বলেন নিষ্ক্রিয় একঘেয়ে কাজ সৃষ্টিশীলতাকে উজ্জীবিত করতে পারে, কেননা সেই সময় মন নিজের মত চড়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়।

    তবে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জন ইস্টউড, স্যান্ডির তত্বের সাথে একমত নন। তার ভাস্যমতে আপনার মন যদি মুক্তই থাকলো তাহলে সেটা একঘেয়েমী নয়। “আমার মতে একঘেয়েমী নিরাসক্ত ও অনাহূত একটা মানসিক অবস্থা, তবে এই অবস্থার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারি” তিনি আরো যোগ করেন “ব্যাথার অনুভুতির সাথেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি- শারীরিক যন্ত্রনার অনুভুতি না থাকলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হতামনা। তার মানে কি আমাদের ব্যাথার জন্য খোজাখুজি করতে হবে? না” অন্য কথায় একঘেয়েমী যদি আমাদের টিকে থাকায় সাহায্য করেও থাকে, একে পুষে রাখাটা যুক্তিযুক্ত নয়। অনুভুতিগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কোন একটি পরিবেশে আমরা কি অবস্থায় আছি। একঘেয়েমী এটাই বলে যে আমরা আমাদের কাজের ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সাথে যুক্ত হবার আকাংক্ষাকে আটকে দিয়েছি। প্রশ্ন হল এই অবস্থায় আমরা কি করতে পারি? ইস্টউডের বিশেষ আগ্রহ হচ্ছে একঘেয়েমীকে সঠিকভাবে বুঝা এবং তার মডেল থেকে দেখা যায় একঘেয়েমী সহ্য করা কেন এমন কঠিন। তার মডেল অনুসারে একঘেয়েমীর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমাদের মনযোগকে যায়গামত রাখার ব্যার্থতা। সমস্যাটা অনুপ্রেরনার অভাব নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সময় শ্রোতের থেকে মনযোগ সরানোর মত কিছু খুজে না পাওয়ার কারনে তখন মনে হতে থাকে যেন খুব ধীরে চলছে, আবার জোড় করে উত্তোরনের চেষ্টা আরো খারাপ লাগার সৃষ্টি করে। মানুষ পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চেষ্টা করে, সেটা করতে না পারলে আসে হতাশা এবং বিরক্তি। এরপর তারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়, কিন্তু তাতেও ভালো না লাগায় তারা আবার সক্রিয় হতে চেষ্টা করেন। তার মানে নিষ্পৃহ আর অতিষ্পৃহ অবস্থার একটা দোলাচাল চলতে থাকে সমস্যাটি সমাধানের জন্য। ইস্টউড বলেন, চিন্তার বিষয় হচ্ছে বারবার মনযোগ প্রদানে ব্যার্থতা এমন অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে আমাদের আর কিছুই করতে ইচ্ছে করেনা, সবই অর্থহীন মনে হয়।

    জন ইস্টউড এখন খুজার চেষ্ট করছেন কেন এই মনযোগ প্রকৃয়া ব্যহত হয়। যদিও ধারনাটি এখনো শৈশবে, তবে তাদের মতে একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হবার প্রবনতা ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। যেসব মানুষ আনন্দ-উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত তারা খুব বাজেভাবে একঘেয়েমীতে ভোগেন। আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্তরাও এতে আক্রাত হন।

    মনযোগ দিতে অপারগতার কারন বের করা গেলে সেটা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে, কেন একঘেয়েমী এত খারাপ লাগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়েছিলেন, যেটার কাজ ছিলো দিনের যেকোন র‍্যান্ডম সময়ে ব্যাবহারকারীকে জিজ্ঞেস করা তিনি কাজ করছেন কিনা, এবং তিনি কতটা সুখী। এর থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেল যারা তাদের কাজে মনযোগ দিতে পারছেন না, তারাই বেশি অসুখী।

    কিছু কিছু সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যারা সহজেই একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয় তারা লেখাপড়া, ক্যারিয়ার তথা সামগ্রিক জীবনে খুব একটা উন্নতি করতে পারেন না। তাদের রাগ অন্যান্য আচরনগত সমস্যা থাকে। তারা মাদক, জুয়া – এধরনের ঝুকিপূর্ন কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরেকটি সমীক্ষায় এমনও দেখা গেছে যে একঘেয়েমী মৃত্যুর কারনও হতে পারে। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সরকারী কর্মজীবদের বলা হয়েছিলো তাদের একঘেয়েমীর মাত্রাকে নিজেরা রেটিং করতে। ২০০০ সালে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যারা বলেছিলেন তারা বেশি একঘেয়েমীতে ভোগেন তারা অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

    তবে একঘেয়েমী নিজে কাউকে মারেনা, একঘেয়েমী কাটাতে আমরা যেসব করতে যাই সেগুলোই আমাদের বিপদে ফেলে দেয়। তো বিপদে পড়ার আগেই একে প্রতিরোধ করতে আমরা কি করতে পারি? টমাস গোয়েটস এবং তার দলের থেকে একটি পরামর্শ পাই। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যারা কোন প্রয়োজনীয় কাজকে একঘেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েও তাতে লেগে থাকে, তাদের তুলনায় যারা এই পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে তাদেরই ভোগান্তি বেশি। তাই, যখন একঘেয়েমী ঘিরে ধরে তখন নিজেকে টিভি, ফাস্টফুড, কিংবা ফেসবুকে ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা খুব একটা ভালো বুদ্ধি না। আপনার যদি একঘেয়েমী থেকে গঠনমূলকভাবে উত্তোরনের ইচ্ছা বা উপায় ভেতর থেকে না আসে, তখনই শূন্যতা নিরসনের জন্য ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত হন। যাদের সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মত ধৈর্য রয়েছে, রয়েছে আত্নবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতা নতুনত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার, তারাই পারেন এর থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে।

    তথ্যসূত্রঃ

    ১। ‘Never dull a moment’ by Kristen Weir, Monitor on psychology.
    ২। ‘Why being bored is stimulating – and useful, too’ by Caroline Williams, New Scientist.

  • আগামীর চিকিৎসার অস্ত্র: স্টেম সেল

    আগামীর চিকিৎসার অস্ত্র: স্টেম সেল

    অনেক সময় সায়েন্স ফিকশনের মুভিগুলিতে দেখা যায়- কিছু মানুষেরা সুনির্দিষ্ট ক্ষমতার (স্পেশাল পাওয়ার) অধিকারী থাকে৷ বাচ্চাদের অতি প্রিয় Ben-10 কার্টুনের কথায় যদি ধরি সেখানে নায়ক বেনের হাতের ঘড়ির কারণে সে চাইলেই কোন অ্যালিয়েনে রূপান্তরিত হতে পারে৷ আবার, টিন টাইটানস কার্টুনে দেখা যায় বিস্ট বালক (Beast boy) চাইলেই যে কোন প্রাণীর আকার ধারণ করতে পারে। Marvel এর অতিপরিচিত X-men মুভির কথাতে যদি আসি সেখানেও অধিকাংশ চরিত্রের ক্ষেত্রে এরকমটা লক্ষ করা যায়। যেমন: রেবেন নামক মেয়ে চাইলেই যে কোন রুপ ধারণ করতে পারে আবার একই মুভির নায়ক লোগানের রয়েছে  আক্রান্ত হলে দ্রুত সেড়ে যাওয়া (healing power) ক্ষমতা। আবার, এ মুভিতে কাউকে আকাশে উড়বার ক্ষমতায়ও দেখা যায়৷ একইভাবে, Deadpool মুভির নায়কের অনেকগুলি ক্ষমতার মধ্যে একটি হলো কোন অঙ্গের বিনাশে নতুন করে সে অঙ্গ তৈরীর ক্ষমতা। অনেক মুভি কিংবা কমিক্সের কার্টুনেই এসব সুপার হিরো চরিত্র আমাদের কাছে অতিপরিচিত। বাস্তব জীবনও কিন্তু এসব অলীক স্বপ্ন কিংবা কল্পনার বাহিরে নয়৷ আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এরকমটা মনে হওয়া স্বাভাবিক৷ যেমন: কখনো মনে হতেই পারে – “ইশ! আমি যদি আকাশে উড়তে পারতাম” “আমি যদি চাইলেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতাম! ” কিংবা “আমি যদি অতীতে কিংবা ভবিষ্যতে যেতে পারতাম” ইত্যাদি ইত্যাদি। আর মানুষের এসব কল্পনার রূপটাই কিন্তু ফিকশান মুভিগুলিতে বাস্তব রূপে দেখা যায়।  

    বাস্তবে পুরোপুরি এরকমটা সম্ভব না হলেও এর কিছুটা আঁচ আমরা মানবদেহের “স্টেম সেল/ স্টেম-কোষ / মাতৃকোষ” নামক এক বিশেষ প্রকৃতির কোষের এর মধ্যে লক্ষ্য করতে পারি। অদূর ভবিষ্যতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যানে স্টেম-কোষের মাধ্যমে হয়ত মানবসভ্যতা কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে তা বলা দুরূহ৷ 

    স্টেম-কোষ কি? 

    এটি হলো বিশেষ ধরণের মানব কোষ, যা বিভিন্ন ধরণের কোষের বিকাশে সক্ষম। যার ব্যপ্তি পেশী কোষ থেকে মস্তিষ্কের কোষ পর্যন্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, তারা ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুগুলিও ঠিক করতে পারে। গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে, স্টেম-কোষ ভিত্তিক থেরাপি একদিন অসাড়তা (paralysis) এবং স্মৃতিশক্তি লোপ (Alzheimer) রোগের মতো গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

    স্টেম কোষ সম্পর্কে জানার পর থেকেই সাধারণ মানুষ এবং বিজ্ঞানী উভয়ের মাঝেই নানা আগ্রহ এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও স্টেম কোষগুলির মূল বৈশিষ্ট্য সবাই বোঝে না। তবে এভাবে বলা যায় যে, একের অধিক প্রকারের কোষ এই “স্টেম কোষ” বিভাগের মধ্যে পড়ে। এই স্টেম-কোষ আমাদের “সঞ্জীবনী বা পুনরুৎপাদনশীল” চিকিৎসা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয় বলেই একে নিয়ে জল্পনা-কল্পনারও নেই কোন শেষ। 

    স্টেম-কোষ সম্পর্কে বিস্ময়কর কিছু তথ্য:

    ‘রোগ এবং আঘাতের’ বিরুদ্ধে লড়াইকারী দেহের সবচেয়ে অলৌকিক-কোষ সম্পর্কে জানার আগ্রহ অনেকেরই রয়েছে৷ আমাদের শৈশবকালের কথায় যদি ধরি, খেলতে গিয়ে অনেক সময় কেটে যাওয়া কিংবা আঘাত লাগার মত ব্যাপার অহরহ ঘটতো৷ দুষ্টু বাচ্চার ক্ষেত্রে এর মাত্রা হয়ত আরো বেশি হবে৷ কিন্তু, এর কিছুদিন পরেই আশ্চর্যজনক ভাবেই দেহ নিজেকে পুনরুদ্ধার করে ফেলতো। যেমন: X-men মুভির নায়ক লোগানের সাথে সাথেই কাটা-ছেঁড়া ঠিক হয়ে যায়। তবে, আমাদের এত দ্রুত না হলেও ধীরে ধীরে অনেকটাই আগের মত হয়ে যায়। কিন্তু, কিভাবে এই সেড়ে যাওয়া প্রক্রিয়াটি ঘটতো তা কি কখনো মনে হয়েছে? এর পিছের দৃশ্যটা কিন্তু বেশ অদ্ভুত। সৌভাগ্যবশত, আমাদের দেহ মূলত স্টেম-কোষ গুলির সাহায্য নিয়েই এই ক্ষতগুলি সাড়াতে সক্ষমতা অর্জন করে থাকে৷ আর এই স্টেম-কোষগুলি আমাদের দেহে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। এই কোষের অদ্ভুত কিছু ব্যাপার জেনে নেয়া যাক

    ১. গবেষক এবং চিকিৎসকেরা আশা করছেন স্টেম-কোষ নিয়ে গবেষণার ফলে, ‘কিভাবে জীবিত জিনিসগুলি কাজ করে?‘ এবং ‘রোগের সময় বিভিন্ন ধরণের কোষে কী ঘটে?’ তার মূল বায়োলজি বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে। অর্থাৎ, কিভাবে দেহে রোগ তৈরী হয় তা বোঝা সহজ হবে। যেমন: হাড়, হৃদপেশী, স্নায়ু কিংবা অন্যান্য অঙ্গ এবং টিস্যুর কোষগুলিতে স্টেম-কোষের রূপান্তর হবার প্রক্রিয়াটি দেখেই কীভাবে রোগ এবং নানা অবস্থার সৃষ্টি হয় তা আরও ভালভাবে বুঝতে পারা যাবে। 

    ২. স্টেম-কোষগুলি সমদর্শী (নিরপেক্ষ) কোষ: এই কোষগুলি সমদর্শী।  যার অর্থ- তারা শরীরের প্রয়োজনে অন্য যে কোন ধরণের কোষে পরিণত হতে পারে। যা এ কোষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। একোষগুলি বিভিন্ন ধরণের পরিণত কোষে পরিবর্তিত বা রূপান্তরিত হয়ে থাকে৷ যেমন: তা হতে পারে হৃদপিণ্ডের পেশী কোষ কিংবা অগ্নাশয় কোষ যা ইনসুলিন তৈরী করে। টিন-টাইটানস কার্টুনের বিস্ট বালকের মত সুবিধামত যে কোন অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়া। জন্মের সময় দেহে প্রচুর পরিমাণে থাকলেও বয়সের সাথে সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। এই কোষগুলি অনেক দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি এবং রোগের ক্ষেত্রে শরীরের সুস্থতায় সহায়তা করে।

    ৩. স্টেম-কোষগুলি অনেক অনারোগ্যের উপশম করতে সক্ষম: পুনরুত্থিত ওষুধ হিসাবে অর্থাৎ রোগাক্রান্ত কোষের প্রতিস্থাপনে সুস্থ কোষের সৃষ্টিতে অবদান রাখে। স্টেম-কোষগুলির মানুষের কোন নির্দিষ্ট রোগাক্রান্ত কোষ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পুনরায় জন্মানো এবং মেরামতে ভূমিকা রয়েছে৷ 

    স্টেম-কোষ থেরাপির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত/ আঘাতপ্রাপ্ত- মেরুদণ্ড, ডায়াবেটিস (টাইপ-১), পার্কিনসন রোগ (স্নায়বিক জটিলতা), পেশীক্ষয়মূলক পার্শ্বিক কাঠিন্য রোগ (amyotrophic lateral sclerosis), আলঝেইমার রোগ (স্নায়বিক রোগ), হৃদরোগ, স্ট্রোক, পুড়ে যাওয়া, ক্যান্সার, অস্টিওআর্থ্রাইটিস (হাড়ের বাত) এবং রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস (সন্ধিবাত) ইত্যাদির চিকিৎসায় সুফল পাওয়া যায়৷ এছাড়াও, স্টেম-কোষগুলির অঙ্গ-প্রতিস্থাপন (transplant) এবং পুনরুৎপাদনশীল ওষুধ হিসাবে নতুন টিস্যুতে পরিণত হবার মতো সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে, এ বিষয়গুলিতে আরো গবেষণা প্রয়োজন৷ 

    ৪. সুরক্ষা এবং কার্যকারীতার জন্যে নতুন ওষুধ তৈরীর দ্বার সৃষ্টি: স্টেম-কোষ গবেষণার নতুন ক্ষেত্রটির মধ্যে রয়েছে, নতুন ওষুধ তৈরীতে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্টেম-কোষের কোনো সুনির্দিষ্ট টিস্যুর কোষে পরিণত হবার ক্ষমতা পরীক্ষার সুযোগ৷ যেমন: নতুন ওষুধের যাচাই হতে পারে স্নায়ুরোগের ক্ষেত্রে স্নায়ুকোষের তৈরী হচ্ছে কিনা তার পরীক্ষা৷ পাশাপাশি নতুন ওষুধ প্রয়োগে কোষীয় কি প্রভাব বিদ্যমান কিংবা কোষসমূহ ক্ষতিগ্রস্ততার সম্মুখীন হচ্ছে কিনা তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

    ৫. স্টেম-কোষগুলি ভ্রূণ ছাড়াও বিভিন্ন উৎস থেকে তৈরী হয়: এ কোষগুলি ভ্রূণ (এমব্রায়ো) ছাড়াও দেহের পেশী কোষ, নানা অঙ্গ, অস্থি মজ্জা এমনকি চর্বি থেকেও তৈরী হতে পারে৷ যার ফলে গবেষণার ক্ষেত্রে এর সহজলভ্যতা রয়েছে৷ যদি আমরা স্টেম-কোষের বিকাশ ভালোভাবে বুঝতে পারি তবে এই প্রক্রিয়াটির প্রতিলিপির মাধ্যমে নতুন কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গ তৈরি করতে পারবো৷ পাশাপাশি এসব অঙ্গ কিভাবে কাজ করে এবং ওষুধের দ্বারা প্রভাবিত হয় তা নির্ধারণেও সক্ষম হবো৷

     স্টেম-কোষের কিছু ধরণ 

    বেশিভাগ কোষই একটি সুনির্দিষ্ট কাজ করে থাকে৷ যেমন: লোহিত রক্ত কণিকা দেহে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পাশাপাশি বিভাজনক্ষম নয়৷ কিন্তু, স্টেম-কোষগুলির এমন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যার ফলে তারা বিভাজনের ফলে নতুন কোষ তৈরী করতে পারে। যা আমাদের দেহ গঠনে অবদান রাখে৷ তবে, সকল স্টেম-কোষ একই রকমের নয়৷ স্বতন্ত্র কাজের ভিত্তিতে স্টেম-কোষগুলির রয়েছে বিভিন্ন ভাগ–

       ক) ভ্রূণীয় (আদি) স্টেম-কোষ :– এ কোষগুলি মানুষের ভ্রূণ থেকে পাওয়া যায় যা ৩-৪ দিন বয়সের৷ এ স্টেম-কোষগুলি ভ্রণের জন্যে নতুন কোষ সরবরাহ করে এবং বাচ্চার বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করে৷ আবার, মাতৃগর্ভের পরিবর্তে পরীক্ষাগারে (ইন-ভিট্রো) একটি ভ্রূণের নিষেক চলাকালীন সময়ে একোষগুলি তৈরী করা যায়। এ কোষগুলিকে টটিপোটেন্ট/ প্লুরিপোটেন্ট (totipotent/ pluripotent) স্টেম-কোষও বলা হয়৷ যার অর্থ- তারা দেহের যে কোন কোষে পরিবর্তিত হতে পারে৷ অনেকটা X-men মুভির রেবেনের মতো যেকোন মানুষের রূপ ধারণ করার ক্ষমতার ন্যায় একোষগুলির যেকোন কোষে রূপান্তরিত হবার মতো ব্যাপার। আর, বিজ্ঞানীরা এ ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ সম্পর্কে আলোড়িত হবার কারণ হলো- মানব বিকাশের সময় এটি প্রকৃতিগতভাবেই  দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও কোষ তৈরী করে থাকে৷ উদাহরণস্বরূপ: রক্তের স্টেম-কোষ কেবল রক্ত ​​তৈরি করতে পারে, তবে একটি ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ রক্ত, হাড়, ত্বক, মস্তিষ্ক ইত্যাদি তৈরি করতে পারে। এমনকি রোগাক্রান্ত অঙ্গগুলি ঠিক করার বৃহত্তর প্রাকৃতিক ক্ষমতা তাদের রয়েছে। 

      খ)  অ-ভ্রূণীয় (প্রাপ্ত বয়স্ক) স্টেম-কোষ :– এ স্টেম-কোষের নামে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। কেননা, এ কোষগুলি সদ্য শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের মাঝেও পাওয়া যায়৷ এ প্রাপ্তবয়স্ক (adult) স্টেম-কোষগুলি দেহের পরিণত(/ উন্নত) অঙ্গ এবং কোষ থেকে আসে। আমাদের দেহ ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুগুলিকে মেরামত ও প্রতিস্থাপনে এধরণের স্টেম কোষগুলিকে ব্যবহার করে৷ তবে, এ স্টেম-কোষগুলিকে মাল্টিপোটেন্ট কোষ বলা যায়৷ যার অর্থ- তারা দেহের সুনির্দিষ্ট কিছু (সকল নয়) কোষে পরিবর্তিত হতে পারে। উৎপত্তি স্থলের উপর ভিত্তি করে এরমধ্যে কয়েক ধরণের স্টেম-কোষে রয়েছে: হিমাটোপয়েটিক স্টেম-কোষ, মেসেনকাইমাল স্টেম-কোষ, স্নায়বিক স্টেম-কোষ এবং ত্বকীয় স্টেম-কোষ। উদাহরণস্বরূপ: হিমাটোপয়েটিক (রক্তের) স্টেম-কোষসমূহ অস্থিমজ্জাতে পাওয়া যায়৷ যা লোহিত রক্ত কণিকা, শ্বেত রক্ত কণিকা এবং অন্যান্য রক্ত কোষ তৈরী করে থাকে৷ আবার, লিভারের থেকে প্রাপ্ত স্টেম-কোষগুলি শুধু লিভারের কোষ তৈরী করে, ত্বকের স্টেম-কোষগুলি দেহের ত্বক এবং চুলের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ধরণের কোষ তৈরী করে৷ অনেকটা Deadpool মুভির নায়কের যেভাবে হাত বা পা কেটে গেলে সেখান থেকে পুনরায় আবার নতুন একই অঙ্গের তৈরী হয়। কয়েক দশক ধরে, ডাক্তারেরা কিছু নির্দিষ্ট ক্যানসারের চিকিৎসায় হিমাটোপয়েটিক স্টেম-কোষের প্রতিস্থাপন করে আসছে যা অস্থি-মজ্জা প্রতিস্থাপন (bone marrow transplants) নামেও পরিচিত। 

     গ) প্রভাবিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষ (iPSCs): সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা, ল্যাবরেটরিতে প্রাপ্ত বয়স্ক কোন কোষকে প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষেগুলিতে পরিণত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এই নতুন ধরণের কোষগুলিকেই প্রভাবিত/ প্ররোচিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষ (induced pluripotent stem cells- iPSCs) বলা হয়। অর্থাৎ, ত্বক কিংবা রক্ত কণিকার মতো সাধারণ প্রাপ্ত বয়স্ক কোন কোষ নিয়ে সেগুলিকে ল্যাবরেটরিতে পুনরায় প্রোগ্রাম (জিনগত কার্যক্রমের পরিবর্তন) করে স্টেম-কোষে পরিণত করা হয়৷ এ কোষগুলি দেহের কোন অঙ্গ বা টিস্যুর জন্যে সুনির্দিষ্ট যে কোন কোষ তৈরী করতে পারে। যা ভ্রূণীয় স্টেম-কোষের অনুরূপ৷ অনেকটা মুভির মিউটেড চরিত্রগুলির ন্যায় এগুলি কৃত্রিমভাবে তৈরী করা হয়। কিছু জিনগত পরিবর্তনের (কিছু জিনকে চালু/ কিছু জিনকে বন্ধ) মাধ্যমে দেহের কোষকে সংকেত দেয়া হয় বিশেষিত কোষ হতে। আবার, এধরণের কোষ তৈরীতে বিজ্ঞানীরা কখনো সংকেতগুলি পুনরায় প্রবর্তন করেন যা সাধারণত স্টেম-কোষকে প্রাথমিক ভ্রূণের স্টেম-কোষ তৈরীতে প্রভাবিত করে। 

    এই যুগান্তকারী স্টেম-কোষের মাধ্যমে কীভাবে রোগের বিকাশ ঘটে তা বোঝার ইতিহাস সহজ হবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, কোনও রোগের চিকিৎসা করার জন্য কারও নিজের ত্বক থেকে এ স্টেম-কোষ তৈরি করা যেতে পারে। যা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ফলে রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থার ‘প্রত্যাখ্যান’ (rejecting) সমস্যা রোধ করতে সহায়তা করবে।

     ঘ)  তন্ত্রীয় (Cord) রক্তের স্টেম-কোষ এবং অ্যামনিয়োটিক তরলের স্টেম-কোষ : সন্তান প্রসবের পর নাভিরজ্জু (/নাড়ি/umbilical cord) থেকে তন্ত্রীয় রক্তের স্টেম-কোষগুলি সংগ্রহ করা যায়৷ ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সেগুলিকে কোষ ব্যাংকে হিমায়িত করা যায়। যা শিশুদের রক্তের ক্যান্সার, যেমন: লিউকেমিয়া এবং কিছু জিনগত রক্তজনিত রোগের  চিকিৎসার জন্য সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

    মাতৃগর্ভে বিকাশমান শিশুকে ঘিরে অ্যামনিয়োটিক তরলেও কিছু স্টেম-কোষ রয়েছে। তবে, এধরণের স্টেম-কোষের সম্ভাব্য ব্যবহারগুলি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। 

    স্টেম-কোষের কিছু অতীত ইতিহাস:

    উনবিংশ শতাব্দীতে, ভ্রূণের-বিকাশ নিয়ে কাজ করা গবেষকরা প্রথমে স্টেম-কোষের ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন। তারা জীবতত্ত্বিক (/ জৈবিক) প্রক্রিয়ার প্রারম্ভিক বিন্দু হিসাবেই এই জাতীয় কোষ আবিষ্কার করেন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে স্টেম-কোষগুলিকে বিভিন্ন ধরণের রক্তকণিকার উৎস হিসাবে দেখা যেতে শুরু করে। তবুও, এই সময়ের মধ্যে রক্তের স্টেম-কোষগুলি দৃষ্টিগোচর করা যায়নি, তাই অনেকে তাদের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্ঞানের পরিসীমা আরো বৃদ্ধি পায়, তখন অস্থিমজ্জার পুনরুদ্ধার ফ্যাক্টরের (দায়ী) শনাক্তের কারণ হিসাবে ধারণা করা হয় একোষগুলিই রক্ত ​​সিস্টেমকে পুনরুত্থানে সহায়তা করেছিলো। হিমাটোলজিস্ট (রক্ত সম্পর্কিত গবেষক) উইলিয়াম ব্লুম এবং লিওন জ্যাকবসন প্রবাহিত রক্তের উপর রেডিয়েশনের প্রভাব সম্পর্কে তাদের গবেষণার অংশ হিসাবে এটি আবিষ্কার করেছিলেন। যেটি ছিলো তাদের প্রথম পারমানবিক-বোমা তৈরির জন্য ম্যানহাটন প্রকল্পের একটি অংশ। এই পর্যবেক্ষণই রক্তের-ক্যান্সার (লিউকেমিয়া) চিকিৎসা  ‘বিএমটি’ (Bone Marrow Transplant) পদ্ধতি বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৯৬০-এর দশকেই বিএমটি পদ্ধতি অস্থিমজ্জার মধ্যে স্টেম-কোষের সনাক্তকরণ এবং বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার পথ দেখিয়েছিলো। ১৯৭৮ সালে মানুষের তন্ত্রীয় রক্তে (cord/ প্লাসেন্টার রক্ত) স্টেম-কোষের   উপস্থিতি আবিষ্কৃত হয়। এর তিন বছর পরে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ব্লাস্টোসিস্ট থেকে প্রথম ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ তৈরীতে সক্ষম হয়েছিলেন।

    এক নজরে স্টেম-কোষ গবেষণায়- সময়রেখার ইতিহাস

    উনিশ শতক থেকেই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা রোগ নিরাময়ের সন্ধানে স্টেম-কোষ নিয়ে গবেষণা করেছেন। যার ব্যাপ্তি ছিলো উদ্ভিদ থেকে শুরু করে ইঁদুর, মানুষ পর্যন্ত৷ 

    ১৮৬৮ :— “স্টেম-কোষ” শব্দটি বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে প্রকাশিত হয়, যখন জার্মান জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল শব্দটি ব্যবহার করে ‘নিষিক্ত ডিম’ সম্পর্কে বোঝাতে। যেটি জীব হয়ে যায় এবং সেই এককোষী জীবকেও বর্ণনা করে যা- ইতিহাসে সবার কাছে জীবনের সূচনার পূর্বপুরুষ কোষ হিসাবে পরিচিত।

    ১৯৫৭ :— সিয়াটলে কর্মরত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ই. ডোনাল থমাস প্রথম মানব অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। (পরে তিনি ১৯৯০ সালে এই কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার পান)

    ২রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৩ :— দুজন কানাডিয়ান বিজ্ঞানী ইঁদুরের অস্থিমজ্জা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় লক্ষ্য করেন বিভিন্ন রক্তকণিকা একটি বিশেষ শ্রেণীর কোষ থেকে আসে। যা রক্তের স্টেম-কোষের প্রথম প্রমাণগুলির মধ্যে একটি।

    ১৯৮১ :— দুজন বিজ্ঞানী পৃথকভাবে ইঁদুরের ভ্রূণ থেকে প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষ আলাদা করেন। যা ছিলো পৃথককৃত প্রথম ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ।

    ৫ ডিসেম্বর, ১৯৮৬ :— ওয়াশিংটনের সিয়াটেলের অ্যান্ড্রু লাসার এবং হ্যারল্ড ওয়েইনট্রাব একটি পরীক্ষায় একটি একক জিন (MyoD) ব্যবহার করে রডেন্ট ফাইব্রোব্লাস্টস (এক ধরণের সংযোজক টিস্যু) কে মায়োব্লাস্টে (যা পেশিকোষ তৈরী করে) রূপান্তরিত করে। যা সঞ্জীবনী-ওষুধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

    ৯ আগস্ট, ২০০১ :—  রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লু. বুশ সীমিত সংখ্যক বিদ্যমান মানব ভ্রূণের স্টেম-কোষ গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহারের অনুমোদন আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন৷ 

    ২৫ আগস্ট, ২০০৬ :— জাপানি বিজ্ঞানীরা ভ্রূণীয় স্টেম-কোষের অনুরূপ প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষ তৈরীর ঘোষণা দেন৷ যা কোষীয় থেরাপির জন্যে মূল্যবান তথ্যের যোগান দেয়৷ 

    ২০১০ :— ক্ষয়প্রাপ্ত মেরুদণ্ডের চিকিৎসায় সর্বপ্রথম মানুষের ভ্রূণীয় স্টেম-কোষের ক্লিনিকাল ট্রায়াল হয়েছিলো৷ 

    ১৪ জুলাই, ২০১১ :— মানুষের অন্ধত্ব চিকিৎসার জন্য প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ থেরাপি শুরু হয়েছিল।

    ২০১২ :— জন গুরডন এবং সিনিয়া ইয়ামানাকা প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষে তৈরী করা পদ্ধতি আবিষ্কার করায় দেহতত্ত্ব বা মেডিসিনে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

    ২০১৪ :— জাপানের বিজ্ঞানীরা ৭০ বছর বয়স্ক রোগীর বার্ধক্যজনিত দৃষ্টিশক্তি লোপ (ম্যাকুলার অবক্ষয়জনিত) রোগের চিকিৎসায় ত্বক থেকে চোখের স্টেম-কোষ প্রতিস্থাপনে সক্ষম হন৷ 

    ২০১৬ :— বিশ্বে প্রথম শ্বাসনালী প্রতিস্থাপন থেকে শুরু করে স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মত রোগের ক্ষতির পুনরুদ্ধারে স্টেম-কোষের সুফল পাওয়া যায়৷ 

    ৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ :— ইঁদুর এবং মানুষের ত্বকের কোষ নিয়ে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রতিরোধক কোষে হিসাবে পুনরায় প্রোগ্রাম করা হয়। 

    ৫ মার্চ, ২০১৯ :— স্টেম-কোষ থেরাপির মাধ্যমে দ্বিতীয় রোগী এইড’স রোগ থেকে মুক্তি পায়৷ 

    স্টেম-কোষ চিকিৎসায় উদ্ভুত কিছু সমস্যা:

    ১. সাম্প্রতিক, মানুষের ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ গ্রহণ করা ঘিরে রয়েছে বিতর্ক। ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ সংগ্রহের প্রক্রিয়ার সময় ভ্রূণটি নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে মনে করেন, ভ্রূণ একটি জীবিত মানুষ। তাদের মতে নিষিক্ত ডিম্বাণু গবেষণার জন্য ব্যবহার করা অনুচিত। তাদের যুক্তিতে, ভ্রূণেরও প্রত্যেকটি মানুষের মতোই অধিকার থাকা উচিত এবং যা রক্ষা করা উচিত। ফলে, এটি নিষিক্ত ভ্রূণের ধ্বংস তাদের নৈতিকতা বিদ্ধ করে। 

    অন্যদিকে, স্টেম-কোষ গবেষণার সমর্থকেরা বিশ্বাস করেন যে, ভ্রূণগুলি এখনও মানুষ নয়। তাদের মন্তব্য হলো গবেষকেরা দাতা দম্পতির কাছ থেকে সম্মতি নিয়েই ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর দ্বারা ভ্রূণ তৈরি করেন। তাছাড়া, ইন-ভিট্রো (ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা) নিষেকের সময় তৈরিকৃত নিষিক্ত ডিমগুলি যে কোন উপায়ে ফেলে দেওয়া হয়। তাই এগুলি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য আরও ভালভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

    তবে, প্রভাবিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষের (iPSC) আবিষ্কারে ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে৷ মজার ব্যাপার হলো, প্রভাবিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষকে ভ্রূনীয় স্টেম-কোষে রূপান্তরিত করা গেলে তাত্ত্বিকভাবে তা দাতার ক্লোন (clone) হয়ে যায়। কিন্তু, অনেক দেশেই ইতিমধ্যে এমন আইন রয়েছে যা কার্যকরভাবেই মানব ক্লোনিং নিষিদ্ধ করে।

    ২. ভ্রূণীয় স্টেম-কোষ ব্যবহারের পিছে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো, বর্তমানে প্রাপ্ত ভ্রূণীয় স্টেম-কোষগুলিকে আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা বহিরাগত হিসাবে ‘প্রত্যাখ্যান’ করতে পারে। তা ঠিক কাম্য নয়৷ 

    ৩. বিজ্ঞানীরা প্রাপ্তবয়স্ক প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষ ব্যবহার করার সময়ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। এই কোষগুলি ল্যাবে তৈরী করাও বেশ কঠিন৷ তাই গবেষকেরা এখনও প্রক্রিয়াটির উন্নতির উপায় সন্ধান করছেন। একোষগুলি শরীরে স্বল্প পরিমাণেও পাওয়া যায়। কিন্তু, তাতে DNA-গত সমস্যা থাকার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

    ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিকিৎসা: স্টেম-কোষ থেরাপি

    সমস্যাগুলি সমাধান করতে পারলে হয়ত স্টেম-কোষ থেরাপি হবে চিকিৎসাক্ষেত্রে দারুন একটি আস্থার জায়গা৷ কেননা, এর রয়েছে বহু সম্ভাবনাময়ী সফলতা।  

    ১)  রোগ, আঘাত এবং জিনগত কারণে কোষ, টিস্যু এমনকি অঙ্গ কখনো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ বা নষ্ট হয়ে  যেতে পারে। আর, স্টেম-কোষের মাধ্যমেই ‘নতুন-কোষ’ তৈরি করে দেহের ক্ষতিগ্রস্থ বা হারিয়ে যাওয়া অংশের প্রতিস্থাপন একটি সুন্দর উপায় হতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্ক স্টেম-কোষগুলি বর্তমানে কিছু চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ:

    ক) রক্তের স্টেম-কোষগুলি রক্তের কিছু রোগের চিকিৎসায়, যেমন: থ্যালাসেমিয়া, ফ্যানকনি অ্যানিমিয়া এবং রক্ত-ক্যান্সার রোগীদের (রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি বা অন্য কারণে যারা নিজেদের রক্তের স্টেম-কোষ হারিয়ে ফেলেছেন) চিকিৎসায় স্বাস্থ্যকর রক্তকণিকা তৈরীতে একটি উৎস হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    খ) ত্বকের স্টেম-কোষগুলি গুরুতর পুড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের নতুন ত্বক তৈরি করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

    গ) বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের প্রতিস্থাপনে কোন দাতার থেকে সুস্থ-অঙ্গ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু, তা  দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্বারা বহিরাগত হিসাবে ‘প্রত্যাখ্যাত’ হতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে রোগীর থেকে উৎপন্ন ‘প্রভাবিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষের’ (ips) মাধ্যমে নতুন অঙ্গগুলির বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা যেতে পারে যা প্রত্যাখ্যান হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। উদাহরণস্বরূপ: হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হৃদপেশিতে একোষগুলি প্রবেশ করা যেতে পারে৷ পাশাপাশি এটি দেশে ডোনার/ দাতা খুঁজে বের করার সমস্যারও সমাধান করবে।

     

    চিত্র: স্টেম কোষের মাধ্যমে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন।

    ২) বয়সের সাথে সম্পর্কিত ম্যাকুলার অবক্ষয় (দৃষ্টিশক্তিলোপ), এমন একটি রোগের উদাহরণ যেখানে স্টেম-কোষগুলিকে এই চিকিৎসার একটি নতুন রূপ হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে:

     বয়স বাড়ার সাথে চোখের অক্ষিপটের রঞ্জকময় আবরণের (রেটিনাল পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম/ RPE) কোষগুলি কাজ করা বন্ধ করায় দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়৷ বিজ্ঞানীরা ল্যাবে প্রভাবিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম-কোষের মাধ্যমে নতুন RPE কোষ তৈরীতে সক্ষম হয়েছেন যা চোখের ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলি প্রতিস্থাপনে ব্যবহার করা যেতে পারে৷ 

    চিত্র: স্টেম-কোষগুলি কীভাবে ম্যাকুলার অবক্ষয়জনিত (Age-related macular degeneration/ AMD) রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে (জিনোম গবেষণা লিমিটেড)৷

    ৩) কে না চাই নিজের বয়স কমাতে? কিংবা, যুবক বয়সটা ধরে রাখতে? কিন্তু, এর উপায় কি হতে পারে। সহজকথায়, স্টেম-কোষ থেরাপি হয়ত এর সুস্থ সমাধান। মূলত স্টেম-কোষগুলি বয়সে বাঁধাদানকারী (anti- aging) এমন কিছু জিনের (যেমন: Klotho) সাথে একত্রে একটি প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করতে পারে। যা হয়ত বার্ধক্যজনিত প্রক্রিয়ার প্রভাবগুলিকে বিলম্ব/ প্রতিরোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

    স্টেম-কোষের সম্পর্কে  ‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন’ -এর মেডিসিন এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং প্রথম লেখক জেফ্রি আর মিলম্যান বলেছিলেন:

    “তত্ত্ব অনুসারে, যদি আমরা কোন ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলিকে নতুন অগ্ন্যাশয় বিটা কোষগুলির সাথে প্রতিস্থাপন করতে পারি— যার প্রাথমিক কাজ রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইনসুলিন সংরক্ষণ এবং নিঃসরণ — তবে, টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের আর ইনসুলিন শট লাগবে না।”

    সত্যি বলতে, স্টেম-কোষ চিকিৎসার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত প্রতিশ্রুতি এবং সম্ভাবনা তৈরী করে৷ যেমন: চিকিৎসকেরা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনে রোগীদের মধ্যে স্টেম-কোষের ইনজেকশন দেয়, বিজ্ঞানীরা ফুসফুসের ক্যান্সার কীভাবে বিকশিত হয় তা একটি মাইক্রোস্কোপের নীচে খুঁটিয়ে তদন্ত করেন ইত্যাদি। তবে, স্টেম-কোষ চিকিৎসার নতুনত্বের এই পথ দীর্ঘ এবং প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ এবং এখনও অনেক উত্তর অজানা। তবুও অগ্রগতি চলছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা চমকপ্রদ৷ গবেষকরা এই অগ্রগতিগুলি নৈতিক ও নিরাপদে চিকিৎসাযোগ্যে আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

    তথ্যসূত্র: 

    ১. 5-astonishing-stem-cell-facts 

    ২. stem-cell-research 

    ৩. what-are-stem-cells/ipscell 

    ৪. What Are Stem Cells?

    ৫. bone-marrow-transplant/in-depth/stem-cells/ 

    ৬. what-is-a-stem-cell 

    ৭. stem-cells-repair-tissues-and-regenerate-cells 

    ৮. about-stem-cells-history 

    ৯. Stem cells and anti-aging genes: double-edged sword—do the same job of life extension