
Category: অনুবাদ
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23bababa%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-164.28586%2045.25186%20-75.06965%20-272.53864%20912.5%20724.2)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23424242%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-58.25003%20128.29689%20-249.634%20-113.34014%2073.8%201181.1)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23434343%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-90.9%20250.7%20251.2)%20scale(199.07107%20113.85161)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23434343%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(101.46196%2078.70197%20-103.68334%20133.66776%201760%203)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণী বিলুপ্ত!
আমি আর আমার এক বন্ধু গল্প করছিলাম কি যেন এক বিষয় নিয়ে। হঠাৎ বন্ধুটি বলল ‘মানুষ সবচেয়ে খারাপ জাতি। নিজের ক্ষতি নিজে আর কোন প্রাণী করে না’। মনে মনে ভাবলাম মানুষ সবচেয়ে খারাপ জাতি হতে পারে তবে সবচেয়ে যে ব্যাপারটি ভয়ঙ্কর তা হলো মানুষ সবচেয়ে ক্ষমতাধর জাতি। মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতা তাকে সবার উপরে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে সে যে শুধু নিজের ক্ষতি করে তা না সে পুরো পৃথিবীর ক্ষতি করতে সমর্থ। এজন্যেই হয়তো Friedrich Nietzsche বলে গিয়েছেন “Man is the cruelest animal.” এর প্রমাণ সম্প্রতি বিলুপ্ত হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণী Bramble Cay melomys। যা একধরণের ইঁদুর। অস্ট্রেলিয়ার সরকার এই প্রাণীটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। এটি মানবসৃষ্ট কারণে বিলুপ্ত হওয়া প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণী।
বিলুপ্ত হওয়া Bramble Cay melomys গ্রেট বেরিয়ায়র রিফের উত্তর প্রান্তের ছোট প্রবাল দ্বীপে Bramble Cay melomys বাস করতো। দ্বীপটির আয়তন ছিল ৫১০০০ মি। সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের কারণে দ্বীপটির ৯৭ ভাগ সবুজ অংশ তলিয়ে গেছে যা ছিল Bramble Cay এর প্রধান খাবার। দ্বীপটির বেশিরভাগ অংশ এখন সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছে। এখন সেখানে রাতদিন বড় বড় ঢেউ খেলা করে।তথ্যমতে সর্বশেষ এই প্রাণীটিকে দেখে এক জেলে সেই ২০০৯ সালে। তবে এই বিলুপ্ত হওয়াতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। একসময় এই ইঁদুরটি ছিল পর্যাপ্ত পরিমাণে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে এর পরিমাণ কমতে থাকলো আশঙ্কাজনকভাবে। তথ্যমতে ১৯৯৮ সালে এর সংখ্যা ছিল ৯৩। কয়েক দশক আগেও যা কি না ছিল কয়েকশ। ২০০২ ও ২০০৪ সালের শুমারিতে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ থেকে ১২টি।এখন মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে Bramble Cay এর বিলুপ্ত হওয়ার কারণ বলে ধরা হচ্ছে। কুইন্সল্যান্ডের পরিবেশ ও প্রত্নতাত্ত্বিক রক্ষা বিভাগও একই মত পোষণ করেছে।এত খারাপের মাঝে একটু আশার আলো হলো গবেষকরা বলছেন এই প্রাণী বা তার কাছাকাছি প্রজাতিদের অন্য কোন দ্বীপে পাওয়া যেতে পারে যেখানে এখনও কোন খোঁজ চালানো হয় নি। Bramble Cay এর বিলুপ্ত হওয়ায় এখন চোখ পড়ছে কিছু সামুদ্রিক পাখি ও সবুজ কাছিমের উপর যাদের আবাস্থল ওইখানেই। গবেষকরা বলছেন ভবিষ্যতে এই প্রাণীগুলোকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া উচিত।ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল প্রাকৃতিক কারণে। কিন্তু মানবসৃষ্ট কারণে কোন প্রাণী বিলুপ্ত হলে বুঝতে হবে কোথাও বড় ধরণের ঝামেলা হচ্ছে। মানুষ কেন এত অবিবেচক হবে যে সে তার আবাস্থলকেই ধ্বংস করবে! ভাবটা এমন যেন এই ক্ষতি তাকে স্পর্শ করবে না। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ! যদি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয় তবে মানবজাতির কপালে শনি আছে। পরে কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। এখনই সময় চোখ খুলে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার।# লেখাটি নিচের লেখার ভাবানুবাদঃ(http://blogs.scientificamerican.com/extinction-countdown/climate-change-first-mammal-extinction/)%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23616b24%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(81.73353%20-5.85873%204.72072%2065.85747%2079%20148.9)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23f3f2fc%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-3.6859%20-26.56283%20117.87062%20-16.3559%2090.8%2049.1)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%237e789e%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(25.61365%2021.0041%20-11.63778%2014.1918%2044.8%20111.7)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23adabbb%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(162.2%2037.9%2013.1)%20scale(82.77315%2024.72155)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
প্লাস্টিকখোর মাছ আর তার করুণ কাহিনী!
এক দেশে এক মাছ ছিলো। সে মনের আনন্দে পানির গভীরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াত। আর খিদে পেলে খেতো শ্যাওলা আর ছোট ছোট প্ল্যাঙ্কটন। একদিন হঠাৎ সে একটা প্লাস্টিক কণা দেখলো। লোভ সামলাতে না পেরে সে ওটা খেলো। আর রীতি ভঙ্গের জন্যে সে হলো অভিশপ্ত! এটা কোন রূপকথার চমৎকার গল্প হতে পারতো। কিন্তু এটা এখন বাস্তব অবস্থা!
প্লাস্টিক দূষণ এখন মানব সভ্যতার অন্যতম হুমকির একটি। Uppsala University বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন যেসব বাচ্চা মাছ মাইক্রোপ্লাস্টিক খায় তারা অন্য মাছের শিকারে বেশি পরিণত হয়। তার মানে যারা প্লাস্টিক খাচ্ছে তাদের কিছু একটা হচ্ছে যার ফলে তারা অন্য মাছের শিকারে পরিণত হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। গবেষকরা আরো বলছেন মাছগুলো তাদের সচারাচর খাবারের চেয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি পছন্দ করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক হচ্ছে প্লাস্টিকের কণা যারা ১ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট।দেখা যাচ্ছে বাল্টিক সমুদ্রে ইউরোপিয়ান পার্চ মাছ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, ব্যাপারটা ঘটছে মাছের লার্ভা থাকা অবস্থায়। যেহেতু বাল্টিক সমুদ্রে প্লাস্টিকের দূষণ সবচেয়ে বেশি হয় তাই গবেষকরা ধারণা করছেন পার্চ মাছ কমার পেছনে প্লাস্টিকের হাত আছে! গবেষকরা পার্চ মাছের উপর প্লাস্টিকের প্রভাব দেখার জন্য বাল্টিক সমুদ্র থেকে পার্চের উর্বর ডিম নিলেন। তারপর তা একই পরিবেশে মানে পলিসটারিন সমৃদ্ধ একুইরিয়ামে রাখলেন। আর কিছু ডিমকে প্লাস্টিকবিহীন একুরিয়ামে রাখলেন। দেখা গেলো যে একুইরিয়ামে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল তার লার্ভা মাছগুলো হলো ছোট। তারা সাতার কেটে বেশি দূর যেতে পারে না এবং বেশিরভাগ সময় নির্জীবভাবে পরে থাকে। পার্চ মাছ সাধারণত ঘ্রাণ শক্তির মাধ্যমে এরা শিকারির উপস্থিতি টের পায়। কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিক তাদের ঘ্রাণ শক্তিও নষ্ট করে দেয়। ফলে যেসব মাছ প্লাস্টিকসমৃদ্ধ পরিবেশে থাকে তারা শিকারির আক্রমণে মারা যায়। দেখা গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত পানিতে যদি পাইক মাছ পার্চ মাছকে আক্রমণ করে তবে ১৬ ঘণ্টার মধ্যে সব মাছ মারা যায়। কিন্তু যদি প্লাস্টিকমুক্ত পানিতে আক্রমণ করে তবে ২৪ ঘণ্টা পরে দেখা যায় মোট সংখ্যার অর্ধেক তখনও জীবিত।
বাল্টিক সমুদ্রে যে শুধু পার্চ মাছের সংখ্যা কমছে তা না। পাইক মাছের সংখ্যাও কমছে। ধারণা করা হচ্ছে পার্চের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাইকে জমা হয়ে পাইক মাছের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।এখন একটা প্রশ্ন মাথায় আসে নিজেদের খাবার ফেলে কেন পার্চ মাছরা প্লাস্টিক খাচ্ছে। Lönnstedt বলছেন, ব্যাপারটা অনেক ছোটদের ফাস্ট ফুড খাওয়ার মত! এটা হয়তো তাদের খাবার সম্পর্কিত কেমিক্যাল রেসপন্সকে উদীপ্ত করে। Lönnstedt আরও অনেক প্রজাতিতে এই পরীক্ষা চালাচ্ছেন এবং damselfish ও একই ধরণের আচরণ লক্ষ্য করেছেন।লেখাটি নিচের লেখার ভাবানুবাদ!%22%20transform%3D%22translate(1%201)%20scale(1.89844)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%2376713d%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(59.36108%203.5267%20-7.70246%20129.64708%2016.5%20138.3)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ffffd9%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(76.7355%20-20.7609%2066.59632%20246.15022%20197.6%2076.7)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23acb36a%22%20cx%3D%2265%22%20cy%3D%22108%22%20rx%3D%2252%22%20ry%3D%2252%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ffffce%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-128.4911%20-57.60045%2021.18392%20-47.25563%20196.2%2030)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
বাস্তবতা কী?
জগতে যার অস্তিত্ব আছে তাই বাস্তব, জগতে যা বাস্তব তা-ই হলো বাস্তবতা। কথাটা কেমন যেন একটু সোজাসাপ্টা শোনাচ্ছে। আসলে বাস্তবতা শব্দটি এতটা সোজাসাপ্টা নয়। এই বিষয়টাকে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমে ডায়নোসরদের কথা বিবেচনা করি, অনেক অনেক আগে এদের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর নেই। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এরা কি বাস্তব? আকাশের তারাদের কথা বিবেচনা করি, আজকের দিনে আমরা কোনো একটা তারাকে যে রূপে দেখছি এটি সত্যিকার অর্থে সেই রূপে নেই। তারার বুক থেকে আলোক রশ্মি মুক্তি পেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে তারপর আমাদের চোখে এসে লাগে। ভ্রমণপথের এই সময়ের মাঝে তারার পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। হয়তোবা তারাটি বিস্ফোরিত হয়ে মরেও গেছে এতদিনে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশের তারারা কি বাস্তব?
এগুলো নাহয় অতীতের জিনিস, এদের বাস্তবতা কিছুটা ঘোলাটে। বর্তমানের কোনো কিছুর বাস্তবতা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব থাকতে হবে। তার অস্তিত্ব আছে এটা কীভাবে নির্ধারণ করি? আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারি কোনো জিনিসের অস্তিত্ব আছে নাকি নেই। পঞ্চ ইন্দ্রিয় হচ্ছে মানুষের প্রধান পাঁচটি অনুভূতি- দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, শ্রবণ শক্তি, স্পর্শের অনুভূতি ও স্বাদ গ্রহণের অনুভূতি। এগুলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই নোনতা লবণ ও মিষ্টি চিনি, শক্ত পাথর ও নরম কাদা, শুকনো কাঠ ও কচি ঘাস, ক্যাটকেটে হলুদ কাপড় ও নীল আকাশের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারি।
কিন্তু ‘অস্তিত্ব’ বা ‘বাস্তবতা’র সংজ্ঞা জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট? যাদেরকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শনাক্ত করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকেই বাস্তব বলব? অন্য সবকিছু কি তালিকা থেকে বাদ?
ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করি। খুব দূরের কোনো গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এতোই দূরের যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার কথা, এদেরকেও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। তাহলে কি বলতে পারবো যেহেতু তাদের দেখা যায় না সেহেতু তারা অবাস্তব? না, এমনটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে বিস্তৃত করতে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে পারি। যেমন দূরের গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে পারি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে পারি।
আমরা যেহেতু টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জানি তাই তারা যে জিনিসকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিবে সে জিনিসকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি। এই ক্ষেত্রে দুটি যন্ত্রের উভয়ই আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করে। অন্যদিকে আমাদের চোখও আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেই দেখার কাজ সম্পন্ন করে। তাই টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ যদি দূরের কোনো গ্যালাক্সি কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় তাহলে গ্যালাক্সি বা ব্যাকটেরিয়াকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।
রেডিও তরঙ্গের কথা বিবেচনা করি, চোখের মাধ্যমে তাদের দেখতে পাই না, কানের মাধ্যমে শুনতে পারি না। তারা কি বাস্তব? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? হয়তো আমরা দেখতে বা শুনতে পাই না, কিন্তু বিশেষ কোনো যন্ত্র যেমন টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সিগনাল প্রেরিত হয়, যা পরবর্তীতে টেলিভিশনের এন্টেনায় ধরা পড়ে, টেলিভিশন সেই সিগনালকে রূপান্তরিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে, যা আমরা দেখতে পাই ও শুনতে পারি। এই হিসেবে যদিও আমরা রেডিও তরঙ্গ শুনতে কিংবা দেখতে পাই না, তারপরেও আমরা ধরে নিতে পারি এই তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে। এটি বাস্তব।
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23fff%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(21.7605%20119.69488%20-198.38482%2036.06631%2089.5%2036.8)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%23fff%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M614%20206.5L497.1%20527.3l-135-49.2%20116.7-320.7z%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23575148%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(168.06506%20-313.44001%20107.04933%2057.39935%20260.8%20309.8)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ea8f40%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-102.78062%20268.55361%20-119.48724%20-45.73006%2064%20380.5)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
অদৃশ্য বস্তুর বাস্তবতা অনুধাবনের চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে মোবাইল ফোন। নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট চালানো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন টাওয়ার হতে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়। এই তরঙ্গও আমরা দেখতে কিংবা শুনতে পাই না কিন্তু মোবাইল, মডেম ও রাউটারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার করে নানা কাজ করছি। যেহেতু মোবাইলের কার্যপ্রণালী জানি এবং মোবাইল তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছে তাই তাদেরকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।
ডায়নোসরের কাছে ফিরে যাই। আজকের যুগে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি কখনো শুনিনি, তাদের ভয়ে কখনো দৌরে পালাতে হয়নি। তাহলে কীভাবে জানতে পারলাম তারা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছিল? টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু যদি থাকতো তাহলে মেশিনে চরে অতীতে গিয়ে দেখতে পারতাম আসলেই তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু নেই।
এই দিক থেকে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে অসমর্থ হলেও অন্য আরেক দিক থেকে কিন্তু ঠিকই তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমাদের কাছে আছে ফসিল রেকর্ড, এবং এসব ফসিল আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। ফসিল কীভাবে গঠিত হয় এবং ফসিলের স্বভাব চরিত্র ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমরা জানি। এদের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন সময়ে কী হয়েছিল তা অনুধাবন করতে পারি। এমনকি কোটি কোটি বছর আগে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারি।
আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যদিও সরাসরি এদের দেখতে পাই না কিন্তু অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এটা অনুধাবন করতে পারি যে ডায়নোসরদের অস্তিত্ব ছিল। তাদের রেখে যাওয়া দেহের ছাপ দেখতে পাই, এমনকি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখতে পারি। কোনো কিছুকে বাস্তব হতে হলে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনুপস্থিত থেকেও সে তার বাস্তবতার জানান দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই তার বাস্তবতার পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। সরাসরি হোক কিংবা প্রায়োগিকভাবে হোক, কোনো একভাবে ইন্দ্রিয়ে অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হতে হবে।
আমাদের কাছে টাইম মেশিন না থাকলেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিস্কোপকে টাইম মেশিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। আমরা যা দেখি তা মূলত বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি, আর আলোক রশ্মি বস্তু থেকে আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগে। এমনকি কেউ যদি তার পাশাপাশি বসে থাকা বন্ধুর চেহারার দিকে তাকায়, ঐ চেহারা থেকেও আলো আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগবে। যত ক্ষুদ্রই হোক সময় ঠিকই লাগবে। এই দিক থেকে আমরা যা দেখছি তা আসলে অতীত। প্রতিনিয়ত অতীতের জিনিস দেখে চলছি।
মূলত সব তরঙ্গেরই ভ্রমণ পথে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। যেমন শব্দ তরঙ্গ। শব্দ তরঙ্গের বেগ আলোক তরঙ্গের বেগের চেয়ে অনেক কম। কোথাও বজ্রপাত হলে আমরা প্রথমে আলোর ঝিলিক দেখতে পাই, পরে জোরে ঠাট ঠাট শব্দ শুনতে পাই। মূলত আলোর ঝিলিক ও শব্দ একই সময়ে উৎপন্ন হয়। শব্দের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম বলে আমাদের কানে এসে পৌঁছুতে দেরি লাগে। এই হিসেবে আমরা অধিকতর অতীতের শব্দ শুনছি। পৃথিবীর মাঝে কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই আমরা তা দেখতে পাই। আলো আসতে খুব একটা সময় লাগে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে না।
%22%20transform%3D%22translate(2.4%202.4)%20scale(4.84375)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%235f51aa%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(23.9%206.6%20315.6)%20scale(93.23272%2076.32732)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%23161b00%22%20d%3D%22M271%20154L-10%2073%201%20175z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%23121700%22%20d%3D%22M139%20131l132%2044V85z%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23756aaf%22%20cx%3D%22115%22%20cy%3D%2221%22%20rx%3D%2241%22%20ry%3D%2241%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
চিত্রঃ বজ্রপাত। আগে আলোর ঝিলিক দেখা যায়, পরে শব্দ শোনা যায়।
আমাদের আশেপাশের কোনো বস্তু থেকে আলো আসতে যদিও সময় অল্প লাগে কিন্তু আকাশের নক্ষত্র (তারা) ও গ্যালাক্সির বেলায় কিন্তু অনেক সময় লাগে। কারণ নক্ষত্রেরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এমনকি আমাদের নিজেদের নক্ষত্র সূর্য থেকেও আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এই মুহূর্তে সূর্য যদি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ৮ মিনিটের আগে তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে না।
সূর্যের পর পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টারি (Proxima Centauri)। এটি থেকে আলো আসতে ৪ বছর লেগে যায়। আজকে ঐ নক্ষত্রকে আমরা যে অবস্থায় দেখছি তা আসলে চার বছরের আগের অবস্থা। ২০১৬ সালে যা দেখছি তা ঘটে গিয়েছে ২০১২ সালেই।
নক্ষত্রের পর আসে গ্যালাক্সি, অনেক অনেক নক্ষত্রের সমাবেশে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। আমাদের সূর্য মানে আমরাও একটি গ্যালাক্সির অংশ। আমাদের গ্যালাক্সিটির নাম মিল্কি ওয়ে (Milky Way)। বাংলায় একে ‘আকাশগঙ্গা’ বলেও ডাকা হয়ে থাকে। মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আড়াই মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাক্সির পরে আসে ক্লাস্টার (Cluster)। ক্লাস্টারের বাংলা হচ্ছে স্তবক বা গুচ্ছ। অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্র হয়ে গ্যালাক্সি-ক্লাস্টার গঠন করে। ‘স্টেফানের পাঁচক’ (Stephan’s Quintet) নামে একটি ক্লাস্টার আছে। এডওয়ার্ড স্টেফান নামে একজন জ্যোতির্বিদ পাঁচটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি এই ক্লাস্টারটি আবিষ্কার করেছেন বলে তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যায় এই ক্লাস্টারের একটি গ্যালাক্সির সাথে আরেকটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হচ্ছে। ছবিতে এই সংঘর্ষ খুব দৃষ্টিনন্দন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা নান্দনিক এই দৃশ্যের ঘটনা ঘটে গেছে আজ থেকে ২৮০ মিলিয়ন বছর আগেই। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই আমরা টাইম মেশিনে ভ্রমণ করছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা দেখছি।
%22%20transform%3D%22translate(1.9%201.9)%20scale(3.71094)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23676767%22%20cx%3D%22130%22%20cy%3D%2276%22%20rx%3D%2259%22%20ry%3D%2252%22%2F%3E%3Cellipse%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(50.6%20127%20270)%20scale(89.21344%2048.06977)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23757575%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-24.6%20232.5%20-258.8)%20scale(28.57376%2025.46432)%22%2F%3E%3Cellipse%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(24.4927%208.14764%20-5.92456%2017.80988%20253.5%20176)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
চিত্রঃ স্টেফানের পাঁচক। ছবিঃ নাসা
এবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি। ঐ ক্লাস্টারের কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থাকে এবং ঐ এলিয়েন যদি খুব শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করে আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে এই মুহূর্তে কী দেখতে পাবে? এই মুহূর্তে কিন্তু গুগল আর ফেসবুক ব্যবহারকারী কোনো মানুষকে দেখতে পাবে না। তারা দেখবে আজ থেকে মিলিয়ন বছর আগের ডায়নোসরদের রাজত্ব। টেলিস্কোপ এখানে টাইম মেশিন হিসেবে কাজ করছে এবং পৃথিবীতে ডায়নোসরদের বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।
%22%20transform%3D%22translate(1.5%201.5)%20scale(3.05078)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-69.44493%2021.4961%20-13.10043%20-42.32205%20235.1%20104)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%235f5f5f%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-3.23816%2014.86995%20-25.55384%20-5.56473%2012.9%20122.4)%22%2F%3E%3Cellipse%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-11.81933%20-42.13633%2071.90476%20-20.16944%20238.5%20104.3)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23262626%22%20cx%3D%2288%22%20cy%3D%2254%22%20rx%3D%2290%22%20ry%3D%2290%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
কথার পিঠে কথা চলে আসে। সত্যি সত্যিই কি এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে? আমরা তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের কথাবার্তা কখনো শুনিনি, কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করিনি। তাহলে তারা কি বাস্তবতার অংশ? এর উত্তর এখনো কেউ জানে না। যদি কোনোদিন তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় তাহলেই তারা বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো একদিন কেউ যদি অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোনো টেলিস্কোপ তৈরি করে যা দিয়ে খুব দূরের কোনো গ্রহের প্রাণীদেরকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে হয়তো আমরা এলিয়েনের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো রিসিভারে এলিয়েনদের পাঠানো বার্তা ধরা পড়লো তখন হয়তো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। (অস্তিত্ব নিশ্চিত হবার আগ পর্যন্ত এরা কাল্পনিক। কাল্পনিক কোনো কিছু বাস্তবতার অংশ নয়।)
তথ্যসূত্র
এই লেখাটি রিচার্ড ডকিন্স-এর চলমান ভাবানুবাদকৃত বই বাস্তবতার যাদু (The Magic of Reality)-র অংশ।
[এই লেখাটি পড়ার পর যদি আরো প্রশ্ন জেগে থাকে, যেমন মাল্টিভার্স থিওরি প্রমাণিত হয়নি তাহলে এটি কি বাস্তব না অবাস্তব? হাট্টিমাটিম টিম কি অবাস্তব? কিন্তু এটি তো কারো না কারো বাস্তব মস্তিষ্কেরই কর্মকাণ্ডের ফল ইত্যাদি প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিলে অনুরোধ থাকবে লেখাটির পরের অংশ- “মডেলঃ কল্পনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা” পড়ে দেখার।]
%22%20transform%3D%22translate(2.3%202.3)%20scale(4.6875)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%235b2802%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(254.43106%2017.02452%20-3.89545%2058.21746%20108.5%20139.3)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ddeca5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(6%20-136%201588.4)%20scale(253.7401%2043.16024)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23093b1c%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(45.74871%20-27.92513%2015.98404%2026.18606%2029%20135)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23c9724c%22%20cx%3D%22174%22%20cy%3D%2273%22%20rx%3D%2283%22%20ry%3D%2230%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
দগ্ধ পৃথিবী, ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ
জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট – মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কিভাবে বেঁচে আছে তারা?
১.
অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই – মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে: বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরতেন পৃথিবী বুকে।এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন কমিয়ে এনেছে এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity)। ধারণ ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেয় একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতোটুকু বাড়তে পারবে। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ, এক সময় যেখানে ছিলো কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। যেখানে জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল। এক সময় যেখানে কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো বসবাস-অনুপযোগী শহর।
জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। এক সময় পৃথিবী যেমনটা ছিলো, আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল, অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এ প্রকান্ডপুরীকে, আকাশভেদী বহু-শত-তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ; গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত ক্ষেতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-সবজি, চরে বেড়ানো গবাদিপশু, কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ-পরিবেশ।
ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিলো বন্ধনহীন, তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো মুক্তবায়ুতে, ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে, মাঠে বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো। এখন বিস্তৃত ভূমিগুলো অরক্ষিত নিষিদ্ধ এলাকা, সে অঞ্চল বিভিন্ন রোগ-দূর্যোগের প্রভাবাধীন, ঝড়ো হাওয়া প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঘন্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়, বৃষ্টি না থাকলে রূক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে এক সময় ছিলো যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-ৎসুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে, দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে, বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাহিরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।
আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ কেন্দ্রিক-ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই। চিন ও রাশিয়ার মতো স্বৈরাচারী দেশগুলো কঠোরভাবে নিয়মতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগকে সবচেয়ে ভালোভাবে সইতে পেরেছিলো। তারা মরিয়া অভিবাসীদের জন্য সীমানা বন্ধ করে দিয়েছিলো, চালু করেছিলো খাবার ও পানির রেশন-ব্যবস্থা, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাধ্য করেছিলো স্থানান্তরে। “যাদেরকে আক্রমণকারী বলে মনে করে তাদের বিরুদ্ধে দেশগুলো নিজেদের সুরক্ষিত করবে, সম্ভবত ব্যক্তিস্বাধীনতাহীন কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে, চীনের মতোই, তারপর যাবতীয় নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে জয়লাভ করবে” — বলেন ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক আর The Collapse of Western Civilization: A View from the Future (২০১৪) এর সহলেখক এরিক কনওয়ে।
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23b0c1a2%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-175.5%20324.6%20380.4)%20scale(852.40896%20256.49994)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-179.7%20284.1%2081.3)%20scale(1275%20246.8042)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23005197%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(1073.38522%2020.61005%20-2.04605%20106.55974%20730.7%20492.8)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23cbd15c%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-91.2%20511.1%20280.5)%20scale(115.2195%20451.13016)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
এই গ্রাফে শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের পরিবর্তন দেখানো হচ্ছে। সূত্র নাসা। ২.
উপরের কথা হয়তো কোন রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিলো। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিলো পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ – এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের সমাজ ছিলো পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। তারা বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিনিময় করতো।তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় উঠে আসে খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার খবর। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে একসময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলাতক। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার, প্রযুক্তির। ফলাফল প্রথম অন্ধকার যুগ – শেষ ব্রোঞ্জ যুগের পতন। একসময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed (২০১৪) বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন, “তখনকার সময় সেটি ছিলো একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিলো, নির্ভর করতো একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতী নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিলো। কিন্তু সে বিজয় ছিলো বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে”।
এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ের দিকে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনও ছিলো জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর – ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিলো আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়কে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিলো ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।
একই সাথে সময়টা ছিলো সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিলো। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিলেন ভালো ভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Global Crisis: War, Climate Change and Catastrophe in the 17th Century বইয়ের লেখক জেফরি পার্কারের মতে সতেরশ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে পাওয়া যাবে: শীতল আবহাওয়া, সাথে সাথে ঝড় তৈরি করা এল নিনোর বাড়তি পর্যায়, যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়, মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার। পার্কার বলেন, “তখনকার বৈশ্বিক সংকট নিশ্চিতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে সমাপ্ত হয়, যেমন বর্তমানকালে একই ধরনের বিপর্যয় কোটি কোটি মানুষের অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হবে।”
ক্লাইন বলেন, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলো। (বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কি না সেটা দেখা এখনো বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিলো শেষ পর্যন্ত ধসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”
<!–nextpage–>
৩.
আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণের ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যে কোনভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে যুক্তরাজ্যের টিনডাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ রিসার্চের গবেষক কেভিন এন্ডারসন চিহ্নিত করেছেন “যেকোন সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ”।প্রিন্সটোনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী ও ২০১০ সালে প্রকাশিত The Weather of the Future বইয়ের লেখক হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোন তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করবো — যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনভাবেই অভিযোজিত নই। প্রতি বছরই বর্ধিত গড় তাপমাত্রা আমাদের কাছে “নতুন মান” হিসেবে গণ্য হওয়ার সাথে সাথে তার মূল ধকল শতাব্দীর শেষের দিকে ধাক্কা দেয়ার জন্য জমা হচ্ছে”। লেখিকা আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”
তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পারবো — আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল। সাগরতল উচ্চতায় চার ফিট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। আর টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে, বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে, লাখো লাখো মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত। অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকা এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিলো তা শুষে নেবে। আর ধ্বংস হবে ফসল যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লাখো লাখো মানুষ। অজস্র গবেষণা-ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহসংকটে আর অনাহারে ভুগবে।
ঝলসে দেয়া তাপপ্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে দেবে, বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দেবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিলো। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিয়ো, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মত। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।
পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে, গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেখানে জমানো তাপশক্তির কারণে জলবায়ু একশ বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। সম্প্রতি বিশিষ্ট জলবায়ু-বিশেষজ্ঞ এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমন্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড়্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না”। মানব-সভ্যতার বেশির ভাগকে অংশকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগপর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে, চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।
দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করবো, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় বাদলবন মরুআবৃত হয়ে পড়বে, আর আলপিন বন সমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বানী করেছেন যে আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেরায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি, হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।
এতো কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে। যদিও সপ্তদশ- ও একবিংশ-শতাব্দীর মাঝে পার্থক্য বহু, [তবে] শিশু তুষারযুগের সরকারসমূহ এখনকার মতো একই দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছে … [শেষ পর্যন্ত তারা বুঝতে পেরেছে] যে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে সস্তা ও দক্ষতর (এবং বেশি মানবিক) কাজ হবে যারা বৃদ্ধ, বিধবা-বিপত্নীক, অসুস্থ, পঙ্গু কিংবা বেকার তাদেরকে সহায়তা করা, ফলাফলে পৃথিবীর প্রথম ‘কল্যাণ রাষ্ট্রের’ উৎপত্তি।”
তাই আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায় সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতি পূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পূনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।
মূল লেখা: Scorched Earth, 2200AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.
লেখক পরিচিতি: লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23080040%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(15.9203%2046.32409%20-243.29597%2083.61405%2097.3%2014.4)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%2343387b%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M121.3%2032.7H541V347H121.3z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%233678a3%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M122%20225.7l16-28.3-19.7-18.6v19.5z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%231d1155%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M102.3%2077l76-109.7-211%20111.8z%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
ডিম, উপবৃত্ত ও মুক্তিবেগ
গত পর্বে সমুদ্রের পারে উঁচু একটি পর্বতের উপরে একটি কাল্পনিক কামানের কথা বলেছিলাম। নিউটন তার চিন্তন পরীক্ষায় এই কামানটি ব্যবহার করেছিলেন। ঐ কামান থেকে খুব বেশি জোরে গোলা ছুঁড়া হলে গোলাটি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে। ঐ কামানের কাছে আবারো ফিরে যাই। এবার কামানটিকে আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী করে তুলি। এমন শক্তিশালী কামান থেকে গোলা ছুড়ে মারলে কী ঘটবে? তা জানতে হলে আমাদেরকে এখন বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলারের অসাধারণ আবিষ্কারের সাথে পরিচিত হতে হবে।

চিত্রঃ জোহানেস কেপলার উপবৃত্তকে অনেকটা ডিমের সাথে তুলনা করা যায়। যদিও ডিম পুরোপুরি উপবৃত্তাকার নয়। তারপরও তুলনার খাতিরে ধরে নিলাম। গোলাকার যে ক্ষেত্রকে আমরা বৃত্ত বলে জানি সেটা আসলে এক ধরনের বিশেষ উপবৃত্ত।কেপলার ছিলেন নিউটনের পূর্বেকার বিজ্ঞানী। নিউটন ছিলেন কেপলারের বিজ্ঞান বিষয়ক কাজের উত্তরসূরি। কেপলার যে সময়ে বাস করতেন ঐ সময়টাতে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল আকাশের যে সকল বস্তু অন্য বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরে, তাদের কক্ষপথ বৃত্তাকার। কেপলার পরবর্তীতে দেখালেন আকাশের বস্তুসমূহের গতিপথ বা কক্ষপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার নয়। এগুলো উপবৃত্তের মতো। উপবৃত্ত হচ্ছে চ্যাপ্টা বৃত্তের মতো এক ধরনের জ্যামিতিক আকৃতি। কেপলারের আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত তখনকার বিজ্ঞানীদের ধারণাই ছিল না গ্রহদের গতিপথ উপবৃত্তাকার হতে পারে। তখনো উপবৃত্তের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
উপবৃত্ত অংকন করার খুব সহজ ও চমৎকার একটি পদ্ধতি আছে। বৃত্ত যে আসলে এক প্রকার উপবৃত্ত তা এই পদ্ধতিতে আঁকলে খুব সহজে বোঝা যাবে। প্রথমেই এক টুকরো মোটা সুতা নিয়ে নিয়ে তার দুই প্রান্ত গিট দিয়ে একটি ফাঁস তৈরি করি। এবার একটি পিন নিয়ে কোনো একটি বোর্ডের উপর বসাই। বোর্ড না থাকলে বুদ্ধি খাটিয়ে খাতার মাঝেই করে নেয়া যায়। সুতার ফাঁসটির এক প্রান্ত পিনের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করাই। ফাঁসের অপর প্রান্ত প্রান্তে একটি কলম বা পেন্সিল দিয়ে সুতাটিকে টানটান করে কাগজের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনলে আমাদের পরিচিত একটি আকৃতির সৃষ্টি হবে। অবশ্যই এই আকৃতিটি একটি বৃত্ত। হাতের কাছে কম্পাস না থাকলে মানুষ এভাবেই বৃত্ত আঁকে। এবার পরের ধাপ। এই ধাপে আরো একটি পিন নেই। এই পিনটিকে বোর্ডের উপর আগের পিনটির একদম কাছাকাছি বসিয়ে দেই। এবারে সুতা ও পেন্সিল ব্যবহার করে টানটান করে কাগজে দাগ টানলে আগেরটির মতোই একটি বৃত্তাকার আকৃতি পাওয়া যাবে। পিনের সংখ্যা দুটি হওয়া সত্ত্বেও তারা খুব কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে আকৃতি প্রায় বৃত্তাকারই হয়েছে। এখানে দুটি পিন মিলে একত্র হয়ে একটি একক পিনের মতো আচরণ করেছে।

এটা করা হয়ে গেলে সবচেয়ে মজার অংশটায় প্রবেশ করা যায়। পিন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব কয়েক ইঞ্চি বাড়িয়ে দেই। এবার যদি সুতাটিকে টানটান করে কলম ঘুরিয়ে যাওয়া হয় তাহলে উৎপন্ন ক্ষেত্রটি বৃত্ত হবে না, হবে অনেকটা ডিম্বাকৃতির উপবৃত্ত। পিন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যতই বাড়ানো হবে উপবৃত্ত ততই চ্যাপ্টা হবে। দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে চ্যাপ্টা হবার পরিমাণ বেড়ে যাবে, পিনের দূরত্ব কমার সাথে সাথে গোলাকার হবার প্রবণতা বেড়ে যাবে। পিন দুটির দূরত্ব যখন কমতে কমতে একসময় একত্র হয়ে যায় অর্থাৎ পিন দুটি মিলে একটি পিন হয়ে যায় তখন ঐ অবস্থায় একদম বৃত্ত পাওয়া যাবে। যেটা আগেও বলেছিলাম, বৃত্ত আসলে এক ধরনের বিশেষ উপবৃত্ত।

উপবৃত্তের সাথে পরিচিত হবার পরে এখন আমরা আমাদের অতি শক্তিশালী কামানের কাছে ফিরে যেতে পারি। আগে দেখেছিলাম খুব জোরে কামান থেকে ছুড়া গোলা প্রায় বৃত্তাকার পথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। এখন এর চেয়েও অধিক শক্তিশালী কামান থেকে গোলা ছুড়লে গোলার গতিপথ চ্যাপ্টা হয়ে যাবে, উপবৃত্তের মতো। এর চেয়ে বেশি যত জোরে ছুড়া হবে উপবৃত্তাকার গতিপথ ততই বেশি চ্যাপ্টা হবে।
একটা প্রশ্ন কি মনে উদয় হয়নি? উপবৃত্তের তো দুটি উপকেন্দ্র (পিন) থাকে, তাহলে এই গোলার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের উপকেন্দ্র দুটি কোথায়? আমরা আগে যেগুলোকে পিন বলেছিলাম, গাণিতিকভাবে সেগুলোকে উপকেন্দ্র বলা হয়। গোলার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের একটি উপকেন্দ্র পৃথিবী নিজেই। আরেকটি উপকেন্দ্র কাল্পনিক-ভাবে ধরে নিতে হয়। উপকেন্দ্রগুলো শক্ত ও কঠিন বস্তু হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শূন্যে উপকেন্দ্র কল্পনা করেও চলবে। এভাবে কল্পনা করে নিলে গাণিতিক হিসাব-নিকাশে সুবিধা হয়। তবে এটা যদি বুঝতে সমস্যার সৃষ্টি করে তাহলে এই বিষয়টা বাদ দিয়েও সামনে এগোনো যায়। মূল আলোচনায় এই জিনিসটা না হলেও চলবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে, পৃথিবী কোনো ডিম্বাকৃতির কক্ষপথের ‘একমাত্র কেন্দ্র’ নয়। কখনো কখনো কক্ষপথ পৃথিবী থেকে অনেক দূরে সরে যায়, আবার কখনো কখনো খুব কাছে অবস্থান করে। শূন্যে কাল্পনিক উপকেন্দ্রের দিকে কক্ষপথের দূরত্ব পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে। উপকেন্দ্র হিসেবে যখন পৃথিবী নিজে থাকে তখন কক্ষপথ পৃথিবীর খুব কাছাকাছি হয়।
আমরা আমাদের কামানকে ক্রমান্বয়ে অধিক থেকে অধিকতর শক্তিশালী করতেই থাকি। এবার গোলাটি আরো অনেক অনেক বেশি বেগে ছুটে যাবে এবং উপবৃত্তাকার কক্ষপথ আরো বেশি চ্যাপ্টা হবে। এভাবে যদি কামানের শক্তির মাত্রা বাড়ানোর সাথে সাথে গোলার বেগ বাড়ানো হয় তাহলে উপবৃত্তাকার কক্ষপথ চ্যাপ্টা হতে হতে একসময় দুই দিক একত্রে পর্যবসিত হয়ে একটি মাত্র পথ বা রেখার সৃষ্টি করবে। ঐ পরিস্থিতিতে কামান থেকে গোলা ছুড়া হলে সেটি বৃত্ত বা উপবৃত্তাকার পথে না গিয়ে সোজা পথে চলে যাবে এবং আর কখনো পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। পৃথিবীকে আর প্রদক্ষিণ করবে না। এই বেগটাকে বলা হয় ‘মুক্তিবেগ’। পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে মুক্ত হয়ে যেতে পারে বলে এর নাম মুক্তিবেগ। মুক্তিবেগে কোনো বস্তুকে পৃথিবী থেকে ছুড়ে মারলে পৃথিবীর অভিকর্ষীয় আকর্ষণ তাকে আটকে রাখতে পারে না। ঐ বস্তুটি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়, কিংবা অন্য কোনো ভারী গ্রহ বা নক্ষত্রের শক্তিশালী আকর্ষণে বাধা পড়ে। যেমন সূর্যের আকর্ষণ পৃথিবী তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি। সূর্যের পক্ষে পৃথিবীর সাপেক্ষে মুক্ত বেগে চলমান কোনো বস্তুকে তার আকর্ষণে বেধে ফেলা সম্ভব।
সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথও আসলে উপবৃত্তাকার। তবে এই আকৃতি অনেকটা বৃত্তের মতো। উপবৃত্তটির ‘উৎকেন্দ্রিকতা’ বা চ্যাপ্টার পরিমাণ এতই কম যে প্রায় বৃত্তাকার বলেই মনে হয়। সূর্যের চারপাশের অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথগুলোও প্রায় বৃত্তাকার। তবে প্লুটোর কক্ষপথের বেলায় এটি প্রযোজ্য নয়। প্লুটোর কক্ষপথ ভালোই উপবৃত্তাকার। যদিও প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে ধরা হয় না আর। ধূমকেতুর কক্ষপথ খুব বেশি পরিমাণ উপবৃত্তাকার। ধূমকেতুর কক্ষপথের উপকেন্দ্র দুটি একটি আরেকটি হতে অনেক বেশি পরিমাণ দূরে অবস্থান করে। ধূমকেতুর কক্ষপথের দুটি উপকেন্দ্রের একটি হচ্ছে সূর্য। আবারো মনে করিয়ে দিচ্ছি, অন্য উপকেন্দ্রটি শূন্যের কোনো এক জায়গায় কল্পনা করে নিতে হবে। এটি সত্যিকার কোনো বস্তু নয়, ধরে নিতে হবে শুধু।
একটি ধূমকেতু যখন সূর্য থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে অবস্থান করে তখন এটি সবচেয়ে কম গতিতে চলে। সূর্য থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বের এই বিন্দুকে বলা হয় aphelion, বাংলায় বলা যায় দূরতম বিন্দু বা অপসূর। ধূমকেতুর বেগ অনেকটা পড়ন্ত বস্তুর মতো। উপরের দিকে কোনো বস্তু ছুড়ে মারলে বস্তুটি উপরে উঠার সাথে সাথে তার বেগ কমতে থাকে। সর্বোচ্চ উচ্চতায় এর বেগ শূন্য হয়ে যায়, এবং এর পরপরই নিচের দিকে পড়তে শুরু করে। যখন নিচের দিকে পড়ে তখন সময়ের সাথে সাথে তার বেগ বৃদ্ধি পায়।
ধূমকেতু সূর্য থেকে দূরতম বিন্দুতে যাবার সময় তার বেগ কমতে থাকে। ঐ বিন্দুতে সর্বনিম্ন বেগে পৌছানোর পর তা আবার সূর্যের দিকে পড়তে থাকে। তখন এর বেগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একসময় সূর্যের আশেপাশে কোনো এক স্থানে সর্বোচ্চ বেগে উন্নীত হয়। এর পরপরই আবার দূরে সরে যেতে থাকে এবং বেগ কমতে থাকে।

ধূমকেতুর চলার পথে সূর্যের সবচেয়ে কাছের বিন্দুকে বলা হয় perihelion, বাংলায় বলা যায় নিকটতম বিন্দু বা অনুসূর। perihelion ও aphelion শব্দ দুটি এসেছে গ্রীক শব্দ হতে। peri অর্থ কাছের (near),আর apo অর্থ দূরের (far) এবং hellion এসেছে গ্রীকদের সূর্যদেবতার নাম থেকে। গ্রীকরা সূর্যদেবতাকে বলত হিলিয়াস (helious)। এভাবে ধূমকেতুর কাছে আসা, দূরে যাওয়া, বেগ বাড়া, বেগ কমা চক্রাকারে চলতেই থাকে।
মহাকাশ প্রকৌশলীরা মহাশূন্যে রকেটের জ্বালানী সাশ্রয় করতে স্লিংশট ইফেক্ট (slingshot effect) এর সাহায্য নেন। স্লিংশট ইফেক্টকে বাংলায় ‘প্রক্ষেপক প্রভাব’ বলা যেতে পারে। ভারী গ্রহ বা নক্ষত্রের পাশ দিয়ে কোনো কিছু যাবার সময় তার গতি বেড়ে যায়। ধূমকেতুর মতো। যে প্রভাবে ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে আবর্তনকারী বস্তুর বেগ বেড়ে যায় তাকে প্রক্ষেপক প্রভাব বলে।
শনি গ্রহের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য ক্যাসিনি স্পেস প্রোব পাঠানো হয়েছিল। প্রোবটিকে সোজা শনির দিকে না পাঠিয়ে একটু ঘুরপথে পাঠানো হয়েছিল। মূলত একটু চালাকি করে প্রক্ষেপক প্রভাবের সুবিধাটি কাজে লাগানোর জন্য ঘুরপথকে বেঁছে নেয়া হয়েছিল। অনেকটা হাত দিয়ে সরাসরি ভাত না খেয়ে মাথা ঘুরিয়ে খাওয়া। মাথা ঘুরিয়ে ভাত খেলে অবশ্য কোনো লাভ পাওয়া যায় না, কিন্তু এতে লাভ আছে, জ্বালানীর সাশ্রয় হয়। শনির দিকে সোজা পাঠাতে যে পরিমাণ জ্বালানী লাগতো, প্রক্ষেপক প্রভাব ব্যবহার করাতে জ্বালানী লেগেছিল তার চেয়ে অনেক কম।
ক্যাসিনি তার ভ্রমণ পথে তিনটি গ্রহের অভিকর্ষের আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েছিল। শুক্র গ্রহকে দুইবার, শুক্রের পাশ দিয়ে দুই চক্কর দেবার মাঝের সময়ে পৃথিবীকে একবার, সবশেষে বিশাল গ্রহ বৃহস্পতির শক্তিশালী অভিকর্ষকে ব্যবহার করেছিল। প্রতিটি গ্রহের কাছেই ক্যাসিনির বন বন করে এগিয়ে যাবার বেগ বেড়ে যাচ্ছিল, ধূমকেতুর বেগ যেমন সূর্যের আকর্ষণে বেড়ে যায় তেমন। ক্যাসিনির এই চারটি প্রক্ষেপক প্রভাবের ব্যবহার তাকে সৌন্দর্যময় বলয় ও ৬২ টি উপগ্রহ সম্বলিত শনি গ্রহের দিকে দ্রুতবেগে নিক্ষেপ করেছিল। ক্যাসিনি সেখানে পৌঁছে অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর সুন্দর ছবি পাঠিয়েছে আমাদেরকে। শনি গ্রহ তথা সৌরজগত সম্বন্ধে অনেক ধারণাই পরিষ্কার হয় ক্যাসিনির তোলা ছবি থেকে।

চিত্রঃ ক্যাসিনির ভ্রমণপথ।
ধূমকেতুর মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে হ্যালির ধূমকেতু। এডমন্ড হ্যালি নামক একজন বিজ্ঞানী এটা আবিষ্কার করেছিল বলে উনার নামে এর নাম হ্যালির ধূমকেতু। এটি যখন অনুসূর বিন্দুর আশেপাশে থাকে তখন আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয়। অনুসূর বিন্দুতে এটি যখন সূর্যের কাছাকাছি থাকে তখন তাতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পড়ে বলে দেখতে পাই। এর চ্যাপ্টা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, ধূমকেতুটি সূর্য থেকে অনেক দূরে চলে যায়, প্রতি ৭৫ থেকে ৭৬ বছর পর পর এটি আগের জায়গায় ফিরে আসে।
ধূমকেতুর সৌন্দর্য তার পুচ্ছ বা লেজের ভেতর। এই পুচ্ছ আসলে অনেকগুলো বরফকণার সমন্বয়। ধূমকেতুর একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে এর পুচ্ছ সবসময়ই সূর্যের বিপরীতে থাকে। খেয়াল করলে দেখা যাবে ধূমকেতুটি সূর্যের যেদিকেই থাকুক না কেন, পুচ্ছ সবসময়ই সূর্যের বিপরীত দিক বরাবর থাকে। সূর্য থেকে এক ধরনের কণার প্রবাহের কারণে ধূমকেতু কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়। অনেকটা বাতাসের বাধার মতো। সামনের ভারী অংশের তুলনায় পুচ্ছটি অনেক হালকা বলে পেছনের দিকে সরে যায়। এজন্য মনে হয় পুচ্ছ সবসময় সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থান করে।
সৌর প্রবাহের (Solar Wind) এই ধারণাকে ব্যবহার করে মাঝে মাঝে অনেক চমৎকার কিছু কল্পনা করা হয়। যেমন মহাকাশযানকে চালিয়ে নিতে সৌর প্রবাহকে ব্যবহার করা। একসময় এটি কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এটি এখন বাস্তবেও চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। জাপানের মহাকাশ গবেষকরা ঐ পরিবেশের উপযোগী করে এক পাল ব্যবহারের কথা চিন্তা করছেন। অনেকটা বায়ুর প্রবাহ ব্যবহার করে চলা পাল তোলা নৌকার মতো। সৌর প্রবাহকে ব্যবহার করতে পারলে অনেক দূরের আন্তঃনাক্ষত্রিক যাত্রায় জ্বালানির অনেক খরচ বেঁচে যাবে। আজ এ পর্যন্তই। আগামিতে কোনো একদিন হাজির হবো মহাকাশ প্রকৌশলের অন্য কোনো পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে।
বিঃ দ্রঃ এই লেখাটি রিচার্ড ডকিন্স-এর চলমান ভাবানুবাদকৃত বই বাস্তবতার যাদু (The Magic of Reality)-র অংশ।
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23dbdbdb%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(19.51375%20-197.05647%20307.01882%2030.4029%20739.3%201210)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23dcdcdc%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(82.09515%20-298.1363%20183.75083%2050.59784%201876.3%2026.3)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%23ccc%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M1365.5%20532.4l47.5-12.6%2061.8%2062.7-97.5%2069.6z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%239e9e9e%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M3.7%203.7h1314.5V1039H3.7z%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
সাইকিয়াট্রিতে নতুন দিগন্ত
ধরুন আপনার প্রচন্ড বুকে ব্যাথা হলো । সেক্ষেত্রে অবশ্যই আপনি একজন ডাক্তারের কাছে যাবেন। আপনার ব্যাথা নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, হৃদরোগ নাকি অন্য কোন কারনে হয়েছে তা জানার জন্য ডাক্তার সাহেব একগাদা টেস্ট দিবেন। ফলে আপনার রোগটি শুধু সুনির্দিষ্ট ভাবে নির্ণয় করা যাবে তাই নয়, বরং এটি আপনে যেন যথাযথ ও সুচিকিৎসা পান এটাও নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে ধরুন আপনি কোন মানসিক জটিলতার মধ্যে দিয়ে গেলেন। এক্ষেত্রে আপনার রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করার কৌশলটি অনেকটাই অন্যরকম হবে। এমনকী আপনার কাছে সেরকম ভালো কোন অপশন নাও থাকতে পারে।
মানসিক রোগে ভোগা বেশিরভাগ মানুষকে হয় স্রিজোফেনিয়া নয়তো বাইপোলার ডিজর্ডারের রোগীর কাতারে ফেলা হয়। টেস্কট বইয়ে এই দুইটা রোগের পার্থক্য শতাব্দীকাল ধরে একই রকম আছে। স্রিজোফেনিয়ার সবচেয়ে সাধারন লক্ষন হলো ভূলে যাওয়া, হ্যালুসিনেশন এবং দীর্ঘসময় ধরে চলা একটা রোগ- সবমিলিয়ে একটা নাজেহাল অবস্থা। বাইপোলার ডিজর্ডারের ক্ষেত্রেও ভুলে যাওয়া ও হ্যালুসিনেশন দেখা যায়। আরো আছে মানসিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন। কখনো হাসিমুখ আবার কখনো গোমরামুখ আর কি।
তো এইসব মানসিক রোগগুলো আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত হয়। সেসব কারনে টেক্সটবইয়ের বাইরে বাস্তবে ইমার্জেন্সি রুম বা ক্লিনিকে এই পার্থক্যটা অতটা স্পষ্ট নয়। কারন অনেক রোগীর ক্ষেত্রে টেক্সট বইতে বর্ণিত লক্ষনগুলো মেলে না। দুঃখের বিষয় হলো সিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিজর্ডার থেকে আলাদা করার জন্য কোন ব্লাড টেস্ট বা স্ক্যানের ব্যবস্থা নাই।
যদিও মনোরোগ বিশেষজ্ঞগন লক্ষন থেকেই রোগ নির্নয় করতে খুবই দক্ষ হয়ে থাকেন, তারপরও এই ধরনের সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবস্থা না থাকায় সাইক্রিয়াট্রিতে ব্যপক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সব রোগীরাই কি আসলে সিজোফ্রেনিয়াতেই ভুগছে? বিশাল একটা শ্রেণির লোকদের যে সিজোফ্রনিয়া এবং বাইপোলার ডিসওর্ডার দুটোতেই ভোগার সম্ভাবনা আছে এই ব্যাপারে তারা কি বলবেন? সম্পূর্ণ রোগলক্ষণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা এইসব রোগ কি স্বতন্ত্র জৈবিকসত্ত্বার উপস্থিতিকে নির্দেশক করে নাকি মনোরোগের সিরিজএই লক্ষণসমূহ অনেকগুলো রোগের সম্ভাবনাকে উসকে দেয়।
বুকে ব্যথার মতো এক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্টভাবে রোগটি নির্ণয় করতে পারা সর্বোত্তম চিকিৎসার পূর্বশর্ত। সাইকিয়াট্রিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মনেরোগ নির্ণয় ছিল একটি দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেন্টাল হেলথ এটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে বাধা অনেক কিন্তু ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা ছিল আশা জাগানিয়া।

চিত্রঃ বায়োটাইপ নির্ধারন
বায়োটাইপ নির্ধারণ:
জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী ব্রেট ক্লেমেজের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় টেক্সাস ইউনিভার্সিটির ক্যারন ট্যামিঙ্গা ডালাসের সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল স্টোরে এবং তাদের ইয়েল ও হার্ভাড ইউনিভার্সিটির সহকরমীরা মনোরোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বায়োটাইপ ( একই রকম জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিসমষ্টি) খুঁজে পান।এটি পরিমাণগত বায়োমার্কার( যে বস্তু কোন রোগের উপস্থিতি বা তীব্রতা নির্দেশ করে) দ্বারা এটি নির্ধারণ করা হয়।এই গবেষণায় বাইপোলার -সিজোফ্রেনিয়া নেটওয়ার্কের অন্তবর্তী বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহের(Bipolar and schizophrenia network on intermediate phenotype(BSNIP)) সাহায্যে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং সিজিওএফেক্টিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত( সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার দুটোই থাকে) ৭১১ জন লোককে বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেয়া হয়। এ থেকে মনোরোগের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কর্মকান্ডেকে মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ছিল – বুদ্দিবৃত্তিক পরীক্ষা (cognitive test),শ্রবণশক্তি মূল্যায়ন, বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণের মূল্যায়ন, EES এবং চোখের নড়াচড়ার পরীক্ষা। আরো ছিল তাদের মস্তিষ্কের MRI স্ক্যান ।
সম্ভবত এতে আশ্চর্যের কিছু নাই যে অনেক লোকজনের উপর তিন ধরনের রোগ নির্ণয় কৌশন ব্যবহারের ফলে তিন ধরনের বায়োটাইপ পাওয়া যাবে। কিন্তু এই তিন ধরনের বায়োটাইপের- প্রথাগত তিন প্রকার রোগ নির্ণয়ের কৌশলের সাথে খুব কমই পার্থক্য আছে।প্রকৃতপক্ষে বায়োটাইপগুলো সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসর্ডার এবং সিজিওএফেক্টিভ ডিসর্ডার এই তিন প্রকৃতির মাঝেই পড়ে। এবং এই বায়োটাইপগুলোতে রোগলক্ষনের তীব্রতা বা ম্যানিয়া সম্পর্কিত লক্ষনের সাথে তেমন পার্থক্য দেখা যায়নি।
তাহলে এরকম ভাবার তেমন কোন কারন নাই যে বায়োটাইপ থেকে রোগনির্ণয় প্রথাগত রোগলক্ষন থেকে রোগ নির্ণয়ের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। তারপরো কিছু পর্যবেক্ষন থেকে দেখা যায় B-SNIP অনুসন্ধানীগন কিছুটা এগিয়ে আছেন। প্রথমত এই বায়োটাইপের পার্থক্যগুলো প্রথম ডিগ্রি(আমরা সরাসরি চিনি) পরিবারের সদস্যদের মাঝেও দেখা গেছে। কারন তাদের থেকেও জেনেটিক ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিলো। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন বায়োটাইপের রোগীদের মধ্যে সামাজিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা গেছে। অন্যান্য বায়োটাইপের চেয়ে বায়োটাইপ-১ এর মধ্যে পড়া লোকজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী বৈকল্য দেখা গেছে।
অধিকতর সঠিক চিকিৎসাঃ
ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগনির্ণয়ের বিপ্লব সাধনের সাথে সাথে সঠিক চিকিৎসা একটি বহুল প্রচলিত শব্দে পরিনত হয়েছে। ব্যপারটা আসলে এরকম- জেনেটিক্স, ইমেজিং এবং আধুনিক জীববিজ্ঞানের অন্যান্য সুবিধার ফলে প্রচলিত রোগনির্ণয় পন্থাকে ভেঙ্গেচুড়ে নতুন রোগনির্ণয় পন্থা তৈরি হবে। এটা হবে আরো সঠিক এবং জেনেটিক প্রকরন নির্ণয় করা যাবে এমন পর্যায়ের। এর ফলে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টিকে নির্দিষ্ট রোগের জন্য আরো সঠিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।তৃতীয়ত, মস্তিষ্কের ছবি নিয়ে গবেষনা। এটা থেকে মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোতে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে ফ্রন্টা, সিংলেট, টেম্পোরাল এবং প্যারাইটাল কর্টেক্সে। যদিও এসব কোন পর্যবেক্ষন থেকেই প্রমাণিত হয়না যে রোগলক্ষন থেকে রোগনির্ণয়ে বায়োটাইপ বেশি কাজের। তারপরও এইসব গবেষনা মনোরোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি নতুন পথের সূচনা করতে পারে। ভবিষ্যতে হয়তো এটা জানা যাবে জিনগত বৈচিত্র্য, মস্তিষ্কের কর্মকান্ডের রূপরেখা নাকি আচরনগত কারন বায়োটাইপকে বুঝতে সাহায্য করে যা পরবর্তিতে কৌশলটিকে নির্ভরযোগ্য করে তুলবে। মনোরোগের ক্ষেত্রে যেহেতু ক্লিনিকে পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা নাই তাই এক্ষেত্রে সঠিক ওষুধ হতে পারে একটি সংহতিনাশক নতুনত্ব। এর ফলে দেখা যাবে বর্তমানে প্রচলিত সর্বপ্রকার রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা ভুল এবং জৈবিক দিকের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ন।
আমরা অটিজম, অ্যাটেনশন ডিফিসিট হাইপার একটিভিটি ডিজর্ডার, ডিপ্রেশন এবং উদ্বেগজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছি। যেমন, অটিজমের ক্ষেত্রে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় অনেক রকমের অটিজম আছে। দুর্বল রোগনির্ণয় ব্যবস্থায় সব ধরনের অটিজমকে মোটামুটি একই রকমের মনে হয়। কিন্তু এগুলো জিনগত ভাবে বৈচিত্র্যপূর্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
NIMH মনোরোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি নতুন কৌশল প্রস্তাব করেছে যা রোগলক্ষণ থেকে রোগনির্ণয়ের সাথে সাথে জৈবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আচরণগত এবং সামাজিক তথ্যের সমন্বয়ের কথা বলে। যাকে বলা হচ্ছে Research Domain Criteria বা RdoC. এটা বিতর্কিতও হতে পারে। কার এটা প্রথাগত সাইকিয়াট্রির সাথে বিশাল একটা ভাঙ্গন তৈরি করবে। আবার টিকেও যেতে পারে।
B-SNIP গবেষনা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল RDOC কৈশলের পক্ষে প্রমাণ দেয়। অবশ্যই B-SNIP, বায়োটাইপ বা অন্য কোন নতুন রোগনির্ণয় কৌশল ব্যাবহার করে চিকিৎসা প্রদান, ফলাফল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কতটা কাজে আসবে তার জন্য গবেষনা প্রয়োজনযুক্তরাষ্ট্রে সিজফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীদের সাধারনত মানসিক অবস্থার উন্নতিসাধনকারী ওষুধ, মানসিক সাহায় যেমন- কাউন্সেলিং, কারিগরী প্রশিক্ষন এবং অন্যান্য ধরনের সাহায্য দেয়া হয়ে থাকে। অন্যদিকে বাইপোলার ডিজর্ডারের ক্ষেত্রে স্ট্যাবিলাইজার, অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, কখনো কখনো অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং মানসিক সাহায্য দেয়া হয়। চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো ততটা ভালো না। এই সুবিধাগুলো পাওয়া সব রোগী সাড়া নাও দিতে পারে।
আশার কথা হলো, সাইকিয়াট্রিতে সঠিক ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বায়োমার্কার কার্যকর অবদান রাখতে পারে। এর ফলে চিকিৎসক এবং রোগীগন মনোরোগ সম্পর্কে আরো বেশি জানতে পারবেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। মানসিক রোগগুলো সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থার সৃষ্টি করে- প্রচুর খরচ হয় এবং রোগী আর তাদের পরিবারকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। নতুন ধরনের রোগনির্ণয় কৌশল এবং তা ব্যবহার করে চিকিৎসা প্রদান করার জন্য আরো অনেক দূর যেতে হবে।
তথ্যসূত্রঃ
Is There a Better Way to Diagnose Psychosis? By Thomas R. Insel, Scientific American, March, 2016%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23f86a40%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-18.1%2077.8%20-128)%20scale(46.00258%2028.96692)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23334f5e%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-79.43121%208.47788%20-2.85396%20-26.73945%201.3%2082.7)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23003d50%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(6.06798%2014.01737%20-27.25988%2011.80054%20123%201)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%234993fc%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M56.5%2080.5h24v20h-24z%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব?
অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব? সম্প্রতি এ বিষয় নিয়ে সাইন্টিফিক আমেরিকানের মাইন্ড ব্লগ অংশে Scott Barry Kaufman এর একটা লেখা পড়লাম। উনি বলছেন, সৃষ্টিশীল লোকেরা শুধুমাত্র কোন নিদিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যাপারটা এমন নয়। তারা চেনা পথে না চলে নিজেদের জন্যে নতুন পথ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানী এরিকসন ও পুলের মতে সঠিক অনুশীলন আপনাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা এনে দেবে। সঠিক অনুশীলন বলতে উদ্দেশ্য ঠিক করা, কাজগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে সম্পন্ন করা, নিজের আয়ত্তের জায়গা থেকে বেড়িয়ে নতুন কিছু করা। এধরণের অনুশীলন কাজে লাগতে পারে দাবা খেলতে কিংবা কোন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে। যে ধরণের কাজে একই প্যাটার্নের বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেখানে অনুশীলন খুবই কাজের। কিন্তু সবক্ষেত্রে অনুশীলনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু কাজ আছে যেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কিছু কিছু সময় পর পর পরিবর্তিত হয়। যেখানে একই ধরণের কাজ বার বার করা সফলতার অন্তরায়ও হতে পারে! আর এ ধরণের কাজ হলো ছবি আঁকা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, লেখালেখি কিংবা কোন সুর তৈরি করা। এক্ষেত্রে একই উপন্যাস বার বার লিখলে বা একই সাইন্টিফিক পেপার বার বার লিখলে ঔপন্যাসিক কিংবা বিজ্ঞানী সফল হবেন না। এজন্য সৃজনশীল মানুষদের উপর অনেক সময় নতুন কিছু তৈরি করার একটা মানসিক চাপ থাকে। সৃজনশীল কাজকে হতে হবে মৌলিক (original), অর্থপূর্ণ এবং চমকপূর্ণ! মৌলিক এই অর্থে কাজটিকে সাধারণের থেকে আলাদা হতে হবে। অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে কাজটি কোন বিষয়কে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করবে। তাই সৃজনশীল মানুষেরা ক্রমাগত তাদের কাজের মাধ্যমে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে বেড়ায়। আর চমকপূর্ণ এই অর্থে তা মানুষের সচারাচর ধারণার বাইরে হবে। যেমন গ্যালিলিও কিংবা লিউয়েন হুকের আবিষ্কার ছিল সকলের কাছে নতুন ও বিস্ময়কর।
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ff6f3c%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(163.6%2077.5%2050.8)%20scale(168.33084%20100.18137)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23003c45%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-8.99228%20-66.50831%2093.81978%20-12.68493%20457.2%201.4)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%2334505f%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-264.09508%206.80355%20-2.44194%20-94.78932%2043.5%20313.2)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%233d91f1%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-6.42724%2069.2835%20-49.1284%20-4.5575%20264.2%20363.8)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
সৃজনশীলতা কি শুধুমাত্রই অনুশীলন এর মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব?! এই যুক্তি খণ্ডনে Scott বারোটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
সৃজনশীলতা অনেকটা অজানার পথে পা বাড়ানোর মত। সৃজনশীল কাজটা মানুষজন গ্রহণ করবে কি না তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। মানুষের রুচি বোঝার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একটা বড় ভূমিকা রাখে। অভিজ্ঞতার সাথে এই মুহূর্তে কি করতে হবে তার একটা উপলব্ধি চলে আসে। এখন থিওরি লেখা হবে নাকি এক্সপেরিমেন্ট, কবিতা নাকি নাটক, পোট্রেট নাকি ল্যান্ডস্কেপ, সিম্ফনি নাকি অপেরা এসব সিদ্ধান্ত এই অনুভূতি থেকেই আসে। কিন্তু সৃজনশীলতা যদি নিছক অনুশীলন হতো তাহলে ছক বাধা রুটিন থেকে আগেই অনুমান করা জানা যেত ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে।
সৃজনশীল মানুষেরা নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগোয়। এমন অনেক প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন যারা তাদের মাস্টারপিস সৃষ্টির পরে খুব ভালো সৃষ্টিকর্ম রেখে যেতে পারেন নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শেক্সপিয়ার তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিকর্মগুলো যখন করেন তার বয়স তখন আটত্রিশের কোটায়। তখন তিনি হেমলেটের মত বিশ্ববিখ্যাত কাজ উপহার দেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত তার Trolius and Cressida খুব বেশি জনপ্রিয় হয় নি। সৃজনশীলতা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে সময়ের সাথে সাথে তার মান বাড়তো। কিন্তু দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ তাদের মদ্ধবয়সে তাদের সৃজনশীলতার শীর্ষে উঠেছেন।
সৃজনশীল কাজের প্রতিক্রিয়া তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় না। এটা আপনি ওজন কমানোর প্রোগ্রামে কতটুকু সফল হয়েছেন তার জন্য ওজন চেক করার মতো নয়। একটা উপন্যাস লিখতে কিংবা গণিতের একটা সমীকরণ লিখতে একজনকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর যখন প্রতিক্রিয়া আসে তখন একেকজন সমালোচক একেকভাবে সমালোচনা করে। কোন সমালোচনা আসলেই কাজে লাগবে তখন তা বেঁছে নেয়া কঠিন হয়ে যায়। সৃষ্টিশীল কাজের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। আজ যে বইটা বেস্ট সেলিং পরের প্রজন্মের কাছে সেটা জঘন্য মনে হতে পারে। এমন চেলেঞ্জিং পথে শুধুমাত্র অনুশীলন খুব একটা কাজে দিবে না।
একটা মিথ আছে যে সৃজনশীলতার বিকাশের জন্যে কমপক্ষে দশ বছর সময় দরকার। কিন্তু কথাটি সত্য নয়। কিছু কিছু সুরকারের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে তারা দশ বছরের আগেই তাদের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকের দশ বছরের বেশি লেগেছে। সৃজনশীলতার কোন এক্সপায়ার ডেট নেই। সৃজনশীল কাজ তখনই হবে যখন সময় তার জন্যে প্রস্তুত।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিভার ভূমিকা আছে। কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে তাড়াতাড়ি শিখতে পারে। তবে কোন কিছুতে দক্ষতা অর্জন করাই মূল লক্ষ্য নয়। একজন সৃজনশীল মানুষ বাহ্যিক সকল জ্ঞান গ্রহণ করে যাতে সে যা কিছু বাহ্যিকভাবে পৃথিবীতে নেই তা সে সৃষ্টি করতে পারে!
ব্যক্তিত্ব সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। একেকজন মানুষ একেক রকম। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে সৃজনশীল মানুষের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা, স্বাধীনচেতা, নানা ধরণের অভিজ্ঞতা অর্জন, ঝুঁকি নেয়া এমনকি সামান্য মনোরোগও দেখা যায়। সৃজনশীলতার প্রতি ক্ষেত্রে তার নিজস্ব এক্স ফ্যাক্টর আছে। যেমন পদার্থবিজ্ঞানে শিল্পকলার চেয়ে বেশি আইকিউ দরকার।

জিনও সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। তবে তার মানে এই নয় যে জিন আমাদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। তবে তাতে জিনের প্রভাব রয়েছে এটুকু বলা যায়। সিমনটন এর মতে, সৃজনশীলতার উপর জিনের প্রভাব এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশ এর মতো! এক্ষেত্রে বলা যায়, ডারউইনের চাচাতো ভাই স্যার ফ্রান্সিস গাল্টন দেখিয়েছিলেন যে বেশিরভাগ বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা তাদের বাবা মায়ের প্রথম ছেলে।
সৃজনশীলতার উপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। সামাজিক, আর্থিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থা এই পারিপার্শ্বিকতার অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা তার শৈশবে রোল মডেল হিসেবে কাকে পাচ্ছে এবং বেঁছে নিচ্ছে তাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
সৃজনশীল মানুষদের ইন্টারেস্টের জায়গাটা ব্যাপক। যেমন যিনি সুরকার তিনি হয়তো শিল্পকলা পছন্দ করেন কিংবা লেখালেখি করেনও হয়তো বা। গ্যালিলিও এর পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলা, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এটা শুধু মাত্র অনুশীলন হলে অন্য ক্ষেত্রে ইন্টারেস্টের দরকার ছিল না।
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23d3d3d3%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(39.84476%20-42.78793%2054.97419%2051.19278%20157.4%2061.8)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23111%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-57.0084%2025.97629%20-107.7986%20-236.57826%2035.1%20141.6)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(26.46894%2030.88184%20-51.1759%2043.86305%20244%20163.8)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%230a0a0a%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-59.75077%20-76.3879%2019.29675%20-15.09396%20260.5%2036.8)%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অতিমাত্রায় অনুশীলন সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেখা গেছে প্রয়োজনের অতিরক্ত জ্ঞান আহরণ করলে ফিকশন লেখালেখিতে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কোন সমাজের বহিরাগতরাও সৃজনশীল হয়। সৃজনশীলতা যদি শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে হতো তাহলে তারা সৃজনশীল কাজ করতে পারতো না। কারণ বহিরাগতরা সুযোগ সুবিধা কম পান। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সুরকার Irving Berlin কিংবা চলচিত্রকার Ang Lee এর কথা।
সৃজনশীল মানুষেরা বাকিদের জন্যে নতুন পথের উন্মোচন করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে গ্যালিলিও এর কথা। তার আবিষ্কার ছিল প্লেটো এবং এরিস্টটল এর জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন গ্যালিলিও যদি তার পূর্বে তৈরি পথে কঠোর অনুশীলন করতেন তাহলে তিনি এই নতুন সত্য জগতের সামনে মেলে ধরতে পারতেন না। তিনি যা করেছেন তা তখনকার বিজ্ঞানীরা কেউ মেনে নেয় নি। কিন্তু তার সেই তৈরি পথেই পরবর্তীতে অনেক প্রতিভাবান মানুষেরা পৃথিবীকে নিত্যনতুন জ্ঞান উপহার দিয়েছেন।
এভাবেই সৃজনশীলরা তাদের পাগলামির মাধ্যমে জগতকে এমনভাবে দেখেন যেটা আগে কেউ দেখে নি। সৃজনশীলতাকে তাই আমাদের সঠিকভাবে বোঝা উচিত যাতে আমরা প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি আর এর মূল্য যে কতটুকু তার উপলব্ধি সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি।
মূল লেখাটি ((http://blogs.scientificamerican.com/beautiful-minds/creativity-is-much-more-than-10-000-hours-of-deliberate-practice)
ছবিসুত্রঃ ইন্টারনেট
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23080040%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(15.9203%2046.32409%20-243.29597%2083.61405%2097.3%2014.4)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%2343387b%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M121.3%2032.7H541V347H121.3z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%233678a3%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M122%20225.7l16-28.3-19.7-18.6v19.5z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%231d1155%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M102.3%2077l76-109.7-211%20111.8z%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
নিউটনের কামানে চড়ে কক্ষপথে
সৌরজগতের গ্রহগুলো নিজ নিজ কক্ষপথ ধরে সূর্যকে কেন প্রদক্ষিণ করে? একটি বস্তু কেন অন্য কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরবে? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তিত ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। তিনি এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও বের করেছিলেন। নিউটন দেখালেন গ্রহদের কক্ষপথগুলো মহাকর্ষ বল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই মহাকর্ষ বলের কারণেই আম গাছ থেকে পাকা আম পড়লে তা নিচে ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে। নিউটনের মহাকর্ষের তত্ত্বটি যখন আলোচিত হয় তখন প্রায় সময়ই তার মাথায় আপেল পড়ার গল্পটি চলে আসে। এটা প্রমাণিত সত্য যে নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার কাহিনীটি মিথ্যা।
যাহোক, গ্রহদের কক্ষপথে আবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি খুব উঁচু পর্বতের উপর একটি কামান কল্পনা করলেন। কল্পনায় যে পর্বতের উপরে পরীক্ষাটি করা হচ্ছে সেই পর্বতটি সমুদ্রের পারে অবস্থিত। কামানটির মুখ সমুদ্রের দিকে তাক করা। কামানে গোলা লোড করে দেয়া হোক আগুন। বুম করে গোলা বেরিয়ে যাবে সামনের দিকে।
কামান থেকে প্রচণ্ড গতি নিয়ে বের হবার কারণে গোলাটি ‘সোজা সামনের দিকে’ যাবে। আবার গোলাটির উপরে পৃথিবীর অভিকর্ষীয় আকর্ষণ কাজ করে, যা গোলাটিকে ‘সোজা নিচের দিকে’ নামিয়ে নিতে চায়। পৃথিবীর টান যেমন আম গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাকা আমকে সোজা নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে তেমন। কিন্তু গোলাটিতে একই সাথে দুটি বল কাজ করছে। সামনের দিকে যাবার জন্য প্রদত্ত গতির বল এবং পৃথিবী কর্তৃক আকর্ষণ বল। এই দুই বলের প্রভাবে গোলাটি ‘সোজা’ সামনের দিকেও যায় না, ‘সোজা’ নিচের দিকেও নামে না। মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। একটি অধিবৃত্তাকার (Hyperbolic) পথ রচনা করে বক্রভাবে সমুদ্রের বুকে নেমে আসে।
%22%20transform%3D%22translate(.8%20.8)%20scale(1.54297)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23727d7a%22%20cx%3D%22135%22%20cy%3D%2285%22%20rx%3D%2249%22%20ry%3D%2245%22%2F%3E%3Cellipse%20cx%3D%22105%22%20cy%3D%22215%22%20rx%3D%22224%22%20ry%3D%2250%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%23054b30%22%20d%3D%22M94.3%20195.4L41.8%2065.6l52-21%2052.4%20129.8z%22%2F%3E%3Cellipse%20cx%3D%2218%22%20cy%3D%2299%22%20rx%3D%2223%22%20ry%3D%22224%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
চিত্রঃ উঁচু পর্বতের উপর নিউটনের কাল্পনিক কামান
এখানে একটা জিনিস অনুধাবন করা খুবই জরুরী, গোলাটি হয়তো সোজা নিচের দিকে নামছে না, কিন্তু শুরু থেকেই আকর্ষণের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে এবং শুরু থেকেই নিচের দিকে পড়া শুরু করেছে। পড়াটা হয়তো ঠিক সোজা হয়নি কিন্তু সমস্ত সময়টাতেই নিচের দিকে পড়ছিল। এমনকি একদম শুরুর দিকে গোলাটির গতিপথ যেখানে ‘সোজা’ সামনের দিকে ছিল ঐ সময়টাতেও এটি নিচের দিকে নামছিল। পরবর্তী চিত্রে খেয়াল করলে দেখা যাবে, একদম শুরুর দিকের সামান্য কিছু অংশের গতিপথ দৃশ্যত সোজা। এর গতিপথ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে নিচের দিক বরাবর নেমে এসেছে। কার্টুনের দৃশ্যগুলোর মতো আকস্মিকভাবে নয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে কার্টুনের কাহিনীগুলোতে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের কোনো বালাই নেই। ‘টম এন্ড জেরি’ সহ অন্যান্য চরিত্রে কেউ কোনো অবলম্বন থেকে পড়ে গেলে কিছুক্ষণ শূন্যে আটকে থাকে। পরে ঐ চরিত্র যখন নিচের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করে যে আর রক্ষা নেই, এবার পড়তে হবেই, তখন ধাম করে পড়া শুরু করে!
%27%20fill-opacity%3D%27.5%27%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23795c39%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-85.0621%20-79.1248%2045.90065%20-49.3449%20376.3%20299.6)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23c9ffff%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(375.52586%201.0339%20-.19895%2072.25952%20178.3%2031.6)%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%235c9bcc%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M-22.8%20368.9l397.6%2026.5L180.4%20129z%22%2F%3E%3Cpath%20fill%3D%22%239ad7ff%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%20d%3D%22M-.5%20261.6l-26.6-125.3%20146.9-31.2%2026.6%20125.3z%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
চিত্রঃ কার্টুন চিত্রে প্রায় সময় পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়!
কামানের গোলাটি নিক্ষিপ্ত হবার পর থেকেই পড়া শুরু করলেও দৃশ্যত তা হয় না। গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গোলাটির শুরুর দিকের গতিপথ সোজা সামনের দিকে। এমনটা হবার কারণ, শুরুর দিকে গোলাটির সামনে যাবার বেগ অত্যন্ত বেশি। প্রথম দিকটায় গোলার বেগ খুব বেশি হবার কারণে পৃথিবীর আকর্ষণ বল এই তুলনায় অনেক কম প্রতিভাত হয়। তবে গতিটি সোজা দেখালেও একদম সোজা নয়। বলা যায় ‘প্রায়’ সোজা।
এবার আরো বড় ও আরো শক্তিশালী কামান দিয়ে পরীক্ষাটি করা হোক। বড় ও শক্তিশালী হলে কামান থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা আগের চেয়ে অধিক পথ অতিক্রম করতে পারবে। একদম সমুদ্রের মাঝখানে গিয়ে পড়বে। এবারেও গোলাটির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে নিচের দিকে কিছুটা বাক ঠিকই আছে। বাক থাকলেও এটি প্রথমটির মতো এতো বেশি নয়। এই গতিপথটি আগের থেকে তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে বাঁকা হয়ে নিচে এসে নেমেছে।
এবার এটির চেয়েও বেশি শক্তিশালী কামান দিয়ে পরীক্ষাটি করা হোক। এর গোলা নিক্ষিপ্ত হলে সমুদ্র পেরিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। এর গতিপথ খেয়াল করলে দেখা যাবে এটি যেন সোজা পথেই সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। মানে পৃথিবীর পৃষ্ঠের সাথে এর উচ্চতা কমেছে খুব ধীরে ধীরে। স্থূল চোখে দেখলে মনে হবে যেন পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা কমতেই চাচ্ছে না। অনেক অনেক দূর অতিক্রম করে খুব ধীরে ধীরে মাটিতে মিশেছে। এখানে উল্লেখ্য যে চিত্রে হয়তো আমরা গতিপথটিকে গোলাকার দেখছি, কিন্তু আদতে এর গতিপথ সোজা বলে বিবেচনা করতে হবে। গোলাটি যদি পৃথিবী পৃষ্ঠের সাথে সমান উচ্চতা বজায় রাখে তাহলে ধরতে হবে এটি সোজা এগোচ্ছে। পৃথিবী পৃষ্ঠের সাথে উচ্চতা কমে গেলে ধরতে হবে এর গতিপথ বেঁকে গিয়েছে। ক্ষুদ্র একটি পাতায় বিশাল পৃথিবীকে অঙ্কন করা হয়েছে বলে গতিপথকে গোল দেখাচ্ছে, বাস্তবে পরীক্ষাটি এমন হলে এবং বাস্তব চোখ দিয়ে দেখলে গোলাটির গতিপথ সোজাই দেখা যেতো।
গোলাটির গতিপথ সোজা দেখালেও সত্যিকার অর্থে এটি প্রতিনিয়তই একটু একটু করে পড়ছে। ঝামেলাটা বাধিয়েছে পৃথিবীর আকৃতি। পৃথিবী ফুটবলের মতো গোলাকার বলে ধীরে ধীরে বলটি নিচের দিকে পড়লেও পৃষ্ঠের সাপেক্ষে গোলাটির দূরত্ব কমছে খুব অল্প করে। যার কারণে গোলাটিকে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে। পড়ছেই পড়ছে, সমস্ত পৃথিবী ঘুরে ঘুরে পড়ছে।
এখন আগের দুটির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কামান কল্পনা করি। এবারের কল্পিত কামানটি আরো অনেক বেশি শক্তিশালী। কাল্পনিক চিন্তন পরীক্ষার জন্য চিন্তা শক্তির কোনো সীমা নেই। কল্পনার শক্তিকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে যেকোনো মাত্রার শক্তিশালী কামানকে কল্পনা করে নিতে কোনো বাধা নেই। এই কামান থেকে কোনো গোলা নিক্ষেপ করলে গোলাটি মাটিতে না পড়েই পুরো পৃথিবী চক্কর দিয়ে আগের জায়গাতে ফিরে আসতে পারবে। এই বেলাতেও গোলাটি ধীরে ধীরে পড়তে থাকবে, কিন্তু পৃথিবী গোলাকার হবার কারণে কোনোদিন এই পড়তে থাকা আর শেষ হবে না। এটি তার গতিপথ, পৃথিবীর গোল বক্রতার মতো করে রচনা করেছে, যার কারণে গোলাটির মাটি স্পর্শ করা হচ্ছে না। পড়েই চলছে কিন্তু শেষ হচ্ছে না।
গোলাটির এই গতীয় পরিস্থিতিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। গোলাটি যে গতিপথ রচনা করছে সেটা তার কক্ষপথ। এটি চাঁদের মতো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কোনো ঝামেলার সৃষ্টি না হলে এটি আজীবন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেই যাবে। যদিও বায়ুমণ্ডলের বাতাস ধীরে ধীরে এর গতি কমিয়ে দিবে। কিন্তু আমাদের চিন্তন পরীক্ষায় বায়ুর বাধাহীন পরিবেশ কল্পনা করে নিয়েছি।
আমরা ‘স্যাটেলাইট’ বলে যে কৃত্রিম উপ-গ্রহের কথা শুনি এগুলো আসলে নিউটনের এই চিন্তন পরীক্ষার উপরে ভিত্তি করেই তৈরি। প্রতিটা স্যাটেলাইট পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে, প্রতিনিয়ত অল্প অল্প করে পড়ছে কিন্তু তাদের পড়ন্ত অবস্থা কখনো শেষ হচ্ছে না। এই ‘অনন্ত পড়ন্ত অবস্থা’য় এদের আটকে রাখা যাচ্ছে বলেই এদেরকে উপরে ধরে রাখতে আলাদা কোনো খুঁটি বা থামের প্রয়োজন হচ্ছে না। এই স্যাটেলাইটগুলো আছে বলেই আমরা ফোনে কথা বলতে পারছি, টিভি দেখতে পারছি, আবহাওয়ার খবর পাচ্ছি। যদি নিউটনের খুটিবিহীন ঝুলে থাকার এই পরীক্ষাটি যদি কাজ না করতো তাহলে কী ঝামেলাতেই না পড়তে হতো।
%22%20transform%3D%22translate(1.2%201.2)%20scale(2.33594)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23f1f2f1%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(90.19904%20-.33153%20.15885%2043.21708%20122.8%20102)%22%2F%3E%3Cpath%20d%3D%22M8.7-52.6l253.6%2026.7-9%2086.5L-.3%2033.9z%22%2F%3E%3Cellipse%20cx%3D%22243%22%20cy%3D%2226%22%20rx%3D%2243%22%20ry%3D%2261%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23e9e9e8%22%20cx%3D%22140%22%20cy%3D%22116%22%20rx%3D%2248%22%20ry%3D%2240%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
চিত্রঃ স্যাটেলাইট, বছরের পর বছর কোনো খুটি ছাড়াই আটকে থাকে আকাশের বুকে।
টেলিফোন লাইন কিংবা টেলিভিশন সিগনালের জন্য স্যাটেলাইটগুলোকে ভূ-স্থির কক্ষপথে রাখতে হয়। ‘ভূ-স্থির কক্ষপথ’ এক ধরনের বিশেষ কক্ষপথ। এই ধরনের কক্ষপথে স্যাটেলাইটগুলো প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় একবার করে পৃথিবীকে আবর্তন করে। অন্যদিকে পৃথিবীও প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় নিজের অক্ষের উপর একবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। ফলে হয় কি, পৃথিবীর ভূমির তুলনায় দেখা যায় স্যাটেলাইট তার আগের জায়গাতেই রয়েছে। নড়েনি একটুও। পৃথিবী ও স্যাটেলাইট একই হারে ঘুরছে বলে আপেক্ষিকভাবে একটির সাপেক্ষে আরেকটিকে স্থির বলে মনে হয়। স্যাটেলাইট চলছে ঠিকই, কিন্তু ভূমির তুলনায় স্থির, এমন ধরনের কক্ষপথকে ভূ-স্থির কক্ষপথ বলে। যে সকল স্যাটেলাইট ভূ-স্থির কক্ষপথে চলে তাদের বলে ভূ-স্থির উপগ্রহ।
এই কক্ষপথের সুবিধাটা কী একটু ভেবে দেখি। যদি এই উপগ্রহগুলো ভূমির সাপেক্ষে স্থির হয় তাহলে ভূমির কোনো একটি স্থান হতে এরা সবসময় একই দিক বরাবর থাকবে। এসকল উপগ্রহ থেকে তথ্য পেতে হলে ভূ-পৃষ্ঠের কোনো একটি স্পট থেকে নির্দিষ্ট দিকে এন্টেনা তাক করলেই হবে। যেহেতু ভূমির সাপেক্ষে এর অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছে না তাই এন্টেনার অবস্থানও পাল্টাতে হবে না, এন্টেনার দিকও পাল্টাতে হবে না। তথ্য আদান-প্রদানের রাস্তা অপেক্ষাকৃত ঝঞ্ঝাটহীন হবে।
বিঃ দ্রঃ এই লেখাটি রিচার্ড ডকিন্সের চলমান ভাবানুবাদকৃত বই “বাস্তবতার যাদু“র অংশ।
অন্যান্য তথ্যসূত্রঃ
- The Magic of Reality: How we know whats really true, Richard Dawkins, Free Press, New York, 2011
- Wikipedia: /Newton’s_cannonball
- Sir Isaac Newton: The Universal Law of Gravitation, http://csepphys.utk.edu/astr161/lect/history/newtongrav.html
- পদার্থবিদ্যার মজার কথা, ইয়াকভ প্যারেলমান, অনুপম প্রকাশনী
%22%20transform%3D%22translate(2.3%202.3)%20scale(4.66406)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23776cb4%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(148.7%2052%2025.8)%20scale(36.2101%2036.94764)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23eff0ec%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-38.07402%20-62.13116%20217.42326%20-133.23714%20197.4%20107.1)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23b3b4b0%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22rotate(-162.1%207.5%2048)%20scale(41.3389%20254.99998)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23afafb3%22%20cx%3D%22105%22%20cy%3D%2255%22%20rx%3D%2243%22%20ry%3D%2220%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
ভ্যাকসিন, ব্যাকটেরিয়া এবং আমরা
বিশ্বজুড়ে পাবলিক হেলথের প্রধান অবলম্বন হল শিশুদের দেয়া ভ্যাকসিন । কিন্তু ভ্যাকসিন সব শিশুর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয়না । কেন হয়না? অন্ত্রে বাস করা অনুজীব এক্ষেত্রে একটা বড় কারণ হতে পারে।
২০০৬ সালে ওরাল ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগে ব্যাপকভাবে বাচ্চাদের মধ্যে রোটাভাইরাস (Rotavirus) সংক্রমণ হত । এর ফলে বাচ্চাদের প্রচন্ড ডায়রিয়া হত। জীবনাশংকা সৃষ্টিকারী এই পানিশূণ্যতার কারণে সারাবিশ্বে এখনো প্রতিবছর সাড়ে চার লক্ষ্যের বেশি শিশু মারা যায়। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকায়।
কারণ ভ্যাকসিন সবসময় কাজে আসে না । আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির ভেনিসা হ্যারিস খুঁজে বের করতে চাইলেন কেন এই অঞ্চলের শিশুরা এত উচ্চমাত্রার নন-রেসপন্ডার ( ভ্যাকসিনে সাড়া দেয়না ) ।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সম্ভবত এইসব শিশুদের বৃহদান্ত্রে বসবাসকারী জীবাণুদের একটা ভূমিকা আছে। ভেনিসা, তার সহকর্মীরা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সম্বনয়কারীগণ ৬৬ জন পাকিস্তানি শিশু এবং ৬৬ জন ডাচ শিশু নিয়ে গবেষণা করেন যারা সবাই ওরাল রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন নিয়েছিল । নেদারল্যান্ডসের অধিকাংশ শিশুর থেকে আশার চেয়েও বেশি প্রতিরক্ষা সাড়া (Immune response ) পাওয়া যায়। কিন্তু মাত্র ১০ জন পাকিস্তানি শিশু সাড়া দেয়।
%22%20transform%3D%22translate(1.4%201.4)%20scale(2.8125)%22%20fill-opacity%3D%22.5%22%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23b8e9da%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-237.2197%20.32599%20-.02809%20-20.43784%20129%2013.2)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ab5473%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(81.28697%20-34.74031%2023.58278%2055.18007%2069%20108.7)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%237b908a%22%20rx%3D%221%22%20ry%3D%221%22%20transform%3D%22matrix(-88.52164%20-2.80976%20.7128%20-22.45652%20178.4%2041)%22%2F%3E%3Cellipse%20fill%3D%22%23ea997f%22%20cx%3D%22169%22%20cy%3D%22164%22%20rx%3D%2235%22%20ry%3D%2274%22%2F%3E%3C%2Fg%3E%3C%2Fsvg%3E)
প্রত্যেক শিশুর থেকে পূর্বে সংগৃহীত স্টুলের নমুনার জেনেটিক স্ক্যান থেকে দেখা যায় যে, সাড়াদানকারী শিশুরা তাদের আন্ত্রিক অঞ্চলে অনেক বৈচিত্র্যময় জীবাণুকে আশ্রয় দেয় ।
এর মধ্যে প্রোটোব্যাকটেরিয়া গ্রুপের অনেক জীবাণুও ছিল।
অনেক আদিকোষী ব্যাকটেরিয়া চালিত হয় লেজের মতো ফ্ল্যাজেলার সাহায্যে । এই লেজে থাকে ফ্ল্যাজেলিন নামক প্রোটিন যা প্রতিরক্ষাদানকারী কোষকে কাজ করার শক্তি দেয় । “শরীরে এই ধরনের আধিক্য একটা স্বাভাবিক অনাক্রম্যতা গড়ে তোলে এবং ভ্যাকসিন এখান থেকে শক্তি পায়” – বলেন বালি পুলানড্র্যান । ইনি হলেন ইমোরি ইউনিভার্সিটির একজন ইমিউনোলজিস্ট । কলোরাডোয় অনুষ্ঠিত কিস্টোন সিম্পোজিয়ার একটি সম্মলনে ভেনিসার গবেষণাপত্রটি প্রদর্শিত হয়। পুলানড্যান এতে যুক্ত ছিলেন না ।
তবে গত বছর পুলানড্যান এবং তার সহকর্মীরা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের সফলতার ক্ষেত্রে ফ্ল্যাজেলাওয়ালা ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা দেখান ।
তিনি জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বসবাসকারী কিছু ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করেন। এই ইঁদুরগুলোর অন্ত্রে কোনো ব্যাকটেরিয়া ছিল না ।
তাদের মধ্যে ফ্ল্যাজেলাহীন ব্যাকটেরিয়ার অণুপ্রবেশ ঘটানো হয়। ফলাফল – তারা এন্টিবডি উৎপন্ন করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, ব্যাকটেরিয়া অনুপ্রবেশকৃত সাধারণ ইঁদুররা স্বাভাবিক শক্তিশালী অনাক্র্যমতা গড়ে তোলে । তাদের দলের মানুষের উপর একটি ছোট্ট গবেষণা দেখাতে পারে যে তিনটি ভিন্ন ব্রডস্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক (একটি অ্যান্টিবায়োটিক একাধিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে ) নেয়া মানুষের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব একইরকম।
২০১৪ সালে পেডিয়াট্রিকসে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায় যে, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া বাংলাদেশী শিশুদের ধনুষ্টংকার, যক্ষ্মা এবং ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের সাথে আন্তঃসম্পর্কিত ।
সবমিলিয়ে অনুজীব নিয়ে এইসব গবেষণায় দেখা যায় যে,আমাদের শরীরের স্বদেশী ব্যাকটেরিয়াসমূহই আমাদের ভ্যাকসিনের প্রতি প্রতিরক্ষা সাড়া নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে।
এই আবিষ্কার শেষ পর্যন্ত মাইক্রোবায়োম স্ক্রিন ( কোনো রোগলক্ষণ ছাড়া যে কৌশলের সাহায্যে নতুন কোনো রোগ নির্ণয় করা হয় ) এবং বিশেষত ভ্যাকসিন নেয়ার পূর্বে উপকারী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা তৈরীকৃত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের কতদুর নিয়ে যাবে তা দেখার বিষয় ।
সবকিছুর পরেও আমাদের শরীরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবগুলো নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীদেরকে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধনে সাহায্য করতে পারে। আর এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই পারে হাজার হাজার জীবন রক্ষা করতে।
তথ্যসূত্রঃ Our Personal Vaccine Helpers, Katherine Harmon Courage, Scientific American Magazine.




























