মেডুসয়েড: ইঁদুরকোষ থেকে তৈরি এক কৃত্রিম জেলিফিশ

Share
   
পাঠ সংখ্যা : 301

মেরী শেলীর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নিশ্চয়ই অনেকে পড়েছেন। প্রাণ আসলে কি? প্রাণকে কি কখনো বোঝা যাবে? তৈরি করা যাবে কৃত্রিম ভাবে? এই প্রশ্নগুলো নানা পদের মানুষকে ভাবিয়েছে, অনেক সময় বিব্রতও করেছে। কিন্তু বিজ্ঞানকে কখনোই নিবৃত্ত করা যায় নি মানুষের ক্ষমতা কতদূর তা আরেকবার যাচাই করে দেখতে। ক্রেইগ ভেন্টরের কৃত্রিম প্রাণ আসলেই কৃত্রিম ‘প্রাণ’ কি না, এ বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সমালোচনা করেন। তাই বলে কৃত্রিম জীবন নিয়ে গবেষণা থেমে থাকে নি। সম্প্রতি এই ধারাবাহিকতায় মাইল ফলক হিসেবে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের কোষ থেকে তৈরি করলেন কৃত্রিম জেলিফিশ।

জীববিজ্ঞানে যারা কারিগরীবিদ্যা ফলান, তাদের বলা যায় জৈবকারিগর বা বায়োইঞ্জিনিয়ার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জৈবকারিগর এই কৃত্রিম জেলিফিশ তৈরি করেছেন ইঁদুরের হৃদকোষ ও সিলিকন ব্যবহার করে। এই কৃত্রিম সৃষ্টিকে তাঁরা নাম দিয়েছেন মেডুসয়েড। এই মেডুসয়েডকে কোন বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের মধ্যে রাখলে দেখা যায় সে ঠিক জেলিফিশের মতোই সাঁতরে বেড়াচ্ছে! এই গবেষণার নের্তৃত্ব দিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিট পার্কার। তিনি বলছেন: ‘শারীরতাত্ত্বীকভাবে আমরা একটা জেলিফিশ তৈরি করছি। যদি এর কাজ-কর্ম দেখেন, তাও এটি জেলিফিশ। তবে জেনেটিক্স অনুযায়ী, এটা একটি ইঁদুর!’

সিলিকন আর ইঁদুরের কোষ দিয়ে তৈরি কৃত্রিম জেলীফিশ

Loading...

পার্কার মূলত কাজ করেন মানুষের হৃদকলা (হার্টটিস্যু) -র কৃত্রিম মডেল নিয়ে। মেডুসয়েড তৈরি করার পেছনে একটা বিশেষ লক্ষ্য আছে তাঁর। মেরুদন্ডী প্রাণীদের হৃদপিন্ড আসলে একটা পাম্পের মতো। মানব হৃদপিন্ডের পাম্প (মাসকুলার পাম্প) আসলে কিভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য এই মেডুসয়েডের তৈরি। আসলে সকল বিজ্ঞানী/কারিগরেরা এভাবেই অগ্রসর হন। তাঁরা যে কোন কিছুর মৌলিক নীতিটা প্রমাণ চেষ্টা করেন একটি মডেল তৈরির মাধ্যমে। মেডুসয়েডও একধরনের মডেল।

২০০৭ সালে পার্কার মাসল-পাম্প কিভাবে কাজ করে বোঝার জন্য মডেল খুঁজছিলেন। তখন জেলিফিশের প্রদর্শনী দেখে এই বুদ্ধিটা আসে তাঁর মাথায়। এই প্রজেক্টের বেশিরভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন জানা নওরোথ। তিনি মুন জেলীফিশের (Aurelia aurita) সব কোষগুলো ম্যাপ করা শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিলো বোঝা যে জেলীফিশেরা কিভাবে সাঁতার কাটে। মুন জেলিফিশ মাত্র এক-স্তরের পেশি দিয়ে তৈরি। এই পেশিস্তর ফাইবার দিয়ে কেন্দ্র বরারবর সজ্জিত থাকে। সাঁতার কাটার জন্য জেলিফিশের এই পেশিস্তরে কেন্দ্র থেকে একটি সংকোচন ছড়িয়ে পড়ে প্রান্ত বরাবর। ঠিক যেভাবে পুকুরে একটি ঢিল একটা তরঙ্গ তৈরি করে, সেভাবে বৈদ্যুতিক সিগনাল এই বেশিস্তর বরাবর ছড়িয়ে পড়ে।

জেলিফিশের মতো হৃদপিন্ডেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। একটি বৈদ্যুতিক সিগনাল ছড়িয়ে পড়ে এবং মাসকুলার পাম্পে সংকোচন ঘটায়। পার্কার হৃদপিন্ডের এই মডেলটিই তৈরি করতে চাচ্ছিলেন। নওরোথ প্রথমে সিলিকনের একটি যৌগ পলি-ডাই-মিথাইল-সিলোক্সানের নির্দিষ্ট সজ্জার একটি শিট নেন। এই শিটের উপরে তিনি ইঁদুরের হৃদপেশির একটি স্তর তৈরি করেন। বিদ্যুতক্ষেত্রের মাঝে রাখলে এই হৃদপেশী দ্রুত সঙ্কুচিত হয়। এই সঙ্কোচন জেলিফিশের মতোই। ইলাস্টিক সিলিকনের স্তর সঙ্কুচিত হৃদপেশীস্তরকে আগের অবস্থায় নিয়ে যায়। পানিতে দুইটি ইলেকট্রোডের মধ্যে রাখলে মেডুসয়েড সত্যিকারের জেলিফিশের মতোই সাঁতার কাটে। এমনকি জেলিফিশ তার মুখের দিকে যেভাবে পানির-তরঙ্গ তৈরি করে খাবার খায়, সেরকম জলতরঙ্গও তৈরি করে মেডুসয়েড।

Loading...

পার্কার বলেন, ‘আমরা কৃত্রিম জীববিজ্ঞানকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছি। এর আগে জীবিত কোষের মধ্যে নতুন জিন প্রবেশ করানোকেই বলা হতো কৃত্রিম জীবনের মতো কিছু একটা। আর আমরা প্রাণী তৈরি করেছি। এটা কেবল জিন নয়, বরং শারীরতত্ত্ব এবং কাজ নকল করা।’

উপরের লেখাটি নেচার নিউজে প্রকাশিত প্রবন্ধের অনুবাদ। নেচার নিউজে মার্কো গাইলেন নামে এক ভদ্রলোক মন্তব্য করছেন, প্রাসঙ্গিক মনে ভাবানুবাদ হওয়ায় নিচে দিয়ে দিলাম:

‘মেডুসয়েড কি জীবিত? প্রাণীদের দেহে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদাভাবে জীবিত ধরা হলে এটাকেও জীবিত বলা যায়। মেডুসয়েডকে হয়তো একটি জীব বলা যাবে না, তবে অঙ্গ বলা যেতে পারে। … যেহেতু এর একটি বিদ্যুত ক্ষেত্র লাগে, তাই বলা যায় এক অর্থে মেডুসয়েড ‘খেতে’ পারে বা শক্তি অর্জন করতে পারে। অবশ্য এই শক্তি অর্জন বা ‘খাওয়া’ অন্যান্য জীবের মতো নয়। তবে খাদ্য গ্রহণ জীবের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। সে হিসেবে মেডুসয়েডের সাথে বড় পার্থক্য দেখি না। জীবনের একটি শর্ত হলো প্রজনন, যে ক্ষমতা মেডুসয়েডের নেই। খচ্চরও তো প্রজননশীল না, তবুও তাকে আমরা জীবিত ধরি। … আবার এখানে যে পালস দেয়া হয়, এই পালস অবশ্যই হৃদকোষের, জেলিফিশের পালস না। সে হিসেবে এটা কৃত্রিম জেলীফিশ নয়। তবে অন্তত মেডুসয়েড একটি কৃত্রিম অঙ্গ, যা মানুষের চোখে জেলিফিশের মতোই লাগবে। আর এটির প্রাণ কৃত্রিমভাবে তৈরি নয়, বরঙ জীবিত ইঁদুর কোষ এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এটাকে আক্ষরিক অর্থে কৃত্রিম জীবন বলা যাবে না …’

 

মূল লেখা: http://www.nature.com/news/artificial-jellyfish-built-from-rat-cells-1.11046

ছড়িয়ে দেয়ার লিঙ্ক: https://bigganblog.org/2012/08/মেডুসয়েড-ইঁদুরকোষ-থেকে-ত/

আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি গবেষক। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

অন্যান্য লেখা | অন্তর্জাল ঠিকানা
0 0 ভোট
Article Rating
আলোচনার গ্রাহক হতে চান?
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

7 Comments
পুরানো
নতুন সবচেয়ে বেশি ভোট
লেখার মাঝে মতামত
সকল মন্তব্য