কালপুরুষ

পাঠসংখ্যা: 👁️ 3,065

রাতের আকাশ বড়ই সুন্দর।বিশেষ করে শীতের সময়ে তাকে আরো ভয়াবহ সুন্দর লাগে। তারাগুলো দেখে মনে হয় তারা যেন বিভিন্ন মজাদার আকার ধারণ করে। কখনো সিংহ, কখন বিছা; আরো কত কি! তেমনি আজ বলবো একটি মজাদার আকৃতির কথা। তার নাম কালপুরুষ। একে ইংরেজিতে Orion বলা হয়। একে দেখতে অনেকটা শিকারির মত মনে হয়। তার এক হাতে ঢাল আর আরেক হাতে মুগুর। কটিতে রয়েছে খাপ খোলা তলোয়ার।

গ্রিক মিথোলজিতে কালপুরুষ

গ্রিক মিথোলজিতে এর একটা মজার কাহিনী আছে। গ্রীক দেবী আর্তেমিস হলো মৃগয়া, বন্য জন্তু, তেপান্তর, শিশু জন্ম, কুমারীত্ব, কিশোরীদের রক্ষাকারী, মেয়েদের রোগদাত্রী ও রোগ মুক্তি দানকারী। চন্দ্রদেবী সেলেনার পাশাপাশি চাঁদের দেবী হিসেবে তাকেও ভাবা হয়। হরিণ ও সাইপ্রেস বৃক্ষ ছিলো তার কাছে ঐশ্বরিক ও পূজনীয়। যৌবন প্রাপ্ত অস্পর্শিত দেবী আর্তেমিস কোন পুরুষকে তার কাছে ঘেষতে দিতো না। দেবী আর্তেমিসের প্রতি অনেক দেবতা ও মানুষ আকর্ষিত ছিলো। কিন্তু শুধুমাত্র তার শিকারের সঙ্গী ওরিয়ন আর্তেমিসের হৃদয় জয় করতে পেরেছিলো। এপোলো প্রেমের এ খবর শুনার পর ক্রোধ দমন করতে পারলো না; কারণ আর্তেমিস প্রেমে পড়েছিলো একজন মরণশীল সাধারণ মানুষের। এপোলো সংকল্প করলো যে, সে এই প্রেমকে আর অগ্রসর হতে দেবে না। এপোলো একটি বৃশ্চিক বা বিচ্ছু পাঠালো ওরিয়নকে হত্যা করার জন্য।

ওরিয়ন তার সমস্ত তীর দিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত তরবারি দিয়ে দৈত্যকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। তারপর নিজেকে বাঁচাতে ওরিয়ন সাগরে ঝাঁপ দিলো এবং সাঁতার কাটতে থাকলো। এরপর আর্তেমিস তীর-ধনুক হাতে যখন সে স্থানে উপস্থিত হলো তখন দেবতা এপোলো তাকে বিভ্রান্ত করলো। সে আর্তেমিসকে বললো – তুমি সাগরে যে কালো বুদ্বুদ ডুবতে ও ভাসতে দেখছো ওটা একটা জঘন্য ব্যক্তির মাথা; সে তোমার একজন কুমারীকে ধর্ষণ করেছে, হত্যা করো তাকে। আর্তেমিস বিশ্বাস করলো এপোলোর কথা, তীর ছুড়লো জলে ভাসা মাথা লক্ষ্য করে। তীর ছুড়ে হত্যার পর সে আবিষ্কার করলো – এ আর কেউ নয়, তার প্রিয় ওরিয়ন। তারপর আর্তেমিস প্রিয় মৃত ওরিয়নকে আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জে স্থান করে দিলো এপোলোর হিংসা ও মিথ্যাকে অমর করে রাখতে। এপোলোর সে বৃশ্চিকটিরও স্থান হলো আকাশে, এখনো সে তাড়া করে ফেরে ওরিয়ন বা কালপুরুষ নামের নক্ষত্রপুঞ্জকে। আকাশের দুই জায়গায় বা মেরুতে স্থান দেয়া হয়েছে তাদের, যাতে করে তারা কখনো আর যুদ্ধে লিপ্ত না হতে পারে।

নক্ষত্রমন্ডলীর নামকরণ ও পৌরাণিক উপাখ্যান️
ধনু মন্ডল (Sagittarius)
মহাকাশে আবর্জনা: ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ
কালপুরুষ তারামন্ডলীর মানচিত্র
কালপুরুষ তারামন্ডলী

কালপুরুষ মন্ডলীতে কি কি তারা আছে

এ মন্ডলের তারাগুলোকে একটু চেনা যাক তাহলে।

  1. ল্যাম্বডা অরিয়নিস (Meissa) হল কালপুরুষের মাথা। অবশ্য আর্দ্রার উত্তরে বেশ কয়েকটি তারা দেখা যায় যার সবকটিই মাথা গঠন করে। বাংলায় এদের একত্রে মৃগশিরা বলা হয়।
  2. জেটা অরিয়নিস (Alnitak – ঊষা), এপসাইলন অরিয়নিস (Alnilam – অনিরুদ্ধ) এবং ডেল্টা অরিয়নিস (Mintaka – চিত্রলেখ) নামক তারা তিনটি পূর্ব আকাশে লুব্ধকের সামান্য উত্তর-পশ্চিমে থাকে এবং এই যুক্ততারাটি (Asterism) কালপুরুষের কোমরবন্ধ গঠন করে। এই তারাসমষ্টিটি এক সরলরেখায় উত্তর-পশ্চিম থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে মুখ করে অবস্থান করে। সর্ব উত্তরে চিত্রলেখ এবং সর্বদক্ষিণে ঊষা অবস্থান করে।
  3. আলফা অরিয়নিস বা আর্দ্রা তারাটি এর ডান কাঁধে অবস্থিত। এটি লাল বর্ণের তারা যার ব্যস শুক্র গ্রহের চেয়ে বেশি। কোমরবন্ধের তারাসমষ্টিটির উত্তরে দুইটি তারা আছে এবং এদুটির মধ্যে পূর্বদিকের তারাটিই হল আর্দ্রা। এটি কালপুরুষ মন্ডলের প্রথম তারা হলেও বাণরাজা (Rigel) অপেক্ষা মৃদু।
  4. গামা অরিয়নিস (Bellatrix – কার্তিকেয়) তারাটি এর বাম কাঁধে অবস্থিত। আর্দ্রার পশ্চিম দিকে তাকালে অতি সহজেই তারাটি চোখে পড়ে। এর অপর নাম হচ্ছে নারী যোদ্ধা বা Warrior woman।
  5. কার্তিকেয়’র পশ্চিমে ছোট ছোট কয়েকটি তারা ধনুকের আকৃতি ধারণ করে আছে দেখা যায়। এগুলো কালপুরুষের হাতের দন্ডের আকার দেয়।
  6. কাপ্পা অরিয়নিস (Saiph – কার্তবীর্য) ডান পায়ের হাটুর তারা। কোমরবন্ধের নিচে পূর্বদিকে এর অবস্থান।
  7. বিটা অরিয়নিস (Rigel – বাণরাজা) বাঁ পায়ের তারা যা কোমরবন্ধের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এটি একটি অতিদানব নীলাভ-সাদা তারা। আকাশের উজ্জ্বলতম তারাগুলোর অন্যতম।
  8. আইওটা অরিয়নিস (Hatsya) তারাটি কালপুরুষের তরবারির ডগায় অবস্থিত।
  9. ইটা অরিয়নিস তারাটি ডেল্টা অরিয়নিস এবং বাণরাজা তারাদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।
কালপুরুষ নীহারিকা

আকাশে কালপুরুষকে চেনার সহজ উপায় আছে। দক্ষিণ এর আকাশে প্রথমে খুজতে হবে একটি সামন্তরিক এবং এর মাঝ বরাবর থাকবে পরপর তিনটি উজ্জ্বল তারা। ছবিতে ভালোভাবে দেওয়া আছে। একবার চিনতে পারলে সহজে এটা চোখে পড়বে।

রেফারেন্সঃ

উইকিপিডিয়ায় কালপুরুষ নিবন্ধ

Sakib Shahriar
খুবই সাদা মনের মানুষ।