উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সবার ধারনা ছিল মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সব কিছুই আসলে অ্যান্টিবডির জারিজুরি। ল্যাবরেটরিতে কিংবা হাসপাতালে দৈবাৎ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটত যার ব্যাখ্যা অ্যান্টিবডির ধারনা ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব হতোনা, তখন তারা ভেবে নিতো যে হয়তো অ্যান্টিবডি নিয়েই এখনো অনেক কিছু জানেন না তাই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।

তবে ১৯৫০ সালের দিকে ব্যতিক্রমের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে আর উপেক্ষা করা গেলনা। যেমন একজনের অঙ্গ আরেক জনের দেহে প্রতিস্থাপনের কথাই ধরা যাক। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ সহ কিছু ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মিল না থাকলে গ্রহীতার দেহ প্রতিস্থাপনটি গ্রহণ করতে পারেনা। প্রতিস্থাপিত টিস্যু কিংবা অঙ্গ যখন শরীর গ্রহণ করতে পারেনা তখন সেই দেহকলাকে বহিরাগত ভেবে নিয়ে তার বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। যদিও কোন অ্যান্টিজেন নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি দেহে একবার তৈরি হলে তা সাধারণত বাকী জীবন ওই অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে থাকে, এমনকি সেই অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস যদি এমন কেউ, যার দেহে সেই অ্যান্টিবডি নেই , গ্রহণ করে তখন সে-ও সুরক্ষিত হতে যায়। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা কেমন গোলমেলে।

ধরা যাক ক এবং খ দুটি ভিন্ন জাতের ইদুর। যখন ক ইঁদুরের দেহে খ ইঁদুর থেকে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পূর্ণ অংশটা প্রত্যাখ্যান(Graft Rejection) হতে ১১ থেকে ১৩ দিন লাগে। একই পরীক্ষা দ্বিতীয় বার করা হলে সময় লাগলো ৫ থেক ৭ দিন। সবাই ভাবল ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনা। তবে প্রত্যাখ্যান যদি আসলেই অ্যান্টিবডির কারণে হয়ে থাকতো, ক ইঁদুরের রক্ত রস নিয়ে তারই কোন আত্নীয়ের দেহে ঢুকানো হলে এবং তারপর খ ইঁদুরের চামড়া প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হলে ৫ থেকে ৭ দিন লাগার কথা। কিন্তু, এবারও ১১ থেকে ১৩ দিন লাগলো।

ঘটনা এমন দাঁড়ালো যে যদিও প্রতিস্থাপিত দেহকলা প্রত্যাখ্যানের সময় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের পেছনে তেমন একটা প্রভাব রাখেনা। ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ইমিউনলজিতে এটা একটা বড় সমস্যা ছিল বহুবছর, এমনকি এর জন্য অনেকের মনে সন্দেহ হতে থাকে আসলেই দেহকলা প্রত্যাখ্যানে ইমিউন সিস্টেমের হাত আছে কি না। কেউই ইমিউন সিস্টেমের নতুন কোন পদ্ধতি খুঁজতে তৈরি ছিলোনা, কারণ কেউই জানতোনা যে আসলে কি খুঁজতে হবে। কিন্তু কিছু একটা যে রয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ বিভিন্ন উৎস থেকে সামনে আসতে থাকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণের উৎস কিন্তু মানুষ নয়, এমনকি ইঁদুর ও নয়। তবে? মুরগী!
ব্রুস গ্লিক নামের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আগ্রহী হলেন মুরগীর পরিপাক তন্ত্রের লেজের দিকে এপেন্ডিক্সের ন্যায় থলেটির ব্যাপারে, যার নাম বার্সা অব ফ্যাব্রিসিয়াস। এনাটমিতে নব্য আবিষ্কৃত কোন বস্তুর অস্তিত্বের হেতু বুঝা না গেলে তাকে আবিষ্কারকের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দেয়া হতো।
এই জিনিসটার প্রথম বর্ণনা দেন হেরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস, এবং তার পরে এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি। গ্লিক চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভরসা রেখে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থেকে বার্সা ফেলে দিলেন(Bursectomy), এবং অপেক্ষা করলেন কি হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার অন্তর্গত মুরগির সাথে সাধারণ মুরগির কোন পার্থক্য না দেখে তিনি হতাশ হলেন, এবং যেহেতু মুরগিগুলোতে কোন দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি নাই তাই সেগুলা স্টকে ফেরত দিয়ে দিলেন।

গ্লিকেরই আরেক বন্ধু, নাম টনি চ্যাঙ্গের কিছু মুরগি দরকার পড়লো সেই সময়েই। যা দিয়ে অ্যান্টিবডি উৎপাদন পরীক্ষা করে দেখাবেন অন্য ছাত্রদের। পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি গ্লিকের বার্সেক্টমাইজড মুরগি গুলোই নিলেন। কিন্তু তাকেও হতাশ করে দিয়ে মুরগিগুলো যথেষ্ট বড়সড় হবার পরেও অ্যান্টিজেনের বিপরীতে কোন অ্যান্টিবডি তৈরি করলোনা। এই পর্যায়ে যেকেউই হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের গুষ্টি উদ্ধার করে মুরগিগুলো খেয়ে নিতেন। কেননা উচ্চতর অধ্যয়নরত ছাত্রদের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তাদের এক্সপেরিমেন্ট সর্বদাই ভুল হয়, এবং তারা সর্বদাই ক্ষুধার্ত। কিন্তু এই দুই পাণ্ডব বাড়তি খাবারের বাইরেও বিশাল এক সম্ভাবনার আঁচ করতে পারলেন।

তারা আরেক সহকর্মীর সাথে আরও কিছু পরীক্ষা চালালেন যা থেকে প্রথম বারের মত বুঝা গেলো অ্যান্টিবডি তৈরিতে বার্সার ভূমিকা, যা আগে কেউ জানতোনা। একসাথে বসে তারা যে প্রবন্ধটি লিখলেন সেটা ইমিউনলজির ইতিহাসে একটা মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সেটার জন্য তৈরি ছিলোনা তখনো। স্বনামধন্য জার্নাল সায়েন্স এর সম্পাদকরা এটি ফিরিয়ে দেন ‘আগ্রহোদ্দীপক নয়’ বলে। শেষ পর্যন্ত পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নালে প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেও বেশ কয়েক বছর সেটা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। কিন্তু যখন ইমিউনোলজিস্টরা এই জার্নালটির খোজ পেলেন, সেটা হয়ে গেলো ইতিহাসের অন্যতম সংখ্যক উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।
ওনাদের পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি কিন্তু এটা নয় যে বার্সেক্টমাইজড মুরগী অ্যান্টিবডি তৈরিতে অক্ষম। তারা দেখলে যে অ্যান্টিবডি ছাড়াও মুরগীগুলো ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত এবং দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলাফল এটাই বলে যে অ্যান্টিজেনের সাথে বোঝাপড়ার জন্য অ্যান্টিবডিই একমাত্র উপায় নয় এবং অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতিতেও অপ্রতিম দেহকলা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল মানুষকে প্রভাবিত করলো যেন তারা ইমিউন সিস্টেমে অ্যান্টিবডির বিকল্প খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যানের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দেয়া যায়। অন্যান্য গবেষক এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও অ্যান্টিবডি ছাড়াও দ্বিতীয় ইমিউন মেকানিজমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করলো। অনেক দিন পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো সেই গূঢ় গোবিন্দের। সংক্ষেপে, ইঁদুরের জন্মের পরপরই যদি দেহ থেকে থাইমাস ফেলে দেয়া হয় তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আগের মত থাকলেও সেই ইঁদুর আর ভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারেনা। গ্লিক মুরগীর বার্সা ফেলে দেয়ার ফলে যা হয়েছিলো ঠিক যেন তার বিপরীত হচ্ছে এবার।

মুরগী আর ইদুরে তো অনেক কিছুই হলো, তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কি ঘটলো? চিকিৎসকরা শিশুদের ইমিউনোডেফিসিয়েন্সির কেস গুলোতে দুই ধরনের প্যাটার্ন ধরতে পারলে। এক ধরণের নাম ব্রুটন’স এগামাগ্লোবিউলিনেমিয়া, যাতে আক্রান্তেরা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারেনা কিন্তু ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ন্ত্রন এবং গ্রাফট রিজেক্ট করতে পারে। তাদের অবস্থা বার্সা ফেলে দেয়া মুরগীর মতো। আরেক ধরনের রোগের উদাহরণ ডিগর্গ সিন্ড্রোম যাতে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া কর্মক্ষম থাকলেও ভাইরাসের আক্রমণ কাবু করে দেয় , এদের সাথে থাইমাসবিহীন ইদুরের অবস্থার মিল রয়েছে।

এই সবকিছুই অবশেষে বুঝালো যে মেরুদন্ডী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্বতন্ত্র শাখা রয়েছে। এক শাখার নিয়ন্ত্রক বি-কোষ(B for Bursa)। এর কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি করা। আরেক শাখা, যা অপেক্ষাকৃত জটিল তার নিয়ন্ত্রনে আছে থাইমাস। থাইমাস থেকে যেসব কোষ তৈরি হয়ে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয় তার নাম টি-কোষ। মানুষের ক্ষেত্রে বার্সা না থাকলেও, মুরগীতে বার্সা যা করে স্তন্যপায়ীতে একই কাজ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো যার ফলে শেষ পর্যন্ত বি কোষের নামের সাথে ‘বি’ রেখে দেওয়াতে মানুষ কিংবা মুরগী কেউই মনঃক্ষুন্ন হয়নি।

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

লিখেছেন রুহশান আহমেদ

আমি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক কনটেন্ট তৈরির একজন স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক। শাবিপ্রবি থেকে জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্নাতক ডিগ্রি বাগানোর চেষ্টায় আছি।

রুহশান আহমেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 36 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    এক কথায় দারুণ উপভোগ্য একটা লেখা! তোমার সিরিজের আগের লেখাগুলোর লিঙ্ক দিতে পারো, বা কোন এক জায়গায় সিরিজের সব লেখার লিঙ্ক একসাথে থাকলে ভালো হয়।

    • রুহশান আহমেদ Reply

      ধন্যবাদ ভাইয়া। ইমিউনোলজি নিয়ে আগের লেখাগুলোর লিঙ্কঃ
      1. goo.gl/1a25ZH : অ্যান্টিবডি যেভাবে কাজ করে
      2. goo.gl/iDbvoF : অ্যান্টিবডির ইতিহাস ও গাঠনিক বৈচিত্র্য
      3. goo.gl/zo4BwJ : আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.